‘যাকাত’ সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক মুক্তির বিধান
২০ মার্চ ২০২৫ ১৪:২০
॥ গাজী মুহাম্মদ শওকত আলী ॥
রাসূল (সা.) বলেছেন, ইসলামের মূল ভিত্তি পাঁচটি- (১) আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, নিশ্চয়ই মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল (ঈমান), (২) সালাত কায়েম করা, (৩) যাকাত আদায় করা, (৪) হজ পালন করা ও (৫) সিয়াম সাধনা করা। (সহীহ বুখারী)।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করছেন, ‘আমি জিন ও মানুষ সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদত করার জন্য।’ (সূরা যারিয়াত : ৫৬)।’ ইবাদতের জন্যই ইসলামের এ পাঁচটি মূল ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। ইবাদত দুই প্রকার- (১) হাককুল্লাহ বা আল্লাহর হক ও (২) হাককুল ইবাদ বা আল্লাহর বান্দার হক। আল্লাহর হক ইচ্ছা করলে তিনি মাফ করে দিতে পারেন, কিন্তু বান্দার হক আল্লাহ কখনো মাফ করবেন না। অতএব বান্দার হক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকেই ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। এজন্য আল্লাহর হক থেকে বান্দার হক আদায় করা অতিব জরুরি।
ঈমান আনতে হবে নিজের জন্য, এটা আল্লাহর হক। সালাত কায়েম করতে হবে আল্লাহকে স্মরণ করার জন্য, এটা আল্লাহর হক। অর্জিত সম্পদ পবিত্র করার জন্য যাকাত দিতে হবে, এটা আল্লাহর হুকুম ও বান্দার হক। যাকাত একটি ইবাদত। ইসলামের মূল ভিত্তির পাঁচটি এর মধ্যে যাকাত তৃতীয়। যাকাত সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ হচ্ছে, ‘(হে নবী!) আপনি তাদের ধন-সম্পদ থেকে সাদাকা (বা যাকাত) গ্রহণ করুন, তাদের পবিত্র করুণ, তাদের পরিশুদ্ধ করুণ, আর তাদের জন্য দোয়া করুন, কেননা আপনার দোয়া তাদের জন্য হবে পরম সান্ত্বনা।’ (সূরা তাওবা : ১০৩)।
যাকাত সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরো নির্দেশ করছেন, ‘‘তোমরা সালাত কায়েম করো আর যাকাত আদায় করো, আর যারা আমার সামনে অবনত হয় তাদের সাথে মিলিত হয়ে আমার আনুগত্য করো।’ (সূরা বাকারা : ৪৩)। এমনিভাবে আল কুরআনের কমপক্ষে ৩৪টি আয়াতে যাকাতের কথা উল্লেখ আছে।
প্রাপ্তবয়স্ক সুবোধ একজন মানুষ ঈমান আনার পর সর্বপ্রথম তার ওপর সালাত ফরজ হয়। অতঃপর সাহেবে মাল বা যাকাত দেয়ার মতো বৈধ সম্পদ এক বছর তার আয়ত্তে থাকলে যাকাত ফরজ হয়। অর্থাৎ ইসলামের মূল ভিত্তির মধ্যে যাকাতের স্থান তৃতীয়। ঈমানের দাবিদার সাহেবে নেসাব সকলের ওপর যাকাত ফরজ। যাকাত শুধু রমাদান (বা রোজার) মাসেই নয়, সারা বছরই ফরজ। যখন বা যে মাসের যে তারিখ থেকে যিনি সাহেবে নেসাব বা যাকাত দেয়ার মতো বৈধ অর্থ-সম্পদের মালিক হবেন তখন থেকে চন্দ্র বর্ষের হিসাবে এক বৎসর পূর্ণ হলেই যাকাত ফরজ। এটা আরবী বর্ষ গণনার শুরু মহরম মাস থেকে জিলহজ মাসের মধ্যে যে কোন মাসেই হতে পারে। আর আপনি যদি খ্রিষ্টীয় বর্ষ বা ইংরেজি মাসের হিসাবে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গণনা করেন, তাহলে যাকাতের পরিমাণ দাঁড়াবে চন্দ্রবর্ষের হিসাবে ২.