ছায়ার বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধপ্রস্তুতি
১০ এপ্রিল ২০২৫ ১২:৩৩
॥ জামশেদ মেহ্দী॥
বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভারতের একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর কাজ করেছেন। এশিয়ার এ অঞ্চলের অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নতির জন্যই করেছেন। দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া একটি বিরাট অঞ্চল। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের জন্য ড. ইউনূসের দৃঢ় বিশ্বাস, সার্কের পুনরুজ্জীবন এবং নতুন করে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। সার্ককেন্দ্রিক উন্নয়ন কিন্তু ড. ইউনূসের দুই দশকেরও বেশি সময় আগের চিন্তা। সেই চিন্তা তিনি আজও লালন করছেন। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পরপরই তিনি বিদেশি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সার্ক পুনরুজ্জীবনের ধারণা ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু ভারতের অব্যাহত নেতিবাচক ভূমিকার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। সার্ক সম্পর্কে ভারতের নেতিবাচক ধারণাও রাজনৈতিক চিন্তাপ্রসূত। সেটি হলো পাকিস্তান। সার্ক পুনরুজ্জীবিত হলে ভারতের একচ্ছত্র মোড়লি থাকবে না। সেই কারণে সার্কের অপমৃত্যু ঘটেছে।
যখন ড. ইউনূস পরিষ্কার অনুধাবন করতে পারলেন যে, ভারতের আধিপত্যবাদী আচরণের কারণে সার্কের পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয়, তখন তিনি এক নতুন অর্থনৈতিক জোটের কথা চিন্তা করেন। এটিকে প্রস্তাবিত উপ-আঞ্চলিক জোটও বলা যেতে পারে। তার চিন্তাধারায় যে নতুন অর্থনৈতিক জোট রয়েছে, তার সদস্য হবে নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, ভারতের সেভেন সিস্টার্স এবং উদীয়মান আরাকান স্টেট। প্রিয় পাঠক, লক্ষ করুন, আমি বলেছি ‘উদীয়মান আরাকান স্টেট’। উদীয়মান এজন্যই যে, আরাকান বা রাখাইন রাজ্যটি এখনো স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জন্মলাভ করেনি। তবে আরাকান নিয়ে যে গৃহযুদ্ধ চলছে, সেই যুদ্ধে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা চূড়ান্ত পরিণতিতে পরাস্ত হবে বলেই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের বিশ্বাস।
ড. ইউনূস তার এ উপ-আঞ্চলিক উন্নয়নের ধারণা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে- বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত সুবিধাজনক। আমাদের দুই পাশে রয়েছে দুটি বৃহৎ শক্তি। একদিকে ভারত; অন্যদিকে চীন। উভয় রাষ্ট্রই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করছে। ড. ইউনূসের ভাষা ব্যবহার করলে বলতে হয়, এ দুটি দেশ যখন উন্নতি করে যাচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে অবস্থানকারী বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তাদের সাথে সাথে উন্নতি করতে থাকবে। একটি ভিডিও কনফারেন্সে তিনি বিষয়টির অধিকতর ব্যাখ্যা দেন।
তিনি বলেন, নেপালের রয়েছে অফুরন্ত এনার্জি বা জ¦ালানি সম্পদ। অথচ তারা তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পারছে না। আমরা নেপাল থেকে বিপুল পরিমাণে এনার্জি আমদানি করতে চাই। নেপালও সেটি রপ্তানি করতে চায়। কিন্তু উভয়ের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও একটি বিশেষ কারণে সেটি সম্ভব হচ্ছে না। অনুরূপভাবে ভুটানও আমাদের কাছে এনার্জিসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য রপ্তানি করতে পারে। আমরাও তাদের কাছ থেকে সেগুলো নিতে আগ্রহী। কিন্তু ঐ যে বললাম, একটি বিশেষ কারণ। সেই কারণে ভুটানের সাথেও আদান-প্রদান সম্ভব হচ্ছে না। এখানে একটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে, নেপাল এবং ভুটান উভয় দেশই ল্যান্ডলকড, অর্থাৎ স্থলবেষ্টিত। বৈদেশিক বাণিজ্য করার জন্য যে সমুদ্রপথ প্রয়োজন সেটি তাদের নেই। অন্যকথায়, তাদের লাগোয়া কোনো সমুদ্র নেই।
