হাসিনার সঙ্গে হেগের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে না ভারত!


১০ এপ্রিল ২০২৫ ১৩:২২

॥ মুজতাহিদ ফারুকী ॥
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফর একদিক থেকে রেকর্ড হয়ে থাকবে। তিনিই প্রথম বাংলাদেশি সরকারপ্রধান, দায়িত্ব নেওয়ার পর যিনি প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত ছাড়া ভিন্ন দেশে গেলেন।
এতে অবশ্য তার নিজের ভূমিকা মুখ্য নয়। ভারতের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক স্থাপনের নানাভাবে চেষ্টা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ড. ইউনূস শুরুতেই বলেছিলেন, ভারতকে তার আশ্রিত শেখ হাসিনাকে চুপ রাখতে হবে।
ভারত সাড়া দিতে শুধু ব্যর্থ হয়নি, সর্বতোভাবে বৈরী আচরণ অব্যাহত রেখেছে। হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তাকে বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা চালানোর সুযোগ দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টিতে ইন্ধন দিচ্ছে, সীমান্তে সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে, যুদ্ধের হুমকি দিয়েছে এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার উপেক্ষা করে এ দেশের বিরুদ্ধে সেনাপ্রধানকে দিয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের দৃষ্টান্ত রেখেছে। এর আগে দেশটির পররাষ্ট্র সচিব মি. মিশ্র এসে আরো বড় ঔদ্ধত্যপূর্ণ কাজ করেছেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের সঙ্গে গোপনে দেখা করে। সবচেয়ে গুরুতর হলো দেশটি এখন পর্যন্ত ইউনূস সরকারকে মেনে নিতে অস্বীকার করছে। অনির্বাচিত সরকার বলে কার্যত আমাদের স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান এবং তার হাজারো শহীদের আত্মদানের গৌরবকে খর্ব করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ড. ইউনূসের সাথে সাইডলাইনে সাক্ষাতের ন্যূনতম সৌজন্য দেখাতেও অস্বীকার করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
ফলে ইচ্ছা থাকলেও ড. ইউনূস প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে যেতে পারেননি। এখানে একটি অপার্থিব ইশারা দেখি। ড. ইউনূসকে দিয়ে আগের প্রচলিত ধারা ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়ে দিলেন অন্তরালের কোন নিয়ন্তা। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের দিক থেকে এ রেকর্ডের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে।
আমরা ভারতের তথাকথিত বন্ধুত্বের নাগপাশ থেকে মুক্তি চাই। এ মুক্তির সম্ভাব্য একটি উপায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীরতর করা।
ভারত বন্ধুত্বের নামে বাংলাদেশকে তার অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্যের অধীনে রাখতে চায় এটি গত ৫৪ বছরের ইতিহাস থেকে আজকের প্রজন্মের বাংলাদেশিদের কাছে স্পষ্ট। চীন এ মুক্তির বিশ্বস্ত সহযোগী হতে পারে।
এরই মধ্যে ভারত আমাদের জন্য ভিসা বন্ধ করে দিয়েছে। আমাদের রোগীদের চিকিৎসা দিতে এবং শিক্ষার্থীদের বিদেশে পড়তে যাওয়ার সুযোগ অন্যায়ভাবে আটকে দিয়েছে। এখন চীনে চিকিৎসার পথ খুলতে শুরু করেছে ইউনূস সরকার। আরো আগে চীন এদেশে বিপুল অর্থ ব্যয়ে বেশকিছু আধুনিক হাসপাতাল স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ভারতের স্বার্থে সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয় গণবিরোধী ভারতের তাঁবেদার হাসিনা সরকার। তিস্তা প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটিও চীনের সহায়তায় সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি কেবল ভারতের আপত্তিতে। অথচ উত্তরাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন করতে হলে এটি হতেই হবে।
চীন আমাদের বৃহত্তম উন্নয়ন অংশীদার। অবকাঠামো থেকে শুরু করে সামরিক খাত পর্যন্ত নানা খাতে চীনের অবদান সর্বোচ্চ। ভারত তার ধরাছোঁয়ার মধ্যে নেই। কিন্তু আধিপত্য ফলাতে তার জুড়ি নেই। এমন কিল মারার গোঁসাই আমাদের কী দরকার!
