নির্বাচনে তরুণ-যুবক ও নারী ভোট কার্যকরী ভূমিকা রাখবে


১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৯

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন ও জুলাই সনদের ওপর গণভোট। বহুদিন পর ছাত্র-জনতা উৎসবমুখর পরিবেশ ভোট দেবে বলে আশা করা যায়। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি সদস্যদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়েছে এবং কোনো দলের বা ব্যক্তির পক্ষ হয়ে কাজ করলে তাকে কঠিন সাজা ভোগ করতে হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আমরা আশা করি, দেশের স্বার্থে, ছাত্র-জনতার ত্যাগের মূল্যায়নের স্বার্থে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট স্বচ্ছ করতেই হবে। দেশের ছাত্র-জনতা ও বিদেশিরাও এ ভোটকে খুবই গুরুত্বের সাথে দেখছে।
দেশের জনগণ এবং প্রায় সাড়ে ৪ কোটি নতুন ভোটারের অংশগ্রহণ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। তাই ভোটের দিনের আইনশৃঙ্খলা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে যেমন সরকারের দায়িত্ব আছে, তেমনি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি ও দলেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। জনতার মতকে প্রাধান্য দিলেই দেশের উপকার হবে এবং সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত নেতা নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। ২৯৯ আসনে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হচ্ছে। ইতোমধ্যেই প্রতিটি এমপি পদে একাধিক দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যার যার এলাকায় তাদের প্রতিশ্রুতি নিয়ে দ্বারে দ্বারে ভোট চাচ্ছেন। ছাত্র-জনতা যারা ভোটার, তারা কিন্তু এবার সচেতনতার পরিচয় দিয়ে ভোট দেবে। ভোটের বাক্স পূর্বেই ভরাট করে রাখার সুযোগ থাকবে না। জোর করে নিজ মার্কায় ভোট নেয়ারও সুযোগ থাকবে না। আমি নিজেও দেখলাম প্রতি ভোটকেন্দ্রে আর্মি, বিজিবির লোকেরা ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করছেন। ভোটে নিয়োজিত ম্যাজিস্ট্রেটরাও ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করে সম্ভাব্য ভোটের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। আমাদের ভোটকেন্দ্রও কয়েকদিন পূর্বে সরকারের লোকেরাÑ যারা ভোট নেয়ার সাথে জড়িত, তারা এলাকার পরিবেশ ছাত্র-জনতার সাথে কথা বলে ভোটকেন্দ্রের ত্রুটিগুলো দূর করার ব্যবস্থা নিচ্ছেন। কোনো কোনো কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করছেন। মনে রাখতে হবে প্রধান উপদেষ্টাও বারবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তারা সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দিতে সব প্রকার সহযোগিতা দিতে চেষ্টা করবেন।
৫ আগস্ট ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণে যে অপ্রতিরোধ্য বিপ্লব হয়েছে, ফলে ফ্যাসিস্ট, দুর্নীতির রানি হাসিনা পালাতে বাধ্য হয়েছে তার দলবল নিয়ে। বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্যানেলকে বিজয়ী করে প্রমাণ করেছে যে, আগামী জাতীয় নির্বাচন ও জুলাই সনদের হ্যাঁ ভোটেও তরুণ ছাত্র-ছাত্রীরাও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে। ইতোমধ্যে ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং হ্যাঁ ভোট ও জামায়াত জোটের পক্ষে কাজ করছে। আমি ইতোমধ্যেই কয়েকটি এলাকা সরেজমিন ফজর থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত মসজিদ, বাজার, চায়ের দোকন, রিকশাওয়ালা, বাসস্ট্যান্ড, রিকশাস্ট্যান্ডসহ সাধারণ জনগণের সাথে আলাপ করে জেনেছি, ছাত্র-জনতা এবার সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত এবং প্রয়োজনে কাছে পাওয়া যাবে, এমন লোককেই ভোট দেবে। আর কোনো দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ বা দখলবাজদের ভোট দেবে না।
আরো একটি বিষয় এবার লক্ষ করা যাচ্ছে, মোট ভোটারের প্রায় ৫০% নারী। তারাও এবার সচেতনতার পরিচয় দিচ্ছে। বিশেষ করে কথিত এলিট শ্রেণির বলতো, মেয়েরা জামায়াত জোটকে ভোট দেবে না। আপনারা ইতোমধ্যেই লক্ষ করেছেন, রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রামে-গঞ্জে নারী সমাবেশ হচ্ছে আবার তারা মিছিল করে জানান দিচ্ছে যে, তারা এবার সৎ লোকের পক্ষে ভোটও দেবে এবং প্রয়োজনীয় সব সহযোগিতা করবে। জামায়াতে ইসলামীর আমীরের ঢাকার সিটে ইতোমধ্যে নারী ভোটারদের বড় মিছিল হয়েছে। মিছিল হয়েছে ধানমন্ডিসহ মফস্বলে এটিএম আজহারুল ইসলামের এলাকায়ও। তাই নারীদের ফাঁকি দেয়া যাবে না। তাদের অধিকার সম্পর্কে আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, নারীদের আমরা মায়ের মতো সম্মান করব। তাদের জন্য স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে বিনা পয়সায় পড়াশোনার ব্যবস্থা করবেন। পৃথক নারী বিশ্ববিদ্যালয় করে