ঘামের সুবাসে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন

শ্রমিকের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতে জুলাই বিপ্লব


৮ জুলাই ২০২৬ ২০:৪২

॥ আব্দুল ওয়াদুদ সরদার ॥
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে জুলাই বিপ্লব একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি ছিল কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি নয়; বরং বৈষম্য, অন্যায়, দুর্নীতি ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদ। সেই সাধারণ মানুষের বিশাল অংশ হলো শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী। কারণ রাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকা তারাই ঘোরায়, শিল্পের প্রাণ তারাই, কৃষির শক্তি তারাই, নির্মাণের ভিত্তি তারাই।
তাই জুলাই বিপ্লবের সাফল্য কেবল সরকার পরিবর্তনে নয়; বরং শ্রমিকের জীবন কতটা বদলাবে, তার ওপরও নির্ভরশীল। যদি শ্রমিকের ভাগ্যে ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তবে যে কোনো বিপ্লবই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
শ্রমিক সমাজ বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি
উন্নয়নের প্রতি সেক্টরে শ্রমিকের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু এই অবদানের তুলনায় তাদের প্রাপ্তি বহু ক্ষেত্রে সীমিত। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, কম মজুরি, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় তাদের জীবনকে প্রতিনিয়ত কঠিন করে তোলে।
সাহিত্য আমাদের শেখায়- একজন শ্রমিক কেবল একজন মজুর নয়; তিনি একজন কবি, যিনি হাতুড়ির শব্দে ভবিষ্যতের কবিতা লেখেন। তিনি একজন শিল্পী, যিনি ইস্পাত, মাটি ও কাঠকে সভ্যতার রূপ দেন। তাঁর ঘামই জাতির উন্নয়নের অদৃশ্য কালি।
জুলাই বিপ্লব সেই অদৃশ্য কালিকে দৃশ্যমান করার আহ্বান জানিয়েছে। এই বিপ্লব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়Ñ শ্রমিককে অবহেলা করে উন্নয়নের গল্প লেখা যায় না। উন্নয়নের সেতু নির্মাণকারী যদি নিজেই নিরাপদ আশ্রয় না পায়, তবে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ।
একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা কেবল অর্থনৈতিক দায়িত্ব নয়; এটি নৈতিক দায়িত্বও। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা, স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে উন্নয়নের সুফল কেবল কিছু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
শ্রমিকের প্রত্যাশা শুধু অর্থ নয়; সম্মানও। একজন শ্রমিক যখন নিজের সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারেন, অসুস্থ হলে চিকিৎসা পান, বার্ধক্যে অনাহারে দিন কাটাতে হয় না- তখনই রাষ্ট্র তার প্রতি প্রকৃত দায়িত্ব পালন করে।
জুলাই বিপ্লব নতুন প্রজন্মকে শিখিয়েছে- ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের ঐক্য অপরিহার্য। এই ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে শ্রমজীবী মানুষকে। কারণ শ্রমিকের উন্নয়ন ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়।
আজকের বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতি নতুন সুযোগ তৈরি করছে, আবার নতুন চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করছে। তাই শ্রমিকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি, পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং আধুনিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে সংযুক্ত করার উদ্যোগও সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখায় শ্রমিককে কেবল উৎপাদনের উপাদান হিসেবে নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। রাষ্ট্র, মালিক ও শ্রমিক- এই তিন পক্ষের পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার মাধ্যমেই টেকসই শিল্পায়ন সম্ভব।
সাহিত্যের ভাষায় বলা যায়, শ্রমিকের হাতের তালুতে লুকিয়ে থাকে জাতির আগামী দিনের সূর্যোদয়। তার হাতের কড়া আসলে সংগ্রামের পদক। তার ঘামের প্রতিটি ফোঁটা স্বাধীনতার আরেকটি সংজ্ঞা।
জুলাই বিপ্লব যদি সত্যিকার অর্থে মানুষের বিপ্লব হয়ে থাকে, তবে তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে শ্রমিকের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মানবিক আচরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই সেই পরিবর্তন বাস্তবায়িত হতে পারে।
আজ প্রয়োজন এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে কোনো শ্রমিক ক্ষুধার কারণে সন্তানের মুখের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকবে না; কোনো শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতার শিকার হবে না; কোনো শ্রমিক তার ন্যায্য মজুরি আদায়ের জন্য অপমানিত হবে না।
জুলাই বিপ্লবের প্রকৃত সার্থকতা তখনই আসবে, যখন শ্রমিকের ঘরে আলো জ্বলবে, তার সন্তানের হাতে বই থাকবে, তার পরিবার নিরাপদ থাকবে এবং তার জীবনে মর্যাদার সুবাস ছড়িয়ে পড়বে।
আসুন, আমরা এমন এক সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে শ্রমিকের ঘাম হবে সম্মানের প্রতীক, শ্রম হবে ইবাদতের মর্যাদা প্রাপ্ত, ন্যায়বিচার হবে রাষ্ট্রের অলংকার এবং জুলাই বিপ্লব হবে বৈষম্যহীন মানবিক বাংলাদেশের অনুপ্রেরণার নাম।
শ্রমিকের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ব্যবধান যত কমবে, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা তত শক্তিশালী হবে। কারণ শ্রমিকের হাসিই জাতির হাসি, শ্রমিকের উন্নয়নই দেশের উন্নয়ন, আর শ্রমিকের মর্যাদাই একটি সভ্য রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয়।
