কর বাড়িয়ে বড় বাজেট


১৮ জুন ২০২৬ ১০:৩৮

ঘাটতি মেটাতে আড়াই লাখ কোটি টাকা ধার নেবে সরকার
গরিবের পকেট কেটে ধনীদের বড় ছাড়
মূল্যস্ফীতিতে চিড়েচ্যাপ্টা হবে মধ্যবিত্তরা

॥ উসমান ফারুক ॥
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ১৯ বছর পর সরকার গঠন করা বিএনপি অর্থনীতির অভিযাত্রা’ শিরোনামে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছে। এক বছরে ১৯ শতাংশ খরচ বাড়িয়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ঘাটতি ধরা হয় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এ পরিমাণ রাজস্ব আদায় করতে এনবিআরকে বর্তমানের চেয়ে ৪২ শতাংশ বেশি কর আদায় করতে হবে। বিশাল এই অঙ্কের টাকা আদায় করতে অন্ধের মতো নতুন নতুন খাত খুুঁজে নির্মমভাবে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর কর চাপালেন ব্যবসায়ী থেকে রাজনীতিতে আসা অর্থমন্ত্রী। বাজেটকে মানবিক বলা হলেও ব্যবসায়ী ও ধনিকশ্রেণির বিদ্যমান কর হার অকাতরে কমিয়ে দিয়েছে। চার বছরের বেশি সময় ধরে আয় স্থবির থাকায় চড়া মূল্যস্ফীতি এমনিতেই অতিকষ্টে জীবন পার করছে নির্ধারিত আয়ের মানুষ, সেখানে করের বাড়তি বোঝার চাপ সামলাতে চিড়েচ্যাপ্টা হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। বড়দের নানা উপায়ে ব্যবসায়ী অর্থমন্ত্রী সেই ঘাটতি আদায়ে সাধারণ নাগরিকদের ওপর কর বসিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা না জেনেই সরকার গঠনের তিন মাস পরই ভুল সূচকের ভিত্তিতে বড় বাজেট দিল বিএনপি। তাতে যতটা ছাড় পেলেন ধনীরা, ততটাই করের বোঝার চাপে পড়লেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের করদাতারা। আয় কর দেয়ার সামর্থ্য ও বাধ্যবাধকতা না থাকলেও অনেককে করের আওতায় চলে আসতে হবে। বিশাল এ বাজেটের রাজস্ব আদায় কোথা থেকে হবে তার কোনো পথ নকশা নেই। অথচ অর্থনীতিতে একটি ছাড়া সবগুলো সূচকই নেতিবাচক রয়েছে। বাজেটে কর্মসংস্থানকে সুচতুরভাবে এড়ানো হয়েছে। কিছু গালগল্প দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের মতো। আওয়ামী লীগের মতো স্টার্টআপ তহবিল গঠন করার কথা বলেছে বিএনপি। কিন্তু এমন কিছু কর্মসূচি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে থাকলেও সেগুলো পরে কর্মসংস্থান বাড়াতে কোনো কাজে আসেনি।
আওয়ামী লীগের লুটপাটে ক্ষত-বিক্ষত অর্থনীতিকে নিজ পায়ের ওপর দাঁড় করাতেই আগামী দুই-তিন বছর লাগবে সংস্কারের মধ্য দিয়ে যেতে। সেই অবস্থায় দুই দশক পর দেশ পরিচালনায় আসা বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে যে, কতটা মানবিক হলো এ বাজেট। সরকার যে বাজেট দিল, তা ধারণ করার মতো আর্থিক সক্ষমতা আছে কি না ক্ষত-বিক্ষত অর্থনীতির। এছাড়া অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি বাজেটে। বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে কোনো উপায় দেখাতে পারেননি বাজেটে।
জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপনকালে একসময়ের ব্যবসায়ী নেতা থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া আমীর খসরু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধির আকাক্সক্ষা পূরণের গল্প শোনান। বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ হবে বলে জানানো হয়। বাজেটের খরচ বাড়ানো হয় ১৯ শতাংশ আর আয় (রাজস্ব আদায়ের) হার বাড়ানো হয় ৪২ শতাংশ। আয় ও ব্যয়ের মধ্যে এ ভারসাম্যহীনতা আর্থিক শৃঙ্খলা নষ্ট হারিয়ে ফেলবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ মেয়াদের বিএনপির প্রথম বাজেটেই ভুল নীতি দৃশ্যমান বাজেট দিয়েছে। এটি বাস্তবায়নযোগ্য না।
অর্থনীতির হাল কেমন
আওয়ামী লীগের লুটপাটে জেরবার হওয়া অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র ব্যাংক খাত এখন দুর্বল হয়ে দুর্দশাগ্রস্তে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে ২০২০ সালের করোনা মহামারির পর ২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ধাক্কায় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের সময়ে অর্থনীতির সংকট বেড়ে যায়। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলে ২৮ লাখ কোটি টাকার বেশি পাচার, সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাটে নিস্তেজ হওয়া অর্থনীতি মেরামত করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার সুফল পেতে আরো সময় লাগবে। এ কারণে এখনো অর্থনীতি নানা ধরনের দুর্দমনীয় চ্যালেঞ্জের ভেতরে রয়েছে।
ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে থাকা রপ্তানি খাত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, কর্মসংস্থান না থাকা, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত না হওয়া, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরি হার আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি না পাওয়া, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকার ঘরে গিয়ে তারল্য সংকট তৈরির মতো সূচকগুলো উঁকি দিয়ে বড় হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ইতিবাচক রয়েছে।
অর্থনীতির এমন অনিশ্চিত গন্তব্যের সময়ে উচ্চাভিলাষী বাজেট দিয়েছে সরকার। যেখানে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি পূরণে পুরোটাই ঋণ করা হবে। এর মধ্যে বিদেশি ঋণের আশা করছে সরকার এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক থেকে নিবে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ও সঞ্চয়পত্র খাত থেকে অবশিষ্টটা। বাজেটে শুধু ঋণের সুদ ব্যয় মেটাতে হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা।
এজন্য বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগখরা, দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক খাত, ধীরগতির রাজস্ব আদায়, রপ্তানির নেতিবাচক ধারা ও চড়া মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা অর্থনীতিতে কীভাবে এ দুই লক্ষ্য অর্জন করা হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পথরেখা মিলল না। অর্থমন্ত্রীর দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতায় রাজনৈতিক দর্শনের অনেক কিছু শুনতে সবার ভালো লাগলেও সাধারণের জীবনযাত্রায় ওঠা নাভিশ্বাস কাটানোর কোনো উপায় তিনি বলেননি। নতুন কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর দিশার পরিবর্তে দেখা গেল জোড়াতালি দিয়ে কোনোরকমে উৎরে যাওয়ার এক চেষ্টা।
অথচ অর্থনীতির এই নাকাল অবস্থার মধ্যে গত অন্তর্বর্তী সরকার ৭ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছে, যা জিডিপির ১২ দশমিক ৬৫ শতাংশের সমান।
নতুন নতুন কর
এখন থেকে ব্যাংক হিসাব খুলতে হলে লাগবে আয়কর সনদ। অর্থাৎ গ্রামের এক প্রবাসী তার স্বজনদের কাছে টাকা পাঠাতেও কর সনদ লাগবে। যার ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানো হবে, তার তো কোনো আয় নেই। বিদ্যমান কর আইনেও তার আয়কর দেয়া লাগছে না। আইনে এরকম নাগরিকের আয়কর দেওয়া না বিধান নেই। তারপরও ব্যাংক হিসাব খুলতে চাইলে আয়কর সনদ লাগবে। বিষয়টি নিরীহ নাগরিকদের হয়রানিতে ফেলবে।
একইভাবে ক্ষুদ্র থেকে শুরু করে যেকোনো ব্যবসা পরিচালনা করতে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করতেও আয়কর সনদ লাগবে। আয়কর নিবন্ধন নম্বর ছাড়া একটি মুদি দোকানের ট্রেড লাইসেন্সও পাওয়া যাবে না। অথচ গ্রামের অনেক নারী সংসারের কাজের পাশাপাশি ছোট-খাটো হস্তশিল্প পরিচালনা করেন নিজের আয় বৃদ্ধি করতে। সেখানে অনেক আয় আসে ব্যাংকের মাধ্যমে। এখন সেখানেও প্রতি বছর আয়কর সনদ নিয়ে আয়কর দিতে হবে।
ট্রেড লাইসেন্স পাওয়া গেলেও ছোট ব্যবসা পরিচালনা করতে বাণিজ্যিক আয়কর সনদ বা টিন নিতে হবে। এজন্য প্রতি মাসেই এনবিআরকে টিনের বিপরীতে রিটার্ন জমা দিতে হবে। এতে করপোরেট আগ্রাসনে ছোট ব্যবসা একসময়ে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি বিক্রি করতেও লাগবে আয়কর সনদ। জমির নামজারি করতেও লাগবে আয়কর সনদ। প্রান্তিক মানুষ যারা কর-ভ্যাট এসবের হিসাব-নিকাশ বোঝেন না, তারা এ নিয়ে বিপাকে পড়বেন।
এছাড়া উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ওপর ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে বাড়ি বা ফ্লাট বানালেও সকল ফ্ল্যাটের ওপর কর দিতে হবে। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে আর্থিক সংকটে অর্ধেক ফ্ল্যাট ছেড়ে দেওয়ার শর্তে শুধু জমির মালিকরা ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছে যান। মোট ফ্ল্যাটের অর্ধেক বিনা খরচে পান জমি মালিকরা। কিন্তু এখন থেকে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের অর্ধেক ও নিজের পাওয়া ফ্লাটের মোট দামের ওপর ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে। আয়কর নথিতে থাকা গহনা বিক্রিতেও দিতে হবে ১৫ শতাংশ কর।
