‘মহান আল্লাহর সৃষ্টি নভোমণ্ডল-ভূমণ্ডল, ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য’
১৩ জুন ২০২৫ ০৮:৩১
॥ আসাদুজ্জামান আসাদ ॥
মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। সংবিধান হিসেবে দিয়েছেন মহাগ্রন্থ আল কুরআন। আল কুরআনে রয়েছে সব সমস্যার সমাধান। পরস্পর পরস্পরের সাথে কীভাবে কথা বলব, সে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা নিজের অনুগ্রহে মানুষকে ভাষা দান করেন। ভাষা আমাদের জন্য নিয়ামত। আল্লাহ বলেন, ‘আমি কি তাকে দেইনি দুটি চোখ, জিহ্বা ও ওষ্ঠদ্বয়’। (সূরা : বালাদ : ৮-৯)। পৃথিবীতে হাজার হাজার ভাষা রয়েছে। অঞ্চল ভেদে মানুষের চেহারায় যেমন ভিন্নতা রয়েছে, তেমনিভাবে রয়েছে ভাষার ভিন্নতা। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘তার আরও এক নির্দশন হচ্ছে নভোমন্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্যে নির্দশনাবলী রয়েছে’। (সূরা রুম : ২২)। মোট কথা, আল্লাহর অনুগ্রহে আমরা মুখ দিয়ে কথা বলি, মনের ভাব প্রকাশ করি।
মহান আল্লাহ হজরত রাসূল (সা.)-এর ওপর নাজিল করেন আল কুরআন। ভাষা শুদ্ধতার প্রধান উৎস হলো আল কুরআন। আল কুরআনে, আরবি ভাষা, ব্যাকরণ, কাব্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা ও সাহিত্যের সব উপকরণ নিহিত রয়েছে। মহান আল্লাহ আঠারো হাজার সৃষ্টির মধ্যে মানব জাতিকে ভাষার জন্য শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এরশাদ হচ্ছে, তিনিই মানুষকে বায়ান তথা ভাব প্রকাশের শিক্ষা দিয়েছেন;। (সূরা রহমান)। আরো বলেন, ‘মানুষের সাথে উত্তম কথা বলো’। (সূরা বাকারা : ৮৩)। উত্তম কথা মানে বিনয়-নম্রতা ও সম্মানজনক ভাষাকে বোঝানো হয়েছে। ইসলাম ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে অমুসলিমদের সাথে শিষ্টাচার রজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এরশাদ হচ্ছে- ‘আহলে কিতাবদের সাথে বিতর্ক করো না, তবে উত্তম পন্থায়’। (সূরা ইসরা : ৪৬)। আল্লাহ তায়ালার প্রতিটি হুকুম পালন করা ফরজ। অস্বীকারকারী কাফির। সে হিসেবে পিতা মাতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশের জন্য কুরআন অত্যন্ত সূক্ষ্ম দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এরশাদ হচ্ছে- ‘তাদের (মাতা-পিতা) সামনে উফ শব্দাট পর্যন্ত বলো না এবং তাদের ধমক দিও না।’ (সূরা ইসরা : ২৩)। আল কুরআনের বাণী দ্বারা বুঝা গেল যে পিতা- মাতার প্রতি বিনয়-নম্র ও সম্মানের সাথে কথা বলতে হবে। এর ব্যতিক্রম করা যাবে না।
আমাদের প্রিয় নবী হজরত রাসূল (সা.) বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলতেন। বিশ্ব নবী (সা.) জন্মের পর দুধ পান করার জন্য মা হালিমা (রা.)-এর কাছে পাঠানো হয়েছিল। দুধ মায়ের দুধ পান করা আরবের স্বাভাবিক নিয়ম ছিল। শিশুর শারীরিক গঠন ও বিশুদ্ধ ভাষা শেখার জন্য গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হতো। গ্রামে বিশুদ্ধ বাচনভঙ্গি পথ মসৃন হতো। হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) একদিন হজরত রাসূল (সা.)-কে বললেন, আপনি খুবই বিশুদ্ধভাষী। প্রতি উত্তরে নবীজি (সা.) বললেন, আমি কুরাইশ বংশের সন্তান। আর আমি দুধ পান করেছি সা’দ গোত্রে’। রাসূল (সা.)-এর বিশুদ্ধ ও সুস্পষ্ট ভাষায় কথা বলা প্রিয় নবীজির সুন্নত। রাসূল (সা.) সাহাবায়ে কিরামকে শুদ্ধ ও মার্জিত ভাষায় কথা বলার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন।
