কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানে প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কার
১৩ নভেম্বর ২০২৫ ১৭:৫৩
॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের পরিবর্তন যে নিছক একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন কিংবা ক্ষমতার পালাবদল ছিল না- এটি সম্ভবত বোধসম্পন্ন মানুষের মগজে জাগরুক আছে। গত বছরাধিককাল ধরে দেশে যে ‘সংস্কার’ নামক এক মহারোল শোনা যাচ্ছিল- এটি তারই বড় একটি অনুষঙ্গ। তবে সেটি ‘নির্বাচন’ নামের ডামাডোলে যেন চাপা পড়তে বসেছে, তাও মাথায় রাখতে হচ্ছে। তবুও সব কথার শেষ কথা এ যে, নতুন প্রজন্ম সর্বাগ্রে চায় রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংস্কার। কেননা আসন্ন বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে এ সংস্কারের সম্পর্ক গভীরভাবে জুড়ে আছে।
সেদিনগুলো তো ভুলে যাওয়ার নয়- যেদিন পরমতসহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা, অন্যের অভিমত ও অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা এবং পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শন, ভিন্নমত আর দ্বিমতকে যুক্তির মাধ্যমে খণ্ডন করার আশা করা; সেসব যেন এক দুঃস্বপ্ন ছিল। সেসব পাঠানো হয়েছিল জাদুঘরে কিংবা আর্কাইভে। অথচ সেগুলোই ছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রাণ। নিজের মতামত ও বক্তব্য উপস্থাপনের পাশাপাশি অন্যেরটা শোনার ধৈর্য ও মানসিকতা এবং যৌক্তিকভাবে নিজের মতামত তুলে ধরা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির স্বীকৃত মূল্যবোধ। দুর্ভাগ্যবশত এ সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এ মৌলিকবোধের ঘাটতি প্রকট ছিল বরাবর। কখনো একদলীয় দুঃশাসন চাপিয়ে দেয়া, কখনো পরদেশের ইচ্ছাকে অগ্রাধিকার প্রদান অথবা স্বৈরশাসনকে হাতিয়ার করে দুর্নীতিকে শাসনের মূলনীতিতে পরিণত করার বাসনা থেকেই এ অপশাসনের প্রবর্তন। এরকম দুঃশাসনকে দীর্ঘস্থায়ী হতে দিতে চায়নি নতুন প্রজন্ম। পঁচাত্তরে বলি কিংবা নব্বইয়ে অথবা চব্বিশে তাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে।
নতুন প্রজন্ম যা চায়
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন প্রজন্ম যা চায়, তার একাধিক নমুনা বা ট্রেলার সাম্প্রতিক সময়ে তারা দেখিয়ে দিয়েছে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে। একটি নির্মল ও জবরদস্তিবিহীন নির্বাচনী তথা রাজনৈতিক পরিবেশ সর্বাবস্থায় বিরাজ থাকবে- এমন প্রত্যাশা যে মানুষ করছে তার এ নমুনা ইতোমধ্যে উপস্থাপিত হয়েছে বলে ভাবা যেতে পারে। আর সেটি ডাকসু, জাকসু, চাকসু ও রাকসু ইত্যাদি নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে। একদা যেখানে দেশের উচ্চ শিক্ষাঙ্গনগুলো ছিল সন্ত্রাসের লীলাভূমি, নির্যাতক ও নিপীড়কের স্বর্গ- সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিষ্ঠানেই শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন পরিবেশের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। অর্থাৎ দেশের তরুণ সমাজ আর সেই বন্য ছাত্র রাজনীতির বুনো পরিবেশে ফিরে যেতে চায় না। তারা চায় পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতকে মেনে নিয়ে সহাবস্থানের সামাজিক অবস্থান বজায় রাখতে। এর মধ্য দিয়ে যেন তারা তাদের এ সুস্পষ্ট অভিমত জানিয়ে দিয়েছে যে, সুশাসন নিশ্চিত করে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে তরুণ প্রজন্মকে এ মূল্যবোধ ধারণ ও চর্চাকে অব্যাহত রাখতে হবে।