ড. ইউনূস বলেন, আমাদের সকলেরই লাগোয়া হলো ভারতের সেভেন সিস্টার্স। এরা হলো আসাম, ত্রিপুরা, অরুণাচল, মেঘালয়, মিজোরাম, মণিপুর এবং নাগাল্যান্ড। ঘটনাচক্রে ভারতের এ ৭টি প্রদেশও ল্যান্ডলকড। অর্থাৎ এরাও স্থলবেষ্টিত। এদেরও লাগোয়া কোনো সমুদ্র নেই। ভারতের অন্যান্য অংশের তুলনায় এ ৭টি রাজ্য বেশ অনুন্নত। সকলেই জানেন, এদের অবস্থান এমন অদ্ভুত যে, ভারতের পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চল বা উত্তর-পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ এই সেভেন সিস্টার্সে পণ্য পরিবহন করতে হলে অনেক ঘুরে বাংলাদেশের মাথার ওপরে অবস্থিত শিলিগুড়ি করিডোর হয়ে তারপর তাদের দক্ষিণে নামতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, কলকাতা থেকে কোনো পণ্য পরিবহন করতে হলে তাকে লম্বা ঘুর পথে সেভেন সিস্টার্সে যেতে হয়। এভাবে শিলিগুড়ি করিডোর হয়ে পূর্বাঞ্চলে যেতে সময় ব্যয় হয় ১৬-১৭ ঘণ্টা। পথ পাড়ি দিতে হয় ১৪০০ থেকে ১৬০০ মাইল। এর ফলে অবধারিতভাবে খরচও অনেক বেড়ে যায়।
এজন্যই পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশের (সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের) বুকের ওপর দিয়ে করিডোর চেয়ে আসছে। পাকিস্তানের পুরো ২৪ বছর তারা ভারতকে সেই করিডোর দেয়নি। অবশ্য ভারত এবং তার বাংলাদেশি দোসররা এটিকে করিডোর বলতে লজ্জাবোধ করে। তারা বলে ট্রানজিট। সকলেই জানেন যে, ট্রানজিট হলো এক দেশ থেকে বেরিয়ে অন্য আরেক দেশে যাওয়া। প্রয়োজন হলে সেই দেশ থেকে আরো অন্য কোথাও যাওয়া। কিন্তু আলোচ্য ক্ষেত্রে এমন যদি হতো যে, কলকাতা বা আগরতলা থেকে বাংলাদেশের ঢাকা বা অন্য কোথাও ভারতীয় পণ্য যাচ্ছে, তাহলে সেটিকে ট্রানজিট বলা যেত। কিন্তু এক্ষেত্রে ভারতের এক স্থান অর্থাৎ কলকাতা বা আগরতলা থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতের অপর স্থান অর্থাৎ সেভেন সিস্টার্সের যেকোনো একটি রাজ্যে যাওয়া। সোজা কথা, ভারত থেকে রওনা হয়ে বাংলাদেশ হয়ে আবার ভারতে যাওয়া। এটি ট্রানজিট নয়, এটি করিডোর।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ভারতকে করিডোর দেওয়ার বিপক্ষে জনমত গড়ে ওঠে। তাই শেখ মুজিবের সরকার ভারতকে করিডোর দিতে পারেননি। প্রেসিডেন্ট জিয়া এবং বেগম জিয়ার সরকারও ভারতকে করিডোর দেননি। এমনকি বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার প্রথম সরকার অর্থাৎ ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সময়েও জনমতের কারণে ভারত করিডোর পায়নি। তারপর ফের ক্ষমতায় আসেন বেগম জিয়ার সরকার। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সেই সরকারের মেয়াদ ছিল। সেই সময়েও ভারতকে করিডোর দেওয়া হয়নি। তারপর দুই বছরের জন্য মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সেনানিয়ন্ত্রিত সরকার। তারাও করিডোর দেয়নি।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অনেক ম্যানিপুলেশন করে ইন্দো-মার্কিন যৌথ প্রচেষ্টায় শেখ হাসিনাকে ২০০৯ সালের ৫ জানুয়ারি ক্ষমতায় আনা হয়। এরপর থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকেন। এ লম্বা সময়ের মধ্যে শেখ হাসিনার তৃতীয় মেয়াদে অর্থাৎ ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের বহু প্রতীক্ষিত সাধনার ফল করিডোর ভারতকে দেওয়া হয়। অবশ্য ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ভারতে করিডোরের ট্রায়াল রান চলছিল। ২৫ অক্টোবর সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হয়।
আমরা এর আগে বলেছি যে, একটি বিশেষ অসুবিধার কারণে নেপাল, ভুটান প্রভৃতি দেশ থেকে বাংলাদেশ তার চাহিদামতো এনার্জিসহ প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী আমদানি করতে পারেনি। এ বিশেষ অসুবিধা হলো বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সংযোগকারী ২২ মাইল চওড়া শিলিগুড়ি করিডোর। মুরগির গলার মতো লম্বা বলে এটিকে বলা হয় চিকেন নেক। কথা ছিল, ভারত করিডোর পাবে, বিনিময়ে চিকেন নেক দিয়ে নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ প্রভৃতি দেশ তাদের পণ্যের আদান-প্রদান করবে। বাংলাদেশ করিডোর দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু চিকেন নেক সেভাবে ব্যবহার করার অনুমতি পায়নি। চিকেন নেক ব্যবহার করতে দিলে উত্তরের স্থলবেষ্টিত দেশগুলো চিকেন নেক দিয়ে বাংলাদেশে আসতে পারে এবং বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রে অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরে নেমে যেতে পারে।
