দেশবিরোধী গোপন চক্রান্ত, সক্রিয় ইনসাইডাররা

কাণ্ডারি হুঁশিয়ার


২০ মার্চ ২০২৫ ১৪:০৮

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
অন্তর্বর্তী সরকারের তথা দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে শত্রুমহল নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। আর এ ষড়যন্ত্রে যেমন দেশীয় অপশক্তি রয়েছে, তেমনি প্রতিবেশী একটি দেশেরও ইন্ধন রয়েছে এবং তা প্রায় প্রকাশ্যে বোঝা যাচ্ছে। কোনো কোনো মহলের অভিযোগ, দেশের ভেতরে তথা সরকারের অভ্যন্তরেই রয়েছে দেশ ও সরকারবিরোধী চক্র। এ অপশক্তির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণেই আঁচ করা যাচ্ছে তারা সরকারকে অকার্যকর করে দেশকে অস্থিতিশীল পর্যায়ে নিতে চায়। আল-জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের সম্প্রতি তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেছেন, আগামী নির্বাচনেই যেন শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা যায়, সেই লক্ষ্যে একযোগে কাজ করছেন অন্তত ১৪ জন ইনসাইডার। উপদেষ্টা, সচিব, গুরুত্বপূর্ণ পদ, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা সব মিলিয়ে এদের মূল ইনসাইডার সংখ্যা ৯ জন। খুবই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন জুলকারনাইন, যা সরকারের জন্য অশনিসংকেত। এদিকে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাপ্রধান তুলসী গ্যাবার্ডকে দিয়ে বাংলাদেশের ব্যাপারে একটি নেতিবাচক বক্তব্য প্রচার করেছে। অবশ্য তুলসীর অতিরঞ্জিত বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে সরকার। অপরদিকে ফ্যাসিস্ট দল আওয়ামী লীগ রাজধানীর কেন্দ্রস্থলেই প্রকাশ্যে নির্বিঘ্নে মিছিল করেছে। মিছিলের খবর দেশের একটি প্রাচীন দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করেছে। বলা যায় খুবই কৌশলে ফ্যাসিস্ট দলটি রাজনৈতিক ময়দানে ফিরে আসার ফন্দিফিকির করছে।

আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল
গণতন্ত্র হরণ ও ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের কারণে আওয়ামী লীগ নিজ থেকেই গুটিয়ে গেছে। সাধারণ জনগণের সাথে তাদের অন্যায় অত্যাচার ও চরম অপরাধের কারণে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করার সাহস নেই। তাই বিগত আট মাসে আ’লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশে কোনো কার্যালয় তারা খোলার সাহস পাচ্ছে না। প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিতে পারছে না ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। কিন্তু তারা বিগত ১৭ মার্চ রাজধানীতে গোপনে একটি ঝটিকা মিছিল করে। প্রায় নিষিদ্ধ এ দলটি শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৫তম জন্মদিন উপলক্ষে রাজধানীতে ঝটিকা মিছিল করে । গত ১৭ মার্চ সোমবার সকাল ৬টার দিকে রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে আয়কর বিভাগ কর অঞ্চল-৫ এর সামনে দিয়ে এ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে আওয়ামী লীগের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
মিছিল শেষে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নেতাকর্মীরা বিচ্ছিন্নভাবে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েন। এ সময় তারা ‘শুভ শুভ শুভ দিন, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন’, ‘কে বলে রে মুজিব নাই, মুজিব সারা বাংলায়’, ‘এক মুজিব লোকান্তরে, লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে’, ‘শেখ শেখ শেখ মুজিব, লও লও লও সালাম’, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’সহ নানা স্লোগান দিতে থাকেন।
এ সময় নেতাকর্মীরা বলেন, এই অবৈধ সরকারের গ্রেফতার আতঙ্কে আমরা ঝটিকা মিছিল করতে বাধ্য হয়েছি। দেশব্যাপী আমাদের হাজারো নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমাদের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তবে এ সরকার যাই করুক, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে, ইনশাআল্লাহ।
খোদ রাজধানীতে আওয়ামী লীগের এ ধরনের মিছিল করার মধ্যে একটি সিগন্যাল রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। মিছিল-পরবর্তীতেও প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়নি। সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো অংশের মৌন সমর্থন আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা উচিত সরকারের নীতিনির্ধারকদের।

শেখ হাসিনাকে ফেরানোর গোপন মিশনে ‘১৪ ইনসাইডার’
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের সম্প্রতি তার ফেসবুকে পোস্টে ওই ইনসাইডারদের নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন, গণঅভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে গেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু তার আগে তিনি পনেরো বছরে নিজস্ব লোকবল দিয়ে সাজিয়ে-গুছিয়ে রেখেছেন দেশের প্রতিটি খাত।
আয়া থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সবাই যেন তার লোকজন। এত সহজে এদের দমানো যাবে নাÑ এটাই তো স্বাভাবিক। আর তাই তো শেখ হাসিনাও বর্ডারের ওপারে বসে গুনছেন দিনক্ষণ।
এবার বেরিয়ে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য। আগামী নির্বাচনই যেন শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা যায়, সেই লক্ষ্যে একযোগে কাজ করছেন অন্তত ১৪ জন ইনসাইডার।
ঢাকার অভিজাত এলাকায় এখন চলছে গোপন বৈঠক। স্তূপ করা ফাইল ঘেঁটে ঘেঁটে দেখা হচ্ছে কোথায় কী আছে।
ফাইলের প্রতিটা পাতা থেকে খুঁজে খুঁজে বের করা হচ্ছে গোপন তথ্য। টার্গেট আগামী নির্বাচন। ছক কষছেন। ইনসাইডারদের লক্ষ্য শেখ হাসিনাকে ফেরানো।
যাদের মধ্যে কিছু লোক ইতোমধ্যে অন্তর্র্বর্তী সরকারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এবং খুবই সাবধানতার সাথে চালাচ্ছেন তাদের চাল। খুবই ধীরলয়ে করছেন পরিকল্পনা।
ইনসাইডারদের আরও লক্ষ্য, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরানো।
কীভাবে এই পদে ওই চক্রের লোক বসানো যায়, সেই রোডম্যাপ তৈরি করছেন তারা।
ওই পোস্টে জুলকারনাইন লেখেন, ‘অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত কতিপয় উপদেষ্টা- যারা অত্যন্ত দুরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্য নিয়ে সরকারে প্রবেশ করেছেন, তারা কিছুতেই সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি রাজনৈতিক সরকার যেন ক্ষমতায় আসতে না পারে, সে লক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন। এ চক্র বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরও অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।’
এ সাংবাদিক দাবি করেন, ‘সরকারের বাইরে থাকা এ চক্রের কয়েকজন অনুঘটকের নাম আমি আগেও বেশ কয়েকবার উল্লেখ করেছি। যদি অনতিবিলম্বে এদের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তাহলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন হবে।’
তিনি এও লেখেন, ‘ওই চক্রের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছেন। যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হলে ড. ইউনূসও সম্ভবত তার পদটি ত্যাগ করবেন। আর সেই সুযোগে তার পদটি বাগিয়ে নিতে সচেষ্ট রয়েছে ওই চক্র।’
‘সে লক্ষ্যে তাদের পছন্দের একজনকে কিছুদিন আগেই ক্যাবিনেটে নেয়া হয়েছে। উপদেষ্টা, সচিব, গুরুত্বপূর্ণ পদ, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা সব মিলিয়ে এদের মূল ইনসাইডার সংখ্যা ৯ জন। আর ভাইটাল আউটসাইড এক্টর আরো ৫ জন, এছাড়া আরো বেশ কয়েকজন রয়েছেন।’
তবে ইনসাইডারদের নাম প্রকাশ করেননি সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের। উপযুক্ত সময়ে তাদের নাম ও বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে বলে তিনি জানান।
তার পোস্টে আরও লেখেন, ‘সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর এদের বিষয়ে সোচ্চার ও রুখে দেয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে।’
সাংবাদিক জুলকারনাইনের এ তথ্য ফেসবুকে প্রকাশকে সরকারের হেলাফেলায় নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। সরকারকে এ তথ্য পর্যালোচনা করে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া উচিত। তুলসীর বক্তব্যের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো হলেও জুলকারনাইনের এ বক্তব্যের ব্যাপারে সরকার নীরব। জুলকারনাইন কিন্তু সরকারের অভ্যন্তরেই সরকারবিরোধী লোক আছে, যাদের তিনি ইনসাইডার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কতজন ইনসাইডার সরকারের বিরুদ্ধে কীভাবে এবং কী কী ষড়যন্ত্র করছেন, তাও উল্লেখ করেছেন। দেশবাসী আশা করে, সরকার তার নিজস্ব মেকানিজম দিয়ে জুলকারনাইনের বক্তব্যের যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।

কাণ্ডারি হুঁশিয়ার
দেশে একটি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায়। সারা দেশের জনগণের সমর্থন নিয়েই এ সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। বিশেষ কয়েকজন ব্যক্তি দিয়ে একটি অন্তর্বর্তী উপদেষ্টা পরিষদ সরকার গঠন করা হয়েছে। বিগত আট মাস ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিছু ঘাটতি থাকলেও উত্তরাধিকার সূত্রে ফ্যাসিস্ট সরকার তৈরি একটি প্রশাসন দিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা করছে সরকার। প্রায় ১৬ বছর ধরে ফ্যাসিস্টদের অবৈধভাবে নিয়োগ দেয়া কর্তাদের অনেকেই এখনো প্রশাসনে রয়ে গেছে। প্রশাসন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গে এখনো স্বৈরাচারের দোসরদের বড় অংশ ঘাপটি মেরে আছে। তাই আগের দোসররা সুযোগ পেলেই সরকারকে বেকায়দায় ফেলার অপচেষ্টা করছে। অপরদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারত এক নম্বর ফ্যাসিস্টকে তার রাজধানী নগর দিল্লিতে রেখে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করার সুযোগ করে দিচ্ছে। সরকার ও প্রশাসনসহ বিভিন্ন স্তরে সরকারের বিরুদ্ধে তৎপর রয়েছে ইনসাইডার- সাংবাদিক জুলকারনাইনের এমন তথ্য প্রকাশ ও হঠাৎ করে মার্কিন গোয়েন্দা পরিচালক তুলসীর দিল্লিতে এসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রদানসহ শত্রুপক্ষের বিভিন্ন তৎপরতা সরকারের জন্য এক অশনিসংকেতই বলা চলে। চতুর্মুখী এসব চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হলে দেশপ্রেমিক জনতা, অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর ইস্পাতকঠিন ঐক্য গড়তে হবে। দেশপ্রেমিক শক্তির মধ্যে যদি দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও পরস্পর বিরোধ জিইয়ে রাখা হয়, তাহলে শত্রুপক্ষ তার সুযোগ নেবে। তাই কবির ভাষায় বলতে হয়, কাণ্ডারি হুঁশিয়ার।