জুলাই বিপ্লবকে যদি আমরা কেবল একটি স্মৃতি না বানিয়ে একটি চলমান অঙ্গীকারে রূপান্তর করতে পারি, তবে শ্রমিকের রক্ত-ঘাম, ত্যাগ ও স্বপ্ন একদিন পূর্ণতার ঠিকানায় পৌঁছাবে। সেই দিনই ইতিহাস লিখবে- এই দেশ তার। শ্রমিককে কেবল কাজে নয়, হৃদয়ের সর্বোচ্চ আসনেও স্থান দিয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের ভবিষ্যৎ করণীয়
জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে-
১. শ্রমিকের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা।
২. কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৩. শ্রম আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন এবং শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে ন্যায়সঙ্গত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা।
৪. দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা।
৫. অবসরকালীন ভাতা, স্বাস্থ্যবিমা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করা।
৬. দুর্নীতি, বৈষম্য ও শোষণমুক্ত কর্ম সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
জুলাই বিপ্লবের প্রকৃত শক্তি হবে এমন একটি বাংলাদেশ নির্মাণ, যেখানে শ্রমিককে কেবল উৎপাদনের উপকরণ নয়, বরং উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হবে।
একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন তার আকাশচুম্বী ভবন দিয়ে নয়, বরং শ্রমিকের মুখের হাসি দিয়ে পরিমাপ করা যায়। যে হাত দেশ গড়ে, সেই হাত যেন অভাবে কাঁপতে না থাকে; যে কাঁধ অর্থনীতির ভার বহন করে, সেই কাঁধ যেন অবহেলার বোঝায় নুয়ে না পড়ে- এটাই হোক জুলাই বিপ্লবের অঙ্গীকার।
জুলাই বিপ্লব যদি সত্যিই ন্যায়, সাম্য ও মানবিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠতে চায়, তবে তার প্রথম সফলতা প্রতিফলিত হবে শ্রমিকের জীবনে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সৎকর্ম এবং আত্মীয়-স্বজনকে তাদের প্রাপ্য দেওয়ার নির্দেশ দেন।’ (সূরা আন-নাহল : ৯০)।
এই মহান নির্দেশনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক অঙ্গীকার।
আসুন, আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে অটল থাকি, যেখানে শ্রমিকের ঘাম হবে সম্মানের অলংকার, শ্রম হবে মর্যাদার প্রতীক, ন্যায়বিচার হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং জুলাই বিপ্লব হয়ে উঠবে শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ নির্মাণের এক চিরজাগরূক প্রেরণা। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাবানদের নয়, সৎ শ্রম, ন্যায় এবং মানুষের মর্যাদাকে ধারণকারীদেরই স্মরণ করে।
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা বলো, কাজ করো। অচিরেই আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনগণ তোমাদের কাজ দেখবেন।’ (সূরা আত-তাওবা : ১০৫)।
এই আয়াত শ্রমকে দায়িত্ব, জবাবদিহি ও ইবাদতের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি তার নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো ভক্ষণ করেনি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতের উপার্জন থেকে আহার করতেন।’ (সহিহ আল-বুখারি : ২০৭২)।
এই হাদিস শুধু অর্থনৈতিক নির্দেশনা নয়; এটি শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষার এক অনন্য মানবিক নীতিমালা।
জুলাই বিপ্লব ও শ্রমিকের নতুন প্রত্যাশা
জুলাই বিপ্লবের পর শ্রমজীবী মানুষের মনে নতুন আশার জন্ম হয়েছে। তারা বিশ্বাস করতে চায় যে রাষ্ট্র কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, উৎপাদক মানুষের কল্যাণকেও সমান গুরুত্ব দেবে।
তাদের প্রত্যাশা
১. ন্যায্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি।
২. নিরাপদ শিল্পকারখানা ও কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি।
৩. শ্রমিকবান্ধব আইন বাস্তবায়ন।
৪. চিকিৎসা ও আবাসনের নিশ্চয়তা।
৫. দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করা।
৬. অবসরে সামাজিক নিরাপত্তা।
একটি বিপ্লবের সাফল্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষের জীবনমান উন্নত হয়। শ্রমিক যদি আগের মতোই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে, তবে বিপ্লবের অর্জন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
প্রাপ্তির বাস্তবতা
বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে এগিয়ে চলেছে। শিল্পায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং রপ্তানি খাতের বিকাশে শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। তবুও বাস্তবতার আয়নায় দেখা যায়, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে এখনো একটি ব্যবধান রয়ে গেছে।
শ্রমিকের ঘাম জাতির অমূল্য সম্পদ
এক ফোঁটা ঘাম যখন মাটিতে পড়ে, তখন শুধু মাটি ভেজে না; ভবিষ্যতের বীজও সিঞ্চিত হয়। শ্রমিকের ঘামের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জাতীয় সমৃদ্ধির সম্ভাবনা।
কবি যেমন কলম দিয়ে ইতিহাস লেখেন, শ্রমিক তেমনি হাতুড়ি, কোদাল, সুঁই, মেশিন ও লাঙল দিয়ে ইতিহাস নির্মাণ করেন। তার নাম হয়তো পাঠ্যপুস্তকে লেখা থাকে না, কিন্তু তাঁর শ্রম ছাড়া কোনো সভ্যতার ইতিহাস পূর্ণ হয় না।
তাই জুলাই বিপ্লবের প্রকৃত চেতনা হবে এমন এক সমাজ নির্মাণ, যেখানে শ্রমিককে কেবল উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের সম্মানিত অংশীদার হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে।
লেখক : সাংবাদিক, শ্রমিক নেতা।