প্রেরণার বাতিঘর শহীদ প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ মুরসি


৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:০২

॥ মতিউর রহমান আকন্দ ॥
॥ সাত ॥
ক্ষমতার চূড়ায় থেকেও আদর্শচ্যুৎ হননি মুরসি
মিশরের শহীদ রাষ্ট্রপতি ড. মুহাম্মদ মুরসির জীবন আমাদের সামনে এক অনন্য সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে— ক্ষমতার শক্তি সাময়িক, কিন্তু আদর্শের শক্তি চিরস্থায়ী। তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার শিখরে আরোহণ করেছিলেন; কিন্তু ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে থাকার জন্য কখনো তার আদর্শ, নীতি ও বিশ্বাসের প্রশ্নে আপস করেননি।
তিনি ক্ষমতার কাছে নত হননি, ক্ষমতার জন্য অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি, অসত্য ও মিথ্যার কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। স্বৈরাচারী শক্তির চাপের মুখেও তিনি তার অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াননি। বরং জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, প্রয়োজনে জীবন দিয়ে হলেও তিনি মিশরের জনগণের বিশ্বাস ও আস্থার মর্যাদা রক্ষা করবেন।
এটি নিছক কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না; এটি ছিল একজন রাষ্ট্রনায়কের আত্মত্যাগের অঙ্গীকার। একজন মানুষ যখন জানেন যে, তার সামনে বিপদ, নিপীড়ন; এমনকি মৃত্যুও অপেক্ষা করছে, তারপরও যখন তিনি সত্য ও আদর্শের প্রশ্নে অবিচল থাকেন— তখন তার সেই অবস্থান কেবল সমকালকে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও আন্দোলিত করে।
মুরসির ক্ষেত্রেও ঠিক সেটিই ঘটেছে। তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল, তার রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তার অনুসারীদের ওপর কঠোর নিপীড়ন চালানো হয়েছিল। কিন্তু তাঁকে মানুষের হৃদয় থেকে মুছে ফেলা যায়নি। বরং ক্ষমতা থেকে তাঁকে যত দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, মানুষের স্মৃতিতে তার অবস্থান ততই গভীর হয়েছে।
তার ক্ষমতাচ্যুতির পর মিশরজুড়ে যে প্রতিবাদের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল, তা সহজে নিভে যায়নি। গ্রেপ্তার, নির্যাতন, দমন-পীড়ন এবং কঠোর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের মধ্য দিয়েও সেই ক্ষোভ ও প্রতিরোধকে সম্পূর্ণভাবে স্তব্ধ করা সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে মিশরের রাজনৈতিক পরিবেশ যেন উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়।
এরপর শুরু হয় বিচার ও দণ্ডের দীর্ঘ অধ্যায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলা ও বিচার প্রক্রিয়ায় মুরসির সমর্থক, রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর সাজা ঘোষণা করা হয়। বহু মানুষ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাঁদের মধ্যে কিছু মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরও করা হয়। এসব ঘটনা মিশরের রাজনীতিতে গভীর ক্ষত তৈরি করে এবং দেশটির রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র করে তোলে। কিন্তু এখানেই মুরসির জীবনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য।
একজন মানুষকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়, কারাগারে বন্দি করা যায়; এমনকি তার জীবনও কেড়ে নেওয়া যায়; কিন্তু তার আদর্শ, তার বিশ্বাস এবং তার আত্মত্যাগের স্মৃতিকে সবসময় হত্যা করা যায় না। তিনি দেখিয়ে গেছেন— ক্ষমতা মানুষকে ইতিহাসের একটি অধ্যায়ে পৌঁছে দিতে পারে, কিন্তু আদর্শ ও আত্মত্যাগই তাকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে। আর এ কারণেই মুরসির জীবন শুধু মিশরের ইতিহাসের একটি রাজনৈতিক অধ্যায় নয়; এটি বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গভীর শিক্ষা— ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, পদ ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু সত্য, আদর্শ এবং ন্যায়ের জন্য আত্মত্যাগ ইতিহাসে চিরস্থায়ী।
