ইন্টারনেটের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০১
॥ সাইদুর রহমান ॥
ইন্টারনেটের ভালো ও মন্দ দুটি দিকই রয়েছে। তবে ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারের কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু-কিশোররা। অনেক অভিভাবকই ইন্টারনেট সম্পর্কে অজ্ঞ হওয়ায় এ ধরনের নিয়ন্ত্রণহীনতা দিনে দিনে বাড়ছে। শিক্ষার পরিবর্তে কখনো কখনো তারা কুশিক্ষা গ্রহণ করছে। শিশু-কিশোরদের একটি প্রবণতা হলো নিজেকে প্রকাশ করা এবং অন্যকে অনুসরণ করা। আত্মপ্রকাশ ও অনুসরণের প্রবণতা তাদের কৌতূহলপ্রিয় করে তোলে। কৌতূহলের বশে তারা নতুন কিছু জানতে চায়, শিখতে চায়। এ স্বতঃস্ফূর্ত আকাক্সক্ষাকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে হবে। তাহলেই ছেলেমেয়েরা ভবিষ্যৎ জীবনে, কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজে সফল মানুষ হতে পারবে। বর্তমানে প্রতিটি সমাজেই ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়ালজগৎ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। এর ফলে কেউই আর তা থেকে দূরে থাকতে পারছে না। এ অবস্থায় ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতন না হলে গোটা সমাজই মারাত্মক সংকটের মুখে পড়বে। কোনো কোনো মানুষের মধ্যে ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি এতটাই বেশি যে, তাদের চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে; বিশেষ করে চীনে ইন্টারনেট এবং ভিডিও গেমসে আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য বেশকিছু নিরাময় কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে যাচ্ছে যে, বিশ্বের প্রতিটি দেশেই এমন নিরাময় কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। কারণ ইন্টারনেটে আসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রতিটি দেশেই বাড়ছে। বর্তমান বিশ্বের তরুণ সমাজের অনেকেই প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা স্মার্ট ফোন, আইফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ অথবা কম্পিউটার নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তারা অনলাইনে অথবা অফলাইনে নানা ধরনের তৎপরতা চালায়। এদের কেউ কেউ ভার্চুয়ালজগৎ বা ইন্টারনেটের প্রতি মারাত্মকভাবে আসক্ত। যারা আসক্ত, তাদের যে সমস্ত শারীরিক সমস্যা হয় বলে চিকিৎসকগণ বলে থাকেন, তা হলোÑ পিঠে ব্যথা, মাথাব্যথা, মেরুদণ্ডে সমস্যা, ওজনে ভারসাম্য নষ্ট, ঘুমের ব্যাঘাত, চোখে ব্যথা বা কম দেখা ইত্যাদি। ইন্টারনেটের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ ক¤িপউটার নিয়ে বেশিরভাগ সময় কাটায় এবং সেই সময়টুকুর জন্য নিজেরাই মূল্য পরিশোধ করে। কম্পিউটার ও ইন্টারনেট আজ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সংবাদ, তথ্য, যোগাযোগ, কেনাকাটা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক, বিনোদন ইত্যাদি অনেক কিছুর জন্য মানুষ এখন ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কেউ যদি ইন্টারনেটের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি আজকের যুগের একটি অত্যন্ত জটিল সমস্যা ও অভিশাপ। অন্যান্য নেশার মতোই এটি একটি সর্বনাশা নেশা, যা ব্যক্তির সামাজিক, পারিবারিক ও পেশাগত জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। ইন্টারনেট ছাড়া থাকতে না পারা, বাদ দিতে গেলে দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা ও অন্যান্য সমস্যা আসা। মাত্রাতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে স্বাভাবিক, পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত জীবনকে ব্যাহত করা। ইন্টারনেট যদি হয় বিনোদনের প্রধান উৎস। ইন্টারনেটের ব্যবহার যারা লুকিয়ে রাখতে চান এবং তা নিয়ে মিথ্যা কথা বলেন। বাস্তব জীবনের চেয়ে ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জীবন যাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এতে করে শারীরিক প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায় ঘাড় ও কোমর ব্যথা, মাথাব্যথা এবং চোখে অস্বাভাবিক চাপজনিত সমস্যা হচ্ছে।
অতিরিক্ত ইন্টারনেট আসক্তি মানসিক রোগের সৃষ্টি করে। আক্রান্ত শিশুরা খিটখিটে মেজাজের হয়, মিথ্যা কথা বলে এবং সবার সঙ্গে অহেতুক তর্কে লিপ্ত হয়। এছাড়া স্কুলের রেজাল্ট দিন দিন খারাপ হতে থাকে। শিশুকে আত্মকেন্দ্রিক, অসহনশীল ও অসামাজিক করে। শিশুর বুদ্ধির বিকাশে বাধা দিয়ে সৃষ্টিশীলতা নষ্ট করে দেয়, শিশুর শারীরিক খেলাধুলার সময় কেড়ে নেয়। এতে শিশুরা শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। শিশু শারীরিক পরিশ্রম কমিয়ে দেয়। এতে শিশুর অস্বাভাবিক ওজন বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, পারিবারিক সদস্যদের মধ্যে বন্ধন কমিয়ে দেয়, সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দেয়, শিশুর স্বাভাবিক আচার-ব্যবহারের ওপর প্রভাব ফেলে, ধীরে ধীরে সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, জীবনের গুণগতমান কমে যায়। পড়ালেখাসহ সব কাজের গতি ও মান নিচে নামতে থাকে। হতাশা বা বিষণ্নতায় আক্রান্ত হতে পারে; ঘটাতে পারে আত্মহত্যা। বাবা-মায়ের সঙ্গে দূরত্বের কারণে সন্তান ইন্টারনেটের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়তে পারে। তাই তাকে সময় দিতে হবে। নৈতিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া অভিভাবকদের কিছু টেকনিক জ্ঞান প্রয়োগ করার প্রয়োজনীয়তাও আছে। ফেসবুক আর ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দিলে তার একটি সময়সীমা বেঁধে দিন। সন্তানের সঙ্গে চুক্তিতে আসুন, যাতে নিয়মগুলো পালন করে।
মনোবিজ্ঞানীরা এটাকে ‘ডিজিটাল মাদক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। বৈজ্ঞানিকভাবে স্মার্ট ফোন, আইফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ ও কম্পিউটারের মতো ডিজিটাল ডিভাইসের ক্ষতির বিষয়টি প্রমাণিত। শিশু-কিশোরদের জন্য এ ক্ষতি আরো বেশি হয়। রাস্তায় কিংবা স্কুলে লক্ষ করলে দেখা যায়, অনেক শিশুর চোখে সমস্যা। শিশুকালেই চশমা ব্যবহার করতে হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর কারণ হচ্ছে ডিজিটাল মাদকাসক্তি। শুধু শিশুরা নয়, বড়দের অনেকেই অফিসে কিংবা বাসায় কোনো কারণ ছাড়াই সচেতন বা অবচেতনভাবে ফেসবুকে থাকছেন। এর পাশাপাশি অনেকে আসক্ত হচ্ছেন পর্ণোগ্রাফিতে। এভাবে হয়তো মনের অজান্তেই তারা অনেক সময় নষ্ট করে ফেলছেন।
রাতে ঘুমানোর সময় এ ধরনের একটা ডিভাইস হাতে নিয়ে শুতে গিয়ে অনেকেই নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পরে ঘুমান। এ অভ্যাস আস্তে আস্তে ঘুম না আসার কারণে পরিণত হচ্ছে। অধিকাংশ শিশুই মোবাইলে গেম খেলে অথবা কার্টুন দেখে। বর্তমান সময়ে শিশুরা যে ভিডিও গেমস পছন্দ করে, তার অধিকাংশেরই উপজীব্য হচ্ছে হিংস্রতা, মারামারি ও যুদ্ধ। এ কারণে এসব বিষয় শিশু-কিশোরদের ওপর মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক প্রভাব ফেলে। চিকিৎসকদের ভাষ্য মতে, ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়ালজগতের প্রতি আসক্তির কারণে একজন ব্যবহারকারী প্রথমেই মাথাব্যথার মতো সমস্যায় ভুগতে শুরু করেন। শিশু-কিশোরদের মধ্যে এ অবস্থা বেশি দেখা যায়। মাথাব্যথার পর চোখের সমস্যা দেখা দেয় এবং মেরুদণ্ডে সমস্যা হয়।