অতীতের নষ্ট রাজনীতি যেহেতু প্রধানত ‘দুর্নীতিপরায়ণতা’কে নির্ভর করে আবর্তিত হয়েছে ফলে তরুণ প্রজন্ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে- এটি ধরে নিয়ে এগোতে হবে। এ দুর্নীতি কেবল ব্যাংকের টাকা পাচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ মনে করলে হবে না। রাষ্ট্র, প্রশাসন, সমাজ, নির্বাচন, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনৈতিক দল প্রভৃতি সর্বত্র নানান আকারে-প্রকারে, পদ্ধতি ও ব্যবস্থায় এবং ব্যবহারিক কৌশলে এ দুর্নীতির অপছায়া বাসা বেঁধে আছে। এসবের মূলোৎপাটন কীভাবে হবে, তার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশিকা থাকতে হবে। নচেৎ ‘সকলই গরলি ভেল’-এর পরিণতি বহন করবে।
বর্তমান প্রজন্ম শুধু সমস্যার সমাধান চায় না, তারা সমস্যার মূলে যেতে চায় এবং পরিবর্তনের জন্য কাজ করতে চায়। আজকের তরুণরা রাজনীতির প্রতি আগ্রহী, কিন্তু তারা প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি আস্থাহীন। কারণ তারা দেখেছে কীভাবে ক্ষমতার লোভ, দমন-পীড়ন এবং দুর্নীতি একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তারা চায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, যেখানে মতের স্বাধীনতা থাকবে, বৈষম্য দূর হবে এবং প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে।
নির্বাচনকেন্দ্রিক নতুন ভাবনা
একটি সর্বপ্লাবি পরিবর্তনের হাত ধরে এখন নতুন ভাবনার সময় এসেছে। তরুণ প্রজন্ম সেটির অপেক্ষায় আছে। প্রথম যে ইস্যুটি সামনে আছে, সেটি হলো আসন্ন নির্বাচন। যেটি জাতীয় জীবনে অনেক প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এ নিয়ে প্রথমেই মাথায় আসেÑ এর আয়োজনের সার্বিক পরিবেশ কেমন থাকবে এবং সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক কোটি নতুন ভোটার এবং ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিতরা এর অংশ হবে সেই অপেক্ষায় আছে।
আগামী বছরের প্রথমার্ধ নির্ধারিত হয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য। দেশে নির্বাচন বা ভোট আয়োজন নতুন কোনো ঘটনা বা নতুন কোনো অভিজ্ঞতা অর্জনের ব্যাপার নয়। তবে আগামী নির্বাচনের জন্য ‘নতুন’ একটি ব্যাপার এই হবে যে, বিগতকালের জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনের মতো এ নির্বাচন ‘গুণ্ডাতন্ত্র’ থেকে মুক্ত থাকতে পারবে কিনা। এ প্রশ্ন ওঠার হেতু হলো, চব্বিশের ৫ আগস্ট জাতি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে বিপুল পরিবর্তন এনেছে, তার মধ্যে অনেক কিছুর সঙ্গে নির্বিঘ্নে ও স্বাধীনভাবে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
যার অধিকার থেকে অন্তত চারটি মেয়াদের সংসদ ও অনেকগুলো স্থানীয় নির্বাচনে মুক্তভাবে অংশ নিতে পারা থেকে জাতি বঞ্চিত ছিল।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় ও মহাজোটের সরকারের অধীনে যে ভোটের অভিজ্ঞতা জাতি অর্জন করেছে, তা এককথায় ছিল ‘নষ্টকাল’। শুধু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই নয়, তৃণমূলেও এ নষ্টামি ছড়িয়ে গিয়েছিল। বহু রাখঢাকের পরও গণমাধ্যমে যা কিছু প্রকাশ পেত তা ছিল শিউরে ওঠার মতো। আওয়ামী লীগের নেতা স্থানীয় এমপি, মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান প্রভৃতি পদের প্রার্থীরা প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বেড়াতো প্রতিপক্ষের প্রার্থীদেরকে। সংবাদপত্রের সেসব ভীতিকর শিরোনামগুলো আজো চোখের সামনে ভাসে: ‘পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে নৌকায় ভোট নেয়া হবে’, ‘হিন্দু ভোটারদের উচিত শিক্ষা দেয়া হবে’, ‘প্রয়োজনে একে-৪৭ ব্যবহার করা হবে’, ‘রক্তের খেলা কিন্তু বন্ধ হবে না’, ‘নৌকায় প্রকাশ্যে সিল মারতে হবে’, ‘পরাজয় হলে ধর্ষণের হুমকি’, ‘নৌকার ভোটার ছাড়া কেন্দ্রে যাওয়া যাবে না’ ইত্যাদি। সেসব কণ্ঠস্বর যেন আর উচ্চারিত হতে না পারে এবং সেই দিনগুলো যেন আর ফিরে আসার সুযোগ না পায়, সেটি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, সেসময়ের এ অপব্যবস্থার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ নির্বাচন-ব্যবস্থার প্রতি ভোটারদের আস্থা কমে গেছে। কারণ তারা