ক্ষমতার ঊর্ধ্বে আদর্শ : ড. মুহাম্মদ মুরসির অমর উত্তরাধিকার
মুরসি শুধু একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির প্রাসাদে প্রবেশ করেননি; তিনি এমন একসময়ে জনগণের রায়ের প্রতীক হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যখন মিশরের রাজনীতি দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী সংস্কৃতির ভার বহন করছিল। তার উত্থানের মধ্যে তাই ছিল একটি নতুন প্রত্যাশার প্রতিধ্বনি— রাষ্ট্র কি জনগণের হবে, নাকি জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার কাছে বন্দি থাকবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মুরসির সামনে যে পথ খুলে গিয়েছিল, তা ছিল কণ্টকাকীর্ণ। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা হাতে পেয়েও তিনি এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হন, যেখানে ক্ষমতার কাঠামো, প্রতিষ্ঠান, সামরিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক স্বার্থ— সবকিছু মিলেমিশে এক জটিল প্রতিরোধের দেয়াল তৈরি করেছিল।
কিন্তু মুরসির ঐতিহাসিক তাৎপর্য তার রাজনৈতিক সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার পরিমাপে সীমাবদ্ধ নয়। তার আসল উত্তরাধিকার নিহিত রয়েছে একটি নৈতিক অবস্থানে। তিনি বিশ্ববাসীর সামনে যেন একটি প্রশ্ন রেখে গেছেন— রাষ্ট্র কি কেবল ক্ষমতা পরিচালনার যন্ত্র, নাকি মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার একটি আমানত? এই প্রশ্নের উত্তর আজও সমকালীন রাজনীতির জন্য প্রাসঙ্গিক।
কারণ পৃথিবীর বহু দেশে আমরা দেখি, গণতন্ত্রের ভাষা উচ্চারিত হয়, মানবাধিকারের শপথ নেওয়া হয়, জনগণের সার্বভৌমত্বের কথা বলা হয়; অথচ ক্ষমতার স্বার্থে সেই জনগণের কণ্ঠই কখনো কখনো সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হয়। নির্বাচন তখন হয়ে ওঠে আনুষ্ঠানিকতা, প্রতিষ্ঠান হয়ে পড়ে ক্ষমতার আনুগত্যশীল, আর বিরোধী মতকে দেখা হয় রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে।
মুরসির জীবন এই প্রবণতার বিপরীতে একটি নৈতিক আয়না তুলে ধরে। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন— রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি অস্ত্রাগারে নয়, জনগণের আস্থায়; শাসকের প্রকৃত মর্যাদা পদে নয়, ন্যায়বোধে; আর নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা বিজয়ের দিনে নয়, পরাজয়ের মুহূর্তে। এই কারণেই তার ক্ষমতাচ্যুতির পরের ইতিহাসও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়।
মিশরের রাজপথে যারা প্রতিবাদে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই জানতেন তাঁদের সামনে কী অপেক্ষা করছে। তবু তারা পিছু হটেননি। কারো সামনে ছিল কারাগারের অন্ধকার, কারো সামনে বিচারের কাঠগড়া, কারো সামনে মৃত্যুর মঞ্চ। কেউ হারিয়েছেন প্রিয়জন, কেউ হারিয়েছেন স্বাভাবিক জীবন, কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন বছরের পর বছর। তবু তাঁদের বিশ্বাসের প্রদীপ নিভে যায়নি।
এখানেই মুরসির ঘটনাটি একটি ব্যক্তিগত জীবনের সীমা অতিক্রম করে একটি বৃহত্তর মানবিক আখ্যান হয়ে ওঠে। একজন রাষ্ট্রনায়কের ভাগ্য তখন আর একা তার নিজের থাকে না; তার সঙ্গে জড়িয়ে যায় অসংখ্য মানুষের আশা, বেদনা, অশ্রু এবং আত্মত্যাগ।
ইতিহাসের বিস্ময় এখানেই— যে শক্তি অস্ত্র দিয়ে একটি আন্দোলনকে দমন করতে পারে, সে শক্তি সবসময় মানুষের বিবেককে পরাজিত করতে পারে না। কারাগারের দেয়াল মানুষের শরীরকে আটকে রাখতে পারে; কিন্তু একটি বিশ্বাসকে আটকে রাখতে পারে না। মৃত্যুর রায় একটি জীবনকে শেষ করতে পারে; কিন্তু একটি আদর্শের যাত্রা থামাতে পারে না।
ড. মুরসির জীবনের শেষ অধ্যায় তাই তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অধ্যায়গুলোর একটি। রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষ থেকে কারাগারের নিঃসঙ্গ পরিসরে তার যাত্রা ছিল ইতিহাসের এক নির্মম বাঁক। কিন্তু সেই অন্ধকারেও তার অবস্থান যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন— মানুষের প্রকৃত উচ্চতা তার অবস্থানের উচ্চতায় নয়; সে কতটা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের বিশ্বাসকে ধারণ করতে পারে, তার মধ্যেই তার মহত্ত্ব।
সময়ের স্রোতে অনেক রাষ্ট্রপতির নাম হারিয়ে যায়, অনেক মসনদের ইতিহাস ধুলোয় ঢাকা পড়ে, অনেক রাজনৈতিক বিজয় কয়েক দশক পর কেবল ফুটনোট হয়ে থাকে। কিন্তু যে মানুষ নিজের জীবনকে কোনো বৃহত্তর নৈতিক বিশ্বাসের কাছে উৎসর্গ করেন, তার গল্পের মৃত্যু হয় না। মুরসির ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।
তার রাজনৈতিক অধ্যায় হয়তো বিতর্কমুক্ত নয়; তার শাসনকাল নিয়েও ইতিহাসে নানা মূল্যায়ন থাকবে। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন— তার পতন তাঁকে ইতিহাসের বাইরে ঠেলে দেয়নি; বরং তার জীবন ও মৃত্যুকে নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার সুযোগ সৃষ্টি করেছে— ক্ষমতার বৈধতা কোথায়, জনগণের রায়ের মূল্য কতটুকু, রাষ্ট্রের শক্তির সীমা কোথায় এবং একজন শাসকের নৈতিক দায় কতখানি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে মুরসি আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত শুধু বিজয়ীদের কাহিনী লেখে না; ইতিহাস কখনো কখনো তাদের কথাও সংরক্ষণ করে, যারা ক্ষমতার স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন— ‘না, অন্যায়কে মেনে নেওয়া যায় না।’
মুরসির উত্তরাধিকার সেই ‘না’-এর উত্তরাধিকার। এটি প্রতিহিংসার শিক্ষা নয়; এটি নৈতিক দৃঢ়তার শিক্ষা। এটি ক্ষমতা দখলের আহ্বান নয়; বরং ক্ষমতার সীমা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার আহ্বান। এটি কোনো ব্যক্তির বন্দনা নয়; বরং এমন একটি রাজনীতির আকাঙ্ক্ষা, যেখানে মানুষ রাষ্ট্রের জন্য নয়— রাষ্ট্র মানুষের জন্য।
তাই ড. মুহাম্মদ মুরসির জীবনকে যখন আমরা ফিরে দেখি, তখন শুধু একটি হারানো রাষ্ট্রপতির গল্প দেখি না। দেখি একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন, দেখি একটি জাতির গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার উত্থান-পতন, দেখি ক্ষমতা ও নৈতিকতার সংঘাত, আর দেখি এমন কিছু মানুষের আত্মত্যাগ— যারা বিশ্বাস করেছিলেন, সত্যের পথ দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু তা কখনো অর্থহীন নয়।
শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার প্রাসাদ বদলায়, পতাকা বদলায়, শাসকের নাম বদলায়; কিন্তু মানুষের বিবেকের ইতিহাসে কিছু দৃশ্য থেকে যায়। মুরসির জীবন ও আত্মত্যাগ তেমনই একটি দৃশ্য।
মৃত্যুদণ্ডের মঞ্চে পরিণত হয়েছিল মিশর
মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মিশরের রাজনৈতিক ইতিহাস প্রবেশ করে এক গভীর অন্ধকার অধ্যায়ে। রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার, কারাবন্দি এবং বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত করা হয়। অসংখ্য মানুষের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায়ও দেওয়া হয়। আদালত ও বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে বারবার। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট— একটি আন্দোলনকে ভয় দেখিয়ে, রক্তাক্ত করে, নেতৃত্বশূন্য করে এবং শেষ পর্যন্ত স্তব্ধ করে দেওয়া।
কিন্তু ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো— রক্ত দিয়ে কোনো আদর্শকে চিরতরে মুছে ফেলা যায় না। বরং কখনো কখনো রক্তই হয়ে ওঠে সেই আদর্শের সবচেয়ে দীপ্তিমান কালির উৎস। মিশর সরকার যে দমন-পীড়নের মাধ্যমে একটি আন্দোলনের কণ্ঠ স্তব্ধ করতে চেয়েছিল, সেই দমনই পৃথিবীর অগণিত মানুষের হৃদয়ে নতুন প্রশ্ন, নতুন প্রত্যয় এবং নতুন আলো জ্বেলে দেয়। কারাগারের অন্ধকারে যে জীবনগুলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাদের স্মৃতি পরিণত হয়েছিল প্রতিরোধের প্রতীকে।
এই রক্তাক্ত অধ্যায়েরই এক মর্মস্পর্শী নাম— লুৎফি ইব্রাহিম ইসমাইল খলিল। মাত্র ২৩ বছরের এক তরুণ। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নথিতে তার বয়স ২৩ বছর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার জীবন, গ্রেপ্তার, বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা মিশরের রাজনৈতিক নিপীড়নের ইতিহাসে এক গভীর বেদনাময় অধ্যায় হয়ে আছে।
লুৎফি ইব্রাহিম ইসমাইল খলিল ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে গ্রেপ্তার হন। তার সঙ্গে আরও কয়েকজনকে আটক করা হয় এবং তাঁদের বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে বিচার শুরু হয়। সাতজনের বিরুদ্ধে পরিচালিত সেই বিচারপর্বের শেষে ২০১৬ সালের ২ মার্চ মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম মিলিটারি কোর্ট অব আপিলস সেই মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে।
তারপর এগিয়ে আসে সেই ভয়াবহ দিন— ২ জানুয়ারি ২০১৮। আলেকজান্দ্রিয়ার বুর্জ আল-আরব কারাগারে লুৎফির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সময়টিও যেন সেই নির্মমতার সঙ্গে এক অদ্ভুত প্রতীকী আবহ তৈরি করেছিল। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ তখন গভীর রাতের নিদ্রায়। প্রকৃতি নিস্তব্ধ। চারদিকে নীরবতার আবরণ। পূর্ব আকাশে নতুন সূর্যের আবির্ভাবের ঠিক আগের মুহূর্ত— অন্ধকার যখন ধীরে ধীরে আলোকে পথ ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই একটি তরুণ জীবনের আলো নিভিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
একটি রাষ্ট্র একজন ২৩ বছরের তরুণের জীবন কেড়ে নিতে পারে; কিন্তু তার বিশ্বাস, তার প্রত্যয় এবং তার আত্মত্যাগের স্মৃতি কেড়ে নিতে পারে না।
লুৎফির শাহাদাত শুধু একটি পরিবারের শোক ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল একটি জাতির বিবেককে নাড়া দেওয়া ঘটনা। তার বাবা-মায়ের জন্য এটি ছিল সন্তানের মৃত্যু— কিন্তু সেই মৃত্যু ছিল এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া, যেখানে একজন তরুণ নিজের জীবনের চেয়েও বড় কোনো বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে প্রস্তুত হয়। পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ তার মৃত্যুর সংবাদে ব্যথিত হয়েছে; মানবাধিকারকর্মীরা নীরব প্রতিবাদ ও শোক প্রকাশ করেছেন।
সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রশ্নটি আজও মানুষের সামনে রয়ে গেছে— মাত্র ২৩ বছরের একজন তরুণ কীভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নিজের বিশ্বাসে অবিচল থাকতে পারে?
এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনো রাজনৈতিক অভিধানে নেই। এর উত্তর খুঁজতে হয় মানুষের অন্তর্গত বিশ্বাসে, আত্মমর্যাদায়, ন্যায়বোধে এবং সেই অদৃশ্য শক্তিতে, যা একজন মানুষকে নিজের জীবনের চেয়েও কোনো আদর্শকে বড় করে দেখতে শেখায়।
লুৎফির মৃত্যু তাই কেবল একটি মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা নয়; এটি ক্ষমতা ও বিবেকের সংঘাতের একটি প্রতীকী অধ্যায়। ফাঁসির দড়ি তার জীবন থামিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু তার গল্প থামাতে পারেনি। কারাগারের প্রাচীর তার কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে পেরেছিল, কিন্তু তার আত্মত্যাগের প্রতিধ্বনি আটকে রাখতে পারেনি।
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মৃত্যু থাকে, যেগুলোকে শুধু মৃত্যু বলে অভিহিত করা যায় না। সেগুলো হয়ে ওঠে প্রশ্ন, প্রতিবাদ এবং স্মৃতির অনির্বাণ শিখা। লুৎফি ইব্রাহিম ইসমাইল খলিