মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনাকে এবার প্রকাশ্যে মাঠে নামিয়েছে ভারত


২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৭

॥ জামশেদ মেহদী ॥
আজ ৩০ জানুয়ারি। নির্বাচনের আর মাত্র ১১ দিন বাকি। ভারত তার প্রচারযন্ত্র এবং ভারতে ও বাংলাদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগারদের মাধ্যমে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, প্রথমে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে। তারপর চেষ্টা করেছে নির্বাচন ভণ্ডুল করতে। এ নির্বাচন ভণ্ডুল করার জন্য চাণক্য বুদ্ধির ভারতীয় নেতৃত্ব হেন কূটচাল চালেনি, যা দিয়ে বাংলাদেশে একটি বড় গোলমাল পাকানো যায়। তারা বারবার সশস্ত্র সংঘাতের উসকানি দিয়েছে। দিল্লি ও কলকাতার গণমাধ্যম এবং একশ্রেণির মুসলিমবিরোধী হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে বারবার উসকানি দিয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান উপেন্দ্র দ্বিবেদীর দাবি তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের সাথে। টেলিভিশনে এবং ভারতীয় পত্রপত্রিকায় উসকানি দেওয়া হয়েছে জেনারেল ওয়াকারকে- যাতে করে তিনি একটি সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ড. ইউনূস সরকারকে হটিয়ে দেন। জেনারেল ওয়াকার ভারতের এ প্রচারণা এবং উসকানির ফাঁদে
পা দেননি।
চতুর্দিকে ব্যর্থতার কালো ছায়া দেখে অবশেষে নরেন্দ্র মোদি শেষ তাসটি খেলেছেন। এবার সরাসরি শেখ হাসিনাকে মাঠে নামিয়ে দিয়েছেন। পাঠক ভাইয়েরা দেখেছেন, বিগত ১৬ মাস ধরে হাসিনা বহু অডিওক্লিপিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে অবস্থানরত লুকিয়ে থাকা আওয়ামী লীগারদের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামার জন্য উসকানি দিয়েছেন। কিন্তু তার কোনো কথাতেই চিড়া ভেজেনি। তাই এবার মরিয়া হয়ে দিল্লিতে বিদেশি সংবাদদাতাদের সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে অডিও বক্তৃতা করার অনুমতি দিয়েছে ভারত সরকার।
ভারতের এ অনুমতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। দিল্লিতে দেওয়া ওই বক্তব্যে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ সরকারের পতনের আহ্বান জানান এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচন বানচালের লক্ষ্যে সহিংস ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়ানোর উসকানি দেন বলেও অভিযোগ করেছে ঢাকা। গত ২৫ জানুয়ারি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, গত ২৩ জানুয়ারি শুক্রবার নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং তার দলীয় অনুসারী ও সাধারণ জনগণকে নির্বাচন ভণ্ডুল করতে সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়ানোর আহ্বান জানান। বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ এ ঘটনায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
বাংলাদেশ সরকার বলছে, দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত আনার জন্য বারবার অনুরোধ জানানো হলেও ভারত এখনো সে দায়িত্ব পালন করেনি। উল্টো নিজ ভূখণ্ডে তাকে এমন উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের এই বেপরোয়া উসকানি প্রমাণ করে, কেন অন্তর্বর্তী সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের দিনে সংঘটিত যেকোনো সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য সরকার আওয়ামী লীগকে দায়ী করবে এবং তাদের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, দিল্লিতে বিদেশি সংবাদদাতাদের ক্লাবে বক্তৃতা করা ছাড়াও শেখ হাসিনা এরই মধ্যে ভারতের নিউজ পোর্টাল ‘দি প্রিন্টে’ একটি বড় সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এছাড়া তিনি ‘রয়টার্সের’ সাথে কথা বলেছেন। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে দিল্লি বিদেশি সংবাদদাতাদের ক্লাবে প্রদত্ত তার অডিও বক্তৃতা। সেই বক্তৃতাটি এতই আপত্তিকর ছিলো যে, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাধ্য হয়েছে এ ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানায়।