৫০% এর স্থলে খ্রিষ্ট্রীয় বা ইংরেজি বর্ষের হিসাবে ২.৫৮%। কারণ চন্দ্রবর্ষ গণনা করা হয় ৩৫৪ দিন আর খ্রিষ্টীয় বর্ষ গণনা করা হয় ৩৬৫ দিন। এই ১১ দিনের ব্যবধানের কারণে ০.০৮ টাকা বেড়ে যাবে। প্রকৃত পক্ষে যাকাতের হিসাব করতে হবে যখন বা যে দিন থেকে যে কোনো মাসে আপনি বৈধ সম্পদের নেসাব পরিমাণ মালিক হবেন ঐদিন থেকে ৩৫৪ দিন অথবা ৩৬৫ দিন অতিক্রম করবে সে দিনই আপনাকে যাকাত দিতে হবে। এটা আল্লাহর হুকুম। আল্লাহর এই হুকুম অমান্য করার শাস্তির কথা উল্লেখ আছে সূরা আত তাওবার ৩৪ ও ৩৫ নম্বর আয়াতে।”
রাসূলকে (সা.) আল্লাহ তায়ালা যে সকল দায়িত্ব দিয়ে দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম একটি দায়িত্ব ছিল, ‘তোমাদেরকে (ঈমাদারদের) পরিশুদ্ধ করবেন বা পবিত্র করবেন।’ (সূরা বাকারা : ১৫১)। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে রাসূল (সা.) এ পরিশুদ্ধতার বা পবিত্রতার কাজ করেছেন।
যাকাত শব্দের অর্থ : আরবী ‘যাকাআ’ শব্দ থেকে যাকাত শব্দের উৎপত্তি। আরবী ‘যাকাআ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে পবিত্রতা, সততা, বৃদ্ধি বা বর্ধন আর ‘যাকাত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে পবিত্রতা, পরিশুদ্ধতা, পরিছন্নতা ও বৃদ্ধিকরণ। যাকাত মাল-সম্পদকে বৃদ্ধি ও পরিশুদ্ধ করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘(হে নবী!) আপনি বলে দিন, আমার মালিক যাকে ইচ্ছা করেন তার রিজিক বৃদ্ধি করে দেন, আর যাকে ইচ্ছা সংকুচিত করেন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা বুঝে না।’ (সূরা সাবা : ৩৬)।
যাকাত ও সাদাকার মধ্যে পার্থক্য : আরবী ‘সাদাকা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দান, সাদকা বা যাকাত। সাদাকা শব্দের অর্থ যাকাত ধরা হলে তা হবে বাধ্যতামূলক দান বা আদায় যোগ্য দান। আর সাদাকা শব্দের অর্থ দান খয়রাত ভিক্ষা বা সাদ্কা ধরা হলে তা হবে স্বেচ্ছায় দান। তবে কেউ যদি সাদকার নিয়ত করেন, তাহলে সে সাদ্কা অবশ্যই আদায় করতেই হবে।
যাকাতের উদ্দেশ্য : ঈমানের পূর্ণতা, নেক আমল, অর্জিত সম্পদের পবিত্রতা, ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মুক্তি, সমাজিক ভারসাম্য, নিরাপত্তা আর দারিদ্র-বিমোচনের হাতিয়ার যাকাত। সফলকাম মুমিনের পরিচয় সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘হেদায়াতের সুসংবাদ ঐ সকল মুমিনদের জন্যে যারা সালাত কায়েম করে ও যাকাত আদায় করে।’ (সূরা নামল : ২-৩)। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হিদায়াত ও রহমত ঐ সকল সৎকর্মপরায়ণদের জন্যে, যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তারাই আখিরাতে বিশ্বাসী।’ (সূরা লুকমান : ৩-৪)।
মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো হচ্ছেÑ অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও নিরাপত্তা যার ব্যবস্থা করবে রাষ্ট্র বা সরকার। রাষ্ট্রের পক্ষে মানুষের এ সকল চাহিদা পূরণ করতে অর্থের প্রয়োজন। যে সরকার আল্লাহ তায়ালার আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করে সে রাষ্ট্রের অর্থের সংস্থান কোথা থেকে হবে আল্লাহ তায়ালা তা বলে দিয়েছেন। মূলত সালাত কায়েম ও যাকাত আদায়ের দায়িত্ব হচ্ছে মুসলিম রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার সুস্পষ্ট ঘোষণা হচ্ছে, ‘আমি যদি এ (মুসলমানদের) জমিনে প্রতিষ্ঠা দান করি (বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিই) তাহলে তার দায়িত্ব হবে, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, নাগরিকদের সৎকাজের আদেশ দেয়া এবং সকল প্রকার খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখা।’ (সূরা আল হাজ : ৪১)।
যাকাত অস্বীকারকারীর পরিণতি : আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘দুর্ভোগ ঐ সকল অংশীবাদী মুশরিকদের জন্যে, যারা যাকাত আদায় করে না আর তারা আখিরাতেও বিশ্বাস করে না।’ (সূরা হা-মিম-আস সাজদা : ৬-৭)। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘আর যারা সোনা রূপা পুঞ্জীভূত করে রাখে তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদের কঠিন আযাবের সংবাদ দাও। সেদিন (হাশরের দিন) জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তাদের কপালে, পার্শ্বদেশে ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেয়া হবে, সেদিন বলা হবে, এটিই সে বস্তু যা তোমরা নিজেদের জন্যে পুঞ্জীভূত করতে, সুতরাং তোমরা যা পুঞ্জীভূত করেছিলে তার স্বাধ আস্বাধন করো।’ (সূরা তাওবা : ৩৪-৩৫)।
রাসূল (সা.) বলেন, ‘মানুষ তাদের সম্পদের যাকাত দেয়া বন্ধ করলেই আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ বন্ধ হয়ে যেত, জীবজন্তু না থাকলে তাদের আর বৃষ্টি দেয়া হতো না’। (ইবনে মাজাহ ও বায়হাকী)। তিনি আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি সওয়াবের আশায় যাকাত দেবে, সে তার প্রতিদান পাবে, আর যে যাকাত দেয়া বন্ধ করে দেবে, আমি তার ঐ সম্পদ নিয়ে নেব, অধিকন্তু তার সম্পদ থেকে আরো অর্ধেক জব্দ করবো, এটি আমার প্রভুর একটি কঠোর নির্দেশ মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধরের জন্যে এর কোনো অংশ হালাল নয়’। (আহমদ, আবু দাউদ ও নাসায়ী)। ইসলামের প্রথম খালিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর পক্ষ থেকে যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণ আছে। (বুখারী ও মুসলিম)। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা যদি তওবা করে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয়, তাহলে তাদের ছেড়ে দাও।’ (সূরা তওবা : ৫)। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘আর তাদের সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে।’ (সূরা যারিয়াত : ১৯)।
যাকাত কার ওপর ফরজ : নেসাব পরিমাণ বৈধ সম্পদের মালিক ঈমানের দাবিদার সকল নারী-পুরুষের ওপর বছরান্তে যাকাত ফরজ। তবে এতিম অপ্রাপ্তবয়স্ক বিকৃত মস্তিষ্ক লোকদের ক্ষেত্রে তাদের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী বা অভিভাবক তাদের পক্ষে যাকাত পরিশোধ করবেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) মুআয (রা.)-কে ইয়ামানে পাঠালেন এবং বললেন, তুমি প্রথমত, তাদের এ সাক্ষ্য দিতে বলবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই আর আমি {মুহাম্মদ (সা.)} আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। তা যদি তারা মেনে নেয় তাদের বলবে, আল্লাহ তোমাদের ওপর তোমাদের সম্পদের যাকাত ফরজ করেছেন, তা তাদের ধনীদের থেকে আদায় করে গরিবের মধ্যে বণ্টন করা হবে’। (বুখারী)।
যে সকল মালের ওপর যাকাত ও ওশর ফরজ : (১) উৎপাদনমুখী সম্পদ যেমনÑ কৃষিজমির উৎপাদিত ফল, ফসল, শাকসবজি ও কল কারখানার উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রীর ওপর যাকাত ফরজ, (২) গৃহপালিত পশুপাখি যেগুলো চারণ করা হয়, (৩) যে সকল দ্রব্য তাৎক্ষণিক বিনিময় করা যায়, যেমনÑ টাকা, সোনা, রুপা, ব্যবসায়ের মাল বা দ্রব্যসামগ্রী, (৪) খনিজসম্পদ, (৫) যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ইত্যাদি।
যাকাতের নেসাব : নেসাব বলতে বোঝায় যে পরিমাণ মাল-সম্পদ থাকলে একজন ব্যক্তির ওপর যাকাত ফরজ হয়, তাহাই নেসাব। আর যার নিকট নেসাব পরিমাণ মাল-সম্পদ থাকে তাকে বলা হয় সাহেবে নেসাব। রাসূল (সা.)-এর সময় সাধারণত সোনা, রুপা, উট, ঘোড়া, ভেরা, বকরী, দুম্বা, খেজুর, গম বা যব এর নেসাব হিসাব করা হতো। ভিন্ন ভিন্ন মালের নেসাবের হিসাব ভিন্ন হবে। যেমনÑ সোনা, রুপা ও প্রচলিত মুদ্রা বা টাকার নেসাব হবে নিম্নরূপ :
সোনার নেসাব হবে, পাঁচ (৫) তোলা আড়াই মাশা বা সোয়া পাঁচ তোলা সোনা বা তার সমপরিমাণ অর্থ থাকলে যাকাত ফরজ হবে। রুপার নেসাব হবে ছত্রিশ (৩৬) তোলা সাড়ে পাঁচ মাশা বা সাড়ে ছত্রিশ তোলা রুপা বা তার সমপরিমাণ অর্থ থাকলে যাকাত ফরজ হবে। মাওলানা আবদুশ শুকুর (র.) তার ইলমুল ফেকাহ গবেষণা গ্রন্থে পরিমাণের উল্লেখ করেছেন। মাওলানা ফিরিংগী (র.) তার গবেষণায় একই পরিমাণ উল্লেখ করেছেন।