পাড়া-মহল্লায় থাকা প্রতিটি দোকানদারকে তার বিক্রির ওপর প্রতি হাজারে ২ টাকা করে কর দিতে হবে। এই কর পণ্য কেনার সময়েই কেটে নেবে সরকার। সর্বশেষ এই বাড়তি কর গিয়ে চাপবে ভোক্তার ঘাড়ে। দেশের ৭০ লাখ দোকানদারকে এই কর দিতে হবে। বাড়ি নির্মাণ খাতে ১০ শতাংশ হারে কর বাড়ানোয় রডের দাম বেড়ে যাবে। এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর কর বাড়ানো হয়। অনলাইনে সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানের ওপর কর বসানো হয়। এখন থেকে অনলাইনে পণ্য কিনতে বেশি কর দিতে হবে। শেয়ারের বিপরীতে পাওয়া ডিভিডেন্ডের ওপর কর হার বাড়ানোর সঙ্গে সঞ্চয়পত্রেও কর বাড়িয়েছে সরকার। মধ্যবিত্ত অনেকের সংসার চলে এই সঞ্চয়পত্র থেকে আসা অর্থের ওপর। নির্দিষ্ট আয়ের ওপর এখন অতিরিক্ত কর বসানো হলো।
টাকা আসবে কোথা থেকে?
বিশাল এ বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, সরকারি চাকুরেদের বেতনসহ কল্যাণমুখী ব্যয়ের টাকা আসবে কোথা থেকে- এমন প্রশ্নের উত্তর নেই অর্থমন্ত্রীর কাছে। তিনি শুধু কর বাড়ানো, আদায় প্রক্রিয়া সহজ ও আধুনিক করা, দুর্নীতি কমানো এবং কর ফাঁকি দূর করার কথা বলেছেন। তবে এগুলো খুব সহজ কাজ নয়। উপায় না পেয়ে সরকার কি শেষ পর্যন্ত টাকা ছাপিয়ে বাজেট অর্থায়নের পথে হাঁটবে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে প্রবলভাবে।
অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর প্রস্তাবিত বাজেটকে অতি বেশি উচ্চাভিলাষী মন্তব্য করে বলেন, টাকা আসবে কোথা থেকে, তা-ই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। অর্থনীতির বিশ্লেষক মাসরুর রিয়াজ বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যেখানে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি প্রয়োজন, সেখানে বাজেটের আকার অতিমাত্রায় বেড়ে গেলে তা মুদ্রানীতির লক্ষ্যকে ব্যাহত করতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তিনি বলেন, চরম দুরূহ অর্থনৈতিক অবস্থায় এই বাজেট প্রণীত হয়েছে; যেখানে অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল, উচ্চ মূল্যস্ফীতি সর্বগ্রাসী সমস্যা তৈরি করছে এবং প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিগুলো নিম্নমুখী।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ফেলো ও অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকার ভুল সূচকের ওপর ভিত্তি করে বাজেট করেছে। চলতি অর্থবছরের অর্থনীতির সূচকগুলো দেখলে আগামীতে প্রস্তাবিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত না। ভঙ্গুর অর্থনীতি কয়েক মাসের মধ্যে হঠাৎ করেই বদলে যাবে, ঠিক হয়ে যাবে তার সুযোগ নেই।
ব্যবসায়ী নেতা বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, গত ১০ মাসে এনবিআরের রাজস্ব দায় হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার মত। অথচ নতুন বাজেটে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের মধ্যে এনবিআরের আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ। এনবিআরের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন ছাড়া এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন প্রায় অসম্ভব। সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিলে বেসরকারি খাত মূলধন পাবে না, যা কর্মসংস্থান ও শিল্প সম্প্রসারণকে আরও বাধাগ্রস্ত করবে।
বাজেটকে ব্যবসাবান্ধব বললেও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটি বলেছে, বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় বাজেট বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং।
পথ নেই সমাধানের
বাজেটে বিনিয়োগ হলে কর্মসংস্থান হবে, এতে দেশের বাজারে অর্থপ্রবাহ বাড়বে এবং তাতে কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ওপর চাপ কিছুটা কমবে- এমন সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা করেছেন অর্থমন্ত্রী। সেজন্য শিল্পে করছাড় দেওয়ার পদক্ষেপ দেখা গেল। তবে কর্মসংস্থানের বাড়ানোর সুস্পষ্ট তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা গেল না বাজেটের কোথাও। বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনেও তা বলতে পারেননি অর্থমন্ত্রী।
যত ছাড় বড়দের
কর রেয়াত কমানোর মতো ধারা এবারও বহাল রেখেছেন অর্থমন্ত্রী। অর্থবিল ২০২৬ এ বর্তমান আয়কর আইন সংশোধনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে কর রেয়াতের বিধানে। এক্ষেত্রে বর্তমান নিয়ম হচ্ছে, করযোগ্য আয়ের ৩ শতাংশ বা অনুমোদনযোগ্য বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ বা ১০ লাখ টাকা- যেটি কম হবে, সেটি রেয়াত বা ছাড় পাবেন করদাতা। নতুন নিয়মে বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ এর জায়গায় হবে ১০ শতাংশ এবং ১০ লাখ টাকার জায়গায় হবে সাড়ে সাত লাখ।
অর্থাৎ সীমিত আয়ের মানুষ যাদের আয় কম এবং বিনিয়োগ কম তারা ১৫ শতাংশের জায়গায় ১০ শতাংশ হওয়ায় বড় ধরনের করছাড় কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়বেন। একদিকে করহার বেশি; অন্যদিকে ছাড় কম- এমন দ্বিমুখী চাপে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। অনুমোদনযোগ্য বিনিয়োগের মধ্যে সঞ্চয়পত্রও রয়েছে। থাকছে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ। দুর্নীতির এই মহোৎসবের সময়েও সরকার বেতন বাড়িয়েছে সরকারি কর্মচারীদের।
এছাড়া পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার আইপিওর মাধ্যমে হস্তান্তর হয়নি এমন তালিকাভুক্ত কোম্পানির বেলায় কর হারে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এসব কোম্পানি আয়বর্ষে সর্বপ্রকার আয় ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেনে আড়াই শতাংশ ছাড় পাবে। বর্তমানে এসব কোম্পানির জন্য করপোরেট করহার সাড়ে ২৭ শতাংশ; শর্ত পূরণ করলে এই করহার হবে ২৫ শতাংশ।
ব্যবসায়ীদের উৎসে কর কেটে রাখার পর এর বেশি কর না এলে সেটিকে ন্যূনতম কর হিসেবে দেখানোর যে বিধান ছিল, তা বাতিল করা হয়েছে। এটিকে দেখানো হবে অগ্রিম কর হিসেবে।
তৈরি পোশাকশিল্পের ন্যায় শতভাগ রপ্তানিমুখী লেদারগুডস ও ফুটওয়্যার শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং তাওয়েল, লিলেন ও হোমটেক্সটাইল শিল্প প্রতিষ্ঠানের জেনারেল বন্ডের মেয়াদ এক বছরের স্থলে তিন বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্ডেড ওয়্যারহাউসে এককালীন কাঁচামাল মজুদের সীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব মিলেছে। পাশাপাশি বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পণ্য জাহাজীকরণের মেয়াদোত্তীর্ণের অন্যূন ৪৮ ঘণ্টা পূর্বে ইউটিলাইজেশন পারমিশন বা ইউপি গ্রহণের পরিবর্তে ২৪ ঘণ্টার আগেই যেন পাওয়া যায় সেই বিধান করায় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যাদেশ পাঠানোর সময় ও বাধা খানিকটা দূর হওয়ার সুযোগ থাকবে।
শুধু ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করার আইনি বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রসারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল স্থাপনের সুবিধার্থে কাস্টমস আইনে একটি নতুন অধ্যায়সহ কতিপয় বিধান সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়।
এর মাধ্যমে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের অভ্যন্তরে রপ্তানির উদ্দেশ্যে পণ্য শুল্ককর ব্যতিরেকে আমদানি করে তা সংরক্ষণ, গ্রেডিং, প্যাকিং, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করা সম্ভব হবে। বন্ড সুবিধার আওতায় ‘সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্স’ আমদানিতে বিদ্যমান ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয় বাজেটে। এছাড়া সোলার, বৈদ্যুতিক গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃষি খাত ও সার-কীটনাশকে করছাড় মিলেছে। কিছু ক্ষেত্রে আমদানি পণ্যে কর বাড়িয়ে দেশীয় ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির নির্বাচনী এজেন্ডা
জনগণের অর্থে নির্বাচনী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে সরকার ফ্যামিলি, কৃষি, এলপিজি কার্ড চালু করেছে। এজন্য সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আগামী অর্থবছরে ব্যয় বাড়িয়েছে সরকার। সেই টাকার জোগান দিতে সরকারের ঋণ আরো বাড়বে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।