ভারতীয় গণমাধ্যম এত কথা বলে, কিন্তু তারা একথাটা বলে না যে, শেখ হাসিনাকে কোনো সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরানো হয়নি। তাকে বন্দুকের নলের মুখেও কেউ গণভবন থেকে বের করে দেয়নি। যেভাবে তাকে পালাতে হয়েছে, সেই কাহিনী পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। মাত্র ১৭ মাস আগের কথা। ১ লাখ, ২ লাখ নয়, লাখ লাখ মানুষ বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে ধেয়ে আসছিলেন ঢাকা মহানগরীতে। তাদের চূড়ান্ত গন্তব্য ছিলো গণভবন। শেখ হাসিনা চেয়েছিলেন সেনাবাহিনী এবং তার অফিসিয়াল গার্ড রেজিমেন্ট এসএসএফ গুলি করে কয়েক হাজার মানুষকে ফেলে দিক। তাহলে ঢাকা অভিমুখে ধেয়ে আসা মানুষের কাফেলা পিছু হটবে।
কিন্তু জেনারেল ওয়াকার শেখ হাসিনার অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও এবং শেখ হাসিনার হাত দিয়েই তার প্রধান সেনাপতি হওয়া সত্ত্বেও তিনি বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছিলেন যে, হাজার হাজার মানুষকে গুলি করলেও গণভবন অভিমুখী ৪০-৫০ লাখ মানুষকে কোনোভাবেই থামানো যাবে না। সুতরাং তিনি বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেন এবং জনগণের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে অবস্থান গ্রহণ থেকে বিরত রাখেন। সেদিন যদি পলায়ন করতে আর ৪৫ মিনিট দেরি হতো, তাহলে শেখ হাসিনার ভাগ্যে কী লেখা হতো, সেটা ধীমান ব্যক্তিরা ঠিকই বুঝতে পারেন।
শুধু তো শেখ হাসিনা এবং কয়েকজন দুর্নীতিবাজ আওয়ামী লীগার পালাননি। সারা দেশে আওয়ামী লীগের লোকজন যে যেখানে ছিলেন, সেখানেই তিনি অপরাধের শাস্তি এড়াতে আত্মগোপনে যান। আর যারা সুযোগ পান, তারা পালিয়ে ভারত যান। ভারত বুঝতে পারছে না যে, তারা যত চেষ্টাই করুক, শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের দিন শেষ। তারা আর কোনোদিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরতে পারবে না।
বিচার-আচারের পর যারা শাস্তিমুক্ত হবেন, তারা যদি তওবা করেন এবং সোজা পথ অনুসরণ করার ওয়াদা করেন, একমাত্র তখনই আওয়ামী লীগের অবশিষ্টাংশ এদেশে রাজনীতি করার সুযোগ পাবেন। সেটাও ‘দিল্লি হনুজ দূর অস্ত’।
দিল্লির এই উদ্ধত কাজ অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যদের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া (যিনি সংক্ষেপে আইকেবি বলে পরিচিত) তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বলেন, এ ঘটনা প্রমাণ করে, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে ইন্ডিয়া বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে, যা আমাদের সার্বভৌমত্বে বিজেপি সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপ। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়বে এবং ইতোমধ্যেই অবনতিশীল সম্পর্কটি আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা কারো জন্যই মঙ্গলজনক নয়। শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের বিরোধের মূল বিষয় হলো- ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন, হত্যাযজ্ঞ ও জাতীয় সম্পদ লুটপাটের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা। শীর্ষ অপরাধীদের বড় অংশই দেশ ছেড়ে পালিয়েছে! তাদের অনেকেই প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিয়েছে, আর ইন্ডিয়াও তা অবারিতভাবে হতে দিয়েছে ও দিচ্ছে।
জেনারেল ভূঁইয়া সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান এরপরও যা বলেছেন, কোনো পলিটিশিয়ান এখনো তা বলেননি। অথচ সেটিই হওয়া উচিত ছিলো প্রধান বক্তব্য।
জেনারেল ভূঁইয়া বলেন, চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর, আদালতের রায়ে নির্ধারিত শাস্তি নিষ্পন্ন বা বাস্তবায়ন শেষ হলেই কেবল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত হতে পারে। এর আগে নয় এবং তা বাংলাদেশের মানুষ হতে দেবে না।
আর সে জায়গায় ইন্ডিয়া উল্টো কাজটাই করছে। তারা অপরাধ আড়াল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, দায়ীদের আশ্রয় দিচ্ছে এবং বিচারের প্রশ্নটি এড়িয়ে এখনই অভিযুক্তদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছে।
৬৬ বছর আগে দালাইলামাকে আশ্রয় দিয়ে গণচীনের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে ইন্ডিয়া আজও যে মূল্য দিচ্ছে, তা থেকে তারা কোনো শিক্ষা নিয়েছে বলে মনে হয় না। শেখ হাসিনাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার পরিণতিও দেশটিকে আরও বড় মূল্য দিতে বাধ্য করবে বলে আশঙ্কা করছি।
যে মুহূর্তে বাংলাদেশের তরফ থেকে ভারতের এ নয়া ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ ওঠার প্রয়োজন ছিলো, কিন্তু বিএনপি যে অবস্থান গ্রহণ করেছে, তা শুধু ন্যক্কারজনকই নয়, পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করার ইঙ্গিত। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে এক নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতের নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের একটি বৃহৎ দলের হাইকমান্ডের সাথে ভারতের ৩ দফা গোপন চুক্তির প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তারপর যখন গত ২৬ জানুয়ারি সোমবার মির্জা ফখরুল এমন বক্তব্য রাখেন, তখন ভারতের সাথে পর্দার অন্তরালে ঐ বড় দলটির গোপন সমঝোতার সন্দেহকে জোরদার করে। গত ২৬ জানুয়ারি দৈনিক ‘কালবেলার’ অনলাইন সংস্করণের রিপোর্ট মোতাবেক ঠাকুরগাঁয়ের এক নির্বাচনী জনসভায় মির্জা ফখরুল বলেন, নৌকা থাকলে গণতান্ত্রিক অবস্থা বিরাজ করতো। তিনি আরো বলেন, আগে নৌকা আর ধানের শীষ ছিল। এবার নৌকা নেই। নৌকার কাণ্ডারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা আপনাদের ফেলে ভারতে চলে গেছেন। দিল্লিতে গিয়ে বসে আছেন। বিপদে ফেলে চলে গেছেন। থাকলে অত্যন্ত একটা গণতান্ত্রিক অবস্থা বিরাজ করত।
ভারত আওয়ামী লীগের মাধ্যমে এবারের নির্বাচনে টার্গেট করেছে জামায়াতে ইসলামীকে। ইতোমধ্যেই দিল্লির সুরে সুর মিলিয়ে ভারত বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার বাংলাদেশে আবার মৌলবাদের উত্থান আবিষ্কার করছেন। এসব হাইকমিশনারের মধ্যে রয়েছেন পিনাক রঞ্জন দাস, পঙ্কজ শরণ, ভিনা সিক্রি, হর্ষবর্ধন শ্রিংলা প্রমুখ।
এদের মধ্যে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেছেন, বাংলাদেশে অতীতে অনুষ্ঠিত কোনো সুষ্ঠু নির্বাচনে জামায়াত জিততে পারেনি, ভবিষ্যতেও তারা পারবে না। তিনি বলেন, একমাত্র অনিয়মের নির্বাচনেই জামায়াত ক্ষমতায় আসতে পারবে। তিনি বলেন, অতীতে জামায়াত কখনো ৫ থেকে ৭ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। তাদের সেরকম জনসমর্থনও নেই। তবে এবার মনে হচ্ছে, কেউ তাদের (জামায়াতকে) সামনে ঠেলে দিচ্ছে। তারপরও নির্বাচন যদি সুষ্ঠু হয়, তাহলে তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে না। একমাত্র অনিয়ম হলেই তাদের পক্ষে আসা সম্ভব, নয়তো নয়।
আসন্ন নির্বাচনে কোন দল জয়ী হবে আর কোন দল পরাজিত হবে, সে সম্পর্কে আমরা কোনো মন্তব্য করছি না। কারণ জনগণের মনের খবর তো এত আগে জানা সম্ভব নয়। তবে আল-জাজিরা, রয়টার্স প্রভৃতি বিশ্ব গণমাধ্যম জামায়াতের জয়লাভের সম্ভাবনা দেখছে। আর সেগুলো দেখেই ভারতের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তাই তারা নাচতে নেমে আর ঘোমটা রাখার প্রয়োজন মনে করেনি। হাসিনাকে মাঠে নামিয়ে তারা ঘোমটা খুলে ফেলেছে।

জামশেদ মেহদী