ছোটদের বিশ্বনবী (সা.)


৬ নভেম্বর ২০২৫ ২১:৩৮

সুমাইয়া নূর : এ অপরূপ সুন্দর পৃথিবীতে মানুষকে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ আমাদের রব। তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন শুধুমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্য। মানুষ অনেক সময় আল্লাহকে ভুলে গিয়ে বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করত। তাদের বিপথ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে অনেক নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁরা ছিলেন মহৎ হৃদয়ের মানুষ। তাদের মধ্যে একজন হলেন হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি আমাদের সর্বশেষ নবী বিশ্বনবী। আমরা যে গ্রন্থ থেকে সঠিক পথের সন্ধান পাই, সেই পবিত্র আল-কুরআন মাজিদ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর নাযিল হয়।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম : আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কায় ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২০ এপ্রিল, রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ জন্মগ্রহণ করেন। সেই দিনটি ছিল সোমবার। হযরত মুহাম্মদ (সা.) কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিচয় : মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নবী। তাঁর মাতা হলেন আমিনা। তাঁর পিতার নাম আব্দুল্লাহ। তিনি জন্মগ্রহণ করার পূর্বেই তাঁর পিতা মারা যান। তাঁর দাদার নাম আব্দুল মুত্তালিব। জন্মগ্রহণের পর তাঁর নাম রাখা হয় মুহাম্মদ এবং আহমাদ। তাঁর দুধমাতা হালিমা। তাঁকে কুরাইশ বংশের প্রথা অনুসারে হালিমার হাতে তুলে দেওয়া হয়। তিনি ছিলেন বানু সাদ গোত্রের একজন বেদুঈন মহিলা। কিন্তু মহানবী (সা.)-এর প্রথম দুধমাতা হলেন সোয়েবা, যিনি মহানবী (সা.)-এর চাচা আবু লাহাবের দাসী ছিলেন। তাঁর দুধভাইয়ের নাম আবদুল্লাহ।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মের সময় তাঁর দেশের অবস্থা : মহানবী (সা.)-এর দেশ তথা জন্মভূমি আরব। তাঁর জন্মের সময় তাঁর দেশ আরবের অবস্থা ছিল খুবই অমানবীক। সেসময় আরবের লোকেরা মূর্তিপূজা করত। নানা ধরনের পাপকাজ করত। আমাদের পবিত্র কাবাঘরে তারা ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করেছিল। সেসময় হাট-বাজারে পণ্য বেচাকেনার পাশাপাশি মানুষও বেচাকেনা হতো। দাস-দাসীদের প্রতি মনিবরা প্রচুর জুলুম করত। নারীদের কোনো অধিকার ছিল না পরিবার ও সমাজে। কন্যাশিশুর জন্ম অপমানের বিষয় মনে করা হতো। এমনকি তাদের মাটিতে পুঁতে রাখা হতো। এই সময় অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর জন্মের সময় কোনো মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ছিল না। সেই সময়ের অবস্থা ছিল খুবই বর্বর ও মানবতাবিরোধী। সেই সময়টাকে বলা হতো ‘আইয়্যামে জাহিলিয়াত’ বা ‘মূর্খতার যুগ।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শৈশবকাল : মহানবী (সা.) শিশুকালে দুধমাতা হালিমার কাছে থাকতেন। পাঁচ বছর পর্যন্ত তিনি তাঁর দুধমাতা হালিমার কাছে ছিলেন। আবার পাঁচ বছর বয়সেই তিনি তাঁর মাতা আমিনার কাছে ফিরে আসেন। কিন্তু যখন মহানবী (সা.)-এর বয়স ছয় বছর, তখন তাঁর মাতাও মারা যান। পিতা-মাতা দুজনকেই হারিয়ে তিনি এতিম হয়ে যান। তখন থেকে তিনি দাদা আব্দুল মুত্তালিবের স্নেহে লালিত-পালিত হতে থাকেন। মুহাম্মদ (সা.)-এর আট বছর বয়সে তাঁর দাদাও মারা যান। তখন চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন তিনি। তখন থেকেই তিনি তাঁর চাচার সাথে থাকতে শুরু করেন।
কিশোর মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) : মুহাম্মদ (সা.) তাঁর চাচার কাছে থাকতেন। তাঁর চাচা আবু তালিরের আর্থিক অবস্থা তখন খুব ভালো ছিল না। তিনি তাঁর চাচার পরিবারে নানাভাবে সাহায্য করতেন। কিশোর মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন কর্মঠ মানুষ। তিনি বিভিন্ন ঝগড়া-বিবাদ সঠিকভাবে বিচার করতেন। তিনি তাঁর চাচার ব্যবসা-বাণিজ্যে সাহায্য করতেন। যখন মহানবী (সা.)-এর বয়স ১২ বছর ২ মাস ১০ দিন, তখন তিনি চাচা আবু তালিবের সাথে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া রওনা হন। তিনি যখন সিরিয়ায় পৌঁছান তখন বুহাইরা (জোরজিস) নামক খ্রিষ্টান পাদ্রির সাথে দেখা হয়। তিনি মহানবী (সা.)-কে শেষ নবী বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেন।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়্যতপ্রাপ্ত হওয়া : মহানবী (সা.) ছোট থেকেই মুক্ত চিন্তার অধিকারী ছিলেন। বাড়ি থেকে তিন মাইল দূরে হেরা পর্বতের গুহায় তিনি ধ্যান করতেন। একদিন জিবরাইল (আ.) আল্লাহর বাণী নিয়ে আসেন গুহায়। তখন মহানবী (সা.)-এর বয়স ছিল চল্লিশ বছর। তাঁর কাছে প্রথমে সূরা আলাকের প্রথম ৫টি আয়াত নাযিল হয়। তারপর থেকে পরিবেশের ওপর নির্ভর করে সম্পূর্ণ কুরআন ধীরে ধিরে নাযিল হয়।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়্যতপ্রাপ্ত হওয়ার পর তাঁর জাতির প্রতিক্রিয়া : মহানবী (সা.) নবুয়্যতপ্রাপ্ত হওয়ার পর যখন ঈমানের দাওয়াত দিতে শুরু করেন, তখন জাতি ও দেশবাসী তাঁর শত্রু হয়ে যায়। তাঁর ওপর ও সাহাবীদের ওপর নির্যাতন শুরু করে। তাঁদের সাথে শত্রুতা শুরু করে। এমনকি মহানবী (সা.)-কে হত্যার চক্রান্ত শুরু করে।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হিজরত : হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নিকট ৬২১ খ্রিষ্টাব্দে হজের মৌসুমে মদিনা থেকে ১২ জন এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরের বছর হজের সময় মদিনার দুজন মহিলাসহ ৭৫ জনের একটি দল ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন কাফেরদের বিরোধিতা বেড়ে গেলে মহানবী (সা.) সাহাবীদের মদিনায় হিজরতের নির্দেশ দেন এবং আল্লাহর নির্দেশ পাওয়ার পর তিনিও হিজরত করেন। অবশেষে তিনি ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর মদিনায় পৌঁছান।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মিরাজে গমন : মহানবী (সা.)-এর নবুয়্যতের একাদশ সনে রজব মাসের ২৭ তারিখে তিনি মিরাজে যান। প্রথমে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে মসজিদে হারাম থেকে বায়তুল মোকাদ্দাসে নিয়ে যাওয়া হয়। তার পর সেখান থেকে ঊর্ধ্বলোকে ভ্রমণ করিয়ে আনেন। মিরাজে তিনি বায়তুল মোকাদ্দাসে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের সান্নিধ্য লাভ করেন। এই মিরাজ গমনের সময় সালাত ফরজ হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বিদায় হজ : মহানবী (সা.) দশম হিজরিতে হজ পালন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এটি তাঁর জীবনের শেষ হজ ছিল। এরপর তিনি হজ করার সুযোগ পাননি। এ হজ হলো বিদায় হজ। এ হজেই মহানবী (সা.) আরাফাত ময়দানে জাবালে রহমতে এক মর্মস্পর্শী ভাষণ দেন। এ ভাষণে দাঁড়িয়ে মহানবী (সা.) জাহেলি যুগের সকল প্রকার কুসংস্কার বাতিল করে দেন।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চারিত্রিক গুণাবলি : মহানবী (সা.) ছিলেন উন্নত চরিত্রের অধিকারী। তিনি সবসময় ভালো কাজ করতেন। সৎ পথে চলতেন। সত্যকে আঁকড়ে থাকতেন। মিথ্যা থেকে দূরে থাকতেন। কারো প্রতি জুলুম করতেন না। তিনি কখনো প্রতারণা করেননি। তিনি ন্যায় পথে ছিলেন। সবাইকে ন্যায়; সত্য ও সুন্দর পথে থাকতে বলতেন। সবাই তাঁকে বিশ্বাস করে ‘আল-আমীন’ বলে ডাকত। তাঁর সত্যবাদিতায় মুগ্ধ হয়ে সবাই ‘আস সাদিক’ বলত।
ছোটদের প্রতি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ভালোবাসা : ছোটদের প্রতি স্নেহ প্রদর্শন করা মহৎ এবং প্রশংসনীয় গুণ। ছোটদের ভালোবাসা হলো উত্তম আচরণ। মহানবী (সা.) সবসময় ছোটদের স্নেহ করতেন। তাদের ভালোবাসতেন। সমাজে মধুর পরিবেশ সৃষ্টি হয় ছোটদের ভালোবাসার মাধ্যমে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘সে ব্যক্তি আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য নয় যে ব্যক্তি ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের শ্রদ্ধা সম্মান করে না।’ এ কথাটি অন্যভাবে সুনানে তিরমিযীতে এসেছে। বাক্যটি এভাবে আসে, যে শিশুদের প্রতি দয়া করে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়। রাসূল (সা.)-এর কথা দিয়ে বোঝা যায় তিনি ছোটদের সীমাহীন ভালোবাসতেন।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা : মহানবী (সা.)-এর শৈশব ও কৈশোর জীবনের কথাই বলি না কেন তিনি সবসময় ছিলেন সত্যবাদী। তিনি সবসময় সত্যের পথে ছিলেন। সত্য কথা বলতেন। সবার সাথে তিনি সম্প্রীতি বজায় রাখতেন। তিনি অন্যের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। তিনি ছিলেন খুবই বিশ্বাসী। এককথায় বলতে গেলে তাঁর ভেতর সকল ভালো গুণ বিদ্যমান ছিল। তাঁর জীবন থেকে আমরা ভালোবাসা, সত্যবাদিতা, শৃঙ্খলা এবং আমানতদার হতে শিখি। তাঁর জীবন থেকে আমরা আরও অনেক কিছু শিখতে পাই। মহানবী (সা.)-এর চরিত্রে ইনসাফের দৃষ্টান্ত ফুটে ওঠে। জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে ইনসাফকে প্রতিষ্ঠিত করতে শিখি।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ইন্তেকাল : বিদায় হজ থেকে ফেরার পর মহানবী (সা.) অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ অসুস্থ অবস্থায় তিনি হিজরি একাদশ সালের ১২ রবিউল আউয়াল তারিখে ইন্তেকাল করেন। মদিনা শরিফের মসজিদে নববির এক পাশে মহানবী (সা.)-কে কবর দেওয়া হয়। বিশ্বের সকল মুসলমান তাঁর কবর ভক্তিভরে জিয়ারত করেন।
উপসংহার : আমাদের প্রিয়নবী ও রাসূল মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর জীবন থেকে আমরা নিজেদের জীবনকে সত্যের পথে গড়ার অনুপ্রেরণা পাই। তাঁর কাজ-কর্ম, কথা-বার্তা সবকিছুতে রয়েছে উত্তম আদর্শ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে তোমাদের জন্য রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ। (সূরা আহযাব : ২১)। আমাদের উচিত তাঁর জীবনকে অনুসরণ করা। মহানবী আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাঁর দেখানো পথে চলার তাওফিক দিন। আমিন।