মালিক ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি
২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:১৯
॥ মনসুর আহমদ ॥
প্রকৃতির নিয়মে লক্ষ করা যায় ধরণী যখন প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, গাছপালা লতাপাতা যখন এক ফোঁটা বারি বিন্দুর অপেক্ষায় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন সেখানে ভেসে আসে ভারী মেঘমালা, বয়ে যায় শীতল বাতাস, অবশেষে ঝরে পড়ে রহমতের বারিধারা। একই নিয়মে যখন কোনো জনপদে অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়ন সীমাহীনভাবে বেড়ে যায় মানুষ একটু শান্তির নিশ্বাস ফেলতে চায়, তখন সে জনপদে আগমন করে শীতল বায়ুরূপী ধর্মীয় চেতনা ও মহৎ মানবীয় গুণাবলিতে পূর্ণ মহামানব এবং আগমন ঘটে ন্যায়নিষ্ঠ রাজশক্তির।
প্রকৃতি ও মানবসমাজের এ মৌলিক বিধানটি অধিকতর সঠিকভাবে প্রতিভাত হয় বাংলাদেশ মুসলিম শক্তির দ্বারা বিজিত হওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশে মুসলিম শক্তির বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত এ দেশটি বর্ণহিন্দু রাজগোষ্ঠী কর্তৃক শাসিত হচ্ছিল। তাদের কার্যকলাপ অত্যাচার ছিল বাঙালি মুসলমাদের জন্য অসহনীয়। তখন অত্যাচারিত, নিপীড়িত, মানবেতর জীবনযাপনকারী স্থানীয় জনগণের পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন উদার, মানবতার মর্যাদা দানকারী সুফী-দরবেশ ও আরব বণিককুল।
বখতিয়ার খলজির আগমনের কয়েক শত বছর পূর্ব থেকেই ইসলাম প্রচারকদের অভূতপূর্ব সাফল্যই সম্ভভবত ইখতিয়ার উদ্দীনকে বঙ্গদেশ অভিযানে উদ্বুদ্ধ করে। যেহেতু ইসলামের বিধান শুধুমাত্র মনুষের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, বরং অর্থনৈতিক, নৈতিক, সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও ব্যবহারিক তথা মানুষের জীবনের সমগ্র বিভাগে ইসলামী জীবনবিধান একটি সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ করে: তাই সুফী-দরবেশ প্রভাবিত এদেশের জন মানসে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার একটি চাহিদা গড়ে উঠেছিল। সেই চাহিদার দাবি মেটানো ও ইসলাম প্রচারকদের অভাবিত সফলতাই বখতিয়ার খলজিকে বঙ্গদেশ অভিযানে উদ্বুদ্ধ করে।
মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি ছিলেন তুর্ক সম্প্রদায়ের লোক। তিনি নিতান্ত সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন উচ্চাভিলাষী। প্রথমে তিনি শিহাব উদ্দিন ঘোরীর সেনাদলে অন্তর্ভুক্ত হতে চেষ্টা করেন। মুহাম্মদ ঘোরী ছিলেন প্রচুর সাহসী ও তেজী শাসক। তিনি দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধে রায় পৃথ্বীরাজের লাখ লাখ সেন্যদের পরাজিত করেন এবং পৃথ্বীরাজ ও তার ভাই এযুদ্ধে নিহত হয় (১১৯২ খ্রি.)। এ বাহিনীতে খলজি তাঁর অনাকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের কারণে প্রবেশ অধিকার লাভে ব্যর্থ হন। অতঃপর তিনি কুতুব উদ্দীন আইবেকের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চেষ্টা করে ব্যর্র্থ হন। তিনি হতোদ্যম না হয়ে আরো পূর্বদিকে অগ্রসর হন এবং বদায়ুনের সিপাহসালার মালিক হিজবার উদ্দীন তাঁকে নিজ বহিনীর অন্তরর্ভুক্ত করেন। অল্পদিন সেখানে চাকরি করার পর তিনি অযোধ্যায় ওয়ালী মালিক হিশাম উদ্দীনের নিকট গমন করেন এবং তার প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর কাছ থেকে হানওয়া নামক স্থানের জায়গীর লাভ করেন। এ জায়গীর লাভ করার পর তিনি গাহড়বার বংশীয় হিন্দু নরপতিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে থাকেন। এর পর তিনি দক্ষিণ বিহারে ওদন্তপুর বৌদ্ধ বিহার দখল করেন।