ফিরে আসছি ড. ইউনূসের ভিশনে। তিনি সাম্প্রতিক চীন সফরে বলেছেন যে, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, সেভেন সিস্টার্স এবং রাখাইনের সাথে চীন যদি ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্পায়নে সম্পৃক্ত হয়, তাহলে এসব দেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দারুণভাবে লাভবান হবে। চীন তার অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের কিছু কিছু বাংলাদেশে রিলোকেট করতে পারে। অথবা তারা বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় শিল্প কারখানা স্থাপন করতে পারে। ওপরে উল্লেখি ভিডিও কনফারেন্সে ড. ইউনূস বলেন যে, এ অঞ্চলের সম্পদ অফুরন্ত। নেপাল ও ভুটান ছাড়াও ওপরে রয়েছে হিমালয় পর্বত। হিমালয় থেকে এ অঞ্চল বহুবিধ সম্পদ আহরণ করতে পারে। চীনসহ এসব দেশ বাংলাদেশকে ব্যবহার করে সমুদ্রে গমনের সুবিধা পেতে পারে। প্রসঙ্গত, তিনি বলেছেন যে, ভারতের সেভেন সিস্টার্সও ল্যান্ডলকড বা স্থলবেষ্টিত। আর বাংলাদেশ হলো সমুদ্রের প্রধান অভিভাবক।
দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো এই যে, ভারত এ ল্যান্ডলকড বা স্থলবেষ্টিত শব্দটিতে দারুণ আপত্তি উত্থাপন করেছে। আর বঙ্গোপসাগরের অভিভাবকত্বে আপত্তি করেছে স্বয়ং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর। তিনি বলেছেন, বঙ্গোপসাগরে তাদেরও হিস্যা আছে। কিন্তু জয়শঙ্কর এ কথাটি আউট অব দি কনটেক্সট বলেছেন। ভারতের সমুদ্রে অ্যাকসেস থাকতে পারে, কিন্তু তাদের সেভেন সিস্টার্সের তো নাই। তারা তো স্থলবেষ্টিত। এখানে প্রফেসর ইউনূস অন্যায় কি বলেছেন? তিনি বলেছেন, ভারত যদি তার ঐ ২২ মাইল স্থান (চিকেন নেক) দিয়ে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেয়, তাহলে চীনের পণ্যও সেভেন সিস্টার্সে যেতে পারে।
আমরা শুরুতে বলেছি যে, ড. ইউনূস ভারতের স্পর্শকাতর একটি কাজ করেছেন। ভারত রজ্জুকে (রশি) সর্প বলে ভ্রম করেছে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সামনে ড. ইউনূস তার এ ভিশন উন্মোচন করার সাথে সাথেই তেলে-বেগুনে জ¦লে উঠেছে ভারত। মুহূর্ত বিলম্ব না করে তৎক্ষণাৎ ভারত চিকেন নেকে বিপুল সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে। যেসব সমরসম্ভার তারা চিকেন নেকে পাঠিয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অত্যাধুনিক ফরাসি রাফায়েল জঙ্গিবিমান, রুশ নির্মিত মিগ-২৯ জঙ্গিবিমান এবং ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, অর্থাৎ সারফেস টু এয়ার মিসাইল, ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র প্রভৃতি সর্বাধুনিক ডেডলি সমরাস্ত্র। বিদেশি গণমাধ্যম থেকে জানা যায় যে, ড. ইউনূসের বেইজিং পৌঁছার ২৪ ঘণ্টা আগে থেকেই এ সমর শক্তি মোতায়েন শুরু হয়েছে।
সাথে সাথে ভারতের সবগুলো রাজনৈতিক দল এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যম বাংলাদেশবিরোধী উক্তি করে হুলুস্থুল ফেলে দিয়েছে। কোনো কোনো টেলিভিশন তো এমনও বলছে, ভারত চাইলে এক দিনেরও কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। তাদের মন্তব্য হলো- ড. ইউনূস নাকি চীনের প্রক্সি দিচ্ছেন। ভাবতে অবাক লাগে যে, দুদিন আগে যে ইউনূস ছিলেন ভারতের কাছে আমেরিকার লোক, সেই ইউনূস চীনে যাওয়ামাত্রই হয়ে গেলেন চীনের লোক। আর তাই চিকেন নেকে সৃষ্টি করা হলো যুদ্ধাবস্থা। কার বিরুদ্ধে ভারতের এ যুদ্ধংদেহী লম্ফঝম্ফ? অভিজ্ঞ মহলের মতে, ভারত ছায়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।