সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিনির্মাণে আমীরে জামায়াতের স্বপ্ন
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৯
॥ জামশেদ মেহদী ॥
সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একদিন পর ১৩ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান এ নির্বাচন সম্পর্কে বলেন, নির্বাচনে বড় রকমের অনিয়ম হয়েছে। যথাসময়ে প্রতিকার চাই। তিনি জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নির্বাচন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য প্রসঙ্গে ওপরে উল্লিখিত মন্তব্য করেন। এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিল ১১ দলীয় নির্বাচনী জোট। এর একদিন পর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রোববার জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, গণভোটের সংস্কার পুরোপুরি মানতে হবে। ঐ দিন কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার বালখিলা ফেরিঘাটে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, দেশ সংসদ থেকেই পরিচালিত হবে। সংসদে একটি দল থাকবে সরকারে, আরেকটি দল থাকবে বিরোধীদলে। এক চাকায় কোনোদিন গাড়ি চলে না। গাড়ি চলতে হলে দুটি চাকা লাগে। তিনি আরো বলেন, সরকারি দল ইতিবাচক কাজ করলে তাদের সহযোগিতা করবো। তবে জনস্বার্থ বিঘ্নিত হলে জামায়াত জনগণের পক্ষে অবস্থান নেবে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার জামায়াত আমীর বলেন, সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে বিএনপি গণঅভ্যুত্থানকে অবজ্ঞা করেছে। এতে জনআকাক্সক্ষার বিপরীতে তারা অবস্থান নিয়েছে বলে আমরা মনে করি। তিনি বলেন, সংস্কারের বিপরীতে তাদের অবস্থান সুস্পষ্ট।
জামায়াতসহ ১১ দলকে সংসদ সচিবালয় থেকে যে পত্র বা চিঠি দেওয়া হয়েছিল, সেখানে দুটি শপথের কথা উল্লেখ ছিল। তিনি বলেন, চিঠিতে বলা হয়েছিল, সংসদ সদস্য হিসেবে তারা প্রথমে শপথ নেবেন। সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আরেকটা শপথ হবে। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা হলে প্রবেশ করার পর সংসদ সচিব আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার, সকালবেলা সরকারি দলের তারা শপথ নিয়েছেন। তারা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আপনারা কী করবেন?’ আমরা তখন বললাম, আমরা দুটিরই শপথ নিতে এখানে এসেছি। জামায়াতসহ ১১ দলের সংসদ সদস্যরা কেন দুটি শপথ নিতে এসেছেন, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জামায়াত আমীর বলেন, ‘আমরা মনে করি যে, ২৬-এ কোনো নির্বাচন হওয়ার কথাই ছিল না। এই ২৬ সালের নির্বাচনটা হয়েছে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের কারণে।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ইংরেজি ‘ডেইলি স্টার’র প্রথম পৃষ্ঠায় ডাবল কলামে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম, “Will be in JS, on the streets/Shafiqur says Jamaat accepts outcome.” বঙ্গানুবাদ : আমরা জাতীয় সংসদেও থাকবো, রাজপথেও থাকবো- বলেন জামায়াত আমীর শফিকুর। আলোচ্য সংবাদে তিনি আরো বলেন, “The Jamaat-e-Islami-led 11-Party Alliance will jointly pursue a dual strategy … acting as an opposition in parliament and in street protests … while seeking legal redress over alleged irregularities in the 13th parliamentary election, the coalition said yesterday.
Jamaat Assistant Secretary General Hamidur Rahman Azad announced the decisions at a briefing at the party’s central office in Moghbazar, Dhaka, following a meeting of the alliance’s liaison committee.
The alliance would act as a constructive opposition in parliament, but if lawful avenues are blocked, the option of taking to the streets would remain open, he said.” বাংলা অনুবাদ : জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সম্মিলিতভাবে দ্বিমুখী কৌশল ব্যবহার করবে। সেটি হলো, বিরোধীদল হিসেবে সংসদের অভ্যন্তরে কাজ করা এবং রাজপথে থাকা। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে যেসব অনিয়ম হয়েছে সেসব অনিয়মের প্রতিকার হিসেবে এই দ্বৈত ভূমিকা পালন করা হবে।
জোটের লিয়াজোঁ কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করার সময় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ উপরোক্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, জোট পার্লামেন্টে গঠনমূলক বিরোধীদল হিসেবে তার ভূমিকা পালন করবে। তবে আইনগত পথ যদি অবরুদ্ধ করা হয়, তাহলে রাজপথে আসার পথ খোলা থাকবে।
উল্লেখ করা যেতে পারে, জামায়াত জোট অভিযোগ করেছে যে, সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে ৩২টি আসনে ভোট জালিয়াতি করা হয়েছে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ‘সংগ্রামের’ রিপোর্ট মোতাবেক স্বল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত আসনগুলোর ভোট জালিয়াতি তদন্ত করতে ৩২ আসনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নির্বাচন কমিশনে দাখিল করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ভোট কারচুপি, নির্বাচনী এজেন্টদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা ও কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, জাল ভোট প্রদান, কালো টাকার ব্যবহার এবং কোথাও কোথাও হুমকি-ধমকি ও সহিংসতার ঘটনা। হামিদুর রহমান আযাদ আরো বলেন, মাঠপর্যায়ে দায়ের করা একাধিক অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি। কিছু কেন্দ্রে কর্তব্যরত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যালটে সিল মারার অভিযোগ রয়েছে। দলীয় কর্মীদের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগে এসেছে। ভোটগ্রহণকালে ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে ভোটার উপস্থিতি কম ছিল বলে আমরা মনে করি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং ১১ দলীয় জোট আরো অনেক অভিযোগ করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে গণনার সময় তাদের এজেন্ট বের করে দেওয়া, যাদের থাকতে দেওয়া হয়েছে, তাদের নিষ্ক্রিয় করে রাখা, রেজাল্ট শিট কাটাছেঁড়া ও ওভাররাইটিং করা, অনেক ক্ষেত্রে এজেন্টদের স্বাক্ষর না নিয়েই ফলাফল ঘোষণা করা। অভিযোগ করা হয়েছে যে, ঢাকা-৬ আসনের একটি রেজাল্ট শিট পেন্সিলে লেখা হয়েছে। ঢাকা-১৩ আসনে আল্লামা মামুনুল হক সুনিশ্চিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার এগিয়ে থাকা রেজাল্ট ঘোষণা অকস্মাৎ থামিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রায় ৪ ঘণ্টা পর ঘোষণায় ববি হাজ্জাজকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। এছাড়া জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের আসনে ভোট টেম্পারিং এবং ঢাকা-৮ আসনে নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারীর বেলায় খোদ পাটোয়ারীর ওপর হামলা এবং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই সমস্ত অভিযোগ যথাসময়ে নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া হয়েছে এবং ভোট পুনর্গণনার আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু কমিশন এখানে চরম পক্ষপাতিত্ব করে তাড়াহুড়া করে অফিসিয়াল ফলাফল ঘোষণা করেছে- যাতে করে ভোট পুনর্গণনা করার দাবিকে এবং সময়কে ধামাচাপা দেওয়া যায়।
দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং ঋণখেলাপির বিষয়ে সংবিধানে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তাদের নির্বাচন করতে দেওয়া হয়েছে। এভাবে দেখা যায় যে, ঋণখেলাপি এবং দ্বৈত নাগরিক মিলে সংবিধান লঙ্ঘন করে অন্তত ৪২ জনকে নির্বাচন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতকিছুর পরও জামায়াত বলেছে যে, তারা জাতীয় সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে চায় এবং রাজপথে নিয়মতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করতে চায়।
১১ দলীয় জোট মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান বর্জন করলেও জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন যে, জাতীয় সংসদে তারা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন। তিনি বলেন, জনগণ বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু ভোট দেওয়ার পরের অধ্যায়টি ছিল অস্পষ্ট। সেখানে বেশকিছু অনিয়ম ঘটেছে। তারপরও সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেইসাথে আমরা এই অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছি যে, অতীতের কথাগুলো অতীত ধারায় নয়; বরং একটি সুষ্ঠুধারার রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও আমাদের সঙ্গীয় দলগুলোর সংসদ সদস্যরা আছেন, আমরা দায়িত্বশীল বিরোধীদল হিসেবে দায়িত্ব পালন করবো। তিনি আরো বলেন, আমরা সরকারি দল না বিরোধীদল, সেটা আমাদের কাছে বড় বিবেচ্য বিষয় না। বরং একেকজন সংসদ সদস্য কতটুকু দায়িত্বশীলতার সাথে তারা জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করলেন, মানুষের হারিয়ে যাওয়া অধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য লড়াই করলেন, সেটাই আমাদের কাম্য। বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে সর্বত্র ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। এ জায়গাগুলোয় অবশ্যই আমরা দায়িত্বশীল বিরোধীদল হিসেবে দায়িত্ব পালন করবো, ইনশাআল্লাহ। আমরা সংসদে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে থাকতে চাই। আমরা যদি দায়িত্বশীল আচরণ করি, তাহলে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি শনিবার জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান একটি পোস্ট দিয়েছেন। ঐ পোস্টে তিনি বলেন, ‘বিএনপি জোট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন অর্জন করেছে। আমরা এই ফলাফলকে স্বীকৃতি দিই এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে সম্মান করি।’
তাঁর পোস্ট তিনি শেষ করেন এই স্তবকটি লিখে, ‘এটি এমন একটি মুহূর্ত, যখন পরিপক্বতা ও জাতীয় দায়িত্ববোধের প্রয়োজন। আসুন, আমরা শান্ত ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে সামনে এগিয়ে যাই। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করি, জনগণের ইচ্ছাকে সম্মান করি এবং এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার কাজ অব্যাহত রাখি, যেখানে ক্ষমতার প্রয়োগ করা হয় সততা, সংযম ও জবাবদিহির সঙ্গে।’’
জামায়াতের আমীর ৫ আগস্ট জুলাই বিপ্লবের পর থেকেই শুধুমাত্র একজন সজ্জন ব্যক্তি নন, একজন রীতিমতো ক্যারিশম্যাটিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এককভাবে জামায়াতের ৬৮টি আসন লাভ যেমন জনমতের প্রতিফলন, তেমনি নেতা এবং জামায়াত কর্মীদের অক্লান্ত ও আন্তরিক প্রচেষ্টার ফল। ওপরে আগামী ভবিষ্যতের জন্য জামায়াত নেতৃত্ব বর্তমান সরকারের সততা ও সুবিবেচনার উদ্বোধন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বিগত ১০ দিনের সরকারি পারফরম্যান্স তার স্বাক্ষর বহন করে না। চাঁদাবাজি সম্পর্কে সেতুমন্ত্রী রবিউল ইসলামের ব্যাখ্যা, ইনকিলাব জিন্দাবাদ সম্পর্কে বিদ্যুৎমন্ত্রীর নব আবিষ্কার এবং সিভিল মিলিটারি ও বিচার বিভাগে ঊর্ধ্বতন মহলে কিছু রিসাফল একটি বিশেষ দিক ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও একটি ক্রান্তিকালে উপনীত হয়েছে বলে মনে হয়।
প্রার্থনা করি, আমীরে জামায়াতের সুস্থ রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ধারা বিনির্মাণে স্বপ্ন যেন স্বপ্নই থেকে না যায়।
Email:jamshedmehdi15@gmail.com