ভার্চুয়ালজগতের নানা গেমস ও কার্টুনের প্রভাবে অনেক শিশুই সহিংসতার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। গেমস খেলতে খেলতে শিশু-কিশোরদের মধ্যে শুধু জয়ের মাসনিকতা গড়ে উঠছে। পরাজয় মেনে নেয়া বা সইতে পারার মানসিকতা তাদের তৈরি হয় না। ফলে পরাজয় না সইতে পেরে তারা ব্যাপকভাবে হতাশ হয়ে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে জীবনের সব কিছুর ওপর। এ ধরনের নানা কারণে ইন্টারনেটে আসক্ত শিশু-কিশোররা সামাজিকভাবে বিকশিত হয় না। তাদের মধ্যে এ ধারণা গড়ে উঠে যে, ইন্টারনেটভিত্তিক গ্রুপগুলোই হলো সবচেয়ে আধুনিক চিন্তা-চেতনার অধিকারী। নিজে যে গ্রুপের সদস্য সেই গ্রুপের চিন্তা-চেতনার বাইরে অন্য কিছু সে ভাবতে পারে না। এ কারণে একপর্যায়ে তার দৃষ্টিভঙ্গিও একপেশে হয়ে ওঠে।
ভার্চুয়ালজগতের বাইরে বাস্তব জগৎ তার কাছে তুচ্ছ মনে হয়। এভাবে একপর্যায়ে সে নিজেকে স্বেচ্ছায় একঘরে করে ফেলে। এ ধরনের প্রবণতার কারণে অধিকাংশ শিশু আত্মকেন্দ্রিক হয়ে বেড়ে উঠছে। ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি শিশুদের সামাজিক দক্ষতাও নষ্ট করছে। শিশু-কিশোররা সবসময় ইন্টারনেট নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে সেখানে নানা বিনোদন খুঁজতে থাকে। কিন্তু এর পরিণতি হয় ভয়াবহ। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটভিত্তিক কথিত শিশু বিনোদনের ভয়াবহ পরিণতির একটি চিত্র পাওয়া গেছে বাংলাদেশের ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর এক জরিপে। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় স্কুলগামী শিশুদের প্রায় ৭৭ ভাগ পর্নোগ্রাফি দেখে। অষ্টম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ঢাকার ৫০০ স্কুলগামী শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, ছেলে শিশুরা সবসময় যৌন মনোভাবসম্পন্ন থাকে, যা নারীর জন্য যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। যৌন মনোভাবের কারণে ওই বয়সের শিশু-কিশোরদের অসামাজিক কার্যকলাপের প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে বিয়ে ব্যবস্থার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ কমছে। অবাধ যৌনাচারের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে, যা পারিবারিক ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় মা-বাবা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের আরও সচেতন হতে হবে। নিজেদের মধ্যে এ ধরনের আসক্তি থাকলে তা ত্যাগ করে সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। শিশুদের গল্প শোনাতে হবে, নানা ধরনের খেলা ও বেড়ানোর মতো নিরাপদ বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হয়Ñ এমন খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সব মিলিয়ে বাবা-মা এবং আত্মীয়-স্বজনের পক্ষ থেকে পরিবারের শিশুদের আরো বেশি সময় দিতে হবে। এসবের মাধ্যমেই প্রযুক্তি ও অনলাইনের প্রতি আসক্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
লেখক : সাংবাদিক।