আসুন, কৃষকবান্ধব দেশ গড়ি
৬ মে ২০২৬ ১৮:১২
অতিবৃষ্টি এবং ভারতের পানি শোষণনীতির শিকার বাংলাদেশের কৃষকরা। উজানের নদীগুলোয় বাঁধ দিয়ে প্রয়োজনের সময় পানি আটকে রাখে। বন্যার সময় বিনা অনুমতিতে বাঁধ ছেড়ে দিয়ে পাকা ফসল ডুবিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির সর্বনাশ করে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ভারতীয় ঢল ও অতিবৃষ্টিতে দেশের উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জসহ দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কৃষকদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আধাপাকা ধানসহ উঠতি ফসল তলিয়ে গেছে। সরকার তাদের পাশে না দাঁড়ালে এ ক্ষতি তারা কোনোদিন পূরণ করতে পারবে না।
আমরা জানি, মানুষের বেঁচে থাকার সাথে কৃষির সম্পর্ক। তাই কোনো বুদ্ধিমান জাতি শিল্পোন্নয়নের নামে কৃষিকে অবহেলা করে না। এশিয়ায় শিল্প ও বাণিজ্যে অগ্রসর দেশগুলোর মধ্যে নিঃসন্দেহে জাপান শীর্ষে। কিন্তু তারা কৃষিকে সবসময় গুরুত্ব দেয়। তারা মনে করে, কৃষির সম্পর্ক দেশের সার্বভৌমত্বের সাথে। কারণ কৃষি থেকে আসে খাদ্য। খাদ্যদ্রব্য আমদানিনির্ভর হয়ে দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি এলে তা কাটানো কঠিন। তাই জাপানে চাল আমদানি খরচ দেশীয় উৎপাদনের চেয়ে কম হওয়া সত্ত্বেও দেশটি প্রচুর পরিমাণে চাল উৎপাদন করে। জাপান প্রচুর ভর্তুকি দিয়ে কৃষি ব্যবস্থা সচল রেখেছে। তাদের কৃষি খাতকে গুরুত্ব দেয়ার কারণ যতটা না অর্থনৈতিক, তার চেয়ে বেশি সামরিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক কৌশলগত। তাদের নেতাদের যক্তি হলো, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা বা যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে যাতে খাদ্যাভাব না হয়, সেজন্য তারা নিজেরা চালসহ কৃষিতে স্বনির্ভর থাকতে সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
আমাদের বাংলাদেশের মতো জাপানিদের প্রধান খাদ্য ভাত। তারা মনে করে, ধান চাষ জাপানি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে গভীরভাবে মিশে আছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে পরিচিত হলেও এ খাত সবচেয়ে অবহেলিত। আমাদের অবহেলার সুযোগ নিচ্ছে আগ্রাসী প্রতিবেশী দেশ ভারত। তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার বাংলাদেশ। ভারত রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল হিসেবেও বাংলাদেশের এ দুর্বলতা কাজে লাগায়। বিগত দেড় দশক ভারতের অনুগত হাসিনা সরকারের সময় আমরা দেখেছি, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্য রফতানির চুক্তি করেও নিজস্ব চাহিদা পূরণের অজুহাতে পণ্য বাংলাদেশে পাঠায়নি। আমাদের বাজার অস্থির করার এ অপকৌশলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকিতে ফেলেছে। এতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। ৩৬ জুলাই বিপ্লবের পর প্রমাণ হয়েছে, দেশের চাহিদা পূরণের মতো পেঁয়াজ আমাদের কৃষকরাই উৎপাদন করার সামর্থ্য রাখেন। শুধু প্রয়োজন সরকারের সঠিক আমদানিনীতি ও কৃষকবান্ধব মানসিকতা। কিন্তু আমাদের সরকারগুলো বারবার এক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তবে আশার কথা হলো, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার এখন ক্ষমতায়। দায়িত্বশীল বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিন মাসের জন্য হাওর অঞ্চলের কৃষকদের সাহায্য করার ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা মনে করি, শুধু হাওর নয়, সারা দেশের কৃষকদের পাশেই দাঁড়াতে হবে। প্রকৃত ও ক্ষতিগ্রস্ত একজন কৃষকও যেন এ সাহায্য থেকে বাদ না পড়ে তা নিশ্চিত করতে হবে। সাথে সাথে কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে- স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ ও দুর্নীতির কবলে পড়ে যেন এ মহতি উদ্যোগ ‘গোদের ওপর বিষফোড়া’ না হয়। কারণ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। এমন অবস্থায় কৃষি সহায়তার মতো প্রকল্পে দুর্নীতি হলে তাতে এ সঙ্কট শুধু বাড়াবেই না, রীতিমতো বিপদ ডেকে আনবে। তাই আমরা আশা করি, কৃষি খাত ও কৃষকদের পাশে সবসময় সরকার ও বিরোধীদল মমতার হাত প্রসারিত রাখবে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে কৃষিপণ্য উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেবে। এতে বাংলাদেশ কৃষিতে শুধু স্বনির্ভর হবে না, এদেশের কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বের দেশে দেশে। অতএব আর অবহেলা নয়, কৃষি খাতকে শক্তিশালী করতে আসুন, একসাথে কাজ করি; কৃষকবান্ধব দেশ গড়ি।