বিশ্বাস করা ছেড়ে দিয়েছিল যে তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব। রাজনৈতিক বিভাজনও দিন দিন তীব্র হয়েছে। এমনও হয়েছে যে, শাসকদল এবং বিরোধীদলের সমর্থকদের মধ্যে সামাজিক, পারিবারিক; এমনকি পেশাগত সম্পর্কেও বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশাপাশি দুর্নীতি দেশের প্রতিটি স্তরে বিস্তার লাভ করেছে। ক্ষমতাসীনদের ছত্রচ্ছায়ায় একদল সুবিধাভোগী শ্রেণি গড়ে উঠেছে, যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটে মত্ত। এ সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি সামাজিক এবং নৈতিক সংকটেরও পরিচায়ক। একটি রাষ্ট্র যখন তার জনগণের আস্থা হারায়, তখন সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা বরাবর বলে আসছেন, এ সময় সর্বাধিক জরুরি বিষয় হলো, রাজনীতিকে মাস্তানতন্ত্র ও বিদেশের ভাড়াটিয়া হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার প্রক্রিয়া থেকে মুক্ত হতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞানভিত্তিক রাজনীতির চর্চা ও অনুশীলনকে নিয়মিত করে তুলতে হবে। সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি স্তরে সুস্থ প্রতিযোগিতার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বিশেষত যেকোনো নির্বাচনের সময় প্রতিযোগী প্রার্থীর প্রচারকালে পরস্পরের প্রতি ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ যদি না-ও হয়, অন্তত শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার সম্পর্ক যেন বজায় রাখা হয়। কারণ রাজনীতি ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি নাগরিক সেবা। আর গণতান্ত্রিক পরিবেশের অর্থই হলো আইন ও বিধানের অধীনে থেকে সকলকে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
বিভাজনের দিন ফুরিয়েছে
বাম-ধর্মনিরপেক্ষ জোটের অপশাসনের অন্যতম কৌশল ছিল ‘বিভাজনমূলক’ স্লোগান ও বক্তব্য ব্যবহার। কিন্তু সেই দিন ফুরিয়েছে। মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, পাকিস্তানপন্থা প্রভৃতি প্রকারের এসব শব্দবন্ধ দেশের মানুষকে আর টানবে না। উচ্চ শিক্ষাঙ্গনের নির্বাচনগুলোয়ও তার পরীক্ষা হয়ে গেছে এবং সেগুলো বিপুল অংকের ব্যবধানে ফেল মেরেছে। এখন প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য, সংহতি, ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি এবং কোনো প্রকার স্বৈরশাসন ফিরে না আসার গ্যারান্টি লাভ করতে পারা। একজন তরুণ নেতা এরই মধ্যে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, ‘নতুন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ইন্ডাস্ট্রি ব্যবসা চলবে না।’ তিনি বলেছেন, ‘ফ্যাসিবাদী আমলে একটি দল সবসময় মুক্তিযুদ্ধ ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে ফ্রেমিং করতো, ব্যবসা করতো। শাহবাগ প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল। নতুন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ইন্ডাস্ট্রির কোনো ব্যবসা চলবে না। জুলাই চেতনা নিয়ে যারা ব্যবসা করতে চাইবে, সেই ব্যবসাও চলবে না। জুলাই আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে যারা নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চাইবে-শুধু সেই রাজনীতিই চলবে।’
রাজনীতিকে দেশ ও মানুষের সেবার সবচেয়ে বৃহৎ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু অতীতে তা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ রক্ষার বাহন রূপে ব্যবহৃত হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম চায় রাষ্ট্র ও রাজনীতি হোক মানবসমাজের কল্যাণের মাধ্যম। এর মধ্য দিয়েও নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব। রাজনীতি কোনো ব্যবসা-বাণিজ্যের বাহন বা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। আমরা আশা করতে পারি যে, তরুণরা ক্ষমতার জন্য রাজনীতি নয়, বরং তারা জনসেবার জন্য রাজনীতির ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তারা চায় এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে এবং তাদের মতামতের মূল্য প্রদান করা হবে।
ক্ষমতার লোভ আর নয়
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকটের একটি বড় কারণ হলো ‘ক্ষমতার লোভ’ এবং একে যেনতেন প্রকারে হলেও ধরে রাখা। বিশ্লেষকরা বলছেন, একই কারণে অতীতে ঘটেছে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, বিরোধীদলের দমন-পীড়ন এবং রাজনৈতিক দুর্নীতি, যা জনগণের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে। গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের প্রচলন স্বাভাবিক রাজনীতিকে বলতে গেলে একঘরে করে ফেলেছে। ক্ষমতাসীন দল নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহারের মাধ্যমে বিরোধীদের কণ্ঠ রোধ করে আসছে। নির্বাচন ব্যবস্থা জনমতের প্রতিফলন ঘটানোর পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের পরিকল্পিত বিজয় নিশ্চিত করার যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বার বার সংগ্রাম করতে হয়েছে এদেশের মানুষকে। কিন্তু সেই সংগ্রামের ফল প্রাপ্তি বার বার মাঝপথে হোঁচট খেয়েছে। রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ক্ষমতার লোভ এবং একনায়কতন্ত্রের প্রবণতা এতটাই গভীরে প্রোথিত যে, সেখানে পরিবর্তনের জন্য নতুন চিন্তাধারা এবং নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। নবপ্রজন্ম সেই নয়া নেতৃত্বকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত হয়ে আছে। এটি যে কেবল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অর্জিত হবে তাই নয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলোকে স্বাভাবিকভাবে এবং অব্যাহতভাবে চলমান থাকতে দিতে হবে।
নৈতিকতাভিত্তিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা
নয়া প্রজন্ম মনে করে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের জন্য একই সঙ্গে প্রয়োজন হলো ‘নৈতিকতাভিত্তিক রাজনীতি’ প্রতিষ্ঠা করা। বিশ্লেষকরা এর জন্য রাজনীতিতে শুদ্ধি অভিযানের প্রয়োজন বলে মনে করেন। তাঁদের মতে, এজন্য প্রয়োজন হবে দুর্নীতিবাজ-দুর্বৃত্তদের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বিতাড়িত করা। রাজনীতিকে যারা জনকল্যাণের পরিবর্তে ‘ব্যবসায়িক’ হাতিয়ারে পরিণত করেছেন, তাদের করালগ্রাস থেকে রাজনীতিকে মুক্ত করা সর্বাধিক জরুরি। আরো প্রয়োজন হলো ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সব ক্ষেত্রে নৈতিক আচরণ।
সংবিধান ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং আদালতের নির্দেশ মেনে চলা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, মানবাধিকার সংরক্ষণে অবিচল থাকা, ক্ষমতার অপব্যবহার না করা, কোনোরূপ পক্ষপাতিত্ব থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি নৈতিক আচরণের বৈশিষ্ট্য। তাই রাজনীতিতে অনৈতিকতার অবসান ঘটলেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলের পথ সুগম হবে। এর সঙ্গে এটিও গুরুত্বপূর্ণ যে, ব্যক্তি মানুষের আচার-আচরণ ও স্বভাব-প্রকৃতি শালীন ও সুসংস্কৃত হতে হবে। অশালীন, উদ্ধত আর অহমিকাপূর্ণ আচরণ সুস্থ রাজনীতির বড় শত্রু বলে বিবেচিত হতে হবে।
বাংলাদেশ একটি আশাবাদী গণতান্ত্রিক ও সুস্থ ধারার রাজনীতির দিকে উত্তরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাপক সংস্কারের কাজ হাতে নিয়েছে। কিছু সংস্কার কাজ ইতোমধ্যে করা হয়েছে। এসব সংস্কারের বাইরে আরেকটি বিষয়ে সংস্কারের কথা ভেবে দেখতে হবে সেটা হচ্ছে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সুস্থ ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা শুরু না হলে কর্তৃত্বাবাদ, সংঘর্ষ ও দুর্নীতির রাজনীতি বন্ধ হবে না।