সম্পাদকীয়

প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ কাম্য নয়

প্রিন্ট ভার্সন
২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৪৮

সারা দেশ থেকেই অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে নির্বাচনের লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘ দেড় দশকের আওয়ামী লীগ এবং তার দোসর ১৪ দল ও জাতীয় পার্টির দুঃশাসনে নির্বাচন দেশ থেকে নির্বাসনে চলে গিয়েছিলো। অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিস্ট সরকার জনগণের সকল মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিলো। প্রহসনের একতরফা, রাতের ভোট, ডামি নির্বাচনের আয়োজন করে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করে লুটপাট করাই ছিলো তাদের একমাত্র লক্ষ্য। দেশের জনগণ সেই দুঃশাসন মেনে নেয়নি। খুন-গুম, অত্যাচার-নির্যাতন উপেক্ষা করে তারা দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিস্টদের পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। প্রায় দুই হাজার তরুণ-তাজা প্রাণের বিনিময়ে তারা হারানো অধিকার ফিরে পেতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের প্রতিটি স্তরেই এখনো ফ্যাসিস্ট সরকারের মানসিক গোলামরা বসে আছে। প্রশাসন সততা-যোগ্যতার সাথে কাজ করলে কোনো সরকারই ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার আশঙ্কা কম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দীর্ঘ দেড় দশকের অপশাসনে প্রশাসনের সৎ ও যোগ্যরা অনেকেই হারিয়ে গেছেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনার আনুকূল্য পেয়ে যারা বড় বড় চেয়ার দখল করেছিলেন, তারা এখনো গোলকধাঁধায় আছেন। আপা ‘আসবেন’, ‘আসছেন’ আতঙ্ক ছড়িয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের নির্দেশ বাস্তবায়নে গড়িমসি করছেন।
গত ১৬ জানুয়ারি শুক্রবার সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন সূত্রে প্রকাশ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মন্তব্য করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ে আমলাতন্ত্রের একটি অংশ বেশি প্রভাবশালী। উপদেষ্টা পরিষদ কোন কাগজে স্বাক্ষর করবে, কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, সেটি আসলে উপদেষ্টা পরিষদ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এ সিদ্ধান্ত নেন আমলাতন্ত্রের ভেতরের অত্যন্ত ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা। উপদেষ্টারা কেন আমলাদের কাছে নতিস্বীকার করেন বা করছেন- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর তার কাছে নেই। তবে দীর্ঘসময় সরকারকে কাছ থেকে দেখে তিনি বুঝেছেন, কোন সিদ্ধান্তে কোন উপাদান থাকবে, কোনটি থাকবে না, তা নির্ধারণ করে দেয় আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী অংশ। এক্ষেত্রে শুধু তাদের গোষ্ঠীস্বার্থ নয়, বরং রাজনৈতিক স্বার্থেরও প্রতিফলন ঘটে। সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমও বলেছেন, তাকে চার মাস কাজ করতে দেয়া হয়নি। সোনার বাংলার একজন পাঠক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বিশেষ ইউনিটের সাথে কথা বলার পর তাদের প্রতিক্রিয়া শুনে হতাশা প্রকাশ করে আমাদের জানিয়েছেন, ‘জুলাই চেতনাবিদ্বেষী এ সকল সদস্য জাতীয় নির্বাচনে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করলে নির্বাচন কি অবাধ ও সুষ্ঠু হবে?’
সম্প্রতি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও বৈঠক করে প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ সম্পর্কে অবগত করেছেন। তারপর জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সাংবাদিকদের বলেন, নমিনেশন বাছাই পর্বে একই নিয়মের অধীনে কারোর নমিনেশন বৈধ আবার কারোরটি অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে মোটা দাগে দুটি বিষয় ছিল- প্রার্থীদের ঋণখেলাপি হওয়া ও দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা। আশঙ্কার বিষয় হলো, একটি বড় দলের কিছু কিছু প্রার্থী অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রার্থিতা বহাল রাখার জন্য নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। কোনো একটি বিশেষ দলের প্রধানকে সরকারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সিকিউরিটি ও প্রটোকল দেওয়া হচ্ছে। যদি তাই হয়, অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানকেও সমভাবে প্রটোকল দিতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে সকল দলের জন্য সমান সুযোগের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হবে। কোথাও কোথাও জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের পক্ষপাতিত্বের বিষয় লক্ষ করা যাচ্ছে। আমরা ইতোমধ্যেই এদের তালিকা তৈরি করেছি এবং এখনো অবজার্ভ করছি। ইলেকশন কমিশন যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে আমরা প্রধান উপদেষ্টাকে এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার কথা অবহিত করেছি। আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি যে, চিফ এডভাইজরের চারপাশের কতিপয় উপদেষ্টা তাঁকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে বিভ্রান্ত করছেন। কোনো প্রকার চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে আরপিও অনুযায়ী ফয়সালা করতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে ইলেকশন কমিশন জনগণের নিকট সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থ বলে বিবেচিত হবে। শুধু তাই নয়, কোনো একটি দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছে বলে প্রমাণিত হবে এবং জনমনে সংশয় তৈরি হবে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উল্লেখিত পর্যবেক্ষণগুলোর সাথে দ্বিমত শোষণ করার সুযোগ নেই। আমরাও মনে করি, নির্বাচনী প্রচার ও ভোটগ্রহণের আগেই জনগণের সংশয় দূর করতে হবে। কোনো একটি দলের প্রতি প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব জাতীয় নির্বাচনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। দীর্ঘ দেড় দশক পরের কাক্সিক্ষত এ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে, যা আমাদের কারো কাম্য নয়। তাই আমরা আশা করি, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের প্রতিশ্রুত ঐতিহাসিক নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

সম্পাদকীয়

সম্পর্কিত খবর