জুলাইযোদ্ধাদের পাপ-পূণ্য এবং নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার গল্প

প্রিন্ট ভার্সন
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৭

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
জুলাই বিপ্লবোত্তর নির্বাচিত সরকার শপথগ্রহণের দিনই জাতিকে হতাশ করেছে। সংবিধানের দোহাই দিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথগ্রহণ করেননি সরকার গঠনকারী দল বিএনপির নির্বাচিত এমপিরা। বিপ্লবের আগে জুলাইয়ের উত্তাল সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘এ আন্দোলনের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’ বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতেও তারা বারবার এ প্রমাণ দিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর সম্প্রতি প্রকাশিত সাক্ষাৎকারেও থলের বিড়াল বের হয়ে আসতে শুরু করেছে। বিএনপির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের বিপ্লবোত্তর অবস্থার সুবিধাভোগ করলেও বিপ্লবীদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা বারবার দাবি করেছে, এর সাথে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতির কোনো সম্পর্ক নেই। ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও দেখা যায়, তিনি এ ঘটনার সাথে জড়িত নন। কিন্তু ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ রাজনীতির সুযোগ পেয়ে ফিরে এসে তার ওপর দায় ঠিকই চাপিয়েছিল। তাকে ‘পাকিস্তানি এজেন্ট’ আখ্যা দিয়ে তার বীর-উত্তম খেতাম কেড়ে নিয়েছে। শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের আসামি করার সব আয়োজনও সম্পন্ন করেছিল। হাসিনা পিতা হত্যার প্রতিশোধ নিতে শহীদ জিয়ার পরিবারের ওপর নির্মম অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছেন। জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারারুদ্ধ করে বিনা চিকিৎসায় তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঢেলে দিয়েছেন। তার কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমানের মৃত্যুর জন্য হাসিনা সরকার দায়ী বলে মনে করেন চিকিৎসকরা।
মুজিব হত্যায় দায়ী না হলেও হাসিনা দায়মুক্তি দেননি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তার পরিবারকে। সেনা কর্মকর্তা হিসেবে জিয়াউর রহমানের একটি নির্দোষ স্বাভাবিক এবং অনুগত সৈনিকসুলভ কথার ভুল ব্যাখ্যা করে গোটা পরিবারকে প্রতিহিংসার আগুনে পুড়িয়েছেন হাসিনা।
কী সেই উক্তি? ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন সেনাবাহিনীর উপপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ঘটনা জানানোর পর তিনি বলেছেন, ‘সো হোয়াট? প্রেসিডেন্ট ইজ ডেড, সো হোয়াট? ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার। আপহোল্ড দ্য কনস্টিটিউশন।’ (তাতে কী? রাষ্ট্রপতি মারা গেছেন, তো কী হয়েছে? উপরাষ্ট্রপতি আছেন। সংবিধান রক্ষা করো)। জাতির সঙ্কটকালে একজন সেনা কর্মকর্তার এমন উক্তি তার বলিষ্ঠতারই প্রমাণ। পেশার প্রতি নিষ্ঠাবানের। এছাড়া আর কী-বা বলার ছিল? কিন্তু হাসিনা ও আওয়ামী লীগ এ উক্তিটিকেই ভুলভাবে উপস্থাপন করে জিয়াউর রহমানের ওপর মুজিব হত্যার দায় চাপিয়ে প্রতিহিংসার আগুন ছড়িয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে সাদা চোখে দেখলে বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে হাসিনাকে হটিয়ে যারা ক্ষমতায় গিয়েছেন এবং অন্যের হাতে তুলে দিয়েছেন, তারা সবাই ‘অপরাধী’। ফ্যাসিস্ট হাসিনার লেখা সংবিধানের বিচারে- জুলাইযোদ্ধা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, সরকারের অধীনে পরিচালিত সামরিক-বেসামরিক, আমলা, পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং এমনকি ৩৬ জুলাই বিপ্লবের সমর্থক সবাই ‘মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধী’।
হাসিনার সংবিধানের বিচারে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য ‘অপরাধীরা’?
২০২৪-এর ৩৬ জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরের পরিবর্তনকে বিপ্লব হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে হাসিনার সংবিধান সমুন্নত রাখলে জুলাইযোদ্ধা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, সরকারের অধীনে পরিচালিত সামরিক-বেসামরিক, আমলা, পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং এমনকি বিপ্লবের সমর্থক সবাই মৃত্যুদণ্ডযোগ্য ‘অপরাধী’। কারণ বাংলাদেশের সংবিধানে ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে ২০১১ সালে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত ৭ক (৭অ) অনুচ্ছেদের বিধানে, ‘সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ ইত্যাদি অপরাধ’। এতে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে, ‘অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা দখল: যদি কোনো ব্যক্তি শক্তি প্রয়োগ বা অন্য কোনো অসাংবিধানিক পন্থায় সংবিধান বা এর কোনো অনুচ্ছেদ রদ, বাতিল বা স্থগিত করেন, তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।’ সংবিধান বা এর কোনো বিধানের প্রতি নাগরিকদের আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট করার চেষ্টা বা ষড়যন্ত্র করাকেও এই অনুচ্ছেদে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কেউ যদি উপরোক্ত কাজে প্ররোচনা দেয়, সমর্থন করে বা অনুমোদন দেয়, তবে তিনিও একই অপরাধে অপরাধী হবেন। এই অনুচ্ছেদের অধীনে সংঘটিত কাজকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এই অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য প্রচলিত আইনে অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
অবস্থা দেখে মনে হয়, সুবিধাভোগী বিএনপি ভাবছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে কোনোদিন বিচার শুরু করলে তারা বলবে, ‘আমরা তো সংবিধানের পক্ষে ছিলাম।’ কিন্তু এতে যে শেষ রক্ষা হবে না, তার প্রমাণ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তার পরিবারের ওপর হাসিনার আক্রোশ। ইতিহাসে আরো অনেক এমন ঘটনা আছে। তাই গণআন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসানের পর ইউরোপ-আমেরিকার মতো গণতান্ত্রিক দেশে বিপ্লবীরা চিরদিনের জন্য ফ্যাসিস্টদের ফেরার পথ বন্ধ করে। পতিত ফ্যাসিস্টের সংবিধান ছুড়ে ফেলে দিয়ে নতুন করে যাত্রা শুরু করে। জার্মানি ও ইতালি এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
আইনের বিচার আর ন্যায়বিচার এক নয়। তাই ন্যায়বিচার করতে হলে প্রেক্ষাপট জানতে হয়। প্রখ্যাত সুফী সাধক নিজাম উদ্দিন আউলিয়াকে নিয়ে একটি শিশুতোষ এবং একটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য গল্প প্রচলিত আছে। শিশুতোষ গল্পটি সবার জানা। তার পাপের ভাগ কেউ নেবে না বলে তিনি সাধক হয়ে যান। কিন্তু প্রাপ্তবয়সস্কদের জন্য গল্পটি অনেকেরই হয়তো অজানা। লেখার শেষে তা উল্লেখ করব। তার আগে আলোচনা করা দরকার বিএনপি কী সত্য আড়াল করার চেষ্টা করছে। দলটির নীতিনির্ধারকরা নিশ্চয়ই জানেন, সত্য হলো আলো, আর মিথ্যা অন্ধকার। প্রতারণার মাধ্যমে সত্য গোপন করে অন্ধকার পথে চলতে গিয়ে যুগে যুগে অনেক রাজা-মহারাজা নিজের ধ্বংস নিজেই ডেকে এনেছেন। বিএনপি শপথের দিন থেকে নিয়ে সরকার গঠনের পর থেকে যে পথে হাঁটছে, তা দেখে মনে হচ্ছে- তারা পথ হারিয়েছে অথবা যাদের হাত ধরে পথ চলছেন, তারা ভুল পথ দেখাচ্ছেন।
ভুল পথের পথিক
রাজধানী ঢাকার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর শুক্রবার বিকাল ৫টা ৬ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ স্বাক্ষর করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রধান প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও এতে স্বাক্ষর করে। বিএনপির প্রতিনিধিদলের পক্ষে সনদটিতে স্বাক্ষর করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। কারণ তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) ফ্যাসিস্ট হাসিনার দেয়া নির্বাসনে লন্ডনে ছিলেন। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও হাসিনার নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে এভারকেয়ার হাসপাতলে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সনদ স্বাক্ষরের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এটিকে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা’ হিসেবে অভিহিত করেন।
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংবিধান সংস্কার এবং ৩৬ জুলাইকে বিপ্লব স্বীকৃতি দেয়ার পক্ষে জনগণের রায়ে ‘হ্যাঁ’ বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়ার পর বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য দলের কোনো নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমতই আর টেকে না। কারণ জনগণই সর্বোচ্চ সংবিধান। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম ভাগের ৭ অনুচ্ছেদের ২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন…।’ জনগণের অভিপ্রায়ই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থারই মূল দর্শন। জনগণ চাইলে যে কোনো আইন ও সংবিধান পরিবর্তন, সংশোধন, সংস্কার ও পরিবর্তন করতে পারে।
৩৬ জুলাই বিপ্লবের পক্ষে ছিল দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। তারা ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে তা দ্বিতীয়বার প্রমাণ করেছে। গণভোটে মোট ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এর মধ্যে বৈধ ভোটের সংখ্যা ৭ কোটি ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৬টি এবং বাতিল হয়েছে ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭টি ভোট। গেজেটের তথ্যানুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০ জন। অন্যদিকে ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬ জন। গণভোটে বাতিল করা ব্যালট পেপারের সংখ্যাও বিপুল, ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭টি।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৫৮ সালে ফরাসি নেতা চার্লস দ্য গল নতুন সংবিধান অনুমোদনের জন্য গণভোটের আয়োজন করেছিলেন। জনগণের বিপুল সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত হয় ফ্রান্সের পঞ্চম প্রজাতন্ত্র বা ফিফথ রিপাবলিক, যা আজও কার্যকর রয়েছে। এই গণভোট ফরাসি রাজনীতিতে স্থিতিশীলতার নতুন অধ্যায় সূচনা করে। এছাড়া সুইজারল্যান্ড থেকে শুরু করে নরওয়ে, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য দেশগুলোয় জনগণের রায় সত্যিই বদলে দিয়েছিল রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। এদেশের ইতিহাসেও গণভোটের দৃষ্টান্ত আছে।
বিএনপি কি তাহলে পুরনো বন্দোবস্তই টিকিয়ে রাখতে চায়? তাই গণভোট নিয়ে এমন আত্মঘাতী খেলায় মেতেছে। অথচ দলটি ভোটের আগে জনগণের কাছে পেশ করা ইশতেহারে, জুলাই বিপ্লব, গণতন্ত্র রক্ষা, মিডিয়ার স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ অনেক ওয়াদা করেছে।
ওয়াদা ও বাস্তবতা
বিএনপির ইশতেহার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রথম অধ্যায়ে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে গণতন্ত্র উপশিরোনমে উল্লেখ করেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ভোটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বিএনপি জবাবদিহিমূলক, দায়বদ্ধ ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠা করবে। সংবিধান ও নির্বাচনব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে। আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হবে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষরের পর গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হওয়ার পরও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেয়া এ প্রতিশ্রুতির খেলাপ। ইশতেহারের এ অধ্যায়ের সংবিধান সংস্কার শিরোনামের ১.-এ আরো পরিষ্কার করে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে ১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, যেগুলো সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে।’
স্থানীয় সরকার শিরোনামের উপশিরোনাম, ‘জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা’। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জনগণের সরাসরি ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারে জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা হবে।’ অথচ শপথের এক সপ্তাহ না যেতেই ৬টি সিটি করপোরেশনে গত ২২ ফেব্রুয়ারি রোববার আমলাদের পরিবর্তে সরকারদলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে মো. আব্দুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে মো. শফিকুল ইসলাম খানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া খুলনা সিটির প্রশাসকের দায়িত্ব পেয়েছেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু, সিলেটের আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, নারায়ণগঞ্জ সিটির প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মো. সাখাওয়াত হোসেন খান এবং গাজীপুর সিটির দায়িত্বভার পেয়েছেন শওকত হোসেন সরকার। এটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে নতুন কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং কিনাÑ প্রশ্ন জাগছে জনমনে।
আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের অফিস খোলার নেপথ্যে বিএনপির অনেকে আছেন বলে মিডিয়ায় এসেছে। অথচ পৃথিবীর কোনো উন্নত সভ্য দেশেই ফ্যাসিস্টদের রাজনৈতিক অধিকার নেই। কারণ তারা গণতন্ত্রের ভাষা বুঝে না। অস্ত্র, সন্ত্রাসের ভাষায় কথা বলে। ইতোমধ্যে সে লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সোমবার নড়াইলে আওয়ামী লীগের হাতে বিএনপির ৫ জন নিহত হয়েছেন। দেশের অন্যান্য জেলা থেকেও ফ্যাসিস্টদের সাথে সংঘর্ষ, নিহত ও আহত হওয়ার খবর আসছে।
দর্শনশাস্ত্রের মতে, ইতিহাস নিষ্ঠুর হয়ে ফিরে আসে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে ফ্যাসিস্ট বাকশালের বীজ থেকে আওয়ামী লীগের পুনর্জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাস নির্মমভাবে ফিরে এসেছিল। ভারত থেকে হাসিনা দেশে আসার ১৩ দিনের মধ্যে তিনি শহীদ হন। জার্মান দার্শনিক হেগেল বলেছেন, ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না।’ আশা করি, বিএনপি এ ভুল করবে না।
জুলাই সনদ ও গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হয়েছে। একটি চিহ্নিত মহল পতিত সরকারের ফেলে যাওয়া সাহাবুদ্দিন চপ্পুকে সামনে এনে আত্মঘাতী বয়ান তৈরির চেষ্টা করছেন। যেমন: ড. মুহাম্মদ ইউনূস সংবিধান অমান্য করে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতো বিরাট অপরাধ করেছেন। তাদের জন্যই সাধক নিজাম উদ্দিনের ডাকাত থেকে আউলিয়া হওয়ার গল্পের বাকি অংশ উল্লেখ করছি, কথিত আছে সাধক হওয়ার আগে নিজাম উদ্দিন একজন ডাকাত ছিলেন। তিনি একবার বনে ডাকাতি করার জন্য ওত পেতে আছেন। এমন সময় দেখেন, এক লম্পট সতী-সাধ্বী এক নারীর শ্লীলতাহানির জন্য জোরজবরধ্বস্তি করছে। তিনি সেই লম্পটকে খুন করেন। তাকে খুন করার আগে তিনি একশত মানুষ খুন করেছেন। ডাকাতি ও লুটপাট করেছেন। কিন্তু এ লম্পটকে খুন করার পর তার আগের সব পাপ মাফ হয়ে যায়। তিনি হন সাধক, নিজাম উদ্দিন আউলিয়া নামে উপমহাদেশব্যাপী তার খ্যাতি। ড. ইউনূস ও জুলাইযোদ্ধা বীর জনতা হাসিনার সংবিধানের ৭ক (৭অ) অনুচ্ছেদের ভয়কে জয় করে দেশকে ফ্যাসিস্ট শাসনমুক্ত করেছেন। তারা কোনো পাপ করেননি। বরং নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মতো মহাপুণ্য করেছেন।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, জুলাইযোদ্ধারা বুকের রক্ত দিয়ে বৈষম্য ও শোষণমুক্ত দেশ গড়ার যে স্বপ্ন জনগণের মনে জাগিয়েছে, সেই সত্য উপলব্ধি করতে যারা ব্যর্থ হবেন, ইতিহাস তাদের কোনোদিন ক্ষমা করবে না।

হারুন ইবনে শাহাদাত

সম্পর্কিত খবর