ইসলামী ব্যাংক ধ্বংসের খেলায় বাংলাদেশ ব্যাংক
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:১২
॥ উসমান ফারুক ॥
দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক, তাওহিদী জনতার সবচেয়ে আস্থার প্রতীকে পরিণত হওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এখন পরিণত হয়েছে বিক্ষোভ আর অনিশ্চয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে। গত দেড় দশকে ব্যাংকটিকে এস আলম গ্রুপ দখলে রেখেছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি সহযোগিতায়। তাতেই একসময়ের আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়া ব্যাংকটি শীর্ষ খেলাপিতে পরিণত হয় এস আলম গ্রুপের নামে-বেনামে নেওয়া ঋণ ও লুটপাটের কারণে। ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে আওয়ামীল লীগ সরকারের পতন হলে এস আলম গ্রুপের কর্তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের হস্তক্ষেপে মুক্ত হয় ইসলামপ্রিয় জনতার আস্থার প্রতীক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। কিন্তু গত আড়াই বছর ধরে ব্যাংকটি দখল করে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে যেখানে ব্যাংকটিকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব ছিল, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের একশ্রেণির সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তার করে ইসলামী ব্যাংক দখল ও লুটপাটে সহযোগিতা করে। সরকার বদল হলেও সেই গোষ্ঠীর শাস্তি হয়নি। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পরে ইসলামপ্রিয় জনগণের সহযোগিতায় ব্যাংকটি ফের যখন ঘুরে দাঁড়ানো শুরু করে, ফের সেই গোষ্ঠী শাসনের নামে দখল করে নেয় ইসলামী ব্যাংক।
এস আলম গ্রুপের শেয়ার বাজেয়াপ্ত না করে উচ্চ আদালতে গিয়ে আইনি খেলায় নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এভাবে ইসলামী ব্যাংক ধ্বংসের খেলায় মেতে চলেছে এখনো। বাংলাদেশ ব্যাংকের হাত দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠিত ও লাভজনক ব্যাংক ধীরে ধীরে পরিণত হয় একটি গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত ঋণের যন্ত্রে। প্রতিষ্ঠা থেকে নিরাপত্তা ও আর্থিক দিক দিয়ে সহযোগিতা করা সেই তাওহিদী জনতা এখন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটিকে বাঁচাতে প্রাণান্তর লড়াই করছে। তাদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে রাজপথের পিচ ঢালা সড়ক। পৃথিবীর কোনো দেশে নজির নেই যে, ব্যাংক বাঁচাতে গিয়ে আমানতকারীরা রাজপথে নেমেছে, রক্ত ঝরাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অতি দ্রুত শেয়ার বাজেয়াপ্ত করে বিক্রি করে ইসলামী ব্যাংকে অর্থ পরিশোধ, সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে পর্ষদ গঠন এবং পুরোনো শেয়ারধারকদের কাছে ব্যাংকের মালিকানা না ফিরিয়ে দেওয়া পর্যন্ত সংকট কাটবে না ইসলামী ব্যাংকের। এস আলম গ্রুপকে সহযোগিতাকারী কর্মকর্তা ইসলামী ব্যাংকেও রয়েছে। তাদের কারণেই এস আলম গ্রুপ এতটা শক্তিশালী হতে পেরেছে। তাদের তালিকাও জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত— যাতে ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।
শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটি শুরু হয় শূন্য হাতে
১৯৮৩ সালে ইসলামপ্রিয় একদল স্বপ্নবাজদের উদ্যোগে শূন্য হাতে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। সেই স্বপ্নবাজ তরুণরা নিজেদের সর্বোচ্চটুকু বিলিয়ে ও দ্বারে দ্বারে গিয়ে ইসলামী ব্যাংক দাঁড় করায়। তাদের সেই উদ্যোগের কারণে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। একে একে ১০টি ব্যাংক এখন ইসলামী ব্যাংকে পরিণত হয়ে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিসর অনেক বড় করেছে। দেশের মোট আমানতের এক-তৃতীয়াংশ এখন ইসলামী ব্যাংকিংয়ের। দেশের মোট রেমিট্যান্সের তিন ভাগের এক ভাগ আসে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। দেশে জনপ্রিয় হতে থাকায় প্রচলিত সুদি ব্যাংকের প্রতি মানুষ আগ্রহ হারাতে শুরু করে। সেই ভয়ে এখন পুরো ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার খেলায় মেতে উঠেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এখন যেভাবে চলছে
সেই দখলমুক্ত করতে নতুন প্রজন্মের একদল আমানতকারী এখন রক্ত ঝরাচ্ছে রাজপথে। ২০২৪ সালে ফ্যাসিস্ট সরকারকে উৎখাত করে ছাত্র-জনতা। তারপর আর্থিক খাতের সংস্কারের আওতায় ইসলামী ব্যাংকও দখলমুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু তারপর থেকে ব্যাংকটি চলছে স্বতন্ত্র পরিচালক দিয়ে। সবশেষ গত জুনে ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর খুরশীদ আলমকে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গ্রাহক আন্দোলনে সেই নিয়োগ বাতিলে বাধ্য হয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তারপর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা জহির হোসেনকে প্রশাসক নিযুক্ত করে ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা করা হচ্ছে। জহির হোসেনকে পরিচালক পর্ষদের পূর্ণ ক্ষমতা দিয়েছে।
এখন ইসলামী ব্যাংক চলছে নিয়ম বহির্ভূত পরিচালক দিয়ে। নেই একজন পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এভাবে এক ব্যক্তিকে দিয়ে চালানো হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংকটিকে। গত চার মাস ধরে ব্যাংকটি এভাবে চালাচ্ছে ব্যাংকটি। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, দুই বছরের বেশি সময় কোনো ব্যাংকের পর্ষদ শূন্য থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই আইন পরিপালনে বিশেষ ছাড় নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
ডেপুটি গভর্নর কবির আহাম্মদের স্বাক্ষরে জারি করা প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (১৯৯১ সনের ১৪ নং আইন) এর ১২১ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা বলে এতদ্বারা সংশ্লিষ্ট সকলের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত) এর ৪৭(২) ধারায় উল্লেখিত পরিচালনা পর্ষদ বাতিল আদেশের মেয়াদ সংক্রান্ত বিধান সকল ব্যাংক-কোম্পানির ক্ষেত্রে, সাধারণভাবে প্রযোজ্য হবে না।
অর্থাৎ এখন থেকে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৭(২) ধারা পরিপালন থেকে অব্যাহতি পেল বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে এখন বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে আজীবন ইসলামী ব্যাংক যেভাবে খুশি সেভাবে চালাতে পারবে।
কী আছে ৪৭(২) ধারায়
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৭নং ধারার ১ উপধারা অনুযায়ী, ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদের কার্যকলাপ বা আমানতকারীদের স্বার্থের পরিপন্থী বা ক্ষতিকর কোনো কিছু পেলে লিখিত কারণ জানিয়ে পরিচালক পর্ষদ বাতিল করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ৪৭(২) ধারায় বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক উপ-ধারা (১) এর অধীন প্রদত্ত আদেশের মেয়াদ সময় সময় বর্ধিত করিতে পারে, তবে বর্ধিত মেয়াদসহ উক্ত মেয়াদ দুই বছরের বেশি হবে না। এখন এই ধারা পালন থেকে ছাড় পাওয়ায় পরিচালক পর্ষদ ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো ধরে রাখতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেক্ষেত্রে মেয়াদ পরিপালনের বাধ্যবাধকতা আর থাকলো না।
ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার জব্দ করছে না বাংলাদেশ ব্যাংক
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ (সংশোধিত ২০২৩) ১৪ক(১) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি বা একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ব্যাংকের শেয়ার কেন্দ্রীভূত করা যাইবে না এবং কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি বা কোনো পরিবারের সদস্যগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, একক বা অন্যের সহিত যৌথভাবে বা উভয়ভাবে, কোনো ব্যাংকের শতকরা ৫ ভাগের বেশি শেয়ার ক্রয় করিবেন না।
কিন্তু শেয়ার ক্রয়ে অর্থের উৎস সম্পর্কে আইনে কোনো বিধি নিষেধ নাই। এই সুযোগে চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই ঋণের টাকা দিয়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশসহ ৯ ব্যাংকের শেয়ার কিনে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছিল। নিজ নামের পাশাপাশি বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামেও শেয়ার কিনে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এভাবে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮৩ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয় নামে-বেনামে।
২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ এস আলম গ্রুপ নেয়ার পরে চেয়ারম্যান করা হয়েছিল সাবেক সচিব আরাস্তু খানকে। সে সময়ে আরমাডা স্পিনিং মিলস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আরাস্তু খান প্রতিনিধি পরিচালক হয়েছিলেন ইসলামী ব্যাংকের। আরমাডা স্পিনিং মিলসের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না আরাস্তু খানের। সাংবাদ সম্মেলনে ‘আরমাডা স্পিনিং মিলস’ সম্পর্কে জানতে চাইলে আরাস্তু খান কোনো উত্তর দিতে পারেননি। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে, এস আলম গ্রুপের বেনামি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে আরমাডা স্পিনিং মিলস।
ধারা ১৪ক (৩) অনুযায়ী, ব্যাংকের শেয়ার ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা তার পরিবারের সদস্য কর্তৃক দাখিলকৃত শপথপত্র বা ঘোষণাপত্রের বিষয়বস্তু যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয় কিংবা কেউ বেআইনিভাবে নির্ধারিত সীমার বেশি শেয়ার বা একক আধিপত্যের জন্য উল্লেখযোগ্য শেয়ার ধারণ করে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের উক্ত অতিরিক্ত বা সকল শেয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হবে।
আইন অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের হাতিয়ে নেওয়া ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার বাজেয়াপ্ত করার কথা বাংলাদেশ ব্যাংকের। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা সেটি করেনি। উল্টো ইসলামী ব্যাংককে বাধ্য করেছে উচ্চ আদালতে যেতে। আইনি মারপ্যাঁচে এখন উচ্চ আদালতে এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বিষয়টি। সর্বশেষ চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে উচ্চ আদলত এসব বেনামি শেয়ার তিন মাসের জন্য লেনদেন স্থগিত করে অবরুদ্ধ করার নিদের্শ দেয়, যা আইনি ভাষায় ফ্রিজ বলা হয়। কিন্তু আইন অনুযায়ী, শনাক্ত হওয়ার পরই শেয়ার বাজেয়াপ্ত করে বাজারে বিক্রি করে দেয়ার কথা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সেই দায়িত্ব পালন না করায় শেয়ারগুলো কিনে নিতে চেয়েছিল ইসলামী ব্যাংক। এস আলম গ্রুপের নামে-বেনামে নেওয়া ঋণের বিপরীতে শেয়ারগুলো জামানত হিসেবে নিতে চেয়েছিল ইসলামী ব্যাংক। কিন্তু তা হতে দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। এটি হলে খেলাপি হওয়া ঋণের বিপরীতে শেয়ারগুলো পুঁজিবাজারে স্বাভাবিক লেনদেনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে দিয়ে অর্থ সংকট কাটাতে পারতো ইসলামী ব্যাংক। লুট করে নেয়া শেয়ারগুলো বিনিয়োগকারীদের কাছে চলে যেত। সাধারণ জনতাও ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পেত।
ব্যাংক বাঁচাতে তাওহিদী জনতার লড়াই
রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে এখন প্রায় নিয়মিত দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আমানতকারী ও শেয়ারধারকদের সংগঠন ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের মানববন্ধন। সর্বশেষ চলতি সেপ্টেম্বরে তাদের ওপর হামলা করে এস আলম গ্রুপের লোকজন। তাদের হামলায় অর্ধশতাধিক সচেতন গ্রাহকের রক্ত ঝরে রাজপথে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এস আলম গ্রুপের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ থেকে ব্যাংকটি মুক্ত হলেও তার ক্ষত এখনো দগদগে রয়েছে।
২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকে এস আলম গ্রুপের ঋণ ছিল চার হাজার কোটি টাকা মতো। সেখানে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও ছায়া কোম্পানির মাধ্যমে তারা নিয়ে নেয় প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি। পরোক্ষভাবে দেড় লাখ কোটি টাকার মতো অর্থ ব্যাংক থেকে বের করে নেওয়ার অভিযোগ এখনো তদন্ত করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তদন্তে যে গতি ছিল, এখন তা নেই। এর ফলে এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা অর্থাৎ মোট ঋণের প্রায় ৫৮ শতাংশই এখন খেলাপি। ব্যাংকটির প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৫ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা।
