সম্পাদকীয়

ঈদ মোবারক


২১ মে ২০২৬ ১০:৩২

ঈদ মোবারক। আমাদের সম্মানিত পাঠক, গ্রাহক, বিজ্ঞাপনদাতা, সাংবাদিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই ঈদুল আজহার আন্তরিক শুভেচ্ছা। ‘তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম’ ‘আল্লাহ তাঢালা আমাদের ও আপনার নেক আমল তথা ভালো কাজগুলো কবুল করুন’। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহিম (আ.), মা হযরত হাজেরা (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র ঈদুল আজহা প্রতি বছরের মতো এসেছে আমাদের আত্মত্যাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের খুশির বার্তা নিয়ে। ঈদুল আজহায় আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমরা পশু কুরবানি করি। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘আমি প্রতিটি উম্মতের (জাতির) জন্য (কুরবানির) নিয়ম করে দিয়েছি। তাদের চতুষ্পদ জন্তু হতে যে রিজিক দেয়া হয়েছে, সেগুলোর ওপর তারা যেন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। কারণ তোমাদের উপাস্য একমাত্র আল্লাহ, কাজেই তাঁর কাছেই আত্মসমর্পণ কর আর সুসংবাদ দাও সেই বিনীতদেরÑ আল্লাহ নামের উল্লেখ হলেই যাদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে, যারা তাদের বিপদে ধৈর্যধারণ করে, নামাজ কায়েম করে, আর তাদের আমি যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে।’ (সূরা হজ : ৩৪-৩৫)। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মানবজাতির আদি পিতা হজরত আদম (আ.) থেকে নিয়ে প্রত্যেক নবী ও রাসূলের উম্মতরাই বিধান পালন করেছেন। তবে আমরা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতরা কুরবানির বিধান পালন করি মহান আল্লাহর নিদের্শে হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর ত্যাগের উদাহরণকে স্মরণ করে।
আমরা জানি, আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে নিজের পুত্রের গলায় ছুরি চালিয়ে হযরত ইবরাহিম (আ.) এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। আল্লাহ তাঁকে খলিল অর্থাৎ বন্ধু সম্বোধন করে বিশেষ মর্যাদাদানে ধন্য করেছেন। মুসলমানরা ছাড়াও আহলে কিতাব দাবিদার ইহুদি, খ্রিস্টানরা হযরত ইবরাহিম (আ.)-কে তাঁদের উত্তম পূর্বপুরুষ ও পথপ্রদর্শক আল্লাহর পবিত্র বান্দা বলে সম্মান করেন। তাই ঈদুল আজহায় পশু কুরবানির দৃষ্টান্ত মানুষকে মানুষের গোলামি থেকে মুক্ত করে আল্লাহর গোলামে পরিণত করার রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমে পুত্রসম প্রিয় স্বজন ও বস্তু ত্যাগের এক বিস্ময়কর স্মারক। মুসলিম উম্মাহকে সত্য ও ন্যায্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বা জিহাদে অনুপ্রাণিত করার এক আধ্যাত্মিক শিক্ষা কুরবানির আসল হাকিকত। বিশ্ব মুসলিমের সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠাতার শপথের দিন ঈদুল আজহা।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘ওরে সত্য মুক্তি স্বাধীনতা দেবে এই সে খুন-মোচন!/ ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্বোধন।’
আমরা জানি, কুরবানির শাব্দিক অর্থ ত্যাগ। ১০ জিলহজ ঈদুল আজহা পালন করা হয়। কুরবানির ঈদকে ‘ঈদুল আজহা’ বলা হয়। ঈদুল আজহার দিন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যে পশু জবাই করা হয়, পারিভাষিক অর্থে তাকে ‘কুরবানি’ বলা হয়। ইবরাহিমি সুন্নাত হিসেবে কুরবানি ইবাদত হিসেবে আমরা পালন করি। কিন্তু আদম (আ.)-এর যুগ থেকেই কুরবানির বিধান চালু ছিল। পরবর্তী সময়ে হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুরবানি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে। ঈদুল আজহার গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআন-হাদিসে এ ব্যাপারে যথেষ্ট তাগিদ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, কুরবানির পশুগুলোকে তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত করেছি। এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। ইসলামের এই ‘মহান নিদর্শন’, যা ‘সুন্নাতে ইবরাহিম হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে মদিনায় প্রতি বছর আদায় করেছেন এবং সাহাবীরাও নিয়মিতভাবে কুরবানি করেছেন। অতঃপর অবিরত ধারায় মুসলিম উম্মাহর সামর্থ্যবানদের মধ্যে এটি চালু আছে।
আমরা মনে করি, পশু কুরবানি আল্লাহর জন্য আত্মত্যাগের একটি দৃষ্টান্ত মাত্র। সারা বছরই আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রত্যাশায় নিজ সম্পদ অন্য মানুষের কল্যাণ ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে ত্যাগ করতে হবে। নিজের পশুত্ব, নিজের ক্ষুদ্রতা, নীচতা, স্বার্থপরতা, হীনতা, দীনতা, আমিত্ব ও অহংকারী মনোভাব মুমিনের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য নয়। তাই কুরবানির ঈদ সার্থক হবে সেই দিন, যেদিন আমরা উল্লেখিত নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করে ত্যাগের মহিমায় আত্মগঠন করতে পারবো। এবার ঈদুল আজহা আসছে, এমন একসময় দেশ যখন ফ্যাসিস্ট হাসিনার জাহেলিয়াতের দুঃশাসন থেকে মুক্ত। একটি গণতান্ত্রিক সরকার এখন দেশ পরিচালনা করছে। তাদের দায়িত্ব ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারী পুরনো কাঠামো ভেঙে একটি নতুন বাংলদেশ গড়া। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশের মানুষ গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রায় ৭০ ভাগ ভোট দিয়েছে। তাই সরকার ও বিরোধীদলের দায়িত্ব সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে কাজ শুরু করা। কিন্তু সরকারি দলের কারণে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যদিও সরকারি দল বলছে, তারা জুলাই সনদের প্রতিটি হরফ বাস্তবায়নে জনগণের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অতএব তারা তা করবেই। তাহলে আর বাধা কোথায়?
আসুন, আমরা বৈষম্য ও দুঃশাসনমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করি। ফ্যাসিস্ট হাসিনার দুঃশাসনের জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূর হয়েছে। কিন্তু আঁধার এখনো কাটেনি। তাই নতুন বাংলাদেশ গড়ার যুদ্ধ চলমান। শোষণমুক্ত ইনসাফের দেশ গড়তে জাতির পিতা হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর কুরবানির শিক্ষা হোক আমাদের পথচলার অনুপ্রেরণা। ত্যাগ ও কুরবানির মানসিকতা নিয়ে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সত্য-ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করি। আল্লাহ আমাদের সালাত, কুরবানি ও যাবতীয় সৎকর্ম কবুল করুন, আমীন।