কবি শরীফ আবদুল গোফরান সাহিত্য ও কর্ম


২০ মার্চ ২০২৫ ১৪:৩৬

॥ আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন ॥
আশির দশক থেকে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে যারা নিরলসভাবে অবদান রেখে যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে কবি গীতিকার শরীফ আবদুল গোফরান অন্যতম। সময়ের কঠিন স্রোতে সাহসী নাবিকের মতো অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তিনি তার অবস্থান তৈরি করে নেন। ফলে একজন শিশুসাহিত্যিক হিসেবে তার খ্যাতি অনন্য। শিশুসাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তার পদচারণায় মুখর এ লেখকের লেখায় যেমন দেশ, মাটি ও মানুষের কথা ফুটে উঠেছে, তেমনি বিষয়-বৈচিত্র্যকে তিনি স্বতন্ত্রভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। কবি শরীফ আবদুল গোফরান ১৯৫৫ সালের ৪ এপ্রিল কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলার মুরগাঁও গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৌলভী কেরামত আলী। মাতা বেগম মরিয়ম। ছোটবেলা থেকেই কবি শরীফ আবদুল গোফরান সাহিত্যচর্চার সাথে জড়িত। দৈনিক আজাদ পত্রিকার মাধ্যমে তার সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। ১৯৬৮ সালে দৈনিক আজাদ পত্রিকার মুকুলের মাহফিলে তার প্রথম লেখা ছড়া ছাপা হয়।
কবি শরীফ আবদুল গোফরানের গল্প, প্রবন্ধ, ছড়া, কবিতা পুরোপুরি শিশুদের জন্যই রচিত। তার লেখা সাবলীল ও গতিময়। তার কবিতায় ছন্দ, গল্পের রস ও প্রবন্ধের দ্যুতি তাকে পাঠকমহলে পরিচিত করে তোলে। কবি শরীফ আবদুল গোফরান শৈশব থেকে অদ্যাবধি লিখে চলেছেন। তার প্রথম ছড়া গ্রন্থ ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয়। নাম ‘ছড়ায় ছড়ায় বৃষ্টি ঝরে’। তারপর আর থেমে থাকেননি। পরপর প্রকাশিত হতে থাকলো- ‘নাওনদী নীল আকাশ’, ‘ফুলে ফুলে প্রজাপতি’, ‘সুবাসিত ভোর’, ‘বড় মানুষের গল্প’, ‘ছোটদের ফররুখ’, ‘ষড় ঋতুর বাংলাদেশ’, ‘সবার প্রিয় সানা উল্লাহ নূরী’, ‘ভাষা আন্দোলন ও বাংলা ভাষা সংরক্ষণের ইতিহাস’, ‘চাঁদের হাসিতে কান্না ঝরে’, ‘কেঁপে ওঠে মায়াবী চাঁদের মুখ’ (বড়দের কবিতা)। কবি শরীফ আবদুল গোফরানের প্রায় অর্ধশত বই এখনো অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। এর মধ্যে ‘কাশের বনে জোনাক জ¦লে’ (কিশোর কবিতা), ‘টাপুর টুপুর টুপ’ (ছড়া গ্রন্থ), ‘প্রচ্ছন্ন কুয়াশা’ (বড়দের কবিতা), ‘ঈদ আনন্দ’ (বড়দের গল্প), ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ (ভ্রমণকাহিনী), ‘পদ্মার চর’ (নাটক), ‘শিশুশ্রম ও অনধিকার চর্চা’, ‘শিশুসাহিত্যে মুসলিম লেখকদের ভূমিকা’, ‘শিশুসাহিত্যের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ’।
বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সংস্কৃতির বিকাশ (প্রবন্ধ) উল্লেখযোগ্য। তিনি বহু গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন। এর মধ্যে ‘দি স্যাটানিক ভার্সেস বনাম লেখার স্বাধীনতা’, ‘হিজল বনের পাখি’, ‘স্বদেশ যেন পলাশীর প্রান্তর’ উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৯ সাল থেকে প্রায় ৩৫ বছর শরীফ আবদুল গোফরান মাসিক ফুলকুঁড়ি পত্রিকার সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯ সাল থেকে দীর্ঘ ২৬ বছর দৈনিক সংগ্রামের সহ-সম্পাদকের ও নীল সবুজের হাট বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি আরো বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের বার্তা সম্পাদক ও সহ-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কবি শরীফ আবদুল গোফরান বিভিন্ন সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সামাজিক সংস্থার সাথে যুক্ত আছেন। এর মধ্যে তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য, বাংলা একাডেমির সদস্য, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য, ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলর সদস্য, বাংলা সাহিত্য পরিষদের সদস্য। তিনি তিন সেশন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের অফিস সম্পাদকসহ কার্যনির্বাহী পরিষদের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। দুই সেশন ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন। তাছাড়া তিনি কিশোর থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, মতিঝিল আইডিয়াল বিজ্ঞান চক্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, অভিনয় নাট্য সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মুক্তাঙ্গন সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।
কবি শরীফ আবদুল গোফরান তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ অনেক পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ শব্দশীলন একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্র সাহিত্য পুরস্কার, নাঙ্গলকোট নজরুল সংসদ সাহিত্য পুরস্কার, নবাব জাদা সৈয়দ হাসান আলী সিএনসি পদক, ঢাকাস্থ নাঙ্গলকোট ফোরামের সাহিত্য পুরস্কার ও ঢাকাস্থ নাঙ্গলকোর্ট ছাত্র ফোরাম সংবর্ধনা ২০১৪ লাভ করেন। এছাড়া তিনি কবি আল মাহমুদ পদক প্রথম লাভ করেন।