জাপা বিলীন


১২ মার্চ ২০২৬ ০৯:৪৫

দায়ী আওয়ামী লীগ নাকি নিজেরাই?

॥ এম গজনবী ॥
সাবেক স্বৈরশাসক মরহুম জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি (জাপা) আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে পরিচিত। চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ঘটলে তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। তার মতো দলটির অনেক নেতা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। কিন্তু আওয়ামী দোসর জাতীয় পার্টির কোনো নেতা দেশ থেকে না পালালেও ছাত্র-জনতার রোষানলে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মতো জাতীয় পার্টির চিহ্নিত অনেক নেতাও আত্মগোপনে চলে যান। তবে দলটির বর্তমান চেয়ারম্যান এরশাদের ভাই জিএম কাদের জুলাইযোদ্ধাদের প্রতি সমর্থন জানালেও হালে পানি পাননি। অফিস খুলে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছেন। জুলাইযোদ্ধাদের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ হয়েছে। দাবি ওঠে আওয়ামী দোসর হিসেবে জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করতে হবে। ফ্যাসিস্ট দল হিসেবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলে জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হবে না কেন? সর্বশেষ দাবি উঠেছিল জাতীয় পার্টি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। এ দাবির জবাবে জিএম কাদের বলেছিলেন, দেশের অন্তত ৩৫ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির পক্ষে। এ বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে দেশে কোনো নির্বাচন হতে পারে না। তার কথা ধোপে টেকেনি। দেশে নির্বাচন ঠিকই হয়েছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে। প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার শেষ পর্যন্ত জাপাকে নিষিদ্ধ করেনি। যে কারণে দলটি নির্বাচনে অংশ নেয়।
মুখ ফিরিয়ে নিল রংপুরের মানুষ : শেষ পর্যন্ত দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশ নিয়েছে জাতীয় পার্টি। নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলটির ভরাডুবি হয়েছে। ১৯২টি আসনে নির্বাচন করে একটিতেও জয়ী হতে পারেনি। দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের নিজেই বিপুল ভোটের ব্যবধানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছে। রংপুর জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে খ্যাত। এরশাদের বাড়ি রংপুরে। যে কারণে এই জেলার মানুষ অতীতে জাপার লঙ্গল প্রতীকে ভোট দিয়ে জয়ী করেছে। কিন্তু এবার রংপুরের মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। রংপুরে মোট ৬টি আসন। ৬টি আসনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীই ৫টিতে জিতেছে। আরেকটিতে জিতেছে তরুণদের দল এনসিপি। এনসিপিও আবার জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করেছে। জিএম কাদের দাঁড়িয়েছিলেন রংপুর-৩ আসনে। রংপুর-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল। তিনি এক লাখ ৭৫ হাজার ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির প্রার্থী। আর জিএম কাদের তৃতীয় হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ৪৩ হাজার ভোট। অথচ একসময় রংপুর ছিল জাতীয় পার্টির ঘাঁটি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল এরশাদ রংপুরে নির্বাচন করে কখনো হারেননি। ৯১ সালের নির্বাচনে এরশাদ জেলে থেকে ৫টি আসনে নির্বাচন করে সব কয়টিতে জয়ী হন। জেনারেল এরশাদের স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদ জিএম কাদের তারা সকলে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছেন। কিন্তু এবার রংপুরের মানুষ তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