কুতুব উদ্দীন আইবেকের সভাসদ হাসান নিজামীর ‘ তাজুল মাসীর’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, ১২০৩ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে কুতুব উদ্দীন কালিঞ্জরের দুর্গ জয় করে সেখান থেকে সরাসরি বদায়ুনে চলে অসেন। বদায়ুনে চলে আসার পরপরই মুহাম্মদ খলজি ওদন্তপুরী বিহার থেকে তাঁর কাজে হাজির হন।‘ তাবাকাতে নাসিরী’ থেকে জানা যায় যে, বিহার থেকে ফিরে আসার পর কুতুব উদ্দীন তাঁকে খিলাত দান করেন এবং পরবর্তী বছর তিনি নদীয়ায় অভিযান চালান। নদীয়া বা নবদ্বীপ ছিল তখন সেন বংশের বল্লাল সেনের শাসিত বাংলা দেশের রাজধানী। বখতিয়ার খলজি মাত্র আঠার জন অশ্বারোহীর এক ক্ষুদ্র বাহিনীর নেতৃত্বে বিচিত্র কৌশলে রাজা লক্ষণ সেনকে বিতাড়িত করে বাংলাদেশ জয় করেন এবং লক্ষেèৗতে বা গৌড়ে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবে ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির নদীয়া বিজয়ের মধ্য দিয়ে লক্ষেèৗতে প্রথম আনুষ্ঠানিক মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্ণহিন্দু শাসনের অত্যাচারে বৌদ্ধ ও অবর্ণ হিন্দু জনতার কাছে ইসলামের মানবতাবাদ ও সাম্যের বাণী খোদার দান রূপে গৃহীত হয়। সেকারণে বখতিয়ার খলজির মুসলিম সেনাদলের অভিযান বাংলাদেশে সেন শাসনবিরোধী অপামর জনতার মধ্যে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্ট করে, যার স্রোতের মুখে লক্ষণ সেনের ক্ষমতার দণ্ড তৃণের মতো ভেসে যায়।
বখতিয়ার বিজিত রাজ্যের সীমা ছিল উত্তরে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত পূর্ণিয়া শহর হয়ে দেবকোটি থেকে রংপুর শহর, পূর্বে ও দক্ষিণে পূর্বে করতোয়া দক্ষিণে গঙ্গার মূলধারা (পদ্মা) এবং পশ্চিমে কুশী নদীর নিম্নাঞ্চল থেকে গঙ্গার কিনারায় রাজমহল পর্যন্ত। বখতিয়ার এক দিকে এরাজ্যেও শাসন শৃঙ্খলা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করেন এবং অন্যদিকে এখানে ইসলামকে সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা চালান।
বখতিয়ার খলজির লক্ষেèৗতে স্থিতিশীল সরকার গঠনের পর সমস্ত মধ্য এশিয়ার ভাগ্যন্বেষীরা বাংলাদেশের প্রতি ধাবিত হয়েছিল। ফলে সামরিক ও বেসামরিক বহিরাগত মুসলমান নাগরিকের সংখ্যা কম করে হলেও বিশ হাজারে পৌঁছে যায়।
বখতিয়ার যেমন ছিলেন একজন সফল সমর নায়ক তেমন ছিলেন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তিনি অনুভব করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, এসব বহিরাগত মুসলমানদের এদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থার প্রয়োজন। তাদের প্রয়োজন রাজ নৈতিক শক্তি ও প্রতিপত্তি। সাথে সাথে প্রয়োজন সাংস্কৃতিক জীবনকে সুন্দরভবে গড়ে তোলা। নয়তো তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং এমনকি অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। তাই তিনি মুসলমনদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনযাপন ও পরিচালনার জন্য বিভিন স্থানে মসজিদ, মাদরাসা ও খানকা তৈরি করেন। মসজিদ ছিল সমাজের কেন্দ্র। খানকার মাধ্যমে ইসলামী শাস্ত্রের পণ্ডিত শায়খগণ মুসলমানদের চিন্তা ও চরিত্রের পরিশুদ্ধি এবং নৈতিক ও আত্মিক উন্নতি বিধানের দায়িত্ব পালন করতেন।