অবশ্য আমাদের দেশে প্রচলিত আছে যে সাড়ে ৭ তোলা সোনা অথবা সাড়ে ৫২ তোলা রুপা হলে যাকাত ফরজ হবে। যার উল্লেখ আছে ‘বেহেশতী জেওর’ নামক গ্রন্থে। যে গ্রন্থের ব্যাপারে প্রশ্নের যথেষ্ট অবকাশ আছে! যাকাত পরিশোধের ব্যাপারে সর্বোচ্চ মূল্যের সোনার পরিবর্তে কম মূল্যের রুপা সাহেবে নেসাব বা যাকাতদাতাগণ নেসাবের হিসাব করে যাকাত পরিশোধ করলে যাকাতের হকদারের ওপর এহসান করা হবে। যেমন পাঁচ তোলা আড়াই মাশা সোনা বা ৩৬ তোলা সারে পাঁচ মাশা রুপা। অথবা সাড়ে ৭ (সাত) তোলা সোনা বা সাড়ে ৫২ (বায়ান্ন) তোলা রুপা, এক্ষেত্রে সোনার মূল্যের পরিবর্তে রূপার মূল্য হিসাব করাই হবে ইহসান।
বর্তমান বাজার মূল্যে নেসাবের হিসাব : সোনা সাধারণত চার প্রকার (১) ১৮ ক্যারেট, (২) ২১ ক্যারেট, (৩) ২২ ক্যারেট ও (৪) ২৪ ক্যারেট। এই চার প্রকার সোনার মূল্যও ভিন্ন। সোনা ২৪ ক্যারেট শুধু ব্যবসায়ের জন্য আর বাকি ১৮, ২১ ও ২২ ক্যারেট অলংকারে ব্যবহার করা হয়। এমনিভাবে রুপাও ভিন্ন প্রকার ও মূল্যও ভিন্ন।
১৮ ক্যারেট সোনা বর্তমানে বিক্রির জন্য বাজার মূল্য প্রতি ভরি ১,২১,৩৭৬ টাকা। ২১ ক্যারেটের মূল্য ১,৪১,৬০০ টাকা। ২২ ক্যারেটের মূল্য ১,৪৮,৩৪৩ টাকা। রুপার ১,৬০০ টাকা, ১,৮০০ টাকা ও ২,০০০টাকা। এ সবের সঠিক ওজন ও বাজার মূল্য নির্ধারণ করে যাকাত হিসাব করা জরুরি। আপনি যদি রুপার হিসাবে নেসাব নির্ধারণ করেন, তাহলে আমাদের দেশের হিসাবে মূল্য দাঁড়ায়, ৫২.৫ী১৯০০=৯৯,৭৫০ টাকা। বর্ষরান্তে আপনি যদি কমপক্ষে ৯৯,৭৫০ টাকার মালিক থাকেন আপনার ওপর যাকাত প্রযোজ্য হবে।
সর্বোচ্চ মূল্য নেসাব হিসাব করে যাকাত পরিশোধ করলে ফরজ আদায় হবে, তবে সর্বনিম্ন মূল্যে নেসাব হিসাব করে যাকাত পরিশোধ করলে ফরজ আদায়ের সাথে সাথে এহসানও করা হবে। আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছে, ‘আর তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করো এবং (সম্পদ আঁকড়ে ধরে) নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ফেলে দিও না, আর তোমরা মানুষের প্রতি এহসান করো কারণ আল্লাহ এহসানকারীদের ভালোবাসেন।’ (সূরা বাকারা : ১৯৫)।
ব্যবসার মালের যাকাত : ব্যবসার শুরু থেকে চন্দ্র বর্ষের যে কোনো সময় এক বছর পূর্ণ হলে, আর তা যদি সোনা বা রুপার হিসাবে প্রচলিত মুদ্রায় ও মূল্যে ব্যবসার মাল ও নগদ অর্থসহ নেসাব পরিমাণ হয়, তাহলে যাকাত ফরজ হবে। তবে ব্যবসার মালের দাম বৃদ্ধি পেয়ে বছরের কোনো এক সময় সাহেবে নেসাব বিবেচিত হলে, যে তারিখ থেকে মাল বা সম্পদ নেসাব পরিমাণ হবে সে তারিখ থেকে এক বছরের মাথায় যদি পরিমাণ হ্রাস না পায়, তাহলে যাকাত আদায় করতে হবে। ব্যবসায় অংশীদার থাকলে হিসাব একত্রে করতে হবে, এতে সম্পদ নেসাব পরিমাণ হলে একত্রে চুক্তি অনুযায়ী যাকাত আদায় করতে হবে, তবে যে সকল অংশীদারের পুঁজি নেসাব পরিমাণ নয় তাকে হিসাব থেকে বাদ দিতে হবে। আর অংশীদারগণের লভাংশ থেকে সঞ্চিত অর্থ যদি নেসাব পরিমাণ হয়, যে দিন থেকে নেসাব পরিমাণ হবে, সেদিন থেকে চদ্র বর্ষের হিসাবে এক বছর হলে তারা আলাদাভাবে যাকাত দেবেন। যাকাতের অংশ হবে শতকরা আড়াই ভাগ।
দালান, ঘরবাড়ি ও জমির যাকাত : বসবাসের জন্য ঘরবাড়ি, দালান ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জমির কোনো যাকাত নাই। দালান, ঘরবাড়ি ও জমি ব্যবসায়ীক ও উৎপাদন কাজে ব্যবহারে অথবা ভাড়ায় খাঁটালে বা ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে ক্রয় করলে যাকাত দিতে হবে। দালান, ঘরবাড়ি বিক্রির নিয়তে তৈরি করলে অথবা দালান, ঘরবাড়ি ও জমি ক্রয়, বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে হলে তা ব্যবসীয়ক পণ্য হিসেবে ধরে নিয়ে নিসাব পরিমাণ হলে বছরান্তে অবশ্যই যাকাত দিতে হবে।
সোনা, রুপা ও নগদ অর্থের যাকাত : সোনা, রুপা ব্যবসার জন্য হোক কি ব্যবহারের অলংকার হোক, নেসাব পরিমাণ হলে তার যাকাত দিতে হবে। অর্থ বা টাকা ঘরে জমানো বা হাতে নগদ অথবা ব্যাংকে আমানত হোক নেসাব পরিমাণ হলে যাকাত দিতে হবে। এ সকল ক্ষেত্রে শতকরা আড়াই ভাগ হিসাবে যাকাত দিতে হবে।
গৃহপালিত পশুর পাখির যাকাত : মাঠে-ময়দানে চরে বেড়ায় এমন পশু যা বংশ বৃদ্ধি ও দুধের জন্য পালন করা হয় তা যদি নেসাব পরিমাণ হয়, তাহলে যাকাত ফরজ। ছাগল ও ভেড়া ৪০ থেকে ১২০ পর্যন্ত ১টি ছাগল অথবা ভেড়া যার সংখ্যা বেশি হয় তার থেকে যাকাত দিতে হবে। ১২১-২০০ পর্যন্ত ২টি। ২০১-৩৯৯ পর্যন্ত ৩টি। ৪০০ থেকে উপরে শতকরা ১টি হিসেবে যাকাত দিতে হবে। গরু-মহিষের নেসাব হবে, ৩০-৩৯টি গরু অথবা মহিষ বা গরু মহিষ মিলে ৩০টি হলে ১টি পূর্ণ এক বছর বয়সের বাচ্চা যাকাত হিসেবে দিতে হবে। ৪০-৫৯ পর্যন্ত ২ বছর বয়সের ১টি বাচ্চা যাকাত হিসেবে দিতে হবে। গরু-মহিষ ৬০টি হলে ১ বছরের ২টি বাচ্চা যাকাত দিতে হবে। ৭০টি হলে ১ বছরের ১টি ও ২ বছরের ১টি যাকাত দিতে হবে। ৮০টি হলে ২ বছরের ২টি আচ্চা যাকাত দিতে হবে। এভাবে ৯০টি হলে ১ বছরের ৩টি বাচ্চা যাকাত দিতে হবে।
ডেইরি ফার্মের গরুর ওপর যাকাত নেই। কিন্তু উৎপাদিত দুধ, গোশত, বাছুর বা গরুর বিক্রয় লব্ধ অর্থ যদি বছরান্তে নেসাব পরিমাণ হয়, তার ওপর শতকরা আড়াই ভাগ হারে যাকাত পরিশোধ করতে হবে।
বিক্রির উদ্দেশ্যে পুকুরে মাছ চাষ করলে এক বছর অতিক্রম হলে বাজারমূল্য যাচাই করে শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত পরিশোধ করতে হবে। হাঁস-মুরগির ফার্ম ডিম বিক্রির উদ্দেশ্যে হলে উৎপাদিত ডিমের ও হাঁস-মুরগির বিক্রয় লব্ধ অর্থ নেসাব পরিমাণ হলে তার ওপর বছরান্তে শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত দিতে হবে।