তাদের লেখাপড়া উন্নত করার সাথে সাথে গবেষণা করার সুযোগ দেয়া হবে। ইতোমধ্যেই আপনারা দেখেছেন, বিভিন্ন সেমিনারে জামায়াতের নারীরা বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে বক্তব্য দিয়েছেন। তারা বুয়েটের প্রফেসর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, ঢাকা মেডিকেলের প্রফেসরসহ জ্ঞানী-গুণী নারীরা প্রকাশ্যে বক্তব্য দিচ্ছেন। সভা-সমাবেশ করছেন। টকশোতে যুক্তিতর্কে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছেন। জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, জামায়াত জোটের মন্ত্রিসভায় নারীরাও মন্ত্রিত্ব পাবেন। জামায়াতে ইসলামীর দীর্ঘ পথচলায় বহু যোগ্য নারী-কর্মী নেতা তৈরি হয়েছে, যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগ্যতার সাথে ভূমিকা রাখছেন। আমি নিজে ঢাকায় একটি স্কুলের সাথে জড়িত। সেখানে প্রিন্সিপাল থেকে শুরু করে শিক্ষক; এমনকি আয়াও নারী। তাছাড়া জামায়াতের গড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যোগ্য নারীদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তারা হাসপাতালে ডাক্তার-নার্সের কাজ সুচারুভাবে করছেন। ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানেও নারীরা যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছেন। তাই নারীরা জামায়াত জোটকেই ভোট দিয়ে বিপুল ভোটের ব্যবধানে তাদের জয়যুক্ত করবেন। মনে রাখতে হবে, নারীরা জামায়াত-শিবিরের কাছেই নিরাপদ। জামায়াত-শিবির দ্বারা পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠানে নারীরা লাঞ্ছিত হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিবিরের ছাত্রদের কাছে কোনো ছাত্রী লাঞ্ছিত হয়নি। তাই তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্বাচনে নারীরা উৎসবমুখর পরিবেশে শিবির প্যানেলে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছে। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের এক ছেলে জসিম উদ্দীন মানিক ১০০ নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করে মিষ্টি বিতরণ করে সেঞ্চুরি পালন করেছে। তার কিন্তু আজ পর্যন্ত বিচার হয়নি।
আল্লাহর নবী মুহাম্মদ সা.-এর সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে নারীরা অংশগ্রহণ করতো। আজকের যুগে নারীদের অনেক পেশায় জড়িত থেকে দেশের ও দশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আবার উপার্জনেরও সুযোগ হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, নারীরা কিন্তু মায়ের জাত। তাদের কমবেশি ১০ মাস সন্তান পেটে ধারণ করতে হয়। আবার পেটে তারা সুস্থভাবে বড় হচ্ছে কিনা, তাও তাদেরই লক্ষ রাখতে হয়। যে মা সঠিকভাবে পেটে বাচ্চা ধারণ করে, সে বাচ্চার জন্ম থেকে শুরু করে বড় হওয়া, মেধাবী হওয়াও নির্ভর করে। তাই আমীরে জামায়াত ঘোষণা করেছেন মায়েরা মাতৃত্বকালীন সময়ে ৮ ঘণ্টার জায়গায় ৫ ঘণ্টা কাজ করবে। জামায়াত জোটের সরকার ৩ ঘণ্টার মজুরি পরিশোধ করবে। যে জাতি মায়েদের মর্যাদা দিতে পারে, সে জাতিকে মেধাবী লোক পেতে সুবিধা হবে। আমি পাঠকদের আশ্বস্ত করতে চাই, গত ১৯৭৭ সালে শিবির গঠনের পর থেকে শুধু বাংলাদেশে নয়, গোট বিশ্বে সৎ, যোগ্য, শিক্ষিত দুর্নীতিমুক্ত লোক সরবরাহ করেছে এবং করবে। তাই দেশ চালানোর জন্য জামায়াত জোটের কাছে সব মন্ত্রণালয় চালানোর জন্য যোগ্য লোক তৈরি আছে।
যারা একাধিকবার ক্ষমতায় ছিল, তারা দেশের উন্নয়ন কতটুকু করেছে আর নিজের দলের ও আত্মীয়দের কতটুকু উন্নয়ন করেছে, খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন। আমাদের ছেলেমেয়েরা ৩-৪ বছর লন্ডনে থেকে ডক্টরেট, ব্যারিস্টার হয়ে দেশের খেদমত করছে। শহীদ মীর কাসেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আরমান হাসিনার আয়নাঘরে ৮ বছর নির্যাতনে ছিলেন। তিনি এখন মিরপুরের জামায়াত জোটের প্রার্থী। আবার শহীদ মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নজিবুর রহমান মোমেনÑ তিনি একাধারে ব্যারিস্টার, ডক্টরেট আবার মাওলানা। তিনি পাবনা-১ আসনের প্রার্থী। আর এভাবে জামায়াত জোটের ৩০০ আসনেই শিক্ষিত, মেধাবী, সৎ, যোগ্য, চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রার্থী। অতএব তরুণ-যুবক, ছাত্র-জনতা এবং নারীরা জামায়াত জোটের প্রার্থীদেরই এবার সংসদে পাঠাবে এবং দেশকে তারা দুর্নীতিমুক্ত দেশ উপহার দেবে।
কোনোভাবেই জনগণ এবার কোনো দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, অসৎ লোককে ভোট দেবে না। ছাত্র-জনতা শহরে-বন্দরে, হাটে-ঘাটে একই আলোচনা- আমরা নৌকা, ধানের শীষ, লাঙ্গল দেখেছি, এবার দাঁড়িপাল্লা দেখতে চাই। মহান আল্লাহ আমাদের এই সুজলা-সুফলা বাংলাদেশকে একটি দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার সুযোগ দিন।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com