বিশ্বনবী (সা.) ছিলেন ভাষার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দক্ষতার অধিকারী। তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমাকে সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থবোর্ধক বাক্য শিক্ষা দেওয়া হয়েছে’। (বুখারী)। বিশ্ব নবী (সা.)-এর ভাষায় কোনো অশুদ্ধি, অমার্জিত শব্দ বা ব্যাকরণগত ত্রুটি ছিল না। তিনি এমন ভাষায় আল কুরআন প্রচার করেছেন, যা আরবের শ্রেষ্ঠ কবি ও ভাষাবিদদের মাথা নত করে দিয়েছিল। আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘রাসূল (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক স্পষ্ট ও প্রাঞ্জলভাষী’। (তিরমিযী)। হজরত রাসূল (সা.) আরো বলেন, ‘ধ্বংস সেই ব্যক্তির জন্য, যে মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা কথা বলে! ধ্বংস তার জন্য’। (আবু দাউদ)। শুদ্ধ ভাষা সর্বদা ব্যবহারের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জন করে। নম্র ভাষা সামাজিক সম্প্রীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করে। এরশাদ হচ্ছে- হজরত রাসূল (সা.) বলেন, মিষ্টি কথা বলা একটি সাদাকাহ (দান) করার ন্যায়’। (মুসলিম)। বিশ্ব নবী (সা.) শিশুদের সাথে কোমল ভাষায় কথা বলতেন। তিনি বলেন, ‘নম্রতা কোনো বিষয়ে যুক্ত হলে তা তার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়’। (মুসলিম)।
আমরা আদি যুগ, মধ্যম যুগ পেরিয়ে আধুনিক যুগে বসবাস করছি। যোগাযোগের সামাজিক মাধ্যম ও চ্যাটিং প্লাটফর্মে ভাষার অপব্যবহার করছি। ভুলে গেছি ইসলামের কথা। ইসলাম ধর্মে ডিজিটাল ভাষা অথবা কথোপকথনে গীবত, মিথ্যা ও অশালীনতা হারাম। আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা রেকর্ড করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে’। (সূরা কফ : ১৮)। এ জন্য অনলাইনে প্রত্যেক মোমিন-মুসলমানের জন্য শব্দের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘আর যারা অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকে’। (সূরা : মুমিনুন)। আরো বলা হয়েছে, ‘আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে উত্তম রূপে এবং তাদের সাথে বির্তক করুন পছন্দ যুক্ত পন্থায়। নিশ্চয় আপনার পালনকর্তাই ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে বিশেষভাবে জ্ঞাত রয়েছেন, যে তার পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে এবং তিনিই ভালো জানেন তাদেরকেÑ যারা সঠিক পথে আছে’। (সূরা নহল)।
ইসলামী সভ্যতা, সংস্কৃতি, ভাষা ও সাহিত্যের ধারক ও বাহক। আল কুরআনের মাধ্যমে সভ্যতা, সংস্কৃতি, ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ ঘটেছে। ভাষা, কলাকৌশল, অলংকার শাস্ত্র ও কাব্য সৌন্দর্য আল কুরআনে যুক্ত রয়েছে। আরবি বিশুদ্ধ ভাষা ছাড়া কুরআন ও হাদীসের গভীর জ্ঞান অর্জন করা অসম্ভব। ভাষা হলো ঈমানের আয়না। ভাষা ব্যক্তির অন্তরের পবিত্রতা ও সমাজে নৈতিকতার প্রভাব বিস্তার করে। বিশুদ্ধ ভাষা ছাড়া পরিপূর্ণ মুসলিম চরিত্র গঠন করা সম্ভব নয়।আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আল কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করাই আমাদের কাম্য। প্রত্যেক মোমিন- মুসলমানের উচিত বিশুদ্ধ ভাষা উচ্চারণ করা। এ হোক আমাদের কামনা।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক।