আসুন, সবাই মিলে গড়ি প্রিয় বাংলাদেশ
২১ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৪৫
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
গত ৫৫ বছর ধরে আমরা দেশের মানুষ একসাথেই বসবাস করছি। কেউবা চাকরি, কেউবা ছোট-বড় ব্যবসা, আবার কেউবা রিকশা চালিয়ে আবার কেউবা কৃষিকাজ করে জীবন অতিবাহিত করছি। আমাদের দেশে ৯২% মুসলমান হলেও অন্যান্য ধর্মের লোকেরাও একসাথে মিলেই বসবাস করছে। আমার স্কুলজীবনের বন্ধু ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন। তিনি বিচারপতি থাকা অবস্থায়ই আমার দাওয়াতে এসেছিলেন। এখনো যোগাযোগ আছে। স্কুলজীবনে প্রাইমারিতে আমাদের হেড মাস্টার ছিলেন তারাপদ রায়। আর মাধ্যমিকে ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। তাদের সাথে আমাদের ছিল গভীর সম্পর্ক।
আজকে যখন দেখি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বড় উৎসব দুর্গাপূজা। তাদের পূজামণ্ডপ পাহারা বসাতে হয়। কেন এমন হয়। আমাদের যেমন মসজিদ পাহারা দিতে হয় না। তেমনি ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় গেলে মন্দির, প্যাগোডা কোনো ধর্মের উপাসনালয় পাহারা দিতে হবে না, কারণ আমরা যার যার ধর্ম তারা স্বাধীনভাবে পালন করব, তাতে তাদের বাধা দেয়া বা অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ নেই। সবাই এ দেশের নাগরিক। তার ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থানেও স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারবে।
আমাদের দেশে মাঝে মাঝে স্বৈরশাসনের সময় জঙ্গি তকমা দিয়ে কোথাও কোথাও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটানো হয়েছে জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করে, যা ছিল পুরোটাই কাল্পনিক। কোনো একটি ঘটনাও প্রমাণিত হয়নি বা আইনের আওতায় আনতে পারেনি। আমার জানা মতে, শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং তার ছেলে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেনও মুসলমানদের এবং হিন্দুদের ভোট পেয়ে এমপি হয়েছেন। কারণ আমার এলাকায় কোনো দল-মত, ধর্মীয় ভেদাভেদ নেই। প্রখ্যাত আলেম মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও তার ছেলে মাসুদ সাঈদীও হিন্দু-মুসলিম সবার ভোট পেয়ে এমপি হয়েছেন। অর্থাৎ আমি বলতে চাই, জামায়াতের বর্তমান আমীর বলেছেন— সংখ্যালঘু না আমরা সবাই বাংলাদেশি হিসেবেই বসবাস করব আবার অধিকার ভোগ করব।
প্রতিবেশী ভারতে মোদি সরকার সে দেশে বাবরী মসজিদ ভাঙাসহ প্রতিনিয়ত মুসলমানদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করছে। যদিও কয়েকদিন পূর্বে ভারতের হাইকোর্ট রায় দিয়েছে মসজিদের আজান দেয়া বন্ধ করা যাবে না, মুসলমানরা স্বাধীনভাবেই তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতে পারবে। রায়ে এমনও উল্লেখ করা হয়েছে, মসজিদের আশপাশে গান-বাজনা চালানো যাবে না। ভালো উদ্যোগ। তাই তো ভারতের তরুণরা মাঠে নেমেছে সে দেশের ধর্মীয় উগ্রবাদী মোদিকে সরাতে সব দল এক হয়ে। বাংলাদেশে যেমন ছাত্র-জনতা ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে দেশ থেকে তাড়িয়েছে, তেমনি ভারতে তরুণরা মাঠে নেমেছে উগ্রবাদী মোদিকে তাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে। আমরা ভারতের সাধারণ মানুষের ভালো চাই, উন্নতি চাই, স্বাধীনভাবে আমরা সবার সাথে ভালো সম্পর্ক রেখেই দেশ ও জাতির উন্নয়ন চাই।
দুনিয়াতে যেভাবে ভৌগোলিক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তা মহান আল্লাহর রহমতে বাস্তবায়ন হলে দুনিয়ায় ইসলামী শক্তির উত্থান হবে। ইরান যেভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করে দেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে শক্তিধর আমেরিকাকে নাকানি-চুবানি খাওয়াচ্ছে, আমাদের বিশ্বাস অতি শিগগিরই আরব দেশ থেকে আমেরিকার ঘাঁটিগুলো বিদায় নিতে বাধ্য হবে। আমেরিকার অর্থনীতি সামাল দেয়া ট্রাম্পের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই শুধু অপেক্ষার পালা।
আমেরিকার সিআইএ, ইসরাইলের মোসাদ ভারতের ‘র’ কিন্তু বসে নেই। আল্লাহর কাছে শয়তান চেয়েই নিয়েছিল যে, সে আল্লাহর বান্দাদের খারাপ পথে ডাকবে। তাই এখনো ঐ শক্তি বিভিন্ন নামে মুসলমানদের পেছনে, সামনে, ডাইনে, বামে লেগে আছে— মুসলিম জাতিসত্তার যাতে বিকাশ ঘটানো না যায়। নিজেদের মধ্যে বিবাদ-ঝগড়া, স্বার্থের হানাহানি লাগিয়ে দিয়ে ঐক্যের ফাটল লাগিয়েই রাখছে। আমেরিকাকে সৌদি আরবসহ অনেক রাষ্ট্রই তাদের প্রভু হিসেবে মেনে তাদের অর্থ-জ্বালানি দিয়ে তাদের সুরক্ষার নিশ্চয়তা দাবি করে আসছে। কিন্তু এবারের ইরানের সাথে যুদ্ধ আমেরিকার হুঁশ ফিরে আসছে যে, আর মুসলমানদের ভয় দেখিয়ে দাবিয়ে রাখা যাবে না।
তাই তো আমেরিকা এখন রাশিয়া-চীনের কাছে ধরনা দিচ্ছে কীভাবে ইরান ও মুসলিম দেশগুলোকে আয়ত্তে রাখা যায়। মক্কা জোটের শরিকরা সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তানের ভূমিকা জোরদার করতে পারছে না। ইরান চেষ্টা করছে এই জোট যাতে কার্যকরী থাকে। মুসলিম দেশের ঐক্যের প্রতীক ওআইসিকে কার্যকরী করতে পারলেই মুসলমানদের সুদিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে, ইনশাআল্লাহ। আমাদের ঐক্যের বাণীর পেছনে কাউকে না কাউকে তুলে ধরতে হবে। এ ব্যাপারে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগানকে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে। পারমাণবিক শক্তিধর একমাত্র মুসলিম দেশ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অবস্থায় বিদেশিদের থাবা বিস্তার করে রেখেছে। ইমরান খান ও দেশের প্রশাসন এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিরোধ জিইয়ে রেখে পাকিস্তানের শক্তি কাজে লাগাতে পারছে না। এ ব্যাপারে মুসলিম দেশগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে— যাতে করে একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ভালো হয় এবং পাকিস্তানকে আলোচনার মাধ্যমে সরকারি ও বিরোধীদলের মধ্যে আপস রফা করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মুসলিম ঐক্য রাখা যায় এবং তা করতে পারলে দুনিয়াকে শাসন করা সম্ভব হবে।
আমরা যদি বাংলাদেশের দিকে তাকাই, তবে এখানেও বিদেশি শক্তির প্রভাব কাটিয়ে উঠে সরকার দেশ চালাতে পারছে না। ৩৬ জুলাই বিপ্লবের পর দেশের মানুষ আশা করেছিল ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ চালানো সম্ভব হবে। জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে দলগুলোর মধ্যেও জাতীয় ঐক্যের ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল। নির্বাচনের পরপরই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলের প্রধানের বাসায় যাওয়া অন্যান্য দলের সাথে সম্পর্কের আভাস জনগণকে আশান্বিত করেছিল। কিন্তু সরকার গঠনের পরপরই যোগ্য লোকের অভাব পরিলক্ষিত হয়। অনভিজ্ঞ ও চাটুকারীদের প্রাধান্য পাওয়ায় তারেক রহমান তার বাবা শহীদ জিয়াউর রহমান ও মা বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শে দেশ চালাতে পারছেন না। আবার কোনো না কোনো জালে আটকিয়ে দেশকে আবার নতুন স্বৈরতন্ত্রের দিকে অগ্রসর করানো হচ্ছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তার কিছু মন্ত্রীদের আচরণ আগের স্বৈরাচারী হাসিনার কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
তাই বিরোধীদলের নেতা জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান যেমন নিয়মতান্ত্রিকভাবে দেশ চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। আবার অন্যান্য দুর্নীতি-চাঁদাবাজদের ব্যাপারে কঠোর হওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে দেন। আমরা আর সংঘাত, জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতি চাই না। আমাদের যা সম্পদ, জনগণ তরুণ সমাজকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতি, সমাজনীতির উৎস পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে চাই। আর নয় মারামারি, হানাহানি, আমরা আমাদের দেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম নিজ পায়ে দাঁড়ানোর শপথ নিতে চাই। ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্যানেল ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুসহ নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ১ বছরে তাদের কাজ দিয়ে ছাত্রদের পড়াশোনার মান বৃদ্ধি, হলে খাওয়া-দাওয়ার সুব্যবস্থা, যাতায়াতের ভালো ব্যবস্থা, আবাসিক হলের উন্নতি এবং নতুন হল নির্মাণকাজের অগ্রগতি, ছাত্রীদের নিরাপদে ক্লাস ও হলে থাকার ব্যবস্থাসহ সব কাজের উন্নতি করার উদ্যোগ নিয়ে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে এবং হচ্ছে তাদের যোগ্যতা দুর্নীতিমুক্ত ব্যবহার দিয়ে। তাই আমরা আগামী দিনে সরকারি ও বিরোধীদলের ঐক্যের মাধ্যমেই আমরা আমাদের জাতীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নিই, তবে ৩৬ জুলাইয়ের ঐক্যের মতোই আমরা ছাত্র-জনতার ঐক্য গড়ে তুলতে পারবো এবং জাতিকে একটি উন্নতমানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে পারবো। আর বিভেদ নয়, জাতীয় ঐক্যই আমাদের উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। এ সুযোগ কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই।
যেহেতু আমাদের বিষয় হলো সবাই মিলেই দেশ গড়তে হবে। কিন্তু কয়েকদিন হলো সরকারি দলের কিছু লোকজন আত্মকেন্দ্রিক কথাবার্তা শুরু করেছেন। আমাদের সরকারি দলের চিফ হুইপ তার এলাকায় গিয়ে বলেই ফেললেন, স্থানীয় নির্বাচনে বিরোধীদলের লোকেরা ভোটে জিতলে এলাকার উন্নয়নে টাকা পাওয়া যাবে না। বেসামাল কথা। ওনার এলাকায় শুধু কি সরকারি দলের লোকেরাই বাস করে? আমার জানামতে, তিনি খুবই কম ভোটে জিতেছেন। সেখানে বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ, অমুসলিম জনশক্তি নিয়েই সংসদীয় এলাকা। আমরা আবার হাসিনার স্বৈরশাসনের দিকে এগোচ্ছি। তেমনিভাবে সরকারের সর্বোচ্চ পদে থেকে যদি বলা হয়, উপনির্বাচনে বিরোধীদলের প্রার্থীকে ঠেকাতে হবে। খুবই আপত্তিজনক কথা। তিনিই কিন্তু ৩৬ জুলাইয়ে বলেছিলেন, আমরা ছাত্রদের আন্দোলনের সাথে নেই। ক্ষমতার মসনদে এসেই দলীয় স্বৈরতন্ত্রে ফিরে যাওয়া যাবে না। বিরোধীদলের নেতা জামায়াতের আমীর কিন্তু কঠোর ভাষায় স্বৈরাশাসনের দিকে ফিরে যাওয়ার বিরোধিতা করে বক্তব্য দিয়েছেন। আমরাও মনে করি, দেশের ছাত্র-জনতা সচেতন। কোনো স্বৈরশাসন আর আমরা দেখতে চাই না। আপনি একজন রিকশা চালক, পান বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলেই টের পাবেন বর্তমান সরকারের গ্রহণযোগ্যতা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে?
প্রধানমন্ত্রী যদিও তাদের সংসদীয় কমিটি বৈঠকে চাঁদাবাজ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার জন্য নেতাকর্মীদের বলেছেন। আবার তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালগুলোয় হঠাৎ করেই পরিদর্শনে গিয়েছেন এবং অনিয়মের প্রতি কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে সরকারি নিয়োগের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান পিএসসির সদস্যদের পদত্যাগে বাধ্য করছেন, যা খুবই খারাপ দৃষ্টান্ত। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ করি। জুলাই ৩৬ হয়েছিল মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার জন্যই।
নিয়োগের ক্ষেত্রে এসব জায়গায় মেধার গুরুত্ব দিতে হবে। সততা ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যক্তিদেরই সরকারি সবক্ষেত্রে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সরকারি দল নাকি স্বচ্ছ লোক খুঁজছে দল পুনর্গঠনের জন্য পত্রিকায় দেখলাম। ভালো কথা। সরকার প্রধানের বাবা এবং মা কিন্তু দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিলেন অন্য দলের লোক থেকে। ফলও পেয়েছিলেন। বাংলাদেশে ভালো, সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত লোকের অভাব নেই। চাই সততার সাথে কাজ করার মানসিকতা। আমরা ছোট দেশ হয়েও আমাদের জনসম্পদ, সমুদ্রবন্দর কাজে লাগিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ চালাতে পারলে গরিব দেশের কলঙ্ক মুছে ফেলতে পারবো। যে মহান আল্লাহ ৫ আগস্ট ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। সেই আল্লাহই আমাদের ১৮ কোটি মানুষকে হেফাজত করবেন, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com¬