বন্ধু বাড়িয়ে শত্রু কমালেই দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ


২০ নভেম্বর ২০২৫ ২১:০৭

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের আশরাফুল মাখলুকাত, তথা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে বানিয়েছেন। আমাদের কাজই হলো দুনিয়ায় সুখের নীড় বানানো। মানুষে মানুষে হিংসা-বিদ্বেষ-পরশ্রীকাতরতা দূর করে একে অপারের সাথে বন্ধুসুলভ ব্যবহার করে পরিবার, সমাজ, দেশ ও আন্তর্জাতিকভাবে সম্পর্ক বাড়ানো। যুদ্ধ-বিগ্রহ তিক্ততা এড়িয়ে সহাবস্থানের পৃথিবী বানানো। এতে পৃথিবীতে শান্তি কায়েম হবে আবার এর বিনিময়ে আখিরাতে আমরা পাব নিয়ামত ভরা সীমাহীন জান্নাত।
মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের মানুষে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, কার সাথে বন্ধুত্ব করা যাবে আর কার সাথে বন্ধুত্ব করা যাবে না, তার বর্ণনা কুরআনুল কারীমের একাধিক সূরার বহু আয়াতে বর্ণনা করেছেন। মুমিন নারী ও পুরুষ পরস্পর বন্ধুত্ব করবে। আল্লাহকে অস্বীকারকারী এবং মুনাফিকদের সাথে বন্ধুত্ব করা যাবে না। বন্ধুত্ব ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। ছেলেমেয়ে, মা-বাবা, ভাই-বোন থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজনদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতে হবে। একে অপরের সুখ-দুঃখের সময় পাশে দাঁড়াতে হবে। ভালো কথা বা ব্যবহার দিয়ে একে অপরের সাথে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। অনেক সময় বিপদে কোনো ভাইয়ের একটি পরামর্শও মানুষকে উজ্জীবিত করে। বিপদ থেকে বাঁচার উৎসাহ পায়। তাই আমরা সবসময় ভালোর সাথে থাকবো, মন্দ থেকে দূরে থাকবো।
সমাজে চলতে গেলে ভালো-মন্দের সম্মুখীন হতে হয়। ছোট-খাটো বিষয়ে মানুষ একে অপরের সাথে ঝগড়া-ফ্যাসাদে জড়িয়ে পড়ে, যা কারো জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে না। একটু ধৈর্য ধরলেই দেখা যাবে একে অপরের ভুল বোঝাবুঝি মিটে গেছে। জীবনে চলার পথে সন্দেহ-সংশয়ের কারণে একে অপরের সাথে ঝগড়া-ফ্যাসাদের সৃষ্টি হয়। সন্দেহ থেকে দূরে থাকতে নবী সা. অনুৎসাহিত করেছেন। দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, হিংসা-বিদ্বেষ মানুষকে খারাপের পথে নিয়ে যায়। একবার নবী সা. বিবি আয়েশা রা.কে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন। পথিমধ্যে কয়েকজন সাহাবীর সাথে দেখা হয়ে যায়। কিছু না বলেই উভয়ই সামনে চলতে থাকে। নবী মুহাম্মদ সা. একটু পরেই উল্টো দিকে এসে সাহাবীদের বললেন, আমার সাথে যে মেয়েটি দেখেছো, তিনি আমার স্ত্রী আশেয়া রা.। সাহাবীদের যাতে কোনো সন্দেহ না জাগে যে নবীর সাথে কে ঐ মহিলা? এ কারণেই সন্দেহ-সংশয়কে দূরীভূত করতে হবে।
গুজব আমদানি করে মিথ্যা অভিযোগে মানুষ হত্যায় হাসিনার জুড়ি নেই। বিশেষ করে গত ১৫ বছর স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার সমাজে সন্দেহবশত গুম, খুন, হত্যা, জেলে ভরা, আয়নাঘরে মানুষকে নির্যাতন করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মিটাতে কত গুজবই রটানো হতো। জঙ্গির মিথ্যা অপবাদে প্রকাশ্যে গুম করে লোক মেরেছে। বছরের পর বছর হাত-পা বাঁধা, চোখ বাঁধা অবস্থায় আয়নাঘরে নির্যাতন করেছে। শহীদ মীর কাসেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আরমানকে ৮ বছর এক অন্ধকার আয়নাঘরে আটক রেখে নির্যাতন করেছে। প্রফেসর গোলাম আযমের ছেলে সোর্ড অব অনার পাওয়া ব্রিগেডিয়ার আযমীকেও দীর্ঘ ৮ বছর আয়নাঘরে নির্যাতন করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই ৩৬-এর বিপ্লবের পর স্বৈরাচার হাসিনা তার দাদার দেশে পালানোর পর তারা মুক্ত হয়েছেন। এখনো তারা আগের মতো সুস্থ হয়ে ওঠেননি। এমন হাজার হাজার ছাত্র-জনতাকে হাসিনার আমলে হত্যা করা হয়েছে, গুম করা হয়েছে, খুন করা হয়েছে, জেলে আটক রাখা হয়েছে। যার ফলে মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে দুনিয়াতেই সাজা দিচ্ছেন। বেঁচে থেকেও তিনি দেশে থাকতে পারছেন না। পাশের দেশে তাকে পরনির্ভর হয়ে বসবাস করতে হচ্ছে। আবার তারই গড়া ট্রাইব্যুনালে সম্প্রতি ফাঁসির আদেশ দিয়েছে তার দোসরদেরসহ। দুনিয়াতেই এ সাজা, আখিরাতে রয়েছে সীমাহীন আগুনে ভরা জাহান্নাম, যার শেষ নেই। চিফ প্রসিকিউটর তো বলেই ফেললেন, হাসিনার যত দোষ প্রমাণিত হয়েছে, তাকে ১০০ বার ফাঁসি দিলেও পাপের ভার শেষ হবে না। দুনিয়াতেই সে ও তার দোসররা বন্ধুহীন অবস্থায় দিনাতিপাত করছে, আর আখিরাতের জন্য রয়েছে সীমাহিন দুঃখের জাহান্নাম।
হাসিনার দোসররা বাংলাদেশের মানুষকে বন্ধু না বানিয়ে শত্রু বানিয়ে নিজের ক্ষতি করেছে। দেশের ক্ষতি করেছে। তারা দেশের অর্থনীতির ধস নামিয়ে দিয়েছে। দেশের টাকা বিদেশে পাঠিয়ে বেগমপাড়া বানিয়েছে, কিন্তু তারা কেউ শান্তিতে আছে বলে আমার মনে হয় না। কখন যেন ধরা পড়ে যায়- এই ভয়ে দিনাতিপাত করছে। দেশের মানুষের অভিশাপ নিয়ে চলতে হচ্ছে। তাদের দুনিয়াতেই বিচার করে ফাঁসি দেয়া হোক। আখিরাত তো রয়েই গেছে। তাই শুরুতে বলেছি, সমাজে ভালো মানুষের মতো বাঁচতে হলে দেশের মানুষকে বন্ধু বানাতে হবে, শত্রু কমাতে হবে।
আমরা যদি বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনা করি, দেখবো বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিন একসাথে চলেছে। নির্বাচন করেছে, সরকার গঠন করেছে। জামায়াতের দুই মন্ত্রী শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ৫ বছর ৩টি মন্ত্রণালয় দুর্নীতিমুক্তভাবে চালিয়ে বাংলাদেশে এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন। যা দুনিয়ার ইতিহাসে বিড়ল। আজকে ভারতের দালালির খপ্পরে পড়ে বিএনপি-জামায়াতের সাথে বন্ধুত্বকে শত্রুতায় পরিণত করেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জামায়াতের নাকি ৫-৭% ভোট আছে বাংলাদেশে। মির্জা ফখরুলকে বলব, সাম্প্রতিক ডাকসু, জাকসু, রাকসু ও চাকসুতে নির্বাচনে কেমন আপনারা ভরাডুবিতে নিমজ্জিত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোটারররা দেশের শিক্ষিত সমাজের অগ্রভাগের ছাত্রছাত্রী। তারা শিবিরকে যেভাবে মূল্যায়ন করে ভোটে অভাবনীয়ভাবে জয়ী করেছে তাতে মনে হয় বাংলাদেশে আগামীতে জামায়াতে ইসলামীই সরকার গঠন করবে, ইনশাআল্লাহ। তখন ফখরুল সাহেবরা বিরোধীদলে থাকতে পারবেন কিনা, চিন্তা করতে থাকেন। তাই বলি, বন্ধু বাড়ান, শত্রু কমান। তাতে আপনাদেরও লাভ, দেশেরও লাভ।
জামায়াতে ইসলামীকে এখন বন্ধু বাড়ানোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। ইতোমধ্যেই ৮ দলের বন্ধুত্ব হয়েছে এবং দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। আগামীতেও আরো দল ও ব্যক্তিকে বন্ধুত্বে আবদ্ধ করতে হবে। কারণ আমরা বলতে চাই, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, আবার দলের চেয়ে দেশ বড়। ৯২% মুসলমান অধ্যুষিত আমাদের এ জন্মভূমি বাংলাদেশ। আমাদের জনশক্তি আছে, আমাদের আছে সমতল ভূমি, নদী-সমুদ্রও কম নয়। আছে প্রাকৃতিক সম্পদও। আমরা ১৮ কোটি মানুষের দেশে খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাই আমরা যদি দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বের পরিবেশ তৈরি করে দেশে ও বিদেশের সাথে সম্পর্ক ভালো করে এগোতে পারি, তবে একটি আদর্শ রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম হব, ইনশাআল্লাহ।