মুসলিম রাজ্য জুনাগড় পাকিস্তানি ভূখণ্ড : গণহত্যা ও বর্বরতায় ভারতের দখল
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:০৮
॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
১৯৪৭ সালের দেশভাগের ইতিহাসে জুনাগড় রাজ্য পাকিস্তানের ভূখণ্ড হওয়া সত্ত্বেও বর্বরতা ও গণহত্যা চালিয়ে ভারতের দখল একটি জঘন্যতম অধ্যায়, যা আজ আট দশক পরও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক গভীর ক্ষত ও অমীমাংসিত ইস্যু হিসেবে রয়েছে। রাজ্যটি তার ইতিহাস, ঐতিহাসিক কেল্লা, রাজকীয় প্রাসাদ ও ধর্মীয় স্থাপত্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। আরব সাগরের তীরে অবস্থিত জুনাগড় রাজ্য প্রাচীনকালের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেও বিখ্যাত। ভারতীয় আগ্রাসনের পূর্ব পর্যন্ত প্রাচীন স্বাধীন এই জুনাগড় রাজ্যটি যুগ যুগ ধরে মুসলিম শাসনাধীনে ছিল।
মুসলিম শাসন : জুনাগড় রাজ্যটির হালের মুসলিম শাসনামল ও শাসকগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৪৭২-১৫৭২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুহাম্মদ বেগাদা, খলিল খান, মুজাফফর, সিকন্দর, বাহাদুরশাহ এবং ইবাদতখানসহ কয়েকটি এলাকা। এ শাসনামলে জুনাগড়ের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন হয়। এরপর ১৫৭৩-১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দ জুনাগড় মুঘল শাসনের অধীনে আসে। মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে স্থাপত্য, সংস্কৃতি এবং প্রশাসনে আরও উন্নয়ন ঘটতে থাকে। সর্বশেষ ১৭৪৯-১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জুনাগড়ের বাবি বংশের নবাবরা (ইয়ুসুফজাই পাঠান) শাসন করতেন কাথিয়াবাড় উপদ্বীপের স্বাধীন জুনাগড়।
কাথিয়াবাড় উপদ্বীপের স্বাধীন জুনাগড় : ১৯৪৭ সালের ১৬ জুলাই ইংল্যান্ডের ভারতীয় বিষয়ক সচিব লর্ড লিস্টোয়েল লর্ড সভায় বলেছিলেন, ‘এখন থেকে ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলো হতে ব্রিটিশ রাজ প্রতিনিধি প্রত্যাহার এবং তাদের দাপ্তরিক কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘোষণা করা হলো। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘দেশীয় রাজ্যগুলো ভারত অথবা পাকিস্তান ডোমিনিয়নের কোনটিতে যোগ দেবে অথবা স্বাধীন থাকবে সেটি সম্পূর্ণ তাদের ইচ্ছাধীন। ব্রিটিশ সরকার সে বিষয়ে কোনোরকম প্রভাব বিস্তার করবে না’। ১৯৪৭ সালের ১০ জুলাই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলীও ‘হাউস অব কমন্সে’ লিস্টোয়েলের অনুরূপ বক্তব্যই প্রদান করেছিলেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হওয়া ১৯৪৭ সালের ভারতীয় স্বাধীনতা আইন এবং লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, উপমহাদেশে বিদ্যমান ৫৬৫টি আধা-স্বাধীন দেশীয় রাজ্যের যেকোনো একটি ডোমিনিয়নে (ভারত বা পাকিস্তান) যোগ দেওয়ার কিংবা সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকার পূর্ণ আইনি অধিকার ছিল। এই আইনি কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই জুনাগড়ের তৎকালীন নবাব তৃতীয় মুহাম্মদ মহাব্বত খানজি ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পাকিস্তানের সাথে যোগদানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।