শুধু রংপুর জেলাই নয়, বৃহত্তর রংপুর বিভাগের অবস্থাও একই। এই বিভাগে মোট ৩৩টি আসন। এখানে জাপা ৩০টিতে প্রার্থী দিয়েছিল। সব আসনে ভরাডুবি হয়েছে। এবারের মতো আগের নির্বাচনগুলোয় এমন করুণ পরিণতি হয়নি। দেখা গেছে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে রংপুর বিভাগ থেকে জাপা ১৭টি আসন পেয়েছিল। ওই সময়টা ছিল তাদের জন্য সবচেয়ে খারাপ সময়। ৯০ সালের গণআন্দোলনে এরশাদের পতন ঘটে। এমন দুর্দিনের মধ্যে নির্বাচন করে দলটি সারা দেশে মোট ৩৫ আসন পেয়েছিল। জেনারেল এরশাদ জেলে থেকে পাঁচটি আসনে নির্বাচন করে পাঁচটিতেই জিতে যান। ’৯৬ সালের নির্বাচনে ২১টি, ২০০১ সালের ১৪টি, ২০০৮ সালে ১২টি, ২০১৮ সালে ৭ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে রংপুর বিভাগ থেকে ৩টি আসন পায়। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচন করলেও রংপুরের বাকি আসন আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর দখলে নিল জামায়াতে ইসলামী।
জামায়াতের দখলে জাপার দুর্গ : স্বৈরশাসক এরশাদ সাড়ে ৯ বছরের মতো ক্ষমতায় ছিলেন। ’৯০ সালে গণআন্দোলনে এরশাদের পতন ঘটে। এরপর থেকে দল আর ক্ষমতায় যেতে পারেনি। তবে বিদায়ী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোট করে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব নিয়েছিল। ক্ষমতার অংশীদারিত্ব হিসেবে জাপা থেকে দুজনকে মন্ত্রী পরিষদে স্থান দেওয়া হয়েছিল। জেনারেল এরশাদ হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা। এরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে অংশ নেয়। এই তিন নির্বাচনে উত্তরবঙ্গ; বিশেষ করে রংপুরে জাপার আসনে ভাগ বসায় আওয়ামী লীগ। সর্বশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে রংপুরের ৬টি আসনের মধ্যে মাত্র তিনটি দখলে রাখতে পেরেছিল। বাকিগুলো আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়।
কিন্তু এবার ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ফলাফল হলো উল্টো। ৬টির মধ্যে ৫টিতে জামায়াত জিতেছে। বাকি একটিতে জিতেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এনসিপি জামায়াতের জোটের শরিক দল। জামায়াত সংশ্লিষ্ট একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলেছে, সাবেক স্বৈরাচার এরশাদ এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দলকে রংপুরের মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের আমলে রংপুরে কোনো উন্নয়ন হয়নি। শুধু রংপুর জেলা নয়, পুরো বিভাগে কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। ফলে মানুষ পরিবর্তনের জন্য জামায়াতে ইসলামীর জনপ্রতিনিধিকে বেছে নিয়েছে। জনগণ বিএনপির প্রার্থীকেও ভোট দেয়নি। সূত্র আরো জানায়, অতীতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি সরকারে ছিল। তাদের শাসনামল জনগণ দেখেছে। তাই জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখতে রংপুরের মানুষ জামায়াতকে ভোট দিয়েছে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। কিন্তু কৌশলে জামায়াতকে ক্ষমতায় যাওয়া থেকে ঠেকিয়ে দিলেও রংপুরে সেটি পারেনি। রংপুরের মানুষ জিতে গেছে।
রংপুর বিভাগে জামায়াতের অভূতপূর্ব বিজয় প্রসঙ্গে লালমনিরহাটের জাতীয় পার্টির এক নেতা এ প্রতিনিধিকে বলেন, জিএম কাদেরের একক নেতৃত্ব এবং কর্তৃত্ব দলকে ক্ষতি করেছে। তারপর নির্বাচনে অংশ নেবে কি-না, তা নিয়ে দ্বন্দ্বের মধ্যে ছিল। ‘আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি ছাড়া এ দেশে নির্বাচন হবে না’- জিএম কদেরের এমন বক্তব্য নির্বাচনকে ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। তিনি বলেন, নেতায় নেতায় দ্বন্দ্ব, দলীয় কোন্দল; বিশেষ করে রওশন এরশাদ এবং জিএম কাদেরের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের হতাশ করেছে। এজন্য জাতীয় পার্টির ভরাডুবি হয়েছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বেঁচে থাকলে এমনটা হতো না। রংপুর-৩ আসনের জাতীয় পার্টির একনিষ্ঠকর্মী কবির হোসেন বলেন, পুরো রংপুর বিভাগ জাতীয় পার্টির ঘাঁটি। এই ঘাঁটি বিনষ্টের জন্য একমাত্র দায়ী জিএম কাদের। দলের ক্ষমতা নিজের হাতে ধরে রাখার জন্য অনেক ত্যাগী নেতাকে বিনা কারণে শোকজ করে দল থেকে বের করে দিয়েছেন। যারা ভোটের জন্য তৃণমূলে লড়াই করবেন তারা কেউ দলে নেই। যারা আছেন তারা, গা বাঁচিয়ে চলছেন। ফলে জামায়াত ও বিএনপির বিপরীতে শক্তিশালী প্রচারণা ছিল না। তাছাড়া জিততে পারবেন না আঁচ করতে পেরে কর্মীদের পেছনে প্রয়োজনীয় টাকাও খরচ করেননি। ফলে ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছে।
আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি : আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট না বাঁধলে জাতীয় পার্টিতে এতো বড় ধস নামতো না- এমন ধারণা শুধু রাজনৈতিক মহল নয়, খোদ দলটির ভেতর থেকেই উঠেছে। জাতীয় পার্টি ঢাকা মহানগর কমিটির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, ৯০ এর আন্দোলনে দলের পরাজয় হলেও সাংগঠনিক ভিত মজবুত ছিল। মিজানুর রহমান চৌধুরী, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, কাজী জাফর আহমেদ, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মতো বাঘা বাঘা নেতা জাতীয় পার্টিতে ছিলেন। জেনারেল এরশাদ এদের নিয়ে দল চালিয়েছেন। ক্ষমতায় না থাকলেও সারা দেশে সাংগঠনিক ভিত ছিল মজবুত। কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোট করার কারণে বাঘা নেতারা জাপা ভেঙে আলাদা দল গঠন করেন। অনেকে আবার আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে ভিড়ে যান। এরশাদ আওয়ামী লীগের খপ্পরে পড়ে যান। এটা সত্য যে তিনি আওয়ামী বলয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেও পারেননি। তার বিরুদ্ধে থাকা মামলার ভয় দেখিয়ে মূলত আওয়ামী লীগই তাকে বেঁধে রাখে। ওই নেতা আরো বলেন, এরশাদের সম্পদের ভাগ-বাঁটোয়ারা, তার মৃত্যুর পর দলের দায়িত্বে কে থাকবেন- তার স্ত্রী রওশন না তার ভাই জিএম কাদের, বিদিশা এরশাদ ইস্যুসহ নানা কারণে দলের মধ্যে সংকট তৈরি হয়। যে সংকট মীমাংসা করার ক্ষমতা দলের কোনো নেতার হাতে ছিল না। এরশাদের এসব দুর্বলতার সুযোগকে কাজে লাগায় আওয়ামী লীগ। ফলে জেনারেল এরশাদ আওয়ামী বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জাপাপন্থী এক আইনজীবী বলেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতায় যাওয়ার লালসা ছিল বেশি। তার ভেতরে আবার মামলার ভয় কাজ করতো। কারণ আওয়ামী লীগ সরকার তখন তার বিরুদ্ধে আদালতে থাকা সকল মামলা তুলে নেয়নি। যে কারণে মামলার ভয় থাকায় আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য হন। তখন অভিযোগ ওঠে গোয়েন্দাদের নিয়ে তাকে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করা হয়।
আওয়ামী লীগের ঘাড়ে দোষ চাপানোর ব্যাপারে জানতে চাইলে গা-ঢাকা নিয়ে থাকা ঢাকা মহানগর যুবলীগের একজন নেতা এ প্রতিনিধিকে বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সে সময় জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগ মহাজোট করেছিল। মহজোটে শুধু জাপা নয়, অন্য দলও ছিল। এমনকি মহাজোটে বামপন্থীদের ১৪ দলও ছিল। সকল দল তাদের প্রয়োজনে জোট করেছিল। আওয়ামী লীগ কাউকে জোর করে জোটে আনেনি। আবার সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে। এ নির্বাচনও জাতীয় পার্টি তাদের দলীয় সিদ্ধান্তে অংশ নিয়েছে। নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভরাডুবি হয়েছে। এমন পরাজয়ের জন্য তারাই দায়ী। সুতরাং জাতীয় পার্টি বিলীন হওয়ার পেছনে দোষ জাতীয় পার্টিরই।