গাজায় যুদ্ধবিরতিতে স্বস্তি


২৩ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:৪৫

হতাহত প্রায় ২ লাখ
পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু, উদ্বাস্তুরা ফিরছেন
নতুন করে গড়ে তুলতে লাগবে ১৫ বছর
জিম্মি-বন্দিবিনিময় শুরু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : টানা ১৫ মাসের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনের গাজায় নৃশংস গণহত্যা চালায় ইসরাইল। এ সংঘাত অবসানের জন্য ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে। এতে ফিরে এসেছে স্বস্তি। গত ১৯ জানুয়ারি রোববার যুদ্ধবিরতির পর আশ্রয় কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি ফিরছেন ফিলিস্তিনিরা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর এ যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। হামাস অপারেশন আল আকসা ফ্লাড অভিযান চালায় ইসরাইলে। এতে নিহত হয় ১১০০ ইসরাইলি এবং ২৫১ জনকে জিম্মি হিসেবে আটক করা হয়। আর গাজায় শতাবদীর নজিরবিহীন গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায় ইসরাইল। সেখানে মানবিক সংকট এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, ইসরাইলের সামরিক অভিযান চলাকালে ৪৭ হাজার ৭০৭ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২ লাখ ১০ হাজার ২৬৫ জন আহত হয়েছেন। গাজার ৮০ শতাংশ অবকাঠামো বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে।
বাড়ি ফিরছেন ফিলিস্তিনিরা
যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে ১৯ জানুয়ারি রোববার সকালে। স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ১১টায় এ যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। হামাস প্রথম দফায় তিন নারী জিম্মির তালিকা প্রকাশের পরই এ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এর আগে জিম্মিদের তালিকা না পাওয়ায় যুদ্ধবিরতি পিছিয়ে দেয় ইসরাইল। যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর গাজার হাজার হাজার গৃহহীন বাসিন্দা বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে। যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার মাত্র ১৫ মিনিট পর ১৯ জানুয়ারি রোববার গাজায় মানবিক সাহায্যবাহী ট্রাকগুলো ঢুকতে শুরু করে বলে এক্সের পোস্টে জানিয়েছেন জাতিসংঘের সহায়তাবিষয়ক কর্মকর্তা জোনাথন হুইটাল।
বন্দিদের তালিকার অপেক্ষায় হামাস
হামাসের হাতে গাজায় বন্দি তিন ইসরাইলি রোমি গোনেন, এমিলি দামারি ও ডরন স্টেইনব্রেচারের তালিকা প্রকাশের পরই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। টেলিগ্রামে এক পোস্টে হামাস এ নাম প্রকাশ করে। তাদের তিনজনই হামাসের হাতে ২০২৩ সালের সাতই অক্টোবর অপহৃত হয়েছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী হামাস তিনজন বন্দির নাম প্রকাশ করলেও তার বিপরীতে ইসরাইল যে ৯০ জন ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তি দেয় তাদের তালিকা প্রকাশ করেনি।
গত ১৯ জানুয়ারি রোববার হামাসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি ইসরাইলি বন্দি মুক্তির বিনিময়ে ৩০ ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হবে। সেই হিসাবে আজ ৯০ জন মুক্তি পায়। ইসরাইলে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মধ্যে নারী ও শিশুরাও রয়েছে। গাজার হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, তারা বন্দিবিনিময়ের জন্য রেডক্রসের সঙ্গে কাজ করবে এবং মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য দক্ষিণ শহর খান ইউনুসের গাজা ইউরোপীয় হাসপাতালে পাঠানো হবে। যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারী অন্যতম দেশ মিশর গত ১৮ জানুয়ারি শনিবার জানিয়েছিল, যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় প্রথম ছয় সপ্তাহে মোট ১,৮৯০ জন ফিলিস্তিনি মুক্তি পাবে। চুক্তির আওতায় ইসরাইলি বিচারবিষয়ক মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত ৭৩৪ জন বন্দি ও আটক ব্যক্তির তালিকা প্রকাশ করেছে। তাদেরকে মুক্তি দেয়া হবে বলেও জানিয়েছিল ইসরাইল। তবে ৭৩৪ জন কি ওই ১৮৯০ জনের তালিকার মধ্যে রয়েছে কিনা, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। এই ৭৩৪ জনের বাইরে ইসরাইল বাকি ১ হাজার ১৫৬ জন বন্দির বিষয়ে এখনো কিছু জানায়নি। যুদ্ধবিরতি চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল বন্দিবিনিময়। তবে প্রতি দফায় কতজন জিম্মি কোন দেশ মুক্তি দেবে, সেটি এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে হামাস দাবি করছে যে, যুদ্ধবিরতির শর্তানুযায়ী প্রতি একজন ইসরাইলি বন্দির মুক্তির জন্য ৩০ ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হবে। যুদ্ধবিরতি শুরুর পর বন্দিদের পরিবার ও স্বজনরা বিভিন্ন কারাগারের সামনে জড়ো হতে শুরু করেছেন।
গাজায় ২ লাখ হতাহত
গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে প্রায় ২ লাখ মানুষ হতাহত হয়েছে। আর ঘরবাড়ি হারা হয়েছে ১৯ লাখ মানুষ। সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ ও আশ্রয়ের ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। ইসরাইল বলছে হামাসের হাতে এখনো ৯৪ জন জিম্মি আছে। এর মধ্যে ৩৪ জন মারা গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বাইরে যুদ্ধের আগে চারজন ইসরাইলি সেনাকে অপহরণ করা হয়েছিল, যার মধ্যে দুজন মৃত। চুক্তির বিষয়ে ইসরাইলি সরকারে ভোটের আগে সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহার বলেন, ‘এটা খুব কঠিন সিদ্ধান্ত, কিন্তু আমরা সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি কারণ আমাদের কাছে সব শিশু ও নারী ও পুরুষকে ঘরে ফিরিয়ে আনাটা গুরুত্বপূর্ণ’।
গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা ৪৭ হাজার ৭০৭ জনের মৃত্যুর হিসাব পেয়েছেন। হাসপাতাল এবং নিহতদের পরিবারের সদস্যদের থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ সংখ্যা তৈরি করেছেন তারা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত অর্থাৎ সংঘাতের এক বছরে শনাক্ত হওয়া মৃতদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ ছিল নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। তবে নভেম্বরের জাতিসংঘের বিশ্লেষণে নিহতের মধ্যে নারী এবং শিশুর সংখ্যা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরো বলেছে, এক লাখ ১০ হাজার ৪৫৩ ফিলিস্তিনি এ সংঘর্ষে আহত হয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তেসরা জানুয়ারি এক প্রতিবেদনে জানায়, এই আহতদের মধ্যে ২৫ শতাংশের আঘাত এতটাই গুরুতর যে, তাদের জীবন আর আগের অবস্থায় ফিরবে না।
মেডিসান সান ফন্তিয়েখ (এমএসএফ)-এর সমন্বয়ক কারিন হাস্টার বিবিসি ভেরিফাইকে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে আহত রোগীদের ঠিকমতো দেখাশোনা করার ক্ষেত্রে গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ‘ভয়াবহ’ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ল্যানসেট মেডিকেল জার্নালে সম্প্রতি একটি প্রবন্ধে বলা হয়, নিহতের সংখ্যা মন্ত্রণালয়ের হিসাবের চাইতেও বেশি হতে পারে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যখন নিহতের সংখ্যা গণনা করে, তখন তারা সাধারণ নাগরিক এবং যোদ্ধাদের আলাদা কোনো হিসাব করেনি। তবে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ দাবি করেছে, তারা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৭ হাজার হামাস যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। তারা কীভাবে এ সংখ্যা নির্ধারণ করেছে তা প্রকাশ করেনি।
ত্রাণের অভাব
জাতিসংঘের ধারণা, ৯১ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে আছে। আইপিসি নামের একটি গ্রুপ যারা সরকার, দাতব্য সংস্থা এবং এজেন্সির সাথে কাজ করে, তারা জানিয়েছে যে, উত্তর গাজায় সাম্প্রতিক অভিযানগুলোর পর সেখানে দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ সংকটগুলোর মধ্যে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো কৃষিজমির ক্ষতি। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো জানিয়েছে যে, গাজার ৬৭ দশমিক ৬ শতাংশ কৃষিজমি গোলাবর্ষণ, যানবাহনের চলাচল ও অন্যান্য সংঘর্ষের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত কয়েক মাসে গাজায় পৌঁছানো ত্রাণ সহায়তার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। আগে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ ট্রাক ত্রাণ গাজায় ঢুকত। কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ত্রাণ আসা কমে গেছে যা এখনো স্বাভাবিক হয়নি। ত্রাণ ঢুকলেও অনেক সময় তা সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে পারে না। ত্রাণকর্মীরা জানিয়েছেন, অপরাধী চক্রগুলো ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোর সময় তা আটকে ফেলে এবং জিনিসপত্র লুট করে। কারণ সেখানে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। জাতিসংঘের ধারণা, প্রায় ১৯ লাখ মানুষের জরুরি আশ্রয় এবং প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী প্রয়োজন। যুদ্ধবিরতিতে হয়তো ত্রাণ পৌঁছানো সহজ হয়েছে। শত শত ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশ করেছে। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, গাজা কীভাবে আবার গড়ে তোলা হবে। ১৫ মাসের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পর গাজা পুনর্গঠনে ১০ থেকে ১৫ বছর লাগতে পারে। গাজাকে বাসযোগ্য করতে পুনর্গঠন ও পরিচ্ছন্ন করার কাজ গাজার বেসরামরিক প্রশাসন ইতোমধ্যে শুরু করে দিয়েছে।
যুদ্ধবিরতির পর কী হবে গাজায়?
এ যুদ্ধবিরতি ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে স্মরণকালের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী লড়াইয়ের অবসান ঘটাতে পারে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ শেষের পর যুদ্ধক্ষেত্র গাজার কী অবস্থা হবে? কার হাতে থাকবে এর নিয়ন্ত্রণ? বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, গাজার বর্তমান মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ। সেখানে যুদ্ধের আগেই ইসরাইলি অবরোধ ছিল এবং যেখানে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব প্রবল ছিল। জাতিসংঘ বলছে, গাজা ভূখণ্ড পুনর্গঠনে ১৫ বছরের বেশি সময় লাগবে। এতে খরচ হবে ৫০ বিলিয়ন ডলার। এ যুদ্ধে গাজার পানি বিতরণ নেটওয়ার্কসহ গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ইসরাইলের হামলায় গাজার ২৩ লাখ বাসিন্দার মধ্যে ১৯ লাখই বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তারা ভুগছে তীব্র খাদ্যসংকটে। গাজায় বেশিরভাগ শিশু এক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্কুলের বাইরে রয়েছে এবং মাত্র কয়েকটি হাসপাতাল আংশিকভাবে চালু রয়েছে। বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যেতে শুরু করেছে।