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ইসলামী ছাত্রশিবির বিশ্ববিদ্যায়গুলোয় বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে তাদের প্যানেলের নামও শিবিরের প্যানেল বলে পরিচয় না দিয়ে শিবির-সমর্থিত প্যানেলে ভোট করে ছাত্রছাত্রীদের বন্ধুত্বের পথে এগিয়েই এমন অভাবনীয় বিজয় লাভ করেছে। আগামীতেও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির তাদের বন্ধুত্ব বাড়ানোর ভূমিকা রাখবে।
জাতীয় জীবনে দীর্ঘ ৫৪ বছরে আমরা দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে পারিনি। দলে দলে বিভেদ, জামায়াতে ইসলামীকে একাধিকবার ব্যান্ড করা জাতিকে বিভক্তির বেড়াজালে ফেলে দিয়েছিল। বন্ধুত্বের বন্ধনে নয়, শত্রুত্বের বেড়াজালে আমাদের দেশকে আটকে উন্নয়নের বাধা সৃষ্টি করে রেখেছিল। বিশেষ দেশের প্রভুত্বের কাছে দেশকে আত্মসমর্র্পণ করে দেশের অর্থনীতি ভারতের কাছে জিম্মি করে রেখেছিল।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর দেশ ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়। আবার কারো প্রভুত্ব নয় আমরা স্বাধীন চিন্তায় চলতে চাই। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার স্বার্থ রক্ষা করেই আমাদের দেশ চালাতে চাই। কিছুদিন পূর্বে গুলশানে একটি বড় মাপের টেবিলটকে আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল- হিন্দুরা কি জামায়াতকে ভোট দেবে? আমি যখন বললাম, তারা জামায়াতে ইসলামীর কাছেই নিরাপদ। কারণ গত ৫৪ বছরে জামায়াতের লোকেরা কোনো হিন্দুর বাড়ি, জমি বা মেয়ে দখল করেনি, তাই তারা জামায়াতকেই ভোট দেবে বলে আমি মনে করি। তাদের আরো বললাম, শহীদ মতিউর রহমান নিজামী, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী হিন্দুদের ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমার ছোটবেলার বন্ধু ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি এখনো আমার ভালো বন্ধু ও শুভাকাক্সক্ষী, আবার আমার এলাকার বড় একজন হিন্দু ব্যবসায়ীও আমার বড় শুভাকাক্সক্ষী এবং আমাদের ভোট দেবে বলে আশা করি। পারিবারিকভাবেও আমার সাথে যোগাযোগ আছে।
দুনিয়াব্যাপীই বন্ধু বাড়ানো ও শত্রু কমানোর কাজ চলছে। শত শত কোটি টাকার যুদ্ধাস্ত্র না বানিয়ে যুদ্ধ-বিগ্রহ পরিত্যাগ করে দুনিয়াব্যাপী ছোট-বড়, ধনী-গরিব সবাইকেই মর্যাদা দিয়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়ালে দুনিয়ায় যুদ্ধ ও দরিদ্রের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। আবার সমাজের অর্থ নিয়ে আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলোর শাসকরা প্রমোদতরীতে সময় কাটানো বাদ দিয়ে মানবতার দিকে নজর দিলে দুনিয়াকে আমরা জান্নাতের বাগান বানাতে সক্ষম হব। সুখের বিষয় সৌদি আরব, ইরান, তুরস্ক, পাকিস্তান, মালায়েশিয়াসহ ইসলামী দেশগুলো বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প সিরিয়া ও সৌদি আরবের সাথে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে সরাসরি সাক্ষাতের উদ্যোগ নিয়েছে। যা দুনিয়ার অর্থনীতির জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে। তাই দেশে ও বিদেশে আমাদের বন্ধু বাড়াতে হবে, শত্রু কমাতে হবে। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণে কাজ করতে হবে।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com