কৃষিজাত ফল ফসল শাকসবজির ওশর : ওশর যাকাতের মতোই ফরজ। ওশর শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দশ ভাগের এক ভাগ। ওশরের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ হচ্ছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপার্জনের উৎকৃষ্ট অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করো এবং তার মধ্য থেকেও যা তোমাদেরকে আমি জমি থেকে বের করে দিয়েছি।’ (সূরা বাকারা ।২৬৭)। আল্লাহ তায়ালা আরো নির্দেশ করেন, ‘আর তোমরা আল্লাহর হক আদায় করো যেদিন তোমরা ফসল কাটবে।’ (সূরা আনআ : ১৪১)।
ওশরের নেসাব পরিমাণ : কৃষি পণ্য ফল, ফসল, ধান, পাট, আলু, গম, সরিষা, আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, শাকসবজি তরিতরকারি ইত্যাদি এগুলোর ব্যবহার যোগ্য ও পরিমাণ ৫ ওয়াসাক বা ৩০ মণ হলে ওশর প্রযোজ্য হবে, ওজন বা পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষত্রে মাপার যন্ত্র গ্রহণযোগ্য’। (সহীহ আল বুখারী)।
ব্যবহারের আগে বাগান, গাছের ফল বা জমির ফসল বিক্রি করে দিলে ফল বা ফসল পাকলে ক্রেতার ওপর ওশর! আদায়ের দায়িত্ব বর্তাবে। কোনো ভূমি বা গাছে বছরে ২-৩ বার ফসল বা ফল হলে যতবার ফল বা ফসল হবে ততবার ওশর আদায় করতে হবে।
যেখানে সেচসহ সার কীটনাশক ইত্যাদি প্রয়োগ করতে হয় সে ক্ষেত্রে ২০ ভাগের এক ভাগ ওশর প্রযোজ্য। প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন যেখানে সেচ, সার, কীটনাশক ইত্যাদি প্রয়োজন হয় না সে ক্ষেত্রে ১০ ভাগের এক ভাগ ওশর ধার্য করতে হবে। ওশর আদায়ের পূর্বে উৎপাদন খরচ বা মজুরি ধরা যাবে না। বাগানের কাঠ, মধু এগুলোর ওশর হবে দশ ভাগের এক ভাগ।
আপনি জমি কিনেছেন ব্যবসায়ের কাজে তার মূল্য যদি বছরান্তে নেসাব পরিমাণ হয়, আপনার ওপর যাকাত প্রযোজ্য। আপনি দালান নির্মাণ করছেন ফ্ল্যাট বিক্রি করার জন্য অথবা আপনি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন অথবা ক্রয়ের জন্য ফ্লাটের অগ্রিম টাকা দিয়েছেন, এই টাকার পরিমাণ যদি বছরান্তে নেসাব পরিমাণ হয়, আপনার ওপর যাকাত প্রযোজ্য। অর্থাৎ ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে আর্থিক যে সকল লেন-দেন হবে তা যদি এক বৎসর পূর্ণ হয় আর তা যদি নেসাব পরিমাণ হয়, তাতে আপনাকে অবশ্যই যাকাত আদায় করতে হবে।
ব্যবসায়ে উদ্দেশ্যে যে কোনো দোকানের মালামাল, হাতে নগদ, ব্যাংকে জমা, বকেয়া পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকলে বিভিন্ন দায়দেনা বাদে আপনি যদি সারে ৫২ (বায়ান্ন) তোলা রুপার হিসাবে, ৯৯,৭৫০ টাকার মালিক থাকেন, আপনার ওপর যাকাত প্রযোজ্য হবে।
যাকাত যারা পাওয়ার হকদার : আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছে, “যাকাত হলো কেবল ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী ও যাদের চিত্তাকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাস মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের জন্য এবং মুসাফিরের জন্য, এই হলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান, আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান। (সূরা তাওবা : ৬০)।” যাকাতের হকদারের ব্যাপারে আল্লাহ আরো বলেছেন, “এটা (যাকাত) প্রাপ্য অভাবগ্রস্ত লোকের যারা আল্লাহর পথে আবদ্ধ থাকার কারণে জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র ঘোরাফেরা করতে সক্ষম নয়, অজ্ঞ লোকেরা তাদের অভাব মুক্ত মনে করে, তোমরা তাদের লক্ষণ দ্বারা চিনবে, তারা মানুষের কাছে কাকুতি-মিনতি করে ভিক্ষা চায় না, তোমরা যে অর্থ ব্যয় করবে, তা আল্লাহ অবশ্যই জানেন। (সূরা আল বাকারা : ২৭৩)।”
উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ে আমরা জানতে পারলাম, যাকাতের হকদার, (১) ফকির-সম্বলহীন, (২) মিসকিন-অসচ্ছল, (৩) (ইসলামী রাষ্ট্রের) যাকাত আদায়কারী, (৪) (অমুসলিমদের) চিত্তাকর্ষণের প্রয়োজনে, (৫) (বন্দী-কয়েদি) দাস মুক্তির জন্য, (৬) ঋণগ্রস্তদের জন্য, (৭) আল্লাহর দীনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজে সার্বক্ষণিক লেগে থাকার ব্যক্তির জন্য ও (৮) মুসাফিরের জন্য যেসফরে আছে)। সূরা বাকারার ২৭৩ নম্বর আয়াতেও আল্লাহর দীনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজে সার্বক্ষণিক লেগে থাকার ব্যক্তির জন্য যাকাতের অর্থ খরচ করার নির্দেশ করা হয়েছে। যাকাতের হকদারদের জন্য এ আটটি খাতেই যাকাতের অর্থ ব্যয় করতে হবে।
যাকাত কাকে কী পরিমাণ দেব : হযরত ওমর (রা.) বলেছেন, যখন দান করবে তখন সচ্ছল করে দিও’ (আবু উবাইদা, আর আমওয়াল)। যে যেই কাজের উপযোগী তার সে উপযোগিতা ও চাহিদা মোতাবেক যাকাত দেয়া প্রয়োজন যাতে সে ব্যক্তি পুনরায় আর কারো কাছে জীবনে হাত পাততে না হয়। প্রত্যেকেরই চাহিদা ভিন্ন ভিন্ন সুতরাং ভিন্ন চাহিদার ভিন্ন লোকেদের ভিন্নভাবেই কর্মসংস্থান হোক বা অন্য কোনো পন্থায় হোক চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করতে হবে, এটাই অধিকাংশ মাযহাবের ফকিদের মতো, যা হযরত ওমর (রা.) নির্দেশ করেছেন।
যাদেরকে যাকাত দেয়া যাবে না : (১) আব্বা-আম্মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি ও তাদের আব্বা-আম্মা (২) ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি, পৌত্র-পৌত্রী ও প্রোপৌত্র-প্রোপৌত্রী (৩) স্বামী (৪) স্ত্রী (৫) সাহেবে নেসাব বা সচ্ছল ব্যক্তি (৬) অমুসলিম ও (৭) নবী (সা.) এর বংশধর।
যাকাতের হিসাব : রাষ্ট্র আরোপিত কর, চুক্তির মেয়াদ অনুযায়ী যাকাতবর্ষে পরিশোধ যোগ্য স্বল্পমেয়াদি ঋণের টাকা ও একই বছরের হজের খরচ (পূর্বে হজ না করে থাকলে) মোট সম্পদের হিসাব থেকে বাদ দিয়ে যাকাতের নেসাব হিসাব করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ যদি ব্যবসায়িক বা উৎপাদন কাজে নিয়োজিত থাকে তা হলে সে ঋণগ্রহীতার ওপর যাকাত বর্তাবে।
লেখক : সাংবাদিক ও ইসলামী চিন্তাবিদ।