দেশে দেশে নির্বাচন ও ভোটের রকমফের
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০১
॥ মুহাম্মদ আল-হেলাল ॥
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণের মতামতের সঠিক প্রতিফলন অপরিহার্য। জনগণের সঠিক মতামত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় থেকে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের রাজনৈতিক, একাডেমিক ও সিভিল সোসাইটি মহলের এক আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে আমাদের জানা-অজানা নানা নির্বাচন ও ভোটিং পদ্ধতি।
পি.আর. পদ্ধতি নির্বাচন : পি.আর. প্রোপোশনাল রিপ্রেজেন্টেশন নির্বাচন পদ্ধতির অন্যতম একটি ধারণা। ১৭৭৬ সালে আমেরিকান বিপ্লবের সময় দেশটির রাষ্ট্রপতি জন অ্যাডামস তার প্রভাবশালী পুস্তিকা ‘থটস অন গভর্নমেন্ট’-এ আনুপাতিকতার প্রথম প্রস্তাবনাগুলো দিয়েছিলেন, তবে ১৮৩০-এর দশকে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সমাজে ছোট দল ও সংখ্যালঘুদের পর্যাপ্ত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব না থাকায় তৎকালীন চলমান পদ্ধতির বিরুদ্ধে এক ধরনের আন্দোলনের মাধ্যমে এ পদ্ধতির উদ্ভব হয়। পরে এটি বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে যুদ্ধপরবর্তী সময়ে যখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা ছিল জরুরি। উইকিপিডিয়ার সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘আনুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থা হলো এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে ভোটারদের রায় প্রতিফলিত হয় রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটপ্রাপ্তির হার অনুযায়ী।’ এর মূল উদ্দেশ্য হলো ভোটের অপচয় রোধ করা এবং সংসদে সব মতের মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। এ পদ্ধতিতে ভোটের হার অনুযায়ী আসন বণ্টন হয়, মাল্টি-মেম্বার কনস্টিটুয়েন্সি থাকে, দলভিত্তিক তালিকা ভোটাররা বেছে নেয়, ছোট দলগুলোও সুযোগ পায় সংসদে প্রবেশের, ভোটার ও প্রার্থীর সরাসরি সম্পর্ক তৈরির সুযোগ অনুপস্থিত ফলে পেশিশক্তি প্রদর্শনের সুযোগও অনুপস্থিত। এ পদ্ধতির বেশকিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে- ভোটের প্রতিফলন নিশ্চিত হয় কোনো ভোট ‘নষ্ট’ হয় না। সংখ্যালঘু, ধর্মীয় বা আঞ্চলিক দলগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ে। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কমে, আলোচনা ও সমঝোতাভিত্তিক শাসন হয়। রাজনৈতিক বৈচিত্র্য উঠে আসে, একক দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ কমে যায়। নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি নির্বাচন সহজ হয়। এ পদ্ধতির কিছু নেতিবাচক দিক দুর্বল ও জটিল কোয়ালিশন সরকার গঠন হতে পারে। নির্ণায়ক সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়। নেতা ও জনতার সরাসরি সম্পর্ক থাকে না, দলই সব সিদ্ধান্ত নেয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ঘনঘন সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে পি.আর. পদ্ধতির প্রয়োগ ও ইতিহাস : তথ্যমতে ১৮৩০-এর দশকে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সমাজে আন্দোলনের মাধ্যমে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি ধারণার উদ্ভব হলেও ১৮৯৯ সালে বেলজিয়ামে সর্বপ্রথম সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিটি প্রবর্তিত হয়। বর্তমানে বিশ্বের ১৭০টি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচন ব্যবস্থার অর্ধেকের মতো রাষ্ট্রে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়। এর মধ্যে অন্যতম নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, ইসরাইল, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, নেপাল প্রভৃতি।
পি.আর. বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নির্বাচনব্যবস্থা একটি অংশগ্রহণমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করার অন্যতম উপায়। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ ইতোমধ্যে এ পদ্ধতি গ্রহণ করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করেছে। বাকি বিশ্বে এ বিষয়ে নতুন করে ভাবা শুরু হয়েছে, যাতে সকল শ্রেণি, মত ও দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় এবং গণতন্ত্র হয় সত্যিকার অর্থেই জনগণের। দক্ষিণ আফ্রিকায় আপারথেইড পরবর্তী যুগে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক কাঠামো গঠনের লক্ষ্যে পি.আর. পদ্ধতি গ্রহণ করে। এর ফলে বিভিন্ন বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মানুষ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব লাভ করে। নেদারল্যান্ডস ও সুইডেন এ দুটি দেশেই পি.আর. পদ্ধতি বহুদিন ধরে কার্যকরভাবে চালু আছে। এর ফলে বহুদলীয় সরকার গঠন হয়, যারা সাধারণত সমাজকল্যাণমূলক নীতির দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। ফলে দেশ দুটিতে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার উন্নত মান বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।
তবে বিশ্বমানের পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফ্রেজার ইনস্টিটিউটের মতো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত দিয়েছে পি.আর. পদ্ধতিকে যতটা ন্যায্য ও সাম্যবাদী মনে হয়, ততটা নয়। বরং পৃথিবীর যে দেশেই পদ্ধতিটির প্রয়োগ রয়েছে, সে দেশেই শাসনতান্ত্রিক জটিলতা না কমে বরং বেড়েছে। হানাহানি, বিভাজন, সংকীর্ণতা, অনৈক্য ও ক্ষুদ্র স্বার্থের লড়াই বেড়েছে। ইসরাইলে পি.আর. পদ্ধতির ফলে প্রায়ই ছোট ছোট দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, ফলে সরকার গঠনে জোট নির্ভরতা বাড়ায়। এর ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইসরাইলে পাঁচবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নেপালে পি.আর. ব্যবস্থা চালুর পর জাতিগত ও অঞ্চল ভিত্তিক ছোট ছোট দলগুলোর উত্থান ঘটে। যদিও এটি বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছে, তবে এর ফলে প্রায়ই কোয়ালিশন জটিলতা, সরকার গঠনে দীর্ঘসূত্রতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। জাতিগত বিভাজন ও দলীয় পারস্পরিক দ্বন্দ্ব রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে।
FPTP নির্বাচন পদ্ধতি : ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট First-past-the-post; FPTP হলো এক প্রকার নির্বাচনী ব্যবস্থা যেখানে কেবলমাত্র একজন প্রার্থী বা একটি দল বিজয়ী হতে পারে। একক বিজয়ী ব্যবস্থার মধ্যে এই পদ্ধতিই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। এই নির্বাচনী ব্যবস্থাটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সিঙ্গেল-মেম্বার প্লুরালিটি ভোটদান (Single-member plurality voting; SMP, এসএমপি) ও বলা হয়। আবার একে একজন-বাছাই ভোটদান (Choose-one voting) বলা হয়। এই পদ্ধতিতে ভোটাররা একজন মাত্র প্রার্থীকে ভোট প্রদান করেন এবং অনেক প্রার্থীর মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশি ভোটে এগিয়ে থাকেন তিনিই নির্বাচনে বিজয়ী হন। FPTP পদ্ধতিতে অনেক সময় মেজরিটি ভোটারের মতের প্রতিফলন হয় না। তবে এফপিটিপি পদ্ধতির মূল সুবিধা হলো, এতে সরকার গঠনে কোনো জটিলতা থাকে না। যেহেতু একটি আসনে একজনই জয়ী হন, তাই সাধারণত একটি দল সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এর ফলে দেশে একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সরকার গঠিত হয়, যা দ্রুত নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে পারে। আবার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়, ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (FPTP) পদ্ধতির একটি অনিবার্য ফল হিসাবে সরকার গুম, খুন, দমন-নিপীড়ন করে এবং স্বৈরশাসক হয়ে উঠে। ধরা যাক, FPTP পদ্ধতিতে ইরানের জাতীয় নির্বাচনে একটি আসনে মোট চারজন প্রার্থী চারটি দল থেকে নির্বাচন করছেন। এই নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৮৫ শতাংশ। এর মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তিনজন প্রার্থীই ২০ শতাংশ করে ভোট পেলেন। আর চতুর্থ প্রার্থী পেলেন ২৫ শতাংশ ভোট।
FPTP পদ্ধতি অনুযায়ী চতুর্থ প্রার্থীই এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন। আর ওই তিনটি দলের ৬০ শতাংশ ভোট তেমন কোনো কাজে আসছে না। একইভাবে সারা দেশের অন্তত ৫০০ আসনের মধ্যে ৩০০ আসনে যদি একই হারে ভোট পেয়ে চতুর্থ দলটির প্রার্থীরা জয়লাভ করে, তাহলে মাত্র ২৫ শতাংশ ভোট নিয়ে তারা সরকার গঠনসহ সংসদে একচ্ছত্রভাবে আধিপত্য করবে। অথচ বাকি তিন দল মিলে ৬০ শতাংশ ভোট পেলেও তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকলো না সংসদে। এতে সংসদে প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ থাকে না।
বিশ্বজুড়ে FPTP পদ্ধতির প্রয়োগ ও ইতিহাস : এফপিটিপি মধ্যযুগ থেকেই ইংল্যান্ডের হাউস অব কমন্সে নির্বাচনের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বহু দেশে এই এফপিটিপি পদ্ধতির প্রচলন লক্ষ করা যায়। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দেশের আইনসভা নির্বাচনের জন্য এফপিটিপি ব্যবহৃত হয় এবং আরও অনেক দেশে সরাসরি নির্বাহী পদ নির্বাচন করতেও ব্যবহৃত হয়। একটি দেশকে কিছু ভৌগোলিক নির্বাচনী এলাকায় বিভক্ত করে প্রত্যেকটি এলাকা থেকে এ পদ্ধতি ব্যবহার করে আইনসভায় একজন সদস্য নির্বাচন করা হয়।
এ পদ্ধতিতে ২০০১ সালে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ৪০.৮৬% ভোট পেয়ে ১৯৩টি আসন লাভ করে। অন্যদিকে প্রায় সমান ভোট (৪০.২২%) পেয়েও আওয়ামী লীগ মাত্র ৬২টি আসনে জয়ী হয়। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ৪৮.০৪% ভোট পেয়ে ২৩০টি আসন অর্জন করে। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ৩২.৫০% ভোট পেয়ে মাত্র ৩০টি আসন পায়। (আমাদের সময়; জুলাই ০১, ২০২৫)। পরবর্তীতে এই আওয়ামী সরকার স্বৈরাচারী রূপ ধারণ করে।
পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, FPTP পদ্ধতিতে প্রাপ্ত ভোট এবং আসনের মধ্যে কোনো আনুপাতিক সামঞ্জস্য নেই। পি.আর. পদ্ধতি চালু থাকলে ভোটের এই বিশাল ব্যবধান দূর হয় এবং সংসদ আরও প্রতিনিধিত্বমূলক হয়।
FPTP ও PR নির্বাচন ব্যবস্থার সমন্বয় : বিংশ শতাব্দীজুড়ে আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের মতো অনেক দেশ যারা আগে এফপিটিপি ব্যবহার করতো তারা এটি পরিত্যাগ করে অন্যান্য নির্বাচনী ব্যবস্থায় স্থানান্তরিত হয়ে গেছে।
কিছু দেশ সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের (Proportional representation; PR) পাশাপাশি এফপিটিপি ব্যবহার করে থাকে, পি.আর. উপাদানটি এফপিটিপি-এর অসমতাকে পূরণ করে না কিন্তু এফপিটিপি-এর অসমতাকে ভারসাম্য করে।
তবে নিউজিল্যান্ডে মিশ্র পি.আর. পদ্ধতি বেশ সফলভাবে কার্যকর রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জার্মানিও ‘মিশ্র নির্বাচন পদ্ধতি’ (মিশ্র PR I FPTP নির্বাচন) গ্রহণ করে। এই পদ্ধতির ফলে দেশটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করে এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ বা চরমপন্থার উত্থান কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়। এতে করে গণতন্ত্রের ভিত আরও মজবুত হয়।
ভোটিং পদ্ধতি : নির্বাচনের সফল প্রতিফলনের জন্য নির্বাচন পদ্ধতির পাশাপাশি সঠিক ভোটিং পদ্ধতি অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বজুড়ে নানা রঙের নির্বাচন পদ্ধতির ন্যায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভোটিং পদ্ধতিরও রয়েছে অবাক করার মতো ভিন্নতা যেটি জানা আমাদের অনেকের জন্য শুধু কৌতূহলের বিষয় হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য অত্যন্ত জরুরি বিষয়।
পোস্টাল ব্যালট : বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। এবার ভোটিং পদ্ধতি যুক্ত হয়েছে পোস্টাল ব্যালট। এতে প্রবাসীরাসহ দেশের আভ্যন্তরীণ অভিবাসীরাও ভোট প্রদান করতে পারছেন। এটি একটি ভালো ভোটিং পদ্ধতি কেননা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের ভোটার তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। যদিও বিশ্বব্যাপী ভোটের ইতিহাসের নানা রঙিন ভোটিং পদ্ধতির ভিন্নতার মধ্যে সবচেয়ে ভালো ভোটিং পদ্ধতি কোনটি সে প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় এখনো বিশ্ববাসী।
মার্বেল দিয়ে ভোট : অবাক করার মতো বিষয় হলেও সত্যিই মার্বেল ভোটিং প্রথা আছে আফ্রিকার গাম্বিয়ায়। এ পদ্ধতি খুব সাধারণ কিন্তু ভোট কারচুপি করা খুব জটিল। এতে প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য আলাদা আলাদা পাত্র থাকবে। ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে চাইলে প্রার্থীর পাত্রে মার্বেল ফেলবে। কারচুপি বা একাধিক ভোট এড়াতে ভোটারদের আঙুলে অমোচনীয় কালি দিয়ে দেওয়া হবে। দেশটিতে শিক্ষার হার কম থাকায় ১৯৬৫ সালে এ পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ চালু করে ব্রিটিশরা। দেশটিতে ২০২১ সালে এ পদ্ধতিতে সফলভাবে ভোটগ্রহণ করা হয়েছিল। দেশটির জনগণ এ পদ্ধতিতে ভোট দিয়েই অভ্যস্ত।
নির্বাচনে প্রার্থী একজনই : আরেক অদ্ভুত ভোট পদ্ধতি চালু আছে উত্তর কোরিয়ায়। এখানে ৪-৫ বছর পরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৮ বছরের ওপরে সবার ভোট প্রদান বাধ্যতামূলক। ভোটের দিন সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। দেশটির আজব রীতি হলো-নির্বাচনে প্রার্থী থাকেন একজনই। তার দলের নাম ওয়ার্কার্স পার্টি। ভোট তাকেই দিতে হবে। সরকারি তালিকার বাইরে এতে অন্য কোনো প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। ভোট না দিলে সেখানে হতে পারে জেল জরিমানা। বিরোধীদল বলেও কিছু নেই। ফলাফল যা হবার তাই হয়, শতভাগ ভোটে পাস করে সুপ্রিম লিডার কিম জং উন। যদিও দেশের পুরো নাম ডেমোক্র্যাটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়া।
মাসব্যাপী ভোট : ভোটগ্রহণ সাধারণত একদিনেই শেষ হয়ে যায়। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বেশিরভাগ গণতান্ত্রিক দেশই এই নিয়ম অনুসরণ করে। কিছু দেশে দুই-তিন ভাগেও ভোট হয়। কিন্তু দীর্ঘ ৩০-৪০ দিনব্যাপী ভোট শুধু পৃথিবীর একটি দেশেই হয়। সেটি হচ্ছে ভারত যা, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, আয়তনে বড় ও অনেক অঞ্চল দুর্গম হওয়ায় এত সময় লাগে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাদের সময় লেগেছে ৪৪ দিন। বিস্ময়কর হলেও সত্য, ১৯৫১-৫২ সালে, প্রথম ভোটগ্রহণ করতে ভারতের সময় লেগেছিল ৪ মাস! ভোটগ্রহণের ক্ষেত্রে ভারতের বিভিন্ন রেকর্ড আছে। যেমন-সবচেয়ে উঁচুতে ভোট কেন্দ্র স্থাপন, সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে ভোট কেন্দ্র স্থাপন ইত্যাদি।
মহাকাশ থেকে ভোটপ্রদান : সময় বদলে গেছে, পৃথিবীর মানুষ এখন মহাকাশেও ঘাঁটি গেড়েছে। কিন্তু দেশের নাগরিক হিসেবে তাদেরও তো ভোটপ্রদানের অধিকার আছে। মহাকাশে থেকে ভোটগ্রহণের রেকর্ড একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। মার্কিন নভোচারী ডেভিড উলফ, ১৯৯৭ সালে প্রথমবার মহাকাশ থেকে ভোট দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে কেন্ট রুবিনস, উইলমোর ও সর্বশেষ ২০২৪ নির্বাচনে সুনিতা উইলিয়ামস মহাকাশে থেকে ভোট দিয়েছেন। মহাকাশ থেকে ভোটপ্রদানের মাধ্যম হচ্ছে অনলাইন। তবে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এক্ষেত্রে সব ধরনের গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়।
কণ্ঠভোটে প্রেসিডেন্ট : যদিও কণ্ঠভোট এখনো বিভিন্ন দেশের সংসদে চালু আছে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য। কিন্তু একসময় কণ্ঠভোটের মাধ্যমে দেশের রাজা পর্যন্ত নির্বাচন করা হতো। কণ্ঠভোটের নিয়মটি ছিল এরকম, একটি নির্দিষ্ট স্থানে দেশের সচেতন নাগরিকগণ একত্রিত হতো। এরপর কোনো নির্দিষ্ট লোককে রাজা নির্বাচন করা যায় কি না, সে ব্যাপারে প্রশ্ন করা হতো। সমাবেত সবাই উচ্চকণ্ঠে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিত। সংখ্যাগরিষ্ঠের কণ্ঠের ভোটে রাজা বা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা হতো। গ্রিস ও রোমে এ ধরনের ভোটিং পদ্ধতি চালু ছিল। অবশ্য তখনকার সময় সেখানে নারীদের ভোটাধিকার ছিল না।
ভোটারদের বয়সের ভিন্নতা : পৃথিবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ দেশেই ভোটার হওয়ার সর্বনিম্ন বয়স ১৮ বছর। তবে ব্যতিক্রমও রয়েছে যেমন-ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও ইকুয়েডরসহ ল্যাটিন আমেরিকান দেশে ভোটার হওয়ার সর্বনিম্ন বয়স ১৬ বছর। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া, উত্তর কোরিয়া, সুদান ও গ্রিসে ভোটার হওয়ার সর্বনিম্ন বয়স ১৭ বছর। আবার কুয়েত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, লেবানন ও ওমানে ২১ বছর হওয়ার পূর্বে ভোটার হওয়া যায় না।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণের মতামতের সঠিক প্রতিফলন অপরিহার্য। মতামতের সঠিক প্রতিফলনের অন্যতম অংশ নির্বাচন সেটি পোস্টাল ব্যালট, মার্বেল বা কণ্ঠভোট যে পদ্ধতিতেই অনুষ্ঠিত হোক না কেন। নির্বাচন, নির্বাচন পদ্ধতি, ভোট ও ভোটিং পদ্ধতি নিয়ে সহিংসতা, সংকটের উদাহরণ বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই বিদ্যমান। সংকটের কারণগুলো পদ্ধতিগত কাঠামোর মধ্যে শুধু সীমাবদ্ধ নয় নির্বাচন পরিচালনার প্রশাসনিক অবিশ্বাসের মধ্যেও বিরাজমান। তবে বিশ্লেষণে পি. আর. পদ্ধতির নির্বাচনের মাধ্যমে মতামতের প্রতিফলন এবং পোস্টাল ভোটিং পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ লক্ষ্যণীয়।
সূত্র : আল-জাজিরা, রয়টার্স, বিবিসি, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, এএফপি, বিবিসি।
এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
alhelaljudu@gmail.com