সভ্যতার উত্থান পতন :রক্তে লেখা ইতিহাস

সোনার বাংলা অনলাইন
১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:২৮

লেখক আবু নাঈম মু. শহীদুল্লাহ

আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ্

নবাতীয় ও সাবা জাতি নিয়ে এ পর্ব 
প্রাচীন ইতিহাসের বালুকাময় মরুভূমির গভীরে লুকিয়ে থাকা সভ্যতা গুলোর মধ্যে কম আলোচিত সাবা ও নবাতীয়দের গল্প, অথচ তাদের কীর্তি আজও মানব সভ্যতার অগ্রগতির সাক্ষ্য বহন করে। আরব উপদ্বীপ ও লেভান্ত অঞ্চলের সেইসব বিস্ময়কর সভ্যতার মধ্যে সাবা ও নবাতীয় সভ্যতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
উন্নত কৃষি ব্যবস্থা, সমৃদ্ধ বাণিজ্য ও কিংবদন্তিতুল্য শাসকদের জন্য ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকা সাবা সভ্যতা। এবং অসাধারণ নগর নির্মাণশৈলী, পানিসংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক দক্ষতার মাধ্যমে প্রাচীন বিশ্বের বিস্ময় সৃষ্টি করা নবাতীয় সভ্যতা।
দুদু মরুভূমির কঠিন পরিবেশকে জয় করা এই দুটি সভ্যতা কেবল টিকেই থাকেনি, বরং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছিল। ইতিহাসে কম আলোচিত এই সভ্যতা নিয়ে সংক্ষেপে তুলে ধরছি। আদ জাতি ধ্বংসের পর পর গড়ে ওঠা সভ্যতার নাম নবাতীয় ও সাবা সভ্যতা। সাবা সভ্যতার সংক্ষিপ্ত বিবরণ:ইয়েমেনের মারিব শহরকে কেন্দ্র করে আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ – খ্রিষ্টীয় ৩ শতক পর্যন্ত গড়ে উঠে সাবা জাতি।
প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম বড় বাঁধ Marib Dam তাদের তৈরী। বর্তমান দক্ষিণ ইয়েমেন তাদের অনেক স্মৃতি রয়েছে। সাবাবাসীরা মূলত সেমিটিক জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। কোরআনে উল্লিখিত রানী বিলকিস (শেবা রাণী) এই সভ্যতার অন্যতম কিংবদন্তিময় শাসক হিসেবে পরিচিত। সুবিন্যস্ত নগর ব্যবস্থা, উন্নত সেচ প্রযুক্তি ও সমৃদ্ধ বাণিজ্যের জন্য তারা খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ধর্মীয় দিক বিবেচনায় প্রথমে সে সূর্য পুজোক হলেও পরবর্তীতে আল্লাহর নবী সোলাইমান আঃ এর আহবানে ইসলাম গ্রহন করেছিলেন পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নামল, ২৭ নং আয়াতে তার প্রমান মিলে। “হে আমার প্রতিপালক! আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আমি সুলাইমানের সঙ্গে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম—যিনি সমস্ত জগতের প্রতিপালক”।

ভৌগোলিক অবস্থান ও বাণিজ্যিক দক্ষতায় তার ভারত, আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে একচেটিয়া ধূপ, মসলা, সোনা ও মূল্যবান পাথরের ব্যাবসা করতেন। সাবা জাতীর অনেকেই তাওহীদের দাওয়াত গ্রহণ করলেও অবাধ্যদের সংখ্যাও কম ছিলো না। অবাধ্যর কারনে ধ্বংশ হয়ে যায় সূরা সাবা: আয়াত ১৫ থেকে ১৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন “নিশ্চয়ই সাবা জাতির জন্য তাদের বসবাসস্থলে ছিল একটি নিদর্শন—ডানে ও বামে দুটি বাগান।
(তাদের বলা হয়েছিল:) তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের রিযিক থেকে আহার করো এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করো। কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিল।
অতঃপর আমরা তাদের ওপর ছেড়ে দিলাম ‘আরিমের বাঁধ ভাঙার বন্যা,এবং তাদের দুই বাগানকে বদলে দিলাম এমন দুই বাগানে,যেগুলোতে জন্মাত তিক্ত ফল, ঝাউ গাছ ও অল্প কিছু কুলগাছ।এভাবেই আমরা তাদেরকে শাস্তি দিলাম তাদের অকৃতজ্ঞতার কারণে।আর আমরা কি অকৃতজ্ঞ ছাড়া আর কাউকে শাস্তি দিই?আর আমরা তাদের ও সেই জনপদগুলোর মধ্যে—যেগুলোকে আমরা বরকতময় করেছিলাম—স্পষ্ট দৃশ্যমান বহু জনপদ স্থাপন করেছিলাম এবং সেখানে ভ্রমণের দূরত্ব নির্ধারণ করেছিলাম।(বলেছিলাম:) তোমরা সেখানে নিরাপদে রাত ও দিনে ভ্রমণ করো।
কিন্তু তারা বলল,”হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের সফরের দূরত্ব বাড়িয়ে দাও।”আর তারা নিজেদের প্রতি জুলুম করল। অতঃপর আমরা তাদেরকে কাহিনিতে পরিণত করলাম
এবং তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে ছিন্নভিন্ন করে দিলাম।
নিশ্চয়ই এতে রয়েছে নিদর্শন—প্রত্যেক ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ মানুষের জন্য”।
নবাতীয় জাতির পরিচয়
আরবি ভাষাভাষী ও বাণিজ্যনির্ভর একটি জাতির নাম ছিল নবাতীয়। তারা আরব উপদ্বীপের উত্তরে লেভান্ত অঞ্চলে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, যার ভৌগোলিক সীমা বিস্তৃত ছিল বর্তমান জর্ডান, সৌদি আরবের উত্তরাংশ, দক্ষিণ সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল পর্যন্ত। পেত্রা নগরীকে রাজধানী করে নবাতীয়রা এই রাষ্ট্র পরিচালনা করত।খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দী থেকে খ্রিস্টাব্দ ১ম শতাব্দী পর্যন্ত নবাতীয়রা
আরব থেকে রোম ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বেশ দাপটের সাথে বাণিজ্য পরিচালনা করে অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠে। আদ ও সমুদ জাতীর মত তারাও
পাহাড় কেটে তৈরি সমাধি ও প্রাসাদ তৈরী করতো।যার প্রমাণ রাজধানী পেত্রার “খাজনেহ”স্থাপত্যে সেখানে
গ্রিক, রোমান ও আরবি শিল্পরীতির সংমিশ্রণ রয়েছে।
ধর্মপালনের দিক থেকে তারা দেবতার পূজা করতো যা সম্পন্ন শীর্ক। এ সময়ে পৃথিবীতে হযরত আইয়ুব, ইউনুস, ইলিয়াস,আল-ইয়াসা,যাকারিয়া,ইয়াহইয়া ও
ঈসা (আ.) এর আগমন হয়েছিল কিন্তু নবাতীয়দের জন্য সুস্পষ্ট কোন নবী ছিলেন কি না তা আমি সঠিক তথ্য দিয়ে বলতে পারতেছিনা। তবে আল্লাহ বলেছেন “আর আমি প্রত্যেক জাতির কাছেই একজন সতর্ককারী পাঠিয়েছি।
(সূরা ফাতির: ২৪) সে আলোকে নবাতীয়দের কাছেও নিশ্চয়ই কোনো না কোনো সতর্ককারী (নবী বা রাসূল) পাঠানো হয়েছিল।

রোমান সম্রাট ট্রাজান সাম্রাজ্যের বিস্তারের জন্য আগ্রাসান চালিয়ে ১০৬ খ্রিস্টাব্দে নবাতীয় অন্ঞ্চল দখল করে নেয়।