পাকিস্তানি ভূখণ্ড জুনাগড় : মুহাম্মদ মহাব্বত খানজির পাকিস্তানে যোগদানের ঘোষণার ঠিক এক মাস পর, ১৫ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান সরকার জুনাগড়ের অন্তর্ভুক্তিপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ ও স্বাক্ষর করে, যা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে একটি সম্পূর্ণ বৈধ চুক্তি। ঐতিহাসিক ও কৌশলগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, নবাবের এই সিদ্ধান্ত একক কোনো পদক্ষেপ ছিল না। জুনাগড়ের হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত স্টেট কাউন্সিল দীর্ঘ আলোচনার পর এই সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে পারস্পরিক ঐকমত্য তৈরি করে। পাকিস্তানের সঙ্গে যোগদানের পর রাষ্ট্রীয় নথিপত্রে জুনাগড়কে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এছাড়া সারা জুনাগড় ও জুনাগড়ের স্টেট হাউসে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়। অন্যদিকে ভারত সরকারের দাবি ছিল, মাউন্ট ব্যাটেন নীতি অনুযায়ী দেশীয় রাজ্যগুলোর অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তব ভৌগোলিক সংলগ্নতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বিপরীতে পাকিস্তান ও জুনাগড় প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের আন্তর্জাতিক উদাহরণটি সামনে আনে। মূল ভূখণ্ডের সাথে সরাসরি স্থল সংযোগ না থাকা সত্ত্বেও আলাস্কা যেমন সমুদ্রপথে আমেরিকার অংশ, ঠিক তেমনি করাচি বন্দর থেকে জুনাগড়ের ভেরাবল বন্দরের দূরত্ব ছিল মাত্র ৩৪০ নটিক্যাল মাইল। এই সামুদ্রিক সীমাকে একটি কার্যকর ও আইনি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে এই আইনি প্রক্রিয়ার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর ভূরাজনৈতিক সংকট। জুনাগড়ের প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি জনসংখ্যা ছিল অমুসলিম এবং রাজ্যটি চারপাশ থেকে ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা পরিবেষ্টিত। এছাড়া জুনাগড়ের নিজস্ব কিছু সামন্ত রাজ্য বা ভ্যাসাল স্টেট, যেমন বাবরিয়াবাদ ও মাংরোল, জুনাগড়ের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ভারতের সাথে যোগদানের ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। ভারতের তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং রাজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ভিপি মেনন জুনাগড়ের পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য চরম হুমকি হিসেবে দেখেন। পরে ভারত সরকার জুনাগড়ের পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে। তারপর ভারত জুনাগড়ের চারপাশে কঠোর অবরোধ আরোপ করে রাজ্যে জরুরি পণ্য সরবরাহ লাইন সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলে। জনসাধারণের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটায়। এ সময় জুনাগড়ের অভ্যন্তরীণ শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ইত্তিহাদুল মুসলিমীন নামে একটি সংগঠন সামনে আসে। পূর্বে এটি অল ইন্ডিয়া ইত্তিহাদুল মুসলিমীন নামে পরিচিত ছিল। এটি ১৯২৭ সালে নবাব মুহাম্মাদ নওয়াজ খান প্রতিষ্ঠা করেন। জুনাগড়ের মুসলমানদের যেন প্রাণ ফিরে এসেছিল। কিন্তু লিস্টোয়েলের ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলীর ঘোষণা সত্ত্বেও মাউন্ট ব্যাটেনের ষড়যন্ত্রমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল কেবলমাত্র পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোই পাকিস্তানে যোগ দিতে পারে। ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লুইস ফ্রান্সিস অ্যালবার্ট ভিক্টর নিকোলাস মাউন্ট ব্যাটেনের ভারতের সাথে যৌথ ষড়যন্ত্র পরবর্তীতেও ধরা পড়ে।
জুনাগড়ের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ-ভারত ষড়যন্ত্র : জুনাগড়ের নওয়াব মুহাম্মদ মহাবত খানজি তৃতীয় পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত মাউন্ট ব্যাটেনের কাছে চিঠি লিখেও জানান। মাউন্ট ব্যাটেন উত্তরে নওয়াবকে জানান যে, তিনি তার পত্র যথাযথভাবে ব্রিটিশ সরকারের কাছে প্রেরণ করেছেন। তিনি খুব শিগগির তার উত্তর পাবেন। নওয়াব লিখেছেন-উত্তরপত্রটি আর কখনোই আসেনি। কেননা, মাউন্ট ব্যাটেন পরবর্তীকালে স্বীকার করেছেন, তিনি পত্রটি ব্রিটিশ সরকারের নিকট আদৌ প্রেরণ করেননি। মাউন্ট ব্যাটেনের এই স্বীকারোক্তির মাঝেও রয়েছে জুনাগড়ের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার ও ভারতীয় কংগ্রেস হিন্দু নেতৃবৃন্দের গভীর হিটলারি ষড়যন্ত্রের গন্ধ। এছাড়া অখণ্ড ভারতের স্বপ্নদ্রষ্টা নেহরুও এটা মেনে নিতে পারেননি-ভারতের হৃৎপিণ্ডের মধ্যে পাকিস্তানের একটি অংশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। পাকিস্তান বিষয়ে শ্রী বিমলানন্দ শাসমল লিখেছেন, ‘পাকিস্তান সৃষ্টি হিন্দুদের মনে অপ্রীতিকর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। যে ভারত মাতাকে হিন্দুরা দেবী বলে পূঁজা করে, মুসলমানরা সেই মাতাকেই দ্বি-খণ্ডিত করলো বলে হিন্দুরা ক্ষুব্ধ ছিল।
নেহরুর কণ্ঠে হিটলারের হুঙ্কার : নেহরু আগ্রাসী হিটলারের মতো প্রকাশ্যে জুনাগড়ের বিরুদ্ধে হুঙ্কার দেন। তিনি বলেন, ‘যদি এবং যখন প্রয়োজন মনে করবো জুনাগড়ের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান শুরু করা হবে’। নেহরুর এই দম্ভোক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ১৯৪৮ সালের ৩০ জুলাই ব্রিটিশ কনজারভেটিভ পার্টির বিরোধীদলীয় নেতা উইনস্টাইন চার্চিল কমন্স সভায় বলেছিলেন, ‘নেহরুর ভীতি প্রদর্শনের ভাষা অনেকটা হিটলারের ভাষার অনুরূপ যা তিনি অস্ট্রিয়া ধ্বংস করার সময় করেছিলেন’। তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভাকে সতর্ক করে বলেছিলেন, তাদের পবিত্র দায়িত্ব এবং কর্তব্য হচ্ছে, রাজ্যগুলোকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে গ্রাস করার প্রক্রিয়াকে ব্রিটিশ সরকার যেন অনুমোদন না দেয়। তবে মি. চার্চিলের সেই সতর্কবাণীকে আমল দেয়নি ব্রিটিশ সরকার, আমল দেয়নি মাউন্ট ব্যাটেনও। নেহরু, মাউন্ট ব্যাটেন, ভারতের তৎকালীন ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেল চক্র ছলনা, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে উপমহাদেশের ৫৬৫টি করদ রাজ্যের অধিকাংশই গ্রাস করেছিলেন। একইভাবে জুনাগড় দখলেরও পরিকল্পনা আঁটতে লাগলো চিরাচরিত অভ্যাস এবং ব্লু-প্রিন্ট অনুযায়ী। ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ছিলেন নেহরুর বন্ধু। তিনিও চাননি ভারতবিভক্তি। কেবলমাত্র কায়েদে আযমের প্রবল ব্যক্তিত্ব ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের সামনে ব্রিটিশ সরকার ও কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানের দাবিকে অখণ্ডনীয় বাস্তবতা বলে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে নেহরু ও মাউন্ট ব্যাটেন রেডক্লিফ রোয়েদাদের মাধ্যমে পাকিস্তানকে দুর্বল রাষ্ট্র করতে জুনাগড়ের নবাব সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক ‘আরজি হুকুমত’ বা অস্থায়ী সরকার গঠন করেন। এসব গোপন পরামর্শের কথা পরবর্তীকালে ল্যারি কলিন্স ও ডোমিনিক লাফিয়ের গ্রন্থে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। ভারত বিভাগের পরেও কংগ্রেস মাউন্ট ব্যাটেনকে স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্ণর জেনারেল নিয়োগ করেছিল। এ ছিল তার মুসলমানদের সাথে বেঈমানীর পুরস্কার।
