ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদে আইনজীবীদের লংমার্চ


১৩ নভেম্বর ২০২৫ ১৮:৪৫

স্টাফ রিপোর্টার : ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং ৫৪টি যৌথ নদীর ন্যায্য পানির হিস্যার দাবিতে আইনজীবীদের সংগঠন ‘ভয়েস অব ল’ইয়ার্স বাংলাদেশ’-এর উদ্যোগে দুদিনব্যাপী লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ৭ নভেম্বর শুক্রবার সকাল ৮টায় জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে লংমার্চ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন সংগঠনের চেয়ারম্যান সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট গিয়াস উদ্দিন আহমেদ। তারপর ‘ভয়েস অব ল’ইয়ার্স বাংলাদেশ’ এর প্রধান সমন্বয়ক আশরাফ উজ জামানের নেতৃত্বে কর্মসূচি শুরু হয়। লংমার্চ চলাকালে বিভিন্ন স্থানে পথসভা, সংহতি সমাবেশ, আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। গত ৮ নভেম্বর বিকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দরে গিয়ে লংমার্চ কর্মসূচির সমাপ্তি হয়।
‘ভয়েস অব ল’ইয়ার্স বাংলাদেশ’-এর প্রধান সমন্বয়ক এডভোকেট আশরাফ উজ জামান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে এ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি ভারত নগ্ন হস্তক্ষেপ করেই যাচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধ, টিপাইমুখ বাঁধসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির একতরফাভাবে প্রত্যাহার করছে। এর ফলে বাংলাদেশের মানুষ ভারতের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালে নদীর পানি ছেড়ে দিয়ে কৃত্রিম বন্যায় ফসল ভাসিয়ে দেওয়া হয়, শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে মরুকরণ করা হয়। এভাবে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা মরুকরণ হয়ে পড়েছে। গত বছর ফেনী নদীর বাঁধ ছেড়ে দিয়ে আকস্মিক বন্যায় বাংলাদেশের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি করা হয়েছে। সীমান্তে ফেলানীসহ বাংলাদেশের শত শত নাগরিককে হত্যা করেছে ভারত। পার্বত্য এলাকায় ভারতের প্রত্যক্ষ মদদে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। অথচ এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সরকার কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না, এটি দুঃখজনক।
তিনি বলেন, ছাত্র ও যুবশক্তি বাংলাদেশের সম্পদ ও গর্ব। জুলাই বিপ্লবে তাদের নেতৃৃত্বে এদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদ পরাজিত ও বিতাড়িত হয়েছে। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অতন্দ্রপ্রহরী হিসেবে ছাত্র ও যুবকদের বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এরাই পারবে ভারতীয় আগ্রাসন প্রতিহত করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে।
এ আইনজীবী বলেন, সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং ৫৪টি নদীর ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে সরকারকে এখনই কার্যকর ও শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। ভারতের দখলে থাকা বাংলাদেশের দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ ফিরিয়ে দিতে হবে। আমাদের দেশের কৃষি, অর্থনীতি এবং স্বাধীনতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নদীর পানির অধিকার ও সীমান্ত সুরক্ষা ইস্যুতে জরুরি ভিত্তিতে কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
পথে পথে সংহতি ও প্রতিবাদী সমাবেশ
লংমার্চ কর্মসূচি ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে গাজীপুর চৌরাস্তায় প্রথম পথসভা করে। সেখানে সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। গাজীপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মুস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে স্থানীয় আইনজীবীরা লংমার্চের প্রতি সংহতি জানান।
এরপর লংমার্চটি কাশিমপুর, কালিয়াকৈর, মির্জাপুর, বাসাইল ও কালিহাতি অতিক্রম করে শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টায় সিরাজগঞ্জে পৌঁছায়। সেখানে জেলা আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ ফুলেল শুভেচ্ছায় লংমার্চে অংশগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দকে স্বাগত জানান।
সেখানে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন সিরাজগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট রফিক সরকার। সভায় বক্তব্য দেন সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু, এডভোকেট আশরাফ উজ জামান, এডভোকেট শাহ আহমেদ বাদল, সাবেক এমপি এডভোকেট তাসমিন রানা, এডভোকেট মো. দেলওয়ার হোসেন, এডভোকেট হুমায়ন কবীর, এডভোকেট সাইদুর রহমান বাচ্চুসহ নেতৃবৃন্দ। বক্তারা স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর ও শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন এবং ভারতের আগ্রাসী নীতির তীব্র নিন্দা জানান।
নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা ও সীমান্ত পরিস্থিতিতে উদ্বেগ
আইনজীবীরা বলেন, ভারত ৫৪টি যৌথ নদীর পানির প্রবাহ একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে রেখে বাংলাদেশকে খরার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, মরুকরণ করছে এবং বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়ে সৃষ্টি করছে ভয়াবহ বন্যা। এর ফলে দেশের কৃষি, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জনজীবন মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তারা আরও বলেন, ফারাক্কা, তিস্তা, টিপাইমুখসহ বিভিন্ন নদীর পানির ওপর ভারতের একতরফা নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক নদী আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি পানি চুক্তি আজও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের জনপদ বারবার খরা ও বন্যার আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। এছাড়া ভারতীয় বাহিনী বিএসএফ কর্তৃক সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশি হত্যাকে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন উল্লেখ করে বক্তারা অবিলম্বে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ ও শক্ত অবস্থান নেওয়ার দাবি জানান।
নাটোর ও রাজশাহীতে সংহতি সমাবেশ
গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় নাটোরের মাদরাসা মোড়ে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বক্তব্য রাখেন এডভোকেট আশরাফ উজ জামান, এডভোকেট শাহ আহমেদ বাদল, সাবেক এমপি এডভোকেট তাসমিন রানা, অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন, জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি অধ্যাপক সাদেকুর রহমানসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। এডভোকেট মো. দেলওয়ার হোসেন পথসভা কর্মসূচি সঞ্চালনা করেন।
রাত ৮টায় লংমার্চ রাজশাহীতে পৌঁছায়। এরপর রাজশাহী কলেজ মিলনায়তনে প্রেস ব্রিফিং করেন ভয়েস অব ল’ইয়ার্স বাংলাদেশ এর নেতৃবৃন্দ। এ সময় তারা বলেন, বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে দিয়ে বন্যা সৃষ্টি, শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে রেখে কৃষি ধ্বংস, ফেনী নদীতে ৩৭টি অবৈধ পাম্পের মাধ্যমে পানি উত্তোলন, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক হত্যাকাণ্ড এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মদদ দেওয়ার মতো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভারত নিজেকে বাংলাদেশের প্রতি বৈরী রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করেছে। বক্তারা এসব পদক্ষেপকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত বলে উল্লেখ করেন এবং এর বিরুদ্ধে কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের দাবি জানান।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সমাপ্তি সমাবেশ
গত ৮ নভেম্বর শনিবার লংমার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জে পৌঁছায়। জেলা আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট মো. ইসহাক। সভায় সমিতির নেতৃবৃন্দ ও ভয়েস অব ল’ইয়ার্স বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য দেন এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
বিকাল ৫টায় সোনামসজিদ স্থলবন্দরে লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তারা বলেন, শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে রাখা, বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়া সাধারণ মানুষের ওপর এক প্রকার জল-অত্যাচার তথা পানি আগ্রাসন। সীমান্তে হত্যা, ফেনী নদীর পানি লুট এবং পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মদদ দেওয়া বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। পানির ন্যায্য অধিকার ও সীমান্ত সুরক্ষার প্রশ্নে ভারতের আগ্রাসী নীতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। সমাপনী সমাবেশে শহরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে। বিকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দরে সমাবেশের মধ্য দিয়ে লংমার্চ কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করেন ভয়েস অব বাংলাদেশ এর চেয়ারম্যান এডভোকেট গিয়াস উদ্দিন আহমেদ।
লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যান এডভোকেট শাহ আহমেদ বাদলের সার্বিক তত্ত্বাবধানে কর্মসূচি ব্যবস্থাপনায় ছিলেন ভয়েস অব ল’ইয়ার্স বাংলাদেশ এর সমন্বয়ক এডভোকেট মো. দেলওয়ার হোসেন। এছাড়া এডভোকেট মজিবুর রহমান, ব্যারিস্টার গোলাম মোস্তফা তাজ, এডভোকেট মাইনুদ্দিন ফারুকী, এডভোকেট নাসিরুদ্দিন সম্রাট, এডভোকেট শাহিন হোসেন, এডভোকেট কাজী ওবায়দুর রহমান, এডভোকেট মিজানুর রহমান, এডভোকেট রাহেদুল ইসলাম লংমার্চ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।