মসজিদ, মাদরাসা ও খানকা নির্মাণের পাশাপাশি বঙ্গের প্রথম মুসলিম শাসক বখতিয়ার খলজি বহু মন্দির ভেঙে ফেলেন। কিন্তু মুসলিম সুফী সাধক, দরবেশ ও মুজহিদগণের মন্দির ও মূর্তি ধ্বংসের বিরুদ্ধে হিন্দু ঐতিহাসিক ও বর্তমান কালের হিন্দু লেখকগণ অত্যন্ত সোচ্চার। তারা একে মুসলমানদের গোঁড়ামি ও অপরাধ বলে অভিহিত করেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, একদা বিশাল ভারতবর্ষের বুকজুড়ে যে বৌদ্ধ ধর্ম বিস্তার লাভ করেছিল, সেই ধর্মের বিশাল জনগোষ্ঠীকে যারা ভারতের বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল তাদের ব্যাপরে কোনো হিন্দু লেখক কিছুই লেখেনি। বৌদ্ধ ধর্মের করুণ পরিণতির পটভূমিতে ইসলাম প্রচারকসহ মুসলিম শাসকগণ প্রতিমার ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা ছিল তাঁদের গভীর জ্ঞান ও দূরদর্শিতার পরিচায়ক। তাদের এ সিদ্ধান্তকে আক্রমণাত্মক মনে হলেও তা আসলে ছিল প্রতিরক্ষামূলক। পৌত্তলিকতার ক্ষতি থেকে মুসমানদের রক্ষা করার দ্বিতীয় কোনো পথ ছিল না।
ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবতাবাদ মুসলিম শাসকদের মাধ্যমে সমাজে যথাযথ রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিধায় বিপুলসংখ্যক হিন্দু ও বৌদ্ধ ইসলামের আকর্ষণে এর ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল।
১২০৩ থেকে ১২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বখতিয়ার খলজি তাঁর বিজিত এলাকায় সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। অতঃপর তিনি ১০ হাজার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে তিব্বত অভিযানে বের হন। কিন্তু সে অভিযান ব্যর্থ হয়। তাঁর বিরাট বাহিনী বিধ্বস্ত হয় এবং তিনি তিব্বত থেকে দেবকোটে ফিরে আসেন। বখতিয়ার খলজি এসময় অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিব্বত অভিযান থেকে ফিরে এসে তিন মাস ধরে যখন তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী, তখন আলী মর্দান খলজি বখতিয়ার খলজির বুকে ছোরা বসিয়ে দিয়ে হত্যা করে। এ হত্যার পিছনে ছিল ক্ষমতার লড়াই; আলী মর্দান নিজে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন। দ্বিতীয় কারণ, নিজের নিরাপত্তার ভয় আশঙ্কা ছিল, বখতিয়ার খলজি তাঁকেও হত্যা করতে পারেন।
ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়র খলজির মাধ্যমে যে বঙ্গ বিজয় সূচিত হয়েছিল তার একশত বছরের মধ্যে বঙ্গের বেশ কয়েকটি শহর ইসলামী সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। ত্রয়েদশ শতাব্দীর শেষ অবধি বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি এলাকা শক্তিশালী ভিত্তিতে মুসলমান সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবার ফলে গোটা বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার এবং ব্যাপকভিত্তিক মুসলিম সমাজ গঠনের একটি বিরাট পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। চতুর্দশ শতকের বাংলা ইসলাম প্রচারের একটি শক্তিশালী স্রোতধারা প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়ে সমগ্র বাংলা দেশকে ইসলামের ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
এ সমস্ত দিক বিবেচনা করে বলা চলে বাংলা দেশে মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির। বাকি কয়েকশত বছরে বাংলা দেশে অধিকাংশ এলাকায় মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে ইসলাম প্রচার ও মুসলিম সমাজ গঠনের যে বিরাট পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল তার কৃতিত্ব বখতিয়ার খলজির। তাই যারা বাংলা দেশে বখতিয়ার খলজিকে বহিরাগত আক্রমণকারী রূপে চিহ্নিত করে থাকেন তারা প্রকারন্তরে বঙ্গদেশে মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠায় বিরূপ মনোভাব পোষণকারী সন্দেহ নেই।