জনগণের চাওয়া ও পাওয়া মিলছেই না
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:৪৭
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
সময়ের পালাবদলে সরকার যায় ও আসে— কিন্তু জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। ছোট থেকে বড়; খেটে খাওয়া মানুষ তো সারা দিন কাজ করে বাসায় ফিরে স্বস্তির সাথে এক মুঠো ভাত খেয়ে ঘুমাবে তার আয়োজনে ভাটা পড়েছে। বাজারে গেলে নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে চাল, ডাল, মাছ-গোশতের দাম কোনোভাবেই গ্রাহকদের নাগালের মধ্যে থাকছে না।
জ্বালানি তেলের দাম লাফ দিয়ে ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে যানবাহনের খরচের সাথে তাল মিলিয়ে ভোগ্যপণ্যের দামও বেড়ে গেছে। তারপরে চাঁদাবাজির খাত তো রয়েই গেছে। পথে-ঘাটে-বাজারে উৎপাদনকারীদের থেকে পাইকারদের কাছ থেকে পণ্য ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছালে জায়গায় জায়গায় চাঁদাবাজদের খপ্পরে পড়তে হয়। সড়কপথ, নৌপথ যেন চাঁদাবাজদের বাপ-দাদার সম্পত্তি হিসেবে চলে আসছে। পণ্য উৎপাদনকারী থেকে পণ্য ভোগকারীদের কাছে পৌঁছাতে চাঁদার কারণে দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়, যা কোনো মতেই সভ্য-স্বাধীন দেশে চলতে পারে না। এর প্রতিবাদে সোচ্চার হতে হবে। প্রশাসনকে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে। শুধু মুখে নয়, কাজে প্রমাণ করতে হবে জনগণের টাকায় প্রশাসন চললেও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে তাদের ভূমিকা আরো জোরালো হতে হবে। কঠোর হাতে দমন করতে হবে সর্বক্ষেত্রে চাঁদাবাজি।
আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, দখল-বাণিজ্য, ছিনতাই, খুন-খারাবি কোনোটাই সরকার নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। প্রকাশ্যে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ পাশে জাসদের অফিসে পলাতক আওয়ামীদের আড্ডাখানায় প্রায় ২৫০ জন লোক সমবেত হলো— কারো খবর নেই। শেষ পর্যন্ত তাদের আটক করে ২৭ জনকে জেলে পাঠিয়ে বাকিদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতির জন্য পালানো ভারতের আশ্রয়ে থেকে দেশের মধ্যে আগুনসন্ত্রাস করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। তারাও জানে, এ সন্ত্রাস করে কোনো লাভ হবে না। সাময়িক জনগণের কাজে বাধার সৃষ্টি হতে পারে।
নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী সন্ত্রাসীদের কঠোরভাবে দমন করতে হবে। তারা গত সাড়ে ১৫ বছরে দেশের টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করেছে। দেশের অর্থনীতির চাবিকাঠি ব্যাংকগুলো খালি করে লাখকোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। তাই তাদের বিচারের আওতায় এনে দ্রুততম সময়ে বিচার করে টাকা ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে হবে। বিদেশেও যাতে তারা চলতে-ফিরতে বাধার সম্মুখে পড়ে, তার ব্যবস্থা করতে হবে।
ইদানীং শোনা যাচ্ছে, গ্রেফতারকৃতরা জেলখানায়ও মিটিং করে ষড়যন্ত্র করছে। বিষয়টি গোয়েন্দা বিভাগকে নজরদারিতে আনতে হবে। স্বৈরাচারের দোসরদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া যাবে না। কারণ দেশের সর্বক্ষেত্রে তারা জনগণের জানমালের ক্ষতি সাধন করে গেছে, যা সহজে স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে না। যেকোনোভাবে স্বৈরাচার হাসিনা, তার পরিবার ও দোসরদের সর্বক্ষেত্র থেকে উচ্ছেদ করতে হবে। লুট করা টাকা ফেরত আনতে হবে। তাদের স্থায়ী-অস্থায়ী ব্যাংক হিসাব জব্দ করে টাকা উদ্ধার করতে হবে। জনগণের টাকা কেউ যেন আর লুট করতে না পারে, তার জন্য আটঘাট বাঁধতে হবে।
রাজনীতিবিদ ও নেতাদের জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে হবে, শোষক হিসেবে নয়। জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে আমরা জনগণের সেবক হবো, শাসক নয়। জনগণের জানমাল আমাদের কাছে আমানত হিসেবে থাকবে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকেই। দীর্ঘদিন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ তো জুলাই বিপ্লবে শরিক ছিলেন না বা বাস্তবে দেখতেও পারেননি। আমরা বাস্তবে সশরীরে বিপ্লবের সাথে ছিলাম। ৫ আগস্টেও জেলে ছিলাম বিএনপি-জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে। ৫ তারিখের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর ৬ আগস্ট স্বৈরাচারমুক্ত দেশে ফিরলাম। ৭ নভেম্বর যদি সিপাহি-জনতার বিপ্লব হয়, তবে ৫ আগস্ট বিপ্লব বলতে এত কার্পণ্য কেন? সত্য সবসময়ই সত্য, মনে রাখতে হবে, কেউ মিথ্যা বানাতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ।
তাই কালবিলম্ব না করে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় কার্যকর করুন। না হলে আম-ছালা সবই যাবে। আবার বিদেশে পাড়ি দিতে না হয়— যা আমরা সচেতন নাগরিক চাই না।
গুরুত্বপূর্ণ একটি রিপোর্ট পত্রিকায় দেখলাম। টিআইবি মন্তব্য করেছে, ‘দলবাজি-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সরকারের জন্য অশনিসংকেত’। সংস্থাটি এসব ঘটনার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করে সারা দেশে দলের আত্মশুদ্ধির উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। টিআইবি উল্লেখ করেছে, কিশোরগঞ্জের জলমহাল বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর কার্যালয়ে ভাঙচুর, শিশুদের চিকিৎসায় নিয়োজিত মা-শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ভাঙচুর সরকারি দলের ইমেজ নষ্ট করছে। টিআইবি আরো উল্লেখ করেছে, ঢাকার সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী বাস টার্মিনাল, ফুটপাত, বাজার, জলমহাল, বালুমহাল, হাটবাজার, ক্যাবল সংযোগ, ইন্টারনেট ও বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবসায় চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগ রয়েছে সরকারি দলের ওপর। ইউনিয়ন থেকে শুরু করে শহর পর্যন্ত এর শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে, যা নিন্দনীয়। মাদকদ্রব্যের প্রসারেও সরকারি দলের লোকদের সংশ্লিষ্টতার কথা বলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শিক্ষা খাতে প্রার্থীদের নিয়োগে জটিলতা সরকারি দলের সৃষ্টি। অতিসত্বর বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে সমস্যার সমাধান আশু প্রয়োজন। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে হঠাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগে দলীয়করণের পদক্ষেপ মোটেই ভালো না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অরাজকতার সুযোগ সৃষ্টি করলে সরকারের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না। শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ রক্ষায় মেধাকেই গুরুত্ব দিতে হবে। উল্টা-পাল্টা করলেই দুর্নীতিতে জর্জরিত সরকার আবার ছাত্র-জনতার ফাঁদে পড়ে যাবে, যা সচেতন নাগরিকরা চায় না। ছাত্র-জনতা অনেক রক্ত দিয়েছে, এবার পাওয়ার পালা। সততা আর যোগ্যতার বলেই আমরা সর্বক্ষেত্রে চাকরি, ব্যবসা পরিচালিত হোক— আমরা চাই।
দুর্নীতি কোনো ক্ষেত্রেই এ সরকার কন্ট্রোল করতে পারছে না। আবার চাঁদাবাজি, দখলবাজি সারা দেশে লেগেই আছে, যা মোটেই দেশের জন্য কল্যাণকর নয়। যেকোনো বিপদ দেশের ক্ষতির মধ্যে ফেলে দেবে। আর দেশ বিরোধী চক্র বিদেশের সহযোগিতায় দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে দেশের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আমরা এটা হতে দিতে পারি না। সর্বক্ষেত্রে সজাগ থেকে এগুলো রুখতে হবে। দেশ বাঁচলে আমরা ভালোভাবে চলতে পারবো, আমাদের পাওনা বুঝে নিতে পারবো।
কিশোর গ্যাং আরেকটি খারাপ উপসর্গ এসে হাজির হয়েছে। কয়েকদিন পূর্বে ৭ম শ্রেণির একটি ছেলেকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে সামান্য কারণে। গোটা দেশেই এই গ্যাংক সক্রিয়। এখানেও স্থানীয়ভাবে সরকারি দল এদের কাজে লাগাচ্ছে। প্রত্যেক অভিভাবককে সজাগ থাকতে হবে। এই অসৎ ছেলেদের সাথে তার সন্তানদের মিশতে না দেয়। মনে রাখতে হবে ভালো লেখাপড়া করলেই সন্তানের নিজের লাভ, পরিবারের লাভ, দেশের লাভ। তাই আমাদের প্রত্যেক অভিভাবককে সন্তানের প্রতি নজর রাখতে হবে। তারা পড়াশোনা ঠিকমতো করছে কিনা লক্ষ রাখতে হবে। ভালো ছেলেদের সাথে তাদের বন্ধুত্ব করাতে সাহায্য করতে হবে। প্রয়োজনে এলাকার শিবিরের ছেলেদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। দেখবেন, আপনার ছেলে পড়াশোনার সাথে আছে। আমি আবার আশাবাদী মানুষদের মধ্যে গণ্য। মহান আল্লাহ তার বান্দার প্রত্যেক অণুপরিমাণ ভালো কাজ এবং অণুপরিমাণ মন্দ কাজ লিখে রাখছেন। এখানে কোনো ফাঁকি দেয়া যাবে না। এ রাডারে যা ধরা পড়েছে, তা কাল কিয়ামতে আমাদের সামনে হাজির করা হবে স্ক্রিনে। ফলে ফাঁকি দেয়ার কোনো উপায় থাকবে না। শুধু তাই না, আপনি, আমি যে সমাজে বাস করি, খোঁজ নিয়ে দেখেন যারা মানুষকে ফাঁকি দেয়, তাদের ছেলেমেয়ে মানুষ হয় না। আবার মরার পূর্বে তার অর্জনও ভালো দেখে যেতে পারে না। আবার যারা ভালো কাজ করে, তারা সমাজে টাকাওয়ালা না হলেও তাদের পরিবার সমাজে ভালো বলেই পরিচিত হবে। মরার সময় ভালো মানুষের আস্থা নিয়েই কবরে যাবে।
দেশের মানুষের মাুষ চায়, নিরাপদে চলাফেরা ও রাতে শান্তিতে ঘুমাতে। বাচ্চাদের স্কুলে নিরাপত্তার সাথে আসা-যাওয়া। ইতোমধ্যেই জেনেছেন রাড্ডায় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থের কারণে। একজন সরকারি দলের নারী এমপির নাম এসেছে মিডিয়ায়। বাংলাদেশের অপরাধ রেকর্ডের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। কিন্তু পুলিশ প্রশাসনের কাজ কী? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর থাকার কি বৈধতা আছে? সারা দেশেই অরাজকতার শেষ নেই। সরকারি দলের চাঁদাবাজি, দখলবাজির কবলে বন্দি আজ জনগণ।
আমার মনে হয়, সরকারি দল শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়ার দল। অথচ এখন এই দলে ভালো লোক নেই, তা কিন্তু নয়। অনেক লোক আছেন, যারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য। এই সালাহউদ্দিনের কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। আমরা ১৮ কোটি মানুষ স্বাধীন-সার্বভৌম জাতি হিসেবে বাঁচতে চাই। কারো গোলামি বা পায়ে বেড়ি পরে বাঁচতে চাই না। বিদ্যুৎ খাত আদানিমুক্ত করতে হবে।
তাই সমাজে চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মিলিয়ে আপনি সৎপথে চলুন, মানুষকে ভালো বাসুন। দেখবেন, আপনিও মানুষের ভালোবাসা নিয়েই দুনিয়ায় ও আখিরাতে উঠবেন, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com¬