মিরসরাইয়ে পাহাড়-ঝর্ণা-সাগরে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা


৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৮:৫০

মো. ছায়েফ উল্লাহ, মিরসরাই : পাহাড়, ঝর্ণা, বন, সাগর ও জলাশয়—প্রকৃতির বিচিত্র রূপ যেন একসঙ্গে ধরা দিয়েছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে। ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে মিরসরাই এখন দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন উপজেলা হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। প্রতি বছরই বাড়ছে পর্যটকের আনাগোনা। বিশেষ করে পাহাড়ি ঝর্ণা, মহামায়া ইকো পার্ক, উপকূলীয় এলাকা ও নতুন নতুন বিনোদনকেন্দ্র ঘিরে তৈরি হচ্ছে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা। উপজেলার একদিকে পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ ঝর্ণার জলধারা অন্যদিকে রয়েছে বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপকূল, নদী, জলাভূমি ও সবুজ প্রকৃতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক ও পরিকল্পিত বিনোদনকেন্দ্র। ফলে মিরসরাইয়ের পর্যটন এখন আর শুধু পাহাড় ও ঝর্ণাকেন্দ্রিক নয়, বরং প্রকৃতি, সমুদ্র, জলাশয় এবং বিনোদন কেন্দ্রের সমন্বয়ে বহুমাত্রিক রূপ পেয়েছে।
মিরসরাইয়ের পর্যটন বলতে প্রথম সারিতেই আসে মহামায়া ইকো পার্ক। পাহাড়, লেক, ঝর্ণা ও সবুজ বনভূমির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই পর্যটনকেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরেই প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয়। বিশেষ করে ছুটির দিন ও বিভিন্ন উৎসবে পরিবার, বন্ধু ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে মহামায়া। লেকের নীল জল, পাহাড়ের সবুজ আর নিরিবিলি পরিবেশ দর্শনার্থীদের প্রকৃতির খুব কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। নৌভ্রমণ, পাহাড়ি পরিবেশ ও সবুজের সমারোহ মিলিয়ে মহামায়া হয়ে উঠেছে মীরসরাইয়ের অন্যতম পরিচিত পর্যটন আকর্ষণ।
দেশজুড়ে মীরসরাইয়ের পর্যটন পরিচিতিকে আরও বিস্তৃত করেছে খৈয়াছড়া ঝর্ণা। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ঝর্ণার কাছে পৌঁছানোর রোমাঞ্চ এবং কয়েক ধাপে নেমে আসা ঝর্ণার পানির অপরূপ দৃশ্য পর্যটকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। তরুণদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেও খৈয়াছড়া এখন পরিচিত একটি গন্তব্য। একইভাবে রূপসী ঝর্ণা ও নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা মিরসরাইয়ের পাহাড়ি পর্যটনে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। এসব ঝর্ণাকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে গাইড, পরিবহন, খাবার ও অন্যান্য সেবার ব্যবস্থা। ফলে পর্যটনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ।
মিরসরাইয়ের পর্যটনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চল। মুহুরী প্রজেক্টের বিস্তীর্ণ জলরাশি, নদী ও সবুজ প্রকৃতি দীর্ঘদিন ধরেই দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে আসছে।
এর পাশাপাশি সাগরপাড়ে গড়ে ওঠা কয়েকটি নতুন বিচ পয়েন্ট মিরসরাইয়ের পর্যটন মানচিত্রকে আরও বিস্তৃত করেছে। সমুদ্রের ঢেউ, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ কিংবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অবসর কাটাতে এসব এলাকায় মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
প্রকৃতির পাশাপাশি মিরসরাইয়ে আধুনিক বিনোদনকেন্দ্রও পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পাহাড় ও প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিকল্পিত পরিবেশের সমন্বয়ে প্রজেক্ট সোনাপাহাড় ইতোমধ্যে দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় একটি স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
অন্যদিকে শিশু ও তরুণদের বিনোদনের কথা মাথায় রেখে গড়ে উঠেছে আরশিনগর ফিউচার পার্ক। বিভিন্ন বিনোদন উপকরণ ও খোলামেলা পরিবেশের কারণে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষের কাছেও এটি ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠছে। ফলে মিরসরাইয়ের পর্যটন এখন পাহাড়-ঝর্ণার গণ্ডি পেরিয়ে প্রকৃতি, সমুদ্র, জলাশয় ও আধুনিক বিনোদনের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, মিরসরাইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো একই উপজেলায় এত বৈচিত্র্যময় পর্যটন উপাদানের উপস্থিতি। একজন পর্যটক পাহাড়ি ঝর্ণা দেখতে এসে একই ভ্রমণে মহামায়া, সমুদ্রসৈকত কিংবা অন্যান্য বিনোদনকেন্দ্র ঘুরে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।
এ কারণে মিরসরাইকে কেন্দ্র করে শুধু এক দিনের ভ্রমণ নয়, বরং দুই থেকে চার দিনের পর্যটন পরিকল্পনাও করা সম্ভব। তবে এজন্য প্রয়োজন পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং পর্যটকবান্ধব অবকাঠামো।
মিরসরাইয়ের পর্যটন সম্ভাবনার সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতির সম্পর্কও দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পর্যটকদের যাতায়াতকে কেন্দ্র করে পরিবহন, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, চা ও খাবারের দোকান, স্থানীয় পণ্য বিক্রি, গাইড সেবা এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার ঘটছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়ছে। ফলে পাহাড়ের ঝর্ণা কিংবা সাগরের ঢেউ শুধু দর্শনার্থীদের বিনোদনই দিচ্ছে না, এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও আয়ও যুক্ত হচ্ছে।
সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট ও প্রাণ-প্রকৃতিবিষয়ক লেখক মঈনুল হোসেন টিপু বলেন, ‘মিরসরাই পর্যটনের জন্য অপার সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র। মিরসরাইয়ের পর্যটন খাতকে আরও সমৃদ্ধ করতে প্রশাসনিকভাবে এর ব্র্যান্ডিং জরুরি। পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইকো ট্যুরিজম বাস্তবায়নও সময়ের দাবি।’
তিনি বলেন, পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদেরও পর্যটকদের স্বার্থরক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। পাশাপাশি ভালো আবাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে পর্যটকরা দুই থেকে চার দিনের ট্যুর প্ল্যান করতে পারবেন।
মঈনুল হোসেন টিপু আরও বলেন, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা গেলে মিরসরাই ভবিষ্যতে চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে। একইসঙ্গে এটি দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
এ বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার বলেন, মিরসরাইয়ের পর্যটন খাত প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ হচ্ছে। স্থানীয় ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়ে পর্যটকদের নিরাপত্তা জোরদারে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, অনেকেই পর্যটনকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, যা ইতিবাচক। বিভিন্ন ঝর্ণার ইজারাদার ও পর্যটন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদেরও পর্যটকবান্ধব হতে হবে।
ইউএনও আরও বলেন, আবাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ব্যক্তি উদ্যোগে উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে এ খাত আরও সমৃদ্ধ হবে।
সব মিলিয়ে পাহাড়, ঝর্ণা, বন, সাগর ও আধুনিক বিনোদনকেন্দ্রের সমন্বয়ে মিরসরাইয়ের পর্যটন সম্ভাবনা দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামো নিশ্চিত করা। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে মিরসরাই শুধু চট্টগ্রামের নয়, দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।