প্রতিশ্রুতি ভঙ্গে জনসমর্থন কমছে
২১ মে ২০২৬ ০৯:৫৫
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দ্রব্যমূল্যের আকাশচুম্বী ঊর্ধ্বগতি ঠেকানো ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল, ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর তিন মাস পার হলেও পরিস্থিতির উত্তরণ হয়নি। বিএনপি নির্বাচনী মেনিফেস্টোয় রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি সরকারি দলের সদস্যরা। ফলে জনগণ মনে করছে, সরকার জুলাই অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষার সঙ্গে বিদ্রোহ করছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বললেও সরকার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল করে কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে স্বাধীন বিচারালয়ের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে, বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তাছাড়া স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিশৃঙ্খলা চলছে, স্থানীয় সরকারের সব জায়গায় দলীয়করণ এবং প্রশাসনে দলীয়করণ করা হচ্ছে, অনুগত কর্মকর্তারাই পাচ্ছে লোভনীয় সব পদ। গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হওয়ার পরও জুলাই সনদ বাস্তাবায়নে সরকার পদক্ষেপ নেয়নি অথচ মুখে বলছে অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সরকারের কার্যক্রমের মিল না থাকায় তিন মাসেই জনপ্রিয়তা হারাতে বসেছে সরকার।
গণভোট নিয়ে সরকারের ইউটার্ন
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটসহ দেশের বিদ্যমান অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই চেয়েছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় থেকে গণভোট আয়োজন করবে এবং ভোটের রায় বাস্তবায়ন করবে। সে কারণে আন্দোলন করে জামায়াতে ইসলামী ও তার মিত্ররা অন্তত জাতীয় নির্বাচনের ১৫ দিন আগে গণভোট আয়োজনের দাবিতে সোচ্চার হন। কিন্তু বিএনপির বিরোধিতা ও সরকারের সদিচ্ছার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। ফলে জাতীয় নির্বাচনের দিনেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হওয়ার পরই সরকার ভোটের রায় অনুযায়ী পদক্ষেপ না নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। অথচ ভোটের আগে বিএনপি বিরোধিতা করেনি, দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও ভোটের প্রচারণার সময় গণভোটে হ্যাঁর পক্ষে ভোট চেয়েছেন, কিন্তু এখন গণভোটের রায় অনুযায়ী চলছে না তার সরকার।
জুলাই সনদ নিয়ে দ্বিচারিতা
গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হওয়ার পরই সামনে আসে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি। কেননা গণভোট আয়োজন করাই হয়েছিল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পক্ষে জনগণ আছে কিনা, তা নিশ্চিত হতে জনগণ ভোট দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চাচ্ছে। কিন্তু সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিচ্ছে না। অথচ সরকারপ্রধান সবসময়ই বলে যাচ্ছেন, তারা জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর বাস্তবায়ন করবেন। কিন্তু জনগণ সরকারের এ ধরনের বক্তব্যে আস্থা রাখতে পারছেন না।
সংবিধান সংস্কার পরিষদে সরকারের না
জুলাই সনদ ও গণভোট অনুযায়ী কথা ছিল জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ দুটি শপথ নেবেন- একটি শপথ হবে জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে; আরেকটি হবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর বিএনপি ও তার মিত্ররা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। শুরুতেই তারা ভোটারদের বিশ্বাস ভাঙে। ফলে সংবিধান সংস্কার করার যে আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল জুলাইযোদ্ধাদের মধ্যে সেই আকাক্সক্ষার সঙ্গে বিএনপি একমত পোষণ করলো না। বরং বিপরীতমুখী অবস্থান নিল।
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় ধীরগতিতে অসন্তোষ
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরসহ প্রসিকিউশনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এটর্নি জেনারেলের কার্যালয়েও আনা হয়েছে বেশকিছু পরিবর্তন। ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিচারকাজ যে গতিতে এগিয়েছিল, সেই গতি এখন আর নেই। বিচার নিয়ে ইতোমধ্যে জুলাই শহীদ পরিবারগুলো ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে
নিত্যপণ্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার প্রতিশ্রুতি ছিল বিএনপির, কিন্তু দলটি ক্ষমতায় আসার পর অনেক পণ্যেরই মূল্য বেড়েছে। বিশেষ করে জ¦ালানি খাতে তৈরি করা হয়েছে চরম অস্থিরতা। ইরান যুদ্ধের কথা বলে ব্যবসায়ীরা তেল ও পেট্রোল অবৈধভাবে মজুদ করে রেখে জনগণকে কষ্ট দিয়েছে, দাম বৃদ্ধির জন্য সংকট তৈরি করেছেন। কিন্তু সরকার এই সিন্ডিকেট ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে কেরোসিন, ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের মূল্য বাড়িয়েছে। আর মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। পেট্রোলপাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন আর দেখা যাচ্ছে না, তেলে কোনো সংকটও থাকলো না। কারসাজি করে জনগণের কাছ থেকে লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়তি নেওয়া হচ্ছে। আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি এলপিজি সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে। শুধু এপ্রিল মাসেই দুই দফায় ৫৯৯ টাকা বাড়ানো হয়েছে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারে, যা অতীতের কোনো সরকার করেনি। এখন আবার ১ জুন থেকে বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুতের মূল্য। অর্থাৎ জনগণ ইতোমধ্যেই অতিষ্ঠ।
অর্থনীতিকে শক্তভাবে দাঁড় করানোর উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ
অর্থনৈতিক সংস্কারেও সরকার ভালো ভূমিকা নিতে পারেনি। প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ গভর্নরকে সরিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যকে বাংলাদেশের ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। যিনি একজন ব্যবসায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক দূরে থাক, অন্য কোনো ব্যাংকে কাজ করার ন্যূনতম অভিজ্ঞতাও নেই তার। তাকে নিয়োগ দেওয়ার পর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনা হয়, জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে বিতর্ক হয়, ব্যাংক বিটের সাংবাদিকরাও তীব্র সমালোচনা করেন, কিন্তু সরকার তাকে স্বপদেই বহাল রাখেন। তাছাড়া ঋণখেলাপি কমানো থেকে শুরু করে অর্থনীতির কার্যকর কোনো সংস্কারে হাত দিতে পারেনি সরকার।
দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, উন্নতি নেই
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর থাকার দাবি করলে দেশে বন্ধ হয়নি খুন-খারাবি। তুচ্ছ ঘটনায় এখনো ঘটছে প্রাণহানি। অনেক রাজনীতিক বক্তৃতায় বলছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নাগরিকদের জীবন ও সম্পদ নিরাপদ রাখা, কিন্তু তিনি মন্ত্রণালয়ে সময় কম দিয়ে অন্যান্য পলিসি লেভেলে বেশি সময় দেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকছে না।
মব কালচার বন্ধ হয়নি, বরং বাড়ছে
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কোথাও বিক্ষুব্ধ জনতা মারমুখী ভূমিকা পালন করলে বিএনপির নেতাকর্মীরাই মব মব বলে মঞ্চে জোরালো বক্তৃতা দিতেন। কিন্তু এখন বিএনপি ক্ষমতায় এসেছেন। এখনো প্রকাশ্যে মাজারের খালেদমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা বন্ধ করা যাচ্ছে না। বাবার কাছ থেকে প্রকাশ্যে দিবালোকে মেয়েকে ফিল্মিস্টাইলে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সমাজে কোনো অসঙ্গতি দেখলে আইনের হাতে তুলে না দিয়ে নিজেরাই শাস্তি নির্ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল করে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েই চলছে। এসব কেউ বন্ধ করতে আসছে না, বন্ধ হচ্ছে না। ফলে মানুষ এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিশৃঙ্খলা
শিক্ষামন্ত্রীর অতিকথনে ইতোমধ্যে তিনি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে হাসির খোরাক হয়েছেন। সর্বোচ্চ পর্যায়ে ট্রলের শিকারও হয়েছেন তিনি। অংশীজনের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই তিনি একেক সময় একেক কথা বলছেন, নিজের সহাকারী একান্ত সচিবকে এই পদ ছাড়াও আরও গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পদে দায়িত্ব দিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন, সমালোচনার মুখে পড়ে তার এপিএসকে অতিরিক্ত পদ থেকে সরাতেও বাধ্য হয়েছেন। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময় নিয়েও তিনি একেক সময় একেক কথা বলছেন, তৈলমর্দন করতে গিয়ে তিনি প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জাইমা রহমানের সঙ্গে রাজনীতি করার উৎসাহ দিয়ে সমালোচিত হয়েছেন। অথচ শিক্ষা করিকুলাম তৈরি থেকে শুরু করে শিক্ষায় আমূল সংস্কারের কোনো উদ্যোগই তিনি নেননি। অন্যদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীও দায়িত্ব দেওয়ার পর অনেক লম্বা লম্বা লেকচার দিয়েছেন, কিন্তু হাম মোকাবিলায় তিনি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। দায়িত্বে থাকাকালে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে না পারলেও তিনি দুষছেন আগের সরকারকে।
স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে শতভাগ দলীয়করণে তীব্র সমালোচনা
দেশের সব সিটি করপোরেশনে দলীয় লোক বসিয়েছে সরকার। অথচ জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই চেয়েছিল জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হয়ে যাক। এজন্য দলগুলো আন্দোলনও করেছিল। আন্দোলনকারী দলগুলোর ভাষ্য ছিল- দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হওয়ার অনেকটাই অস্বাভাবিক। তাই তারা সত্যিকারার্থে জনগণের ভোটে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার পক্ষে আন্দোলনে ছিলেন। কিন্তু বিএনপি এর তীব্র বিরোধিতা করেছিল, ফলে সেই সময় নির্বাচন হয়নি, কিন্তু নির্বাচিত সরকার আসার পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএপির ফেল করা প্রার্থীদের সব সিটি করপোরেশনে বসিয়ে দিয়েছে, যা জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, জনগণ সেসব ব্যক্তিকে ভোটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যন করেছেন সেসব ব্যক্তি জনগণের ঘারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদলগুলো সরকারের এই প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করলেও সরকার তা আমলে নেয়নি।
ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড
বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল তারা ক্ষমতায় গেলে ঘরে ঘরে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড দেবে। ক্ষমতায় আসার পর দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন সমাবেশে বলছেন, তারা আরও অনেক কার্ড দেবেন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, এলপিজি কার্ড দেবেন। সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ড দেওয়া শুরু করেছে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে কিছু পরিবারকে এই কার্ড দিয়েছে। কিন্তু সাধারণ জনগণ এই কার্ডনির্ভর জীবনযাপন করতে চান না। কারণ সরকারের পক্ষ থেকে সব দরিদ্র পরিবারকে কার্ড দেওয়া সম্ভব নয়, এতো টাকা সরকারের কাছে নেই। সরকারই চলছে ঋণ করে। অন্যদিকে একটি পরিবারে যে পরিমাণে টাকা দরকার কার্ডে তার ১০ ভাগের একভাগও জোগান হচ্ছে না। ফলে জনগণ কার্ডনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসার কথা বলেছেন।
খালকাটা কর্মসূচি
সরকারের আরও একটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে খালকাটা কর্মসূচি। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশজুড়ে খালকাটা কর্মসূচি করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তারপুত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খালকাটা কর্মসূচি চালু করেছেন। তিনি নিজেই কোদাল হাতে নিয়ে এসব কার্যক্রম উদ্বোধন করছেন। কিন্তু যেসব স্থানে তিনি কর্মসূচি পালন করছেন, সেসব স্থানে ওই সব খাল আসলে কাটার নানা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে। সেখানে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে আদৌ সেসব স্থানে কাটাকাটির দরকার আছে কিনা? ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোয় বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। মানচিত্রে ঢাকাসহ যেসব শহরগুলোয় যেখানে যেখানে খাল ছিল এখন দখল হয়ে গিয়েছে, জনগণ চাচ্ছে সরকার দখল উদ্ধার করে সেসব খাল ঝিলের নাব্য ফিরিয়ে দিক। এতে একদিকে নৌপথ তৈরি হবে এবং পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারলে জলাবদ্ধতা নিরসন হবে।
রাজধানীর ট্রাফিক ও জনদুর্ভোগ কমাতে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনা
রাজধানীর ট্রাফিক জ্যাম এক সপ্তাহের মধ্যে নিরসনের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারের দায়িত্ব দেওয়ার পরপরই তিনি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বৈঠক করে এমন নির্দেশনা দিয়েছেন। তার ওই নির্দেশনা দেওয়ার পর প্রায় তিন মাস চলে গেছে, ঢাকার ট্রাফিকের অবস্থা রয়েছে আগের মতোই। বন্ধ হয়নি উল্টোপথে চলা ও অবৈধ পার্কিং, কমেনি যানজটও।
কিছু এলাকায় চাঁদাবাজি ও দখলবিরোধী অভিযান
চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধে সরকার আন্তরিক থাকলেও পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। দেশের প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্থানে চাঁদাবাজি হচ্ছে। চাঁদা না দেওয়া দোকানিকে দোকান থেকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, হামলা চালিয়ে রক্তাক্ত করা হচ্ছে, ঘটানো হচ্ছে প্রাণহানিও। সরকার চাইলেও এই দলীয় লোকদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ফলে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ
সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নিলেও তাতে সফল হতে পারেনি। প্রশাসনে এখনো ফ্যাসিবাদের ভূত রয়ে গেছে। টাকার বিনিময়ে চলছে নিয়োগ বদলি ও পদায়ন। স্ট্যাম্পে চুক্তি করে ঘুষ নিয়ে বদলি ও পদায়ন করার খবরও বের হচ্ছে। এমন একাধিক ঘটনার তদন্তও হচ্ছে। তাছাড়া সরকাররের বিরুদ্ধে দলীয়করণের অভিযোগ তো আছেই। ফলে কখন প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বিশিষ্ট ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জন, লেখক ও মিডিয়াব্যক্তিত্ব ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ মনে করেন, সরকারের পক্ষে কথা বলার মতো কোনো অর্জন এখনো সামনে আসেনি। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি নিজেকে বিএনপির সমর্থক উল্লেখ করে বলেন, বিএনপি সরকারের পক্ষে বলতে চাই কিন্তু বলার মতো কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না।
সরকারের তিন মাস পূর্তি উপলক্ষে গত ১৯ মে মঙ্গলবার সচিবালয়ে ব্রিফিং করেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। এ সময় তিনি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। মন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছরে পাঁচ লাখ শূন্য পদে জনবল নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাব নিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে জ্বালানি সংকট সফলভাবে উত্তরণ এবং ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, জ্বালানি সরবরাহে শৃঙ্খলা আনতে ইতোমধ্যে ফুয়েল কার্ড চালু করা হয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে মোট ৩ লাখ ৮৭ হাজার ২১১টি যানবাহন ফুয়েল পাস সিস্টেমে নিবন্ধিত হয়েছে। সারা দেশে মোট ২২৩টি ফিলিং স্টেশন এ কার্যক্রমের আওতায় এসেছে।’ সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ (১০ হাজার মেগাওয়াট) নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। শিক্ষা খাতে চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৫২ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি বরাদ্দ আসছে বলে জানান তিনি। তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষা খাতে জিডিপির পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে ২০ হাজার ৮৩৫ দশমিক ৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’ তিনি জানান, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ‘লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন (লেইস)’ প্রকল্পের আওতায় ছয় হাজার ৯২৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও তিন হাজার ৪১২টি মাদরাসাসহ মোট ১০ হাজার ৩৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০ হাজার ৬৮০টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। দেশের ১৫টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্রি ওয়াইফাই সেবা চালু করা হয়েছে এবং ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্লোবাল লাইব্রেরি কার্যক্রম চলছে, জানান তিনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের সাফল্য জানাতে ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হলেও বাস্তবিক অর্থে তেমন কোনো সাফল্য জানাতে পারেননি মন্ত্রী, তিনি সরকারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনাগুলোই তুলে ধরেছেন মাত্র।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মনে করেন, সরকার নির্বাচনের আগে জনগণের সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে। সরকারের তিন মাসের মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকার জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন থেকে দূরে সরে গেছে। গণভোটের রায় অনুযায়ী নির্বাচনের এক মাসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ হওয়ার কথা, কিন্তু সরকারি দলের সদস্যরা শপথ নেননি। জুলাই অভুত্থ্যানের আকাক্সক্ষা ছিল রাষ্ট্র যাতে নতুন করে ফ্যাসিবাদের দিকে যেতে না পারে, সেজন্য সংবিধান সংস্কার করা হবে। জনগণও গণভোটে হ্যাঁ এরপক্ষে রায় দিয়ে সংস্কারের পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন, কিন্তু খুবই দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক যে সরকারের ভূমিকা দেখে মনে হচ্ছে পুরোনো একদলীয় ও স্বৈরশাসনের পথেই হাঁটছে বিএনপি সরকার।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সরকার স্বৈরাচারী কায়দায় দেশের সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকারের সব গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় লোক বসিয়ে দিয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিককার কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসি থেকে শুরু করে স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দলীয়করণে করেছে, যা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে সরকার অনেকগুলোই বাতিল করে দিয়েছে। বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করার কথা বিএনপি তাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টে তে ধারণ করলেও তারা ক্ষমতার চেয়ারে বসেই ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ অধ্যাদেশ বাতিল করেছেন। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের তীব্র বিরোধিতার পরও সেটি বাহাল রাখেনি সরকার। ফলে মানুষ সরকারের মনোভাব কোন দিকে, তা বুঝতে বাকি নেই।
জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের ভূমিকায় থাকা জামায়াতে ইসলামীর এই শীর্ষ নেতা আরও বলেন, হামের টিকার অভাবে প্রতিদিনই কোমলমতি শিশুরা মৃত্যুবরণ করছে। সরকারের ব্যর্থতার কারণেই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
কয়েকদিন আগে জ্বালানি খাতে তীব্র সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। যেসব জ্বালানি আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই, ইরান যুদ্ধের অযুহাতে সেসব জ্বালানির সংকট তৈরি করা হয়েছে। জনগণকে ভোগান্তির মধ্যে রেখে হঠাৎ মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মূল্য বাড়ানোর পর সংকটও হাওয়া হয়ে গেছে। ফলে জনগণের বুঝতে বাকি নেই যে, কিছু লোককে লাভবান করার জন্য এই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছিল।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, দ্রব্যূমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সরকার শতভাগ ব্যর্থ হয়েছে। প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনী পণ্যমূল্য বেড়ে গেছে। সাধারণ মানুষ এজন্য ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও খুবই খারাপ, প্রতিদিনই ভয়াবহ খুন হচ্ছে- গলাকেটে হত্যা করা হচ্ছে নাগরিকদের। সরকারের দায়িত্বশীলরা এদিকে নজর না দিয়ে রা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ ও দলীয় লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর কাজে এটেনশন বেশি দিচ্ছেন। গত তিন মাসে সরকার যা করেছে, তাতে ভালো কিছু দেখা যায়নি- ভালোর চেয়ে খারাপ দিকই বেশি ছিল। জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম এই নীতিনির্ধারক বলেন, আমরা আশা করেছিলাম- ঐক্যবদ্ধ থেকেই দেশের সমস্যাগুলো সমাধান করবো, কিন্তু সরকার সেই সুযোগ রাখেনি, তারা এককভাবে হাঁটছে।
এছাড়া সরকারের তিন মাস নিয়ে মূল্যায়ন জানতে সরকারের বিদ্যুৎ জ¦ালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সংস্কৃতি বিষয়কমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব, সংসদ সদস্য আখতার হোসেনসহ বিভিন্ন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কথা বলা যায়নি।