আলোকে তিমিরে

টেকসই সরকার কাঠামো গড়তে রাজনৈতিক দলের সমঝোতা চাই


৭ অক্টোবর ২০২৬ ২০:২৭

বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি এখন আর শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একটি দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। নির্বাচন হতে হয় অবাধ, সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক; একইসঙ্গে নির্বাচনের আগে ও পরে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক থাকতে হয়। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন হয়েছে বহুবার, কিন্তু নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা, ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি।
ফলে দেশের সামনে এখন প্রধান প্রশ্ন হওয়া উচিত— কীভাবে এমন একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, যেখানে সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবে, বিরোধীদল সরকারের সমালোচনা করতে পারবে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করবে এবং নাগরিকের অধিকার ক্ষমতাসীন ও বিরোধী— উভয় পক্ষের কাছেই সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে।
শুধু নির্বাচন নয়, দরকার গণতান্ত্রিক কাঠামো
গণতন্ত্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান উপাদান নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচন গণতন্ত্রের শুরু, শেষ নয়। একটি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার থাকলেই নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার পূর্ণ হয় না। নাগরিককে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠন করার স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হয়।
দেশে গণতন্ত্রকে টেকসই করতে হলে তাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করা। নির্বাচনের সময় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে শুধু সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন করলেই হবে না; বাস্তব কাজেও তাকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস থাকলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই নির্বাচনের আগে যেমন সব দলের জন্য সমান সুযোগ দরকার, তেমনি নির্বাচনের পর বিজয়ী ও পরাজিত— উভয় পক্ষকেই ফলাফল মেনে নেওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
নির্বাচনকালীন ব্যবস্থায় আস্থা জরুরি
দেশের রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা। অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে দেশ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। আবার এই ব্যবস্থার সাংবিধানিক বৈধতা ও রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়েও বিতর্ক হয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতায় যে ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হোক, তার প্রধান শর্ত হওয়া উচিত— নির্বাচন পরিচালনাকারী রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর জনগণের আস্থা। নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা প্রয়োজন। কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচনব্যবস্থা তৈরি করা হলে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে না।
এক্ষেত্রে একটি সর্বদলীয় রাজনৈতিক সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সংলাপের উদ্দেশ্য শুধু পরবর্তী নির্বাচন কীভাবে হবে তা নির্ধারণ করা নয়; বরং আগামী কয়েক দশকের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী কাঠামো তৈরি করা। সেই কাঠামোয় নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ, প্রশাসনের ভূমিকা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা, নির্বাচনী অর্থায়ন এবং ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা— সবকিছু নিয়ে সুস্পষ্ট বিধান থাকা দরকার।
নির্বাচন কমিশনকে সত্যিকারের স্বাধীন করতে হবে
গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। আর বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন অপরিহার্য। কমিশনের সদস্য নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া দরকার। শুধু নিয়োগের সময় নয়, কমিশনের দৈনন্দিন কার্যক্রমেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা বাস্তবে কার্যকর করা, প্রার্থীদের অর্থের উৎস প্রকাশ করা, কালো টাকা ও অবৈধ প্রভাব প্রতিরোধ করা এবং নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে, তবে প্রযুক্তি যেন স্বচ্ছতা বাড়ায়— অবিশ্বাস নয়— সেদিকেও নজর দিতে হবে।
সংসদকে কার্যকর করতে হবে
দেশে গণতন্ত্রের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো সংসদীয় রাজনীতির মান। সংসদ কেবল আইন পাস করার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রধান সাংবিধানিক মঞ্চ। একটি কার্যকর সংসদে বিরোধীদলের যথাযথ ভূমিকা থাকতে হবে। সংসদীয় কমিটিগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। সরকারি অর্থের ব্যবহার, বড় প্রকল্প, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও নীতিনির্ধারণের ওপর সংসদীয় নজরদারি কার্যকর হওয়া দরকার।
একইসঙ্গে সংসদ সদস্যদের দলীয় আনুগত্য ও ব্যক্তিগত বিবেকের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। গণতন্ত্রে দল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্যের জনগণের প্রতিও জবাবদিহি রয়েছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অপরিহার্য
গণতন্ত্র টেকসই হয় তখনই, যখন একজন সাধারণ নাগরিকও বিশ্বাস করতে পারেন যে ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও তিনি ন্যায়বিচার পাবেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তাই গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত। বিচারক নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং পেশাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
একইভাবে দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা, আইনি সহায়তা সম্প্রসারণ এবং নিম্ন আদালতের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। আইনের শাসন কেবল সংবিধান ও আইনের বইয়ে থাকলে হবে না; সাধারণ মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রতিফলন থাকতে হবে।
রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা
গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোর একটি হতে পারে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক দলীয়করণ থেকে মুক্ত করা। প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সাংবিধানিক সংস্থার কর্মকর্তারা যদি মনে করেন যে, রাজনৈতিক আনুগত্য ছাড়া পেশাগতভাবে টিকে থাকা কঠিন, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হবেই।
তাই নিয়োগ ও পদোন্নতিতে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতাকে প্রধান মানদণ্ড করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় যেন কারো সুবিধা বা অসুবিধার কারণ না হয়— এই নীতি বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা দরকার।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন গণমাধ্যম
গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমকে সরকারের প্রশংসা করার জন্য নয়, বরং সরকারের কর্মকাণ্ডের প্রশ্ন তোলার জন্যও স্বাধীন থাকতে হয়। একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারে। তবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে পেশাগত দায়িত্বও যুক্ত। ভুল তথ্য, গুজব, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার কিংবা ব্যক্তিগত চরিত্রহননকে সাংবাদিকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
রাষ্ট্রের উচিত সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিবেশ সৃষ্টি করা। একইসঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, তথ্যের অধিকার এবং উৎস সুরক্ষার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরেও গণতন্ত্র দরকার
বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আলোচনা করতে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। অথচ যে রাজনৈতিক দল নিজের ভেতরে মতের ভিন্নতা সহ্য করতে পারে না, ক্ষমতায় গেলে সেই দল রাষ্ট্রে ভিন্নমত কতটা সহ্য করবে— এ প্রশ্ন থেকেই যায়।
রাজনৈতিক দলগুলোর নিয়মিত সম্মেলন, নেতৃত্ব নির্বাচনে অংশগ্রহণ, তৃণমূলের মতামতের গুরুত্ব এবং দলের অর্থনৈতিক হিসাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা দরকার। দলে ভিন্নমত প্রকাশকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে গণতান্ত্রিক মতপার্থক্য হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দেশদ্রোহী বা রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর।
তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে
বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু তরুণদের যদি শুধু নির্বাচনের সময় ভোটার হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তাদের সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংগঠন, সামাজিক সংগঠন এবং নীতিনির্ধারণের বিভিন্ন পর্যায়ে তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। তাদের রাজনৈতিক শিক্ষা ও নাগরিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মতপ্রকাশের নিরাপদ পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র শুধু সংসদে শেখা যায় না; পরিবার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানেও গণতান্ত্রিক আচরণ চর্চা করতে হয়।
স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা
ঢাকাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গণতন্ত্রকে গভীরভাবে প্রোথিত করতে পারে না। জনগণের দৈনন্দিন জীবনের অধিকাংশ সমস্যা স্থানীয় পর্যায়ে সৃষ্টি হয় এবং সমাধানও স্থানীয় পর্যায়েই হওয়া উচিত। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনকে কার্যকর আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দিতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি তাদের কাজ করার বাস্তব ক্ষমতাও দিতে হবে। স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হলে জনগণ সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। এতে গণতন্ত্র কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না।
দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা
দুর্নীতি গণতন্ত্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে। নির্বাচনে অর্থের প্রভাব, সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, নিয়োগে দুর্নীতি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের বিনিময়ে সুবিধা— এসব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষয় করে। দুর্নীতি দমন করতে হলে কেবল দুর্নীতির মামলা করলেই হবে না। সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা, প্রকল্প বাস্তবায়ন, সম্পদের হিসাব এবং রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা আনতে হবে।
দুর্নীতি দমনকারী প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাগতভাবে শক্তিশালী করতে হবে। দুর্নীতির অভিযোগ যেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় শর্ত রাজনৈতিক সমঝোতা
সব শেষে বলতে হয়, কোনো আইন বা প্রতিষ্ঠান একা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংকট সমাধান করতে পারবে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য। গণতন্ত্রে ক্ষমতায় থাকা দল যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিরোধীদলও গুরুত্বপূর্ণ। আজ যে দল ক্ষমতায়, আগামীকাল তারা বিরোধীদলে যেতে পারে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এমন নিয়ম তৈরি করা, যা ক্ষমতায় ও বিরোধী— দুই অবস্থাতেই সবার জন্য গ্রহণযোগ্য।
ক্ষমতার পরিবর্তনকে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংকট হিসেবে না দেখে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। নির্বাচনে হারলে সরকার পরিবর্তন হবে— এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু নির্বাচনে জয়ী হলে বিরোধীদের অস্তিত্ব অস্বীকার করা যাবে না; আবার বিরোধীদলেও নির্বাচিত সরকারকে অকার্যকর করে দেওয়ার রাজনীতি করা উচিত নয়।
এখন কী করা দরকার?
বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনর্গঠন বা শক্তিশালী করার জন্য কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে—
প্রথমত, সব রাজনৈতিক পক্ষের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় রাজনৈতিক সংলাপ শুরু করা।
দ্বিতীয়ত, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর স্বাধীনতা দেওয়া।
তৃতীয়ত, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার করা।
চতুর্থত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ নিশ্চিত করা।
পঞ্চমত, সংসদীয় কমিটি ও বিরোধীদলের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা।
ষষ্ঠত, সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা রক্ষা করা।
সপ্তমত, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
অষ্টমত, স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতায়ন করা।
নবমত, দুর্নীতি দমন ও রাষ্ট্রের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানো।
এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে রাজনৈতিক সহনশীলতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা।
সব শেষে বলা যায়, বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো জাদুকরী পদ্ধতি নেই। একটি নির্বাচন, একটি সরকার, একটি আইন কিংবা একটি রাজনৈতিক দল একা গণতন্ত্রকে স্থায়ী করতে পারে না। গণতন্ত্র একটি চলমান প্রক্রিয়া— যেখানে নির্বাচন, আইনের শাসন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং জবাবদিহি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করা। যে সংস্কৃতিতে ক্ষমতা হবে জনগণের অর্পিত দায়িত্ব, রাষ্ট্র হবে কোনো দলের সম্পত্তি নয়, বিরোধী মত হবে শত্রুতা নয় এবং নির্বাচন হবে ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়— জনগণের রায় গ্রহণের সাংবিধানিক পথ।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্ত তাই শুধু ব্যালট বাক্স নয়; জনগণের আস্থা। সেই আস্থা অর্জন করতে হলে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়— তারা জনগণের।
বাংলাদেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে তখনই, যখন ক্ষমতার পরিবর্তন হবে শান্তিপূর্ণভাবে, বিরোধী মত নিরাপদ থাকবে, নাগরিক তার অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রের কাছে দাঁড়াতে পারবে এবং কোনো সরকারই নিজেকে জনগণের ঊর্ধ্বে মনে করবে না।
অতএব বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্র থেকে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক গণতন্ত্রে উত্তরণ। অবাধ নির্বাচন হবে তার প্রবেশদ্বার, আইনের শাসন হবে ভিত্তি, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হবে স্তম্ভ এবং জনগণের অধিকার হবে পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। এই চারটি উপাদানকে সমন্বিত করতে পারলেই বাংলাদেশে গণতন্ত্র কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হতে পারে।