ষড়যন্ত্রমূলক ‘আরজি হুকুমত’ : ভারতের গোয়েন্দা বাহিনী ছদ্মবেশে জুনাগড়ের হিন্দুদের ওপর রাতের অন্ধকারে হঠাৎ আক্রমণ করে। ভারতীয় মিডিয়া এই আক্রমণের দায় মুসলিম নবাবের সরকারের ওপর দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে। তৎকালীন দ্য হিন্দুস্তান টাইমস ঐ কলুষিত ভূমিকা পালন করে। এছাড়া পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে নেহেরু ও মাউন্ট ব্যাটেন ১৯৪৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বোম্বাইতে (বর্তমান মুম্বাই) নবাবের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক ‘আরজি হুকুমত’ বা একটি অস্থায়ী সমান্তরাল সরকার গঠন করে। যার নেতৃত্বে ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর ভাইপো শ্যামলদাস গান্ধী। এই ষড়যন্ত্রমূলক ‘আরজি হুকুমত’ বা অস্থায়ী সরকারের সশস্ত্র কর্মীরাও জুনাগড়ের সীমান্ত এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা দখল করতে শুরু করে। অন্যদিকে হিন্দুত্ববাদীদের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু কংগ্রেসের বোম্বে অধিবেশনে সদম্ভে মানবতাবিরোধী জঘন্য যুদ্ধের ঘোষণা করে বলেন, ‘জুনাগড়ের সামনে এখন দুটি পথ খোলা আছে- হয় পথে ফিরে আসা, নয়তো ভারতীয় হামলা।’
জুনাগড়ে বর্বর ভারতীয় হামলা : অবশেষে কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত হয় ভারতীয় সেনাবাহিনী জুনাগড়ে দ্বিমুখী আগ্রাসন পরিচালনা করবে। পরিকল্পিত আগ্রাসন পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয় ডিভিশন কমান্ডার এবং আর্মড ব্রিগেড কমান্ডারের ওপর। ভারতের তৎকালীন ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেল স্বাধীন মুসলিম রাজ্যটিকে ভারতের সাথে যুক্ত করতে জুনাগড়ে ভারতীয় বর্বর সেনাবাহিনীকে প্রবেশের অনুমতি দেন। এরপর জুনাগড়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী হামলা শুরু করে। শুরু হয় ভারতীয় আগ্রাসী বাহিনীর রাজ্যটিতে নারকীয় মুসলিম গণহত্যা। লাখ লাখ সাধারণ নাগরিক ও সেনাদের হত্যা করে অসভ্য বর্বর ভারতীয় বাহিনী। শেষ পর্যন্ত নবাব জনগণের জানমালের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেন। ফলে প্রায় বহু বছরের স্বাধীন মুসলিম জুনাগড় রাজ্য পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও ভারত দখল করে। দখলের পর আবারো চালানো হয় নির্যাতনের স্টিমরোলার। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।
নামকাওয়াস্তে গণভোট : পাকিস্তানি ভূখণ্ড জুনাগড় শক্তি প্রয়োগ করে দখল করার পর ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে নামকাওয়াস্তে একটি গণভোট চালানো হয়েছিল রাজ্যটিতে। ভারতভুক্তি গণভোটের পর জুনাগড়কে ১৯৪৯ সালের জানুয়ারিতে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গৃহীত হয়নি এবং আজ পর্যন্ত অমীমাংসিত ইস্যু হিসেবে রয়েছে। ভারতের এই বর্বরতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়ায় এক প্রবন্ধে অধ্যাপক উইলফ্রেড ক্যান্টওয়েল স্মিথ বিবেকবান হিন্দু প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পরও মুসলমানরা ব্যাপক গণহত্যা ও পাশবিক হামলার শিকার হয়। ধ্বংসযজ্ঞের পর যারা বেঁচে ছিলেন তারাও ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। তাদের লাখ লাখ ব্যক্তিকে হত্যা এবং উচ্ছেদ করা হয়। মুসলিম বাহিনীর সহযোগীদের কথিত সহিংসতার প্রতিশোধ নেয়ার অজুহাত দেখিয়েই এসব নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল।’ (১৯৫০ সালে প্রকাশিত ‘দ্য মিডল-ইস্ট জার্নাল’, খণ্ড-৪)। এছাড়া ৭ নভেম্বর ১৯৪৭ সালে শাহ নওয়াজ ভুট্টো (জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিতা এবং বেনজির ভুট্টোর দাদা) আঞ্চলিক কমিশনারকে চিঠি লিখে ভারতের হস্তক্ষেপের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। পাকিস্তানের প্রথম ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান তখন স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, একবার বৈধভাবে অন্তর্ভুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হওয়ার পর কোনো দেশের সামরিক উপস্থিতির ছায়ায় গণভোট আয়োজন করা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদের পরিপন্থী। এটি জাতিসংঘে একটি অমীমাংসিত মামলা হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতে, অখণ্ড ভারতের ধারণাটি একটি রাজনৈতিক প্রতারণা। জুনাগড় ও কাশ্মীরের ঘটনার মধ্য দিয়ে ভারতের এই দ্বৈত নীতি বিশ্বদরবারে উন্মোচিত হয়। জুনাগড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনসংখ্যার অজুহাতে ভারত সামরিক হস্তক্ষেপ করে, অথচ ঠিক একই সময়ে কাশ্মীরে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও সেখানকার হিন্দু মহারাজা হরি সিং-এর স্বাক্ষরকে আইনি ভিত্তি ধরে ভারত সেখানে সৈন্য পাঠায়। উল্লেখ্য, জুনাগড় রাজ্য ভারতের দখলের পরবর্তীতে ১ নভেম্বর ১৯৫৬ বোম্বাই রাজ্যের অংশ হয়ে যায়।
বর্তমানে জুনাগড়ের এই ঐতিহাসিক মামলাটি কাশ্মীর সংকট এবং হায়দরাবাদের সংকটের মতোই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে ‘ভারত-পাকিস্তান প্রশ্ন’ শিরোনামে তালিকাভুক্ত রয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী আইনি লড়াইয়ে এক নতুন মোড় আসে ২০২০ সালের আগস্ট মাসে, যখন পাকিস্তান সরকার তাদের একটি নতুন আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করে। এই মানচিত্রে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে জুনাগড়, মানভেদর এবং স্যার ক্রিক অঞ্চলকে তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের দাবিকে পুনরায় আন্তর্জাতিক মহলে পুনরুজ্জীবিত করেছে। জুনাগড়ের খেতাবধারী শেষ নবাব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর খানজি ২০২৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পাকিস্তানে অবস্থান করে ‘জুনাগড় স্টেট লিবারেশন মুভমেন্ট’-এর মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে এই আইনি ও ঐতিহাসিক অধিকারের পক্ষে জোরালো জনমত গঠনের চেষ্টা করে গেছেন। অচিরেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পাকিস্তানি ভূখণ্ড জুনাগড়ের এই অমীমাংসিত মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে।
তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, বিবিসি, দ্য হিন্দুস্তান টাইমস, আল-জাজিরা ইত্যাদি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com