পাশ ফিরে শুতে যাওয়া হাতির পেটের নিচে চাপা পড়লে যে কোন মানুষ তৎক্ষণাৎ অক্কা পাবে। তাতে হাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ হয় না। অতিকায় ভারতের বৈরিতা আমাদের জন্য বিপদের বটে। কিন্তু গত সাত আট মাসের ঘটনাবলি বলছে, ভারত-বাংলাদেশ সহযোগিতা আমাদের নয়, ভারতের জন্যও জরুরি। সেটা যেমন অর্থনৈতিক, তেমনি রাজনৈতিক ভৌগোলিক দিক থেকেও। বাংলাদেশি ক্রেতার অভাবে কলকাতার দোকানিদের এবং চিকিৎসা পর্যটকের অভাবে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের হাপিত্যেশ প্রকাশ্যে এসেছে। গার্মেন্টসহ বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে প্রবাসী ভারতীয়দের কান্না অবশ্য শোনা যায়নি।
হাসিনা দেশের স্বার্থ বরবাদ করে ভারতকে প্রায় বিনামূল্যে যেসব ট্রানজিট করিডোর ও বন্দর সুবিধা দিয়েছে, সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হলে দেশটির কী অবস্থা হবে, তা বলাবাহুল্য। শুধু বলি, তথাকথিত বিশ্বগুরু মোদির সরকারের একের পর এক ভুল নীতি তার দেশকে ত্রিশঙ্কু অবস্থায় এনে ফেলেছে। যে আমেরিকার পিঠ চাপড়ানিতে বিশ্বগুরুর পুচ্ছ লাগিয়েছিল সেই আমেরিকা এখন উঠতে বসতে ডান্ডা মারছে। ভারতের অভিবাসীদের হাতকড়া লাগিয়ে কার্গো প্লেনে করে ডাম্প করেছে। শুল্কের বিশাল খাঁড়া তো আছেই। ধারণা করি, বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের যে মুখোশ তারা লাগিয়ে রেখেছে, সেটাও অচিরেই খসে পড়বে এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের দায়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক ও মানবতাবিরোধী দেশ হিসেবে চিহ্নিত হবে সর্বব্যাপী বৈষম্যের দেশ ভারত। যে বারাক ওবামা মোদির পিঠে ভরসার হাত রেখেছিলেন সেই তিনিই কি বলেননি, এভাবে চললে ভারত শিগগিরই ভেঙে পড়বে! সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ ইলন মাস্কের নতুন এআই সার্চ টুলে প্রশ্ন করলে সারা বিশ্ব জানছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক নেতা নরেন্দ্র মোদি।
লক্ষণ কিন্তু খারাপ। সম্প্রতি দক্ষিণের পাঁচ রাজ্যে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার ইস্যুতে ঠিক সেই প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, যেমনটা হয়েছিল ’৪৭ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু চাপানোর ঘোষণায়। উত্তর ভারতে দলিতদের উত্থানও তাৎপর্যপূর্ণ। মনিপুরের দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা কি অর্থবহ কিছু? সম্ভবত। মনিপুরসংলগ্ন মিয়ানমারে চীন আমেরিকা উভয়ে সক্রিয়।
চীনের সঙ্গে আমাদের অতিরিক্ত মাখামাখি ভারতের মতো আমেরিকারও গায়ে লাগতে পারে। স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সবারই জানা। সেসব বিষয়ে সতর্কতা জরুরি।
মূল প্রসঙ্গে আসি। বাংলাদেশে ভারতের চাণক্যনীতি ভুল ছিল- এটা ভারত এখনো স্বীকার করেনি। তবে হাসিনাকে তারা কতভাবে মদদ দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে, সেটা স্বীকার করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছেন, আমরা হাসিনা সরকারের পতন হচ্ছে জেনেও তাকে রক্ষা করতে পারিনি। এ বিবৃতি দিতে গিয়ে তিনি আরও যা বলেছেন, তাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে খোদ ভারত সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রমাণিত হয়ে যায়।
বাংলাদেশ যখন হাসিনার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পেশ করার ঘোষণা দেয়, তার পরই জয়শঙ্কর এ বিবৃতি দেন। বলেন, হাসিনার সাথে ভারত হেগের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে যাবে না। কিন্তু এ কথা বললে কি চলে! উচিত-অনুচিতের বিবেচনা না হয় বাদই দিই, কৃতজ্ঞতা বলেও তো একটা কথা আছে। সেই যে সর্বদলীয় সভায় আপনারা বললেন, শেখ হাসিনা ভারতবাসীর পরম মিত্র। তাকে সসম্মানে আশ্রয় দিতে হবে। তো সেই পরম মিত্রকে সাত মাস না যেতেই ভুলে যাবেন? হাসিনা কত বড় মুখ করে বিশ্বকে শুনিয়ে বললেন, ভারতকে যা দিয়েছি আজীবন মনে রাখবে। এ আপনার মনে রাখা। একবার অন্তত হেগের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আপনাদের ওপর হাসিনার বিশ্বাসের সম্মান দিন! না হলে বিশ্ব জানবে, ভারত এক অকৃতজ্ঞ জাতি। এটাই কি চান গুজরাটের কসাই মোদি, অমিত শাহ।
হায় হাসিনা! হায় আফসোস!
হাসিনা এখন দুধ মুড়ি খেয়ে শোকের গান গাইতে গাইতে কপাল চাপড়ে বিলাপ করতে থাকুন। তার মতো জাতিদ্রোহীর সেটাই প্রাপ্য। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে আপনার তো কিছু দায়দেনা আছে মোদিজী, অমিতজী!
হাসিনাকে দিয়ে হাজারও বাংলাদেশিকে খুন করালেন, নিজের সশস্ত্র লোকদের একটি স্বাধীন দেশে ঢুকিয়ে দিয়ে প্রতিবাদী জনতাকে গুলি করে মারলেন, কয়েক হাজার তরুণকে অন্ধ ও পঙ্গু করে দিলেন কাশ্মীরে ব্যবহৃত প্যালেট গুলি দিয়ে এসবের একটা জবাব দিতে হবে না? না হয় শুধু ওইটুকু বলে আসুন, যেমনটা বলেছেন আপনার সেনাপতি যে, আমরা শেখ হাসিনাকে বলেছিলাম গুলি না চালাতে, তিনি আমাদের কথা রাখলেন না, বুলেট চালালেন।
বাংলাদেশের ২০০৯-এর নির্বাচনের আগে সেনাশাসক জেনারেল মঈন উ’র সঙ্গে হাসিনাকে ক্ষমতায় আনার বিষয়ে বোঝাপড়ায় ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির পৌরহিত্য এবং নিজের বইয়ে সবিস্তার উল্লেখ।
২০১৪-র নির্বাচনে সুজাতা সিংয়ের দূতিয়ালি (পড়ুন চাপ দিয়ে এরশাদকে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করা), বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মাওলানা সাঈদীর মামলার অপহৃত সাক্ষী সুখরঞ্জন বালিকে ভারতের কারাগারে আবিষ্কার, বাংলাদেশের নিখোঁজ রাজনীতিক সালাহউদ্দিনকে ভারতের ভূখণ্ডে খুঁজে পাওয়ার মতো অসংখ্য ঘটনা এ দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের প্রমাণ দেয়। সেই অভিযোগ খণ্ডনের জন্য হলেও মোদিজীকে হেগের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে যে! সব অপকর্ম কি ওবায়দুল কাদের কথিত ‘তলে তলে’ সামাল দেয়া যায়, সবাই কি হাসিনা আর কাদের?
সবাই হাসিনা বা কাদের নয় বলেই ফাঁপড়ে পড়েছে চাণক্যপাড়া, মোদি, অমিত ও জয়শঙ্কররা। তারা আরেকটা হাসিনা খুঁজছে। সম্ভবত পেয়েও গেছে। সেজন্যই শুনতে পাই কেউ বলছেন, জনগণ সংস্কার বোঝে না, তারা বোঝে ভাত আর ভোট। কেউ সরকারকে বলছেন, সংস্কার আপনার কাজ না, নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব। অবিলম্বে নির্বাচন দিন।
এসব যারা বলছেন, তারা চেনা। গত সাড়ে ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী তথাকথিত আন্দোলনের নামে কার্যত ফ্যাসিস্টকে টিকিয়ে রেখেছেন, নিজের আখের গুছিয়েছেন, লাখো দলীয় নেতাকর্মী, সমর্থককে গুম-খুন নির্যাতনের মুখে ঠেলে দিয়েছেন এবং দেশের ১৮ কোটি মানুষকে স্রেফ ধোঁকা দিয়েছেন, প্রতারণা করেছেন। এসব এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। এদের অপরাধ ফ্যাসিস্ট হাসিনার চেয়ে একবিন্দুও কম নয়। আগামী নির্বাচনে এদের কৈফিয়ত তলব করতে হবে। এটাই এখন জাতির শপথ।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক।