কুড়িগ্রাম চরাঞ্চলের গ্রামীণ জনপদের আমূল পরিবর্তন


১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৪:৪৬

আমানুর রহমান খোকন, কুড়িগ্রাম: গ্রামীণ মেঠোপথ ধরে চলতে চলতেই যেন হারিয়ে যাই এক অচিনপুরে। ধূসর বালির রাজ্যে সবুজ ঘাসের চাপায় দৃশ্যমান মাটির তৈরি রাস্তা মন ছুঁয়ে যায় প্রতিটি মুহূর্তে। কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের জনপদের মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করতে দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসকরণ প্রকল্পের আওতায় বালি ও মাটির তৈরি বাঁধ-রাস্তায় গ্রামীণ জনপদের জীবন-জীবিকায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পিছিয়ে থাকা জেলা কুড়িগ্রামের তিনটি ইউনিয়নে একটি বাঁধ ও তিনটি রাস্তা তৈরি করায় বিশ হাজারের বেশি মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পেয়েছে। সরেজমিন জানা যায়, জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা, নুনখাওয়া ও বামনডাঙা ইউনিয়নে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বাঁধ এবং তিনটি রাস্তা তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কচাকাটা ইউনিয়নের ইন্দ্রগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে জালিরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত নয়শ মিটার উঁচু বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এই ইউনিয়নের ধনীরাম মৌজার খেয়াঘাট থেকে মধ্যধনীরাম জামে মসজিদ পর্যন্ত দীর্ঘতম একটি উঁচু রাস্তার কাজ শুরু করা হয়েছে। ইন্দ্রগড় এলাকার মিজানুর, হোসেন আলী বলেন, আমরা চর এলাকার মানুষ প্রতিকূল পরিবেশের সাথে লড়াই করে চলি। এখানে বানের সময় পানিতে হাবুডুবু আর খড়ার সময় বালির সাগর পারি দিতে হয়। রাস্তার অভাবে এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রামের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। বাজারের সাথে রাস্তার সংযোগ না থাকায় কৃষিপণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে দারুণ অসুবিধা সহ শিশু-বৃদ্ধদের যাতায়াতের অনেক কষ্ট হয়ে থাকে। উঁচু বাঁধ ও রাস্তা তৈরিতে আমরা অনেক বেশি উপকৃত হলাম। বাঁধ ও রাস্তা দিয়ে আমাদের সন্তানরা খুব সহজে বিদ্যালয় যাতায়াত করতে পারবে। কচাকাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. সাহাদত হোসেন মাস্টার বলেন, আমার ইউনিয়নবাসী বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, আরডিআরএস বাংলাদেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের নিকট চিরকৃতজ্ঞ থাকবো। আমার ইউনিয়নে একটি বাঁধ ও একটি রাস্তা তৈরি হওয়ায় অনেক মানুষ উপকৃত হলো। এতে আমার ইউনিয়নের সাথে পার্শ্ববর্তী পাঁচটি ইউনিয়নের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে। এখন শিশুরা খুব সহজেই বিদ্যালয় যেতে পারবে। অসুস্থরা খুব সহজেই চিকিৎসার জন্য উপজেলা-জেলা শহরে যেতে পারবেন। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে বিক্রয় করে অধিক লাভবান হবেন। বাঁধ ও রাস্তা অনেক উঁচু হওয়ায় বন্যার সময় এতে মানুষ ও তাদের গৃহপালিত পশু আশ্রয় নিতে পারবে। একইভাবে নুনখাওয়া ইউনিয়নের চরকাপনা থেকে আতাউরের দোকান পর্যন্ত বারশ মিটার উঁচু রাস্তা তৈরি করায় যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক উন্নত হয়েছে। নুনখাওয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসকরণ প্রকল্পের আওতায় আরডিআরএস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনায় এ বৃহত্তর মাটির রাস্তা তৈরি হওয়ায় নুনখাওয়া, ভিতরবন্দ, কালীগঞ্জ, নারায়ণপুর, ঘোগাদহ, যাত্রাপুর, কচাকাটাসহ আশপাশের আরো অনেক মানুষ উপকৃত হয়েছেন। এ এলাকায় যোগাযোগের রাস্তা তৈরি হওয়ায় ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। অপরদিকে বামনডাঙা ইউনিয়নের দক্ষিণ লুছনী জব্বারের মোড় থেকে বন্ধু বাজার পর্যন্ত ২০৬০ মিটার রাস্তার সংস্কার কাজের আওতায় রাস্তা উঁচু করা হয়। এ রাস্তা তৈরি করায় বামনডাঙা, কচাকাটা, মাদারগঞ্জের সংযোগ স্থাপন হওয়ায় ব্যবসা বৃদ্ধি পেয়ে মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। বন্ধু বাজার এলাকার বাসিন্দা আলতাফ হোসেন ও মাহাবুর রহমান বলেন, আমরা চরের মানুষ সবসময় উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে থাকি। নদীতে বেষ্টিত ধাকায় আমরা শহর থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন থাকি। আমরা শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা সব থেকেই পিছিয়ে। রাস্তার অভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন তাই আমাদের ছেলে-মেয়েদের বিয়েশাদী ভালো ঘরে দিতে পারি না। এখন রাস্তা তৈরি হওয়ায় আমরা অনেক বেশি আনন্দিত। বামনডাঙা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আসাদুজ্জামান রনি বলেন, আমার ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকাই নদীর ওই পাড়ে অবস্থিত। রাস্তার অভাবে আমরা নানাভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত এবং অবহেলিত হয়ে থাকি। আরডিআরএসের ব্যবস্থাপনায় কোটি টাকা ব্যয়ে মাটির রাস্তা তৈরি করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। আরডিআরএস এর সমন্বয়কারী তপন কুমার সাহা বলেন, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং আমারা যৌথভাবে এ কাজের বাস্তবায়ন করছি। প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি ইউনিয়নে আমরা একটি বাঁধ এবং তিনটি রাস্তা তৈরি করেছি। এ বাঁধ ও রাস্তা তৈরি হওয়ায় তিন ইউনিয়নের প্রায় বিশ হাজারের বেশি মানুষ উপকৃত হবেন। এতে করে এ অঞ্চলের জীবনযাত্রার মান অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। বন্যার সময় মানুষ ও গৃহপালিত পশু এখানে আশ্রয় নিতে পারবে। আগামীতে নাগেশ্বরী উপজেলার পাশাপাশি জেলার অন্য উপজেলায়ও আমরা দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসকরণ প্রকল্পের আওতায় উন্নয়ন কাজ করবো। নাগেশ্বরী উপজেলার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মোফাখখারুল ইসলাম বলেন, ডিআরআর প্রকল্পের আওতায় তিনটি ইউনিয়নে মাটির রাস্তা ও বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। আশা করি, এতে করে এসব এলাকার দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস হবে।