রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক জনগণের টাকা লুটের মাধ্যম
২১ মে ২০২৬ ১০:৩৮
॥ মাহবুবুল হক ॥
পাকিস্তান সৃষ্টির প্রায় ১ বছর পর আমার জন্ম। বয়স খুব বেশি একটা হয়নি। সুতরাং পাকিস্তান আমলে ব্যাংক ডাকাতি, ব্যাংক লুট হয়েছে কিনা- আমার স্মরণে আসছে না। আমার মুরুব্বিজন অর্থাৎ আমার থেকে যারা ১০-১৫ বছরের বড়, তারা হয়তো বলতে পারবেন। আমার এই ক্ষুদ্র লেখা সেই সৌভাগ্যবানদের চোখে পড়লে এ বিষয়ে তাদের কারো কাছে যদি কোনো তথ্য থাকে, তারা যদি একটু উদ্যোগ নিয়ে প্রকাশ করেন, তাহলে ভালো হয়।
তবে বাংলাদেশ আমলের শুরু থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক ডাকাতির সূচনা ঘটে। যারা এ ঘটনার ক্যাটালিস্ট ছিলেন, তারা যেকোনো কাজ করতেই বড় বড় সূত্র ধরে করতেন। যেমন ব্যাংক যদি ডাকাতি করতেই হয়, তাহলে ছোট ব্যাংক থেকে শুরু করবো কেন? করতেই যদি হয়, তবে সবচেয়ে বড় ব্যাংক থেকে করা উচিত। রিস্ক যখন নিতেই হবে, তখন রিস্কই নেয়া উচিত। সেভাবেই মনে হয় বাংলাদেশ ব্যাংক মহাসমারোহে লুট করা হয়েছিল। তবে তার মানে এই নয়, ছোট ছোট ব্যাংকে লুটপাট বা ডাকাতি সংঘটিত হয়নি। কিন্তু পাকিস্তান আমল থেকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকে যে ঘুষ প্রচলিত ছিল, তা সর্বজনবিদিত। কারণ দেখা গেছে, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তুলনায় পাকিস্তানি আমলে ব্যাংক পরিচালক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শান-শওকত বেশি ছিল। তাদের জমিজমা, বাড়িঘর, গাড়ি-ঘোড়া অনেকটা দ্রুততার সাথে হয়ে যেত।
বাংলাদেশকালে যখন দেখা গেল সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির বিকাশ সম্প্রসারিত হয়েছে, তখন স্থান-কাল-পাত্র ভেদে রাজনীতিক অঙ্গনের মান্যবররা একটা সূক্ষ্ম চিন্তা করলেন- ছোট ছোট দুর্নীতি করে তাড়াতাড়ি সম্পদশালী হওয়া যাবে না, তখন তারা সূক্ষ্ম বিবেচনায় আসলেন। সেটা হলো পাবলিকের টাকা মাটির নিচ থেকে, বিছানার নিচ থেকে, তোষক ও বালিশের ভেতর থেকে কত টাকা আর অর্জন করা যায়। সেই অর্থ দিয়ে তো ধানমন্ডি, গুলশান, বনানীতে বাড়ি করা যাবে না এবং বিদেশে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার জন্য পাঠানো যাবে না। অথবা শিল্পপতি বা এমপি হওয়া যাবে না। বলতে গেলে এ রাজনৈতিক মান্যবরদের চাপেই বাংলাদেশে বহু ব্যাংকের জন্ম। সরকারি ব্যাংকগুলো দিয়েই যখন অর্থনীতিক কর্মকাণ্ড সম্পন্ন হওয়ার বন্দোবস্ত ছিল, তখন ধীরে ধীরে কত ধরনের ব্যাংক সৃষ্টি হয়ে গেল। পাঠকের সুবিধার্থে এখানে একটি মোটামুটি তালিকা আমরা পেশ করছি। সেখান থেকেই পাঠক অনুমান করতে পারবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের বাজার অল্প সময়ের মধ্যে কতটা ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত (তফসিলি) ব্যাংকের মোট সংখ্যা ৬১টি। এর মধ্যে সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক ১০টি, বেসরকারি ব্যাংক ৪২টি এবং বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ৯টি। এছাড়া ৫টি অ-তফসিলি ব্যাংক রয়েছে।
১. রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক (৬টি) : সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল)। বিশেষায়িত ব্যাংক (৪টি) : বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এবং কর্মসংস্থান ব্যাংক।
২. বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক (৪২টি) : প্রথাগত ব্যাংক : ব্র্যাক ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, দ্য সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ইত্যাদি।
শরীয়াহভিত্তিক (ওংষধসরপ) ব্যাংক : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ইত্যাদি।
৩. বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক (৯টি) : স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, এইচএসবিসি (ঐঝইঈ), সিটি ব্যাংক এনএ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, ব্যাংক আল-ফালাহ এবং উরি ব্যাংক।
৪. ডিজিটাল ব্যাংক (১টি) নগদ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি।
৫. অ-তফসিলি ব্যাংক (৫টি) : আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, গ্রামীণ ব্যাংক ও জুবিলী ব্যাংক।
এছাড়া অন্যান্য ব্যাংকও রয়েছে। এ বিষয়ে যদি মন্তব্য করা যায়, তাহলে বলতে হবে ব্যাঙের ছাতার মতো বাংলাদেশে আর্থিক ব্যাংক গজিয়ে উঠেছে। নামের মধ্যে শ্রেণিবিভক্তি থাকলেও মূল কাজ ছিল অন্য কিছু। সরকারি ব্যাংক, বিদেশি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ছাড়া অন্যগুলো প্রায় একই নিয়তে সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে ব্যক্তি ভারী হয়েছে, পরিবার ভারী হয়েছে, দল বা গোষ্ঠী ভারী হয়েছে, কিছু শিক্ষিত বেকারের চাকরি হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে গরিব ও মধ্যবিত্তদের।
শুরুতে সেক্যুলার ব্যাংকগুলো সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে সুদের হার বিদেশের তুলনায় ভালোই দিত। ৮০-এর দশকে সুদবিহীন ইসলামী ব্যাংকের উত্থান ঘটায় দেশময় একটা বিপ্লব সৃষ্টি হয়ে গেল। দেশে অন্তত ৫০ ভাগ মানুষ যারা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত এবং তাদের মধ্যে যারা শরীয়াপন্থী, তাদের কিছুটা সামর্থ্য থাকলেও ব্যাংকিংজগতে তাদের উপস্থিতি ছিল শূন্যের কোটায়। তারা বিভিন্নভাবে অর্থ সংরক্ষণ করতো এবং এ কারণে তাদের অনেক রিস্ক বহন করতে হতো। মাঝে মাঝে অর্থ-সম্পদ লোপাট হয়ে যেত। ইসলামী ব্যাংকের উত্থান ঘটায় এসব মানুষ ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থার সাথে অনেকটা জড়িয়ে পড়লো। ধীরে ধীরে একটার পর একটা ইসলামী ব্যাংকের জন্ম হলো। সারা দেশে তাদের শাখা বৃদ্ধি পেল। পরবর্তীতে সঞ্চয়কারীরা কিছুটা লাভবান হলেও একের পর এক ছোট ছোট বেসরকারি ব্যাংক লুটিয়ে পড়তে লাগলো। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের একদিকে যেমন রিস্ক বেড়ে গেল, অন্যদিকে লাভ ও সুদ ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেল। সাধারণ সঞ্চয়ীরা ৯০ দশক থেকে শুরু করে এ যাবত শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হতেই থাকলো।
সুতরাং আমরা যে কথাটি বলতে চাচ্ছি, আজ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যে ধস নেমেছে, তা কিন্তু এক লাফে হয়নি। দুর্নীতির চর্চা এ দেশে যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই একই হারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অবনতি হয়ে গেছে। এ বিষয়ে গত ৫৪ বছর যাবত যে সরকারই এসেছে, তারা যে শুধু অবজ্ঞা ও অবহেলা করেছে তাই নয়, বিলক্ষণ দেখা গেছে, আমাদের দেশে হাতেগোনা কয়েকজন অর্থনীতিবিদের ও আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক যখন বলছে, এ দেশে আর ব্যাংকের সৃষ্টি বা জন্মের কোনো প্রয়োজন নেই, নতুন ব্যাংক সৃষ্টি হলে অর্থনীতিক ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, তখনো আমাদের সরকারগুলো ব্যাংক লুটপাটে সহযোগিতা করার জন্য দারুণভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। নতুন নতুন আইন ও বিধিব্যবস্থা তৈরি করেছে। ব্যাংকগুলোয় দলীয় পরিচালক বসিয়েছে। শুধু একটি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ব্যাংকের সম্পদ যেন চলে যায়, সে ব্যবস্থাও বারবার তৈরি করা হয়েছে। নাম বলা ঠিক হবে না। দেশবাসী দেখলো যে দরদি ব্যাংকার বেসরকারি ব্যাংকের প্রথম উদ্যোক্তা ছিলেন, তার সম্পদ ও বৈভব প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বাড়েনি। কিন্তু যাদের নিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক সৃষ্টি করলেন, তাদের সম্পদ ও বৈভব বছরে বছরে আকাশচুম্বী হতে লাগলো। অন্যায়ভাবে ব্যক্তির সমৃদ্ধি হলেও সাধারণ মানুষের জীবন ও জগৎ নিম্নগতিসম্পন্ন হলো। মধ্যবিত্ত আশা করেছিল উচ্চমধ্যবিত্ত হবে, হয়ে গেল নিম্নমধ্যবিত্ত। নিম্নমধ্যবিত্ত আশা করেছিল মধ্যবিত্ত হবে, কিন্তু হয়ে গেল দরিদ্র।
ভারতের মতো ‘দরিদ্র হটাও বলে’ কেউ এদেশে উচ্চকণ্ঠ না হলেও দারিদ্র্য নির্মূল, দারিদ্র্য অপনোদন, দারিদ্র্য দূরীকরণ বা দারিদ্র্যকে জিরো পয়েন্টে নিয়ে আশা বিভিন্ন দল বিভিন্নভাবে বলেছে। কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি। বরং দরিদ্র মানুষ হতদরিদ্র হয়ে গেছে। যে পরিবারটি গ্রামে শুয়ে-বসে কাজকর্ম করে যাপিত জীবন অতিবাহিত করতো, তাকে জোত-জমা বিক্রি করে রাতের অন্ধকারে শহরে বা নগরে বিশৃঙ্খলভাবে বেঁচে থাকার লড়াই করতে হচ্ছে। সে হয়তো গ্রামে বসে বিভিন্ন ব্যাংকের স্লোগান শুনে, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে এবং চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ প্রদান করে নিজেদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে ফেলেছে। বলা হয়ে থাকে একসময় আফগানিরা আমাদের দেশে ব্যক্তিগতভাবে ঋণ প্রদান করতো। সময়ের ব্যবধানে তারা বলতো, ‘ম্যায় তো আসলি নাহি মাংতা হ্যায়, ম্যাংতা হ্যায় থোড়া সুদ, ওহি দে দে।’ এ সুদ ব্যবসায়ী আফগানিদের কারণেও অনেক হতদরিদ্র মানুষ গ্রাম থেকে নির্মূল হয়ে শহর বা নগরের বস্তিবাসী হয়েছিল। সেই একই দৃষ্টান্ত বহু বছর পর পুনরায় দৃষ্টিগোচর হলো গ্রামীণ ব্যাংকসহ শত শত এনজিও ও কিস্তি ব্যাংকের মাধ্যমে। ঠিক এ জায়গাটায় দেখা গেল মূর্খ ও অশিক্ষিত মানুষ তাদের মূল্যবোধ অনেকটাই হারিয়ে ফেললো। একদিকে যেমন কিছু মানুষ সুদী ব্যবসা ও সুদী ব্যাংকিং ছেড়ে ইসলামী ব্যাংকের দিকে ধাবিত হলো; অন্যদিকে আরেক শ্রেণির মানুষ সুদী ব্যাংক ও ব্যবসায় নিমজ্জিত হয়ে গেল। পল্লীগাঁয়ে যখন নানারকম ব্যাংকিং ছিল না, তখন মানুষ অতটা সুদী ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল না। অল্প কিছুসংখ্যক বিভিন্ন ধর্মের মানুষ সুদী ব্যবসা করতো। গ্রামবাসী বিপদে-আপদে তাদের দ্বারা উপকৃত হলেও তারা ছিল সমাজের নিন্দিত ব্যক্তি। তাদের নাম ছিল সুদী মহাজন। তাদের উচ্চহারে সুদ ও চক্রবৃদ্ধির কারণে অসংখ্য দরিদ্র মানুষ গ্রামছাড়া হয়। ভিটেমাটিছাড়া হয়। ছেড়ে আসা ভিটেমাটিতে পুনরায় ফিরে যাবার আর কোনো ব্যবস্থা হয় না।
ব্যাংক নিয়ে এই যে তেলেসমাতি শুরু হলো স্বাধীনতার পর থেকে, তা ধীরে ধীরে মহীরুহ হয়ে উঠলো। কারণ যারা ব্যাংক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিল, তাদের বিচার ও শাস্তি হলো না। যা হলো তার সবটাই লোকদেখানো। আজ পর্যন্ত নানা বাঁক ঘুরেও আমরা দৃষ্টান্তমূলক একটি বিচার ও শাস্তি দেখতে পারলাম না। সাধারণ মানুষ এখন জানে না, ব্যাংকের টাকা লুট করলে ফেরত দিতে হয় কিনা বা জেল-জরিমানা হয় কিনা? কিছু ছোট-খাটো মামলা-মোকদ্দমা জনগণ হয়তো দেখে, সেখানে জেল-জরিমানার কথা তারা হয়তো কিছুটা জানতে পারে। কিন্তু যে পরিমাণ অর্থ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্যায়ভাবে ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নেয়, সেই অর্থ ব্যাংক ফিরে পায় কিনাÑ জনগণ জানে না। জনগণ শুধু জানতে পারে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, ব্যবসায়ী মহল, শিল্পপতি মহল অন্যায়ভাবে কী পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে এসেছে।
দেশবাসী জানে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ড. আতিয়ার রহমানের সময় ডিজিটাল চৌর্যবৃত্তির মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাওয়া হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশ বা বিভিন্ন দেশে ডিজিটাল আর্থিক জালিয়াতরা এই বিশাল অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। তথ্যাভিজ্ঞমহল পরিষ্কারভাবে সবকিছু জানে, মামলা-মোকদ্দমার এ যাবত কোনো অগ্রগতি বলে আমরা জানি না। ২০১৭ সালে সরকারের বিভিন্ন দফতরের সহযোগিতায় একজন এস আলম শুধু ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন (এটাও সত্য কিনা জানি না)। অন্যান্য ইসলামী ব্যাংক থেকে আরো কয়েক হাজার কোটি টাকা তিনি সরিয়েছেন। তার মোট অংক অনেকবার অনেকভাবে এসেছে। সেসবের ওপরও জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস একেবারে নেই। এখন শোনা যাচ্ছে, তাকে আবার বাংলাদেশ ব্যাংকিংজগতে পুনর্বাসিত করা হবে। অথচ মাঝে একবার জানা গিয়েছিল, তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ তিনি এখন আর বাংলাদেশের নাগরিক নন। আবার নানারকম তথ্য আছে যে, দেশের প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের দিকপাল ও বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য তার আর্থিক সাম্রাজ্যের কেউকেটা ছিলেন এবং এখন আছেন। তাকে সামলাবার জন্য শুধু দেশের মানুষ নয়, পার্শ্ববর্তী দেশের মানুষও ডিপস্টেটের মহাজনরা ছাতা মেলে দাঁড়িয়ে আছেন। সুতরাং ঋণের বা পাচারের ১০% জমা দিয়ে আইনত তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে পুনরায় সংশ্লিষ্ট হতে পারবেন।
সম্প্রতি রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত দেশের ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয় : প্রেক্ষিত ইসলামী ব্যাংকিং সেক্টর : জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ও উত্তরণের পথ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে অর্থ লুটপাটের জড়িতদের পুনর্বাসন নয়, বরং দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, সুশাসনের অভাব ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতার কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত গভীর সংকটে পড়েছে। এ সংকট থেকে উত্তরণে কঠোর সংস্কার, জবাবদিহি এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের একান্ত দাবি। সেমিনারে আলোচনার ভিত্তিতে ১১ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ১. ব্যাংক লুট ও অনিয়মে দ্রুত বিচারের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন। ২. বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন। ৩. ২০১৭ সালের পর দখল হওয়া ব্যাংকের মালিকানা পূর্ববর্তী মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া। ৪. খারাপ ঋণ ব্যবস্থাপনায় পৃথক এসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন। ৫. রাজনীতি হস্তক্ষেপমুক্ত পরিচালনা বোর্ড নিশ্চিত করা। ৬. মেধাভিত্তিক নিয়োগ চালু। ৭. বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীন অডিট ও নজরদারি জোরদার। ৮. ইসলামী ব্যাংকের পরিচালকদের জন্য শরীয়া জ্ঞান বাধ্যতামূলক করা। ৯. ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। ১০. গ্রাহকের স্বার্থরক্ষা এবং আস্থা পুনরুদ্ধারে দ্রুত সংস্কারের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।
‘ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’ এ উল্লেখযোগ্য সেমিনারের আয়োজন করে। ফোরামের আহ্বায়ক এফবিসিসিআই-এর সাবেক প্রেসিডেন্ট বলেন, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন ব্যাংক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং ইসলামী ব্যাংকিং আইন দ্রুত পাস করতে হবে। তিনি আরও বলেন, গত ৩ মাসে প্রায় ৩০০ শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সেমিনারের প্রধান অতিথি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ব্যাংক রেজ্যুলেশন এ্যাক্টের ১৮ (ক) ধারার কোনো অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা নেই। এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আমরা দৃঢ়তার সাথে এসবের বাস্তবায়ন দাবি করছি।