নিবন্ধন ও প্রতীক ফিরে পেল জামায়াত
২৬ জুন ২০২৫ ১০:৩৯
সোনার বাংলা রিপোর্ট : ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘ সংগ্রামের পর গত ২৪ জুন মঙ্গলবার দলের নিবন্ধন ও প্রতীক ফিরে পেয়েছে।
দাঁড়িপাল্লা প্রতীকসহ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন পুনরায় বহাল করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গত ২৪ জুন মঙ্গলবার ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২ (Representation of the People Order, 1972) অনুযায়ী রাজনৈতিক দলহিসেবে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ওই আদেশের আর্টিকেল -৯০ বি) অৎঃরপষব ৯০ই-এর শর্তানুযায়ী, দলটিকে ২০০৮ সালের ৫ নভেম্বর/২১ কার্তিক ১৪১৫ তারিখে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নিকস/প্র-৩/রাদ/৫(৪৪)/২০০৮/১১৪১ নম্বর প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছিল। প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে দায়ের হওয়া রিট পিটিশন নম্বর ২০০৯ এর ৬৩০ এর রায়ের ভিত্তিতে ২০১৮ সালের ২৮ অক্টোবর/১৩ কার্তিক ১৪২৫ তারিখে দলটির নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছিল। পরে ২০১৩ সালের ১৩৯নং দেওয়ানি আপিল ও ২০১৩ সালের ৩১১২নং আপিলের জন্য দেওয়ানি আবেদন (ঈরারষ অঢ়ঢ়বধষ ঘড়. ১৩৯ ড়ভ ২০১৩ ও ঈরারষ চবঃরঃরড়হ ঋড়ৎ খবধাব ঞড় অঢ়ঢ়বধষ ঘড়. ৩১১২ ড়ভ ২০১৩) মামলায় আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের রায় বাতিল করে।
আদালতের সেই রায়ের আলোকে ২০১৮ সালের ২৮ অক্টোবর ইসির যে প্রজ্ঞাপনে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছিল, তা এখন বাতিল করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ও দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা পুনর্বহাল হয়েছে। জামায়াতের নিবন্ধন নাম্বার ১৪।
প্রজ্ঞাপন জারির আগে, জামায়াতের নিবন্ধন ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ নিয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছিলেন, প্রতীকের বিষয়টি আমরা বিবেচনায় নিয়েছি। একই প্রজ্ঞাপনে ২০০৮ সালে দলটিকে প্রতীকসহ নিবন্ধন দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া কোনো দলকে একবার প্রতীক দেওয়া হলে তা সেই দলের জন্য সংরক্ষিত থাকে আরপিও অনুযায়ী। দলটি প্রতীকসহ নিবন্ধন পাবে।
তিনি আরও বলেছিলেন, গত ১ জুন মহামান্য আপিল বিভাগ ২০১৩ সালের হাইকোর্টের রায় বাতিল করে দলটির নিবন্ধন পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে আদালত কমিশনকে রায়ের অনুলিপি পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। এজন্য আমরা আলোচনা করেছি। খুব শিগগির জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দলটির পক্ষ থেকে প্রতিনিধি পাঠিয়ে আবেদনও করা হয়েছে, তারা তাদের পুরোনো প্রতীক দাঁড়িপাল্লা ফেরত চান। সেটিও আমরা গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছি।
জানা যায়, ১৯৮৬ সাল থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা জাতীয় নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে অংশগ্রহণ করে আসছেন। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের বিধান চালু হয়। এরপর ২০০৮ সালে জামায়াত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকসহ নিবন্ধন পায়। পরে দলটির গঠনতন্ত্র সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবি করে ২০০৯ সালে একটি রিট করা হয়েছিল। রিটটি করেছিলেন, বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশনের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী, জাকের পার্টির তৎকালীন মহাসচিব মুন্সি আবদুল লতিফ, সম্মিলিত ইসলামী জোটের প্রেসিডেন্ট মাওলানা জিয়াউল হাসানসহ আরও ২৫ জন। এর প্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ১ আগস্ট হাইকোর্টের লার্জার বেঞ্চ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে। এই বেঞ্চের সদস্য ছিলেন বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত), বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম (পরে আপিল বিভাগের বিচারপতি পদে ছিলেন, পরবর্তীতে পদত্যাগ করেন) এবং বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক (পদত্যাগ করেন ১৯ নভেম্বর)।
উল্লেখ্য, গত ১ জুন রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় বাতিল ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ। সেই সঙ্গে দলটির নিবন্ধন ফিরিয়ে দিতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে রায় দেয় হাইকোর্ট। এক যুগ পর সেই রায় বাতিল করে দিলো আপিল বিভাগ।
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর আপিল শুনানি করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারকের বেঞ্চ এ রায় দেন। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেনÑ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জোবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক।
গত ১৪ মে আপিলের শুনানি শেষে রায়ের জন্য গত ১ জুন রোববার মামলাটি কার্যতালিকায় এক নম্বরে রাখা হয়েছিলো।
এ রায়কে ঐতিহাসিক বলে মন্তব্য করেছেন পর্যবেক্ষকরা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে আন্দোলন দমনের ষড়যন্ত্রের শেষ অপকৌশল হিসেবে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের সরকার গত বছরের ১ আগস্ট জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু তীব্র গণআন্দোলনে তাদের শেষ রক্ষা হয়নি। ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।