কাগজে-কলমে এস আলম গ্রুপের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ থেকে ব্যাংকটি মুক্ত হলেও বাস্তবে সমস্যা তাতে মেটেনি। ব্যাংকের প্রকৃত ও প্রতিষ্ঠাতা শেয়ারধারকদের শেয়ার জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তাদের মালিকানা ফিরে পাননি। বরং ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংক-নিযুক্ত স্বতন্ত্র পরিচালক ও পরবর্তীতে প্রশাসকের অধীনে পরিচালিত একটি আধা-রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এই অনিশ্চিত মালিকানা কাঠামোই পরবর্তী সংকটগুলোর একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দায় নিচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক ও বর্তমান সরকার
ইসলামী ব্যাংকের এই দুর্দশার জন্য কারা দায়ী— এই প্রশ্নের উত্তর এখন সবার জানা। আওয়ামী লীগ সরকারের দায় দিয়ে দেড় দশক বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা পার পেয়েছিল। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়েছে গত আড়াই বছর। আওয়ামী অলিগার্করা এখন দেশ ছেড়ে পলাতক জীবনযাপন করছে। কিন্তু গত আড়াই বছরেও তাদের আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এখনো এস আলম গ্রুপের হয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সেই কর্মকর্তারা।
বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ইসলামী ব্যাংক দুর্বল হওয়ায় গোটা ব্যাংকিং খাতেই তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। শরিয়াহভিত্তিক অন্য ব্যাংকগুলো এখন তারল্য সংকটে ভুগছে। ব্যাংকটির বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক, বিপুল আমানতকারী ভিত্তি এবং রেমিট্যান্সপ্রবাহে ইসলামী ব্যাংক এখন দেশের ব্যাংকিং খাতের সিস্টেমিকালি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ডলার সংকট, মূল্যস্ফীতির চাপ ও সামগ্রিক আর্থিক খাতের অস্থিরতার মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের এই টালমাটাল অবস্থা দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করছে। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের প্রতি সাধারণ মানুষের যে গভীর ধর্মীয় ও নৈতিক আস্থা, তা-ও এই সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইসলামী ব্যাংকের বিপর্যয় শুধু একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা নয়, এটি লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ আমানতকারীর সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ের প্রতি আস্থার প্রশ্নও।
সমাধান কোন পথে
বিশেষজ্ঞ ও ব্যাংকাররা বলছেন, দ্রুত ও স্বচ্ছ পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ গঠন করতে হবে। দেশের ইসলামপ্রিয় ও দক্ষ ব্যাংকার দিয়ে ব্যাংকটিকে পরিচালনা করতে দিতে হবে। প্রশাসক দিয়ে একটি বৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনা করা কোনো সমাধান না। যোগ্যতা, সততা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য বোর্ড দ্রুত গঠন করা প্রয়োজন। বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত করতে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে করা মামলা ট্রাইব্যুনালে নিয়ে যেতে হবে। আইন অনুযায়ী, দ্রুত এস আলম গ্রুপের নামে-বেনামে নেয়া শেয়ার বাজেয়াপ্ত করে পুঁজিবাজারে বিক্রি করতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকে। যেসব প্রতিষ্ঠাতা ও দীর্ঘদিনের শেয়ারধারকদের শেয়ার জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়েছিল, তাদের ফিরিয়ে দিতে হবে।
ভবিষ্যতে যেন কোনো একক গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে কোনো ব্যাংক দখল করতে না পারে, তার জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইন, শেয়ার মালিকানার সীমা এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী (বেনিফিশিয়াল ওনার) শনাক্তকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা ও স্বাধীনতা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। এস আলম গ্রুপকে সহযোগিতাকারী বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদেরও দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এস আলম গ্রুপকে সহযোগিতাকারী কর্মকর্তা ইসলামী ব্যাংকেও রয়েছে। তাদের কারণেই এস আলম গ্রুপ এতটা শক্তিশালী হতে পেরেছে। অনেকে সহযোগিতা না করলেও নীরবে থেকে সবকিছু দেখেছে। প্রতিটি ঋণ অনুমোদন ও যাচাইয়ের সঙ্গে জড়িত সকল কর্মকর্তাকেও আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া প্রয়োজন। তাদের তালিকাও জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত। যাতে ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।