প্রিয় পাঠক,ইতোমধ্যে আপনারা বুঝতে পেরেছেন যে আমি সভ্যতার ইতিহাস ও তাদের ধ্বংসের কারণ গুলো তুলে ধরছি শুধু এটা স্পষ্ট করতে যে-যারাই তাওহীদের বিপরীতে গিয়ে দাম্ভিকতা করেছে আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দিয়েছেন। ক্রমান্বয়ে আমি কাওমে লুত কাওমে মাদায়েন,ফেরাউন, আসহাবুল আইকা ও আসহাবুর রাস সকলের বিষয়ে আপনাদের সামনে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরবো,

কাওম লূত আঃ

পথহারা বনী আদমকে পথের দিশা দিতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন দুনিয়াতে যত নবী ও রাসুল পাঠিয়েছেন তার মধ্যে হযরতে ইব্রাহীম আঃ ও হযরতে লুত আঃ প্রায় সমসাময়িক সময়ে সাদূম ও আশপাশ
(বর্তমান ফিলিস্তিন–জর্ডান সীমান্ত, মৃত সাগর) এ
জনপদের মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহবান করেছেন। হযরত লূত আঃ সম্পর্কের দিক থেকে হযরতে ইব্রাহীম আঃ এর ভাতিজা ছিলেন।
সে সময়ে এ অন্ঞ্চলের মানুষ অশ্লীলতাকে স্বাভাবিক ও গর্বের বিষয় মনে করতেন, আল্লাহর নবী যখন তাদের
সতর্ক করতেন তখন তারা উপহাস করতেন।
পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম প্রকাশ্যভাবে সমকামিতা চালু করেন কাওমে লুত। কুরআনের বর্ননা হচ্ছে –
তোমরা কি এমন অশ্লীলতায় লিপ্ত হচ্ছ, যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বের কেউ করেনি? (সূরা আ‘রাফ: ৮০)
অবৈধ কাজ পরিত্যাগ করে পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র জীবন যাপনের জন্য বিবাহের মাধ্যমে হালাল সম্পর্কের প্রস্তাব দিতেন হযরতে লূত (আ.) তিনি বলতেন –
“এই আমার কন্যারা (বৈধ স্ত্রী), এগুলো তোমাদের জন্য পবিত্রতর।” (সূরা হূদ: ৭৮)

কিন্তু তারা এসব উপদেশে কোনো কর্ণপাত করত না। তারা শুধু নিজেরাই অপকর্মে লিপ্ত ছিল না, বরং আগত মেহমানদের অপমান ও নির্যাতন করত এবং জোরপূর্বক তাদের ওপর অশ্লীল কাজ চাপিয়ে দিত।
অবশেষে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হযরত লূত (আ.)–কে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ নিয়ে ফেরেশতারা মানুষের রূপে তাঁর কাছে আগমন করেন। এ সময়ও কাওমের লোকেরা তাদের নিকৃষ্ট কুকর্মে লিপ্ত হওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। কুরআনের ভাষা
“যখন আমাদের ফেরেশতারা লূতের কাছে মেহমান হয়ে এলো, তখন তিনি তাদের নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত হলেন…
আর তার কওম দৌড়ে তার কাছে এলো—এর আগেও তারা কুকর্ম করত।
লূত বললেন: ‘হে আমার কওম! এরা আমার মেহমান; তোমরা আমাকে লজ্জিত করো না…’
তারা বলল: ‘তুমি তো জানো, আমাদের নারীদের কোনো প্রয়োজন নেই, আর তুমি ভালো করেই জানো আমরা কী চাই। ”
লোকেরা যখন জোর করে গৃহে প্রবেশ করতে চাইলো তখন আল্লাহর ফেরেশতারা তাদের চোখ অন্ধ করে দিলেন। এটা ছিলো প্রথম প্রতিরোধ ও শাস্তি।

তারা তাদের নবীর উপদেশকে উপহাস ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে অশ্লীলতা ও কুকর্ম লিপ্ত থাকতো, প্রকাশ্যেই সমকামিতা ও নিকৃষ্ট কাজ করাকে স্বাভাবিক ও গর্বের বিষয় মনে করত। এসব পাপ কাজে বাঁধা দিতে গেলে নবী লূত আঃ কে দেশ ছাড়তে হুমকি দিতো
কুরআনে এসেছে,
“তারা বলল, ‘লূতকে ও তার পরিবারকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও; এরা তো পবিত্র থাকতে চায়। (সূরা আন-নামল: ৫৬)
পরকালীন শাস্তির ভয় দেখালে তারা আল্লাহর শাস্তিকে অস্বীকার করে লূত (আ.)–কে চ্যালেঞ্জ করে বলতো-
যদি তুমি সত্যবাদী হও, তবে আমাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি নিয়ে এসো। তাদের এসকল ঔদ্ধত্য, অহংকার আর সমকামিতা, অশ্লীলতা, জুলুম ও নৈতিক অবক্ষয়ের
শাস্তি কার্যকর করতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের রুপে ফেরেশতারা পাঠিয়েছেন। আগত ফেরেস্তাগন হযরতে লূতকে বলেন তুমি রাতের কোনো অংশে তোমার পরিবার নিয়ে বের হয়ে পড়ো এবং তোমাদের কেউ যেন পেছনে ফিরে না তাকায়। (সূরা হূদ ১১:৮১) তিনি ও তার দুই কন্যা আল্লাহর গজব থেকে রক্ষা পেয়েছেন।কিন্তু তার স্ত্রী অবিশ্বাসীদের সাথে সহমত হওয়ায় তিনিও অভিস্পতদের অন্তর্ভুক্ত হন। সমকামীতার নোংরা সময়ে তিনি গোপনে কওমে লূতকে খবর দিতেন, যে আজ ঘরে সুন্দর পুরুষ মেহমান এসেছে। শুধু সমকামীদের খবর দেওয়ার কারনে তিনিও ধ্বংস হয়ে যান। যার নির্দশন জর্ডন ও ফিলিস্তিন অন্ঞ্চলে লবণস্তম্ভ এখনো রয়েছে। পিছনে তাকিয়ে থাকা একটা স্তম্ভকে
পর্যটকরা বলেন Lot’s Wife Pillar (লূতের স্ত্রীর মূর্তি)।যদিও কুরআন ও হাদিসে এর কোন সত্যতা নেই।
কুরআনে এ মহিলার বিষয়ে আল্লাহ বলেন –
নূহের স্ত্রী ও লূতের স্ত্রী—তারা দুই সৎ বান্দার অধীনে ছিল, কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।(সূরা আত-তাহরীম ৬৬:১০)

ঈমানদারগন শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর হযরতে
জিবরাইল (আ.) তাঁর ডানা দ্বারা পুরো জনপদকে উপর থেকে তুলে উল্টে মাটিতে আছড়ে ফেলেন। তারপর আকাশ থেকে পোড়া মাটির শক্ত পাথর লাগাতার বর্ষণ হয়, এই পাথরগুলো ছিল প্রত্যেক অপরাধীর জন্য আলাদা আলাদা এর পর প্রচন্ড বিকট শব্দ ও ভূমিকম্প হয়। যার নিদর্শন বর্তমান ফিলিস্তিন–জর্ডান সীমান্ত ডেড সি (মৃত সাগর) যার পানিতে কোনো মাছ বাঁচে না
অস্বাভাবিক লবণাক্ততা এবং ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে।জ্ঞানীদের জন্য এটা একটা নিদর্শন আল্লাহ বলেন
“তোমরা তো তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদের পাশ দিয়ে যাতায়াত করো—তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো না?
(সূরা সাফফাত ১৩৭–১৩৮)

আসহাবে মাদায়েন :
হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পুত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন মাদিয়ান, যিনি কাতুরা (আ.)-এর গর্ভজাত সন্তান। সাধারণত আমরা হযরত ইসমাঈল (আ.) ও হযরত ইসহাক (আ.)-কেই তাঁর পুত্র হিসেবে বেশি জানি। তবে হযরত সারাহ (আ.)-এর ওফাতের পর হযরত ইব্রাহিম (আ.) কাতুরা (আ.)-কে বিবাহ করেন এবং তাঁর গর্ভে জন্ম নেন মাদিয়ান। মাদিয়ানের বংশধরদেরই পরবর্তীতে মাদিয়ান জাতি বা আসহাবে মাদিয়ান বলা হতো। এ জাতির নিকট আল্লাহ তাআলা নবী হিসেবে প্রেরণ করেন হযরত শু‘আইব (আ.)-কে। বর্তমান উত্তর-পশ্চিম সৌদি আরব, দক্ষিণ জর্দান ও সিনাই উপদ্বীপ অঞ্চল ছিল তাদের বসতির এলাকা। সামাজিক কাঠামো, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মাদিয়ানরা ছিল ধনী, প্রভাবশালী ও সুপরিচিত এক ব্যবসায়ী জাতি।
কিন্তু আর্থিক সমৃদ্ধির আড়ালে তারা নানাবিধ অন্যায় ও পাপকর্মে নিমজ্জিত ছিল। মাপে ও ওজনে কম দেওয়া, অন্যায়ভাবে পথ রোধ করে মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, অতিরিক্ত লাভ ও অবৈধ মুনাফার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে শোষণ করা, প্রভাবশালীদের দ্বারা দুর্বলদের ওপর জুলুম চালানো—এসব ছিল তাদের নিত্যদিনের চর্চা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল শিরকসহ আরও বহু নিষিদ্ধ ও ঘৃণ্য কাজ।
এই জুলুম, অন্যায় ও পাপাচার থেকে তাদের ফিরিয়ে এনে পবিত্র ও ন্যায়নিষ্ঠ জীবনযাপনের আহ্বান জানাতে আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্য থেকেই হযরত শু‘আইব (আ.)-কে নবী হিসেবে মনোনীত করেন। তিনি ছিলেন তাদের সতর্ককারী ও পথপ্রদর্শক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তারা তাঁর আহ্বান গ্রহণ না করে তাঁকে বিদ্রূপ ও উপহাস করতে থাকে। তারা ঠাট্টা করে বলেছিল—
“হে শু‘আইব! তোমার নামাজ কি তোমাকে এ আদেশ দেয় যে, আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের উপাস্য পরিত্যাগ করব এবং আমাদের ধন-সম্পদে যা ইচ্ছা করি তা ছেড়ে দেব?(সূরা হূদ: ৮৭)
তারা শুধু নবুয়ত অস্বীকারই করেনি; বরং হযরত শু‘আইব (আ.)-কে মিথ্যাবাদী আখ্যা দিয়ে ঈমানদারদেরসহ জনপদ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেয়। তারা বলেছিল:হে শু‘আইব! তুমি ও তোমার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছে, তাদেরকে আমরা আমাদের জনপদ থেকে বের করে দেব, নতুবা তোমাদের আমাদের ধর্মে ফিরে আসতে হবে।(সূরা আল-আ‘রাফ: ৮৮)
আল্লাহর নবীর সঙ্গে তাদের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অবাধ্য আচরণের পর হযরত শু‘আইব (আ.) আক্ষেপভরে বললেন: হে আমার কওম! আমি তো আমার দায়িত্ব পালন করেছি। এখন আল্লাহর ফয়সালার অপেক্ষা কর।
অবশেষে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নেমে আসে ভয়াবহ শাস্তি। আকাশ থেকে নেমে আসে এক প্রচণ্ড বিকট শব্দ—যাতে তাদের হৃদপিণ্ড কেঁপে ওঠে। পুরো জনপদ ভীষণভাবে কম্পিত হয়ে ওঠে, ঘরবাড়ি ধসে পড়ে, আর তারা নিজ নিজ ঘরের ভেতর উপুড় হয়ে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। মুহূর্তের মধ্যেই এক সময়ের শক্তিশালী ও অহংকারী জাতি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।(সূরা হূদ: ৯৪)
তবে আল্লাহর অনুগ্রহে শুধু ঈমানদাররাই নিরাপদ ছিলেন। ( অসমাপ্ত)

 

সভ্যতার উত্থান পতন :রক্তে লেখা ইতিহাস