রাজনৈতিক ইস্যু সামাজিক অশান্তির কারণ হবে কেন?

প্রিন্ট ভার্সন
৫ মার্চ ২০২৬ ২১:৩৯

সরদার আবদুর রহমান

॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সামাজিক সংঘাত হওয়া যেন একটি কালচারে পরিণত হয়েছে। নির্বাচন, ভোট, নির্বাচনী প্রচার এসব কিছুই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। এটি মাত্র দু-তিন মাস চলে। আর এসব কিছুতেই অংশগ্রহণ করে সমাজবদ্ধ মানুষ। কিন্তু দেখা যায়, নির্বাচনে নিজ নিজ প্রার্থীর পক্ষে তাদের কর্মী সমর্থকগণ কেবল ভোটকেন্দ্রিক কর্মসূচিতেই নয়, একেবারে হিংসা-প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ে। অনেকেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন যে, রাজনৈতিক ইস্যু সামাজিক অশান্তির কারণ হবে কেন? তবে এই আশাও করা যায় যে, চব্বিশ-পরবর্তী বাংলাদেশ পর্যায়ক্রমে ভেতর থেকে বদলে যাবে। এমন আশা নিয়েই দেশের আমজনতা প্রাণ ও রক্তের বিনিময় করেছে।
এই প্রতিহিংসামূলক প্রবণতার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। যেমনÑ এসব মানুষের ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থ প্রবলভাবে ক্রিয়াশীল। এর সঙ্গে থাকে পানি ঘোলা করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মাধ্যমে তার অর্থ সম্পদ লুটে নেয়া বা অধিকার করা। ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায়, বিজয়ী প্রার্থীর লোকেরা তাদের উদগ্র মনোভাব কারো না কারোর ওপর চরিতার্থ করতে চায়। আবার প্রার্থী নিজে পরাজিত হলে এবং তার দল ক্ষমতাসীন হলে তার ভেতরে হীনম্মন্যতার সৃষ্টি হয়। তখন বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠে এবং নানান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটাতে থাকে।
বর্তমান সময়ে রাজনীতিতে আদর্শিক বিরোধ থাকলেও সেটি সামাজিক স্বার্থ ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বস্তুগত স্বার্থ একেবারে রাজনৈতিক আদর্শকে অতিক্রম করে যাচ্ছে। মুখে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণের পক্ষে জোর গলার স্লোগান উচ্চারিত হলেও অন্তরালে ব্যক্তি স্বার্থ প্রবল।
কেবল নির্বাচনের সময় নয়, অন্য সময়েও রাজনৈতিক মতবিরোধ সামাজিক সংঘাতের কারণ হয়ে থাকে। দেখা যায়, এই প্রবণতা একই পরিবারের মধ্যে অথবা দুই গ্রামের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে। কোনো কোনো সময় এমনও হয় যে, বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে এক সময় সমঝোতা হয়ে গেল এবং বিরোধও মিটে গেল। কিন্তু এই বিরোধের শাখা-প্রশাখাগুলোয় সংঘাতের জের দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত থাকলো। এমনটা দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে। অনুসন্ধান করলে এরকম অনেক উদাহরণ মিলবে।
ক্ষতিকারক কালচার
একজন রাজনৈতিক এক্টিভিস্টের মৃত্যু কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, এর ফলে একটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এর মানে সেই পরিবার সমাজের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এমনিভাবে রাজনৈতিক কারণে কারো বাড়ি ঘর ও সম্পদের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অর্থ হলো তাকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা। এর অর্থ রাজনৈতিক কারণে একটি প্রতিহিংসামূলক ঘটনা পাল্টা প্রতিহিংসার জন্ম দিতে পারে। একে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
যারা রাজনীতি করেন, তারা তো কোনো একটা সমাজেই বাস করেন। উল্টো করে বললে যারা সমাজে বাস করেন, তারাই তো রাজনীতি করেন। অর্থাৎ সমাজ ও রাজনীতিতে পরস্পরের পরিপূরক হয়ে বাস করেন একই মানুষ। এখন কেউ যদি রাজনৈতিক মতাদর্শগত কারণে তার প্রতিপক্ষের যে কোনো প্রকার ক্ষতি করে, তাহলে সমাজেরই ক্ষতি করা হলো।
দলীয় বিরোধের কারণে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করার যে কালচার গড়ে তোলা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে সেটি খুবই সাময়িক স্বার্থের বিষয়। কিন্তু এর ক্ষতির জের দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে। এটি সত্য যে, আক্রমণকারী এবং আক্রান্ত দিন শেষে উভয়েই হয় পরস্পরের আত্মীয় অথবা প্রতিবেশী কিংবা একই সমাজের মানুষ। এই সাময়িক স্বার্থের জন্য একে অপরকে দুশমনে পরিণত করার কোনো মানে হয় না।
সাম্প্রতিক কিছু উদাহরণ
রাজনৈতিক ক্ষমতার বাগডোর হাতে এসে গেলে মানুষ কী রকম মানসিকতার অধিকারী হতে পারে, তার কিছু নমুনা দেয়া যেতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এসব ঘটনা সংঘটিত হয়। এগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে নেয়া।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার ইফতারের পর চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের হাসাদহ বাজারের কামিল মাদরাসা গেটের সামনে বিএনপির হামলায় আহত ইউনিয়ন আমীর মফিজুর রহমানের ভাই হাফিজুর রহমান শাহাদাত বরণ করেন। এছাড়া ওই হামলায় জামায়াতে ইসলামীর অনেক নেতাকর্মী আহত হন। সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এ সংঘর্ষ ঘটে বলে জানায় পুলিশ।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঝালকাঠির রাজাপুরে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেয়ার জেরে তিন নারীকে পিটিয়ে জখম করার অভিযোগ ওঠে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ঝালকাঠি আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছে আহতদের পরিবার। আহতরা হলেনÑ সুফিয়া বেগম, মরিয়ম বেগম ও তাছলিমা বেগম। সম্পর্কে তারা মা-মেয়ে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহতদের উদ্ধার করে রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায়। চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে সুফিয়া বেগম ও তাছলিমা বেগমকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। তবে মরিয়ম বেগমের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়। এ বিষয়ে স্থানীয় বিএনপির দাবি, দীর্ঘদিন ধরে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের ধারাবাহিকতায় এ ঘটনা ঘটে।
এর আগে ১৩ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে স্বামীর নিষেধ অমান্য করে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেয়ার অভিযোগে শিবগঞ্জ পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের শেখটোলা তর্তিপুর রোড এলাকায় তারাফুল খাতুন নামে এক গৃহবধূকে তালাক দেয়ার ঘটনা ঘটে। তারাফুল খাতুনের স্বামী সৈবুর রহমান স্থানীয় বিএনপির কর্মী। দম্পতির সংসারে দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, সন্তানদের সঙ্গে তারাফুল খাতুন এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি তারাফুল খাতুন জানান, ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সময় স্বামী তাকে বলেছেন, ‘সব ঠিক থাকে যেন’। তবে তিনি দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছেন। আগে জামায়াতের বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশ নেয়ার বিষয়টি স্বামী জানতেন। কিন্তু স্থানীয়দের কথার প্রভাবেই তিনি তাকে তালাক দিয়েছেন। তারাফুলের ছেলে তারিফ হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে তারা ফুফুর বাড়িতে আছে। স্বামী পরে নিজের ভুল স্বীকার করেছেন, তবে তার মা সংসারে ফিরে যেতে চান না।’
কুমিল্লায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসব বিএনপি নেতাকর্মীর স্ত্রী দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছেন তাদেরকে তালাক দেয়ার জন্য গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বুধবার নির্দেশ দেন কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য। বুধবার রাতে ওই সংসদ সদস্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এর আগে মঙ্গলবার বিকেলে লালমাই উপজেলার বাগমারা বাজারে নেতাকর্মীদের এ নির্দেশ দেন মোবাশ্বের আলম। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমার দলে কিছু মোনাফিক আছে, যারা বিএনপি করে, কিন্তু ভোট দিয়েছে দাঁড়িপাল্লায়। অর্থ দিয়েও জামায়াতকে সহযোগিতা করেছে। আবার কেউ কেউ আছে, যারা বিএনপি নেতা হলেও তাদের বউ ভোট দিয়েছে জামায়াতকে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি বাগেরহাট সদর, মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলায় অন্তত ২০টি বসতবাড়ি ভাঙচুর ও তছনছ করে প্রতিপক্ষ। এ নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের মান্দ্রা গ্রামে ওয়ার্ড জামায়াতের সেক্রেটারি কারি মোল্লা, জামায়াতের কর্মী জাহাঙ্গীর শেখ, ইয়াকুব আলী হাওলাদার, মশিউর রহমানসহ পাঁচ-ছয়জনের বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়। এছাড়া মোরেলগঞ্জ-শরণখোলায় বিএনপির পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মারধর ও হুমকি দেয়ার অভিযোগ করেন ওই আসনের বিজয়ী প্রার্থী আবদুল আলীম। কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বিজয়ী প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ও পরাজিত প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। বাজিতপুর উপজেলার হুমায়ুনপুর ইউনিয়নের হুমায়ুনপুর গ্রামের এ সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন। তাদের মধ্যে চারজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। ঝিনাইদহ জেলায় ৫টি সহিংসতায় অন্তত ২৬ জন আহত হন। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প, সমর্থকদের বাড়িঘর ও প্রেস ক্লাবে ভাঙচুর চালানো হয়। শৈলকুপা, ঝিনাইদহ সদর, মহেশপুর ও কালীগঞ্জে এসব পাল্টাপাল্টি হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার ভাষ্য, শৈলকুপা উপজেলার ত্রিবেনি ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামে বিএনপির নেতা মধু মোল্লা ও তপনের সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১৩ জন আহত হন। কালীগঞ্জ শহরের নিমতলা বাসস্ট্যান্ডের বাজার রোডে ঝিনাইদহ-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলামের নির্বাচনী ক্যাম্পে হামলার পর ভাঙচুর করা হয়। এ সময় খোকন, ইভন ও জবেদ আলী নামের বিএনপির তিন নেতাকর্মীকে পিটিয়ে জখম করা হয়। তাদের মধ্যে জবেদকে যশোর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। তিনি কালীগঞ্জ পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। একই সময়ে সদর উপজেলার নলডঙ্গা ইউনিয়নের ভিটশ্বর গ্রামে কাপ পিরিচ প্রতীকের সমর্থকদের ওপর হামলা ও বাড়িঘর ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ উঠে ধানের শীষের সমর্থকদের বিরুদ্ধে। এতে পাঁচজন আহত হন।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দেশজুড়ে হামলা ও সহিংসতার ২১টি ঘটনার তালিকা প্রকাশ করে জামায়াতে ইসলামী। ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া এক পোস্টে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়। কুড়িগ্রামে ভোট নিয়ে তর্কের জেরে এক জামায়াত নেতাকে কুপিয়ে জখম করার ঘটনা উল্লেখ করা হয়। খুলনায় এক শিক্ষার্থীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও তার পরিবারের সদস্যদের মারধরের অভিযোগ আনা হয়। পাটগ্রামে বাড়িতে ঢুকে লুটপাট, বরিশালে রাজনৈতিক পরিচয়ের জেরে হামলা এবং চট্টগ্রামে সাবেক শিবির নেতার বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনাও তালিকায় রয়েছে। চকরিয়ায় জামায়াত নেতার বাড়িতে দফায় দফায় হামলা, কুষ্টিয়ায় এনসিপি নেতার বাসভবনে হামলা এবং ফেনীতে জামায়াত কর্মীদের বাড়িতে আক্রমণের অভিযোগও তুলে ধরা হয়। সিরাজগঞ্জে জামায়াত আমিরের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, সন্দ্বীপে জামায়াত নেতাদের বাড়িতে হামলা এবং দিরাই পৌরশহরে এক জামায়াত নেতার ওপর শারীরিক আক্রমণের ঘটনা ঘটে। গোপালগঞ্জে এক জামায়াত নেতার বাড়িতে হামলা এবং বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের যৌথ হামলায় এক শিবির কর্মী আহত হওয়ার অভিযোগও প্রকাশিত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আওয়ামী নৃশংসতা
এর আগে আওয়ামী আমলে ভোট দেয়াকে কেন্দ্র করে তাদের ভয়ানক নৃশংসতার ঘটনার খবর পাওয়া যায়। যেমন একটি ঘটনায় দেখা যায়, ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর নোয়াখালীর সুবর্ণচরে চার সন্তানের এক জননীকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ১০-১২ কর্মী মিলে গণধর্ষণ করার অভিযোগ ওঠে। গুরুতর আহত অবস্থায় নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৩৫ বছরের ওই নারীর অভিযোগ, নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেয়ায় তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। চর জুবিলী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য রুহুল আমীনের নেতৃত্বে এই পাশবিক কাজ করা হয় বলে জানান ওই নারী। তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে ভোট দেয়ার জন্য জোর করেছিল, কিন্তু আমি তাদের কথা না শুনে ধানের শীষে ভোট দিয়েছি।’ রুহুল আমীনের রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাইলে, তিনি সুবর্ণচর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন বলে জানান।
ঘটনার বর্ণনায় ভুক্তভোগী নারী জানান, ‘ঐদিন মধ্যরাতের পর ১০ থেকে ১২ জন লোক হাতে লাঠিসোঁটা নিয়ে বেড়া কেটে তার বাড়িতে ঢোকে। তারপর তারা তার সিএনজি-চালিত অটোরিকশার ড্রাইভার স্বামী ও চার সন্তানকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে। এরপর তারা আমাকে বাইরে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এ বিষয়ে মুখ খুললে তার স্বামী ও সন্তানদের মেরে ফেলা হবে এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হবে বলে হুমকি দেয় ধর্ষণকারীরা।’
অন্য একটি ঘটনায় দেখা যায়, সংসদ নির্বাচনে বিরোধী বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট দেয়ায় এর খেসারত দিতে হয় রাজশাহীর তানোর উপজেলার একটি গ্রামকে। রাজশাহী-১ আসনের কলমা গ্রামটিতে রয়েছেন ২ হাজার ৪৩৫ জন ভোটার। কলমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট পড়েছিল ১ হাজার ৯১৪টি। এর মধ্যে ১ হাজার ২৪৯ ভোট পেয়েছিলেন বিএনপির প্রার্থী আমিনুল হক এবং ৬৫৩টি ভোট পেয়েছিলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ওমর ফারুক চৌধুরী। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, ভোটের পরদিনই লাঠিসোঁটা নিয়ে আওয়ামী লীগের লোকেরা অবস্থান নেন গ্রামের প্রবেশ পথ দুটিতে। বিল্লি এবং দরগাডাঙ্গা মোড়ে অবস্থান নিয়ে তারা গ্রামের দিকে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেন। এমনকি বাইসাইকেল ও রিকশা-ভ্যানের চলাচলও বন্ধ করে দেয়া হয়। তারা বলেন, আওয়ামী লীগের লোকেরা গ্রামের সেচকাজে ব্যবহৃত গভীর নলকূপটিও দখল করে নিয়েছেন। এছাড়া বন্ধ করে দিয়েছেন টেলিভিশনের স্যাটেলাইট সংযোগ।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যা কিছুই ঘটুক না কেন, তার সুরাহার জন্য আইন-আদালত আছে। কিন্তু কিছু মানুষ যেন শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরিবর্তে শক্তি প্রয়োগ এবং আদালতের বারান্দায় সময় কাটাতেই বেশি আগ্রহী।
সরকারের দায়িত্ব যেমন রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অটুট রাখতে সবরকম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাখা, তেমনি সমাজে যাতে শান্তি ও স্বাভাবিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাও সমান দায়িত্ব। বিশেষ করে সামাজিক শান্তি-অশান্তির বিষয়টি নাগরিকরা প্রতিনিয়ত টের পায় বলে এটি তাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে।
আওয়ামী দুঃশাসনের অবসানের পর একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে আসবে বলে মানুষ আশাবাদী হয়ে আছে। এর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ায় একটি সহনশীল সামাজিক পরিবেশও তৈরি হতে থাকবে বলে মনে করতে পারি।

সরদার আবদুর রহমান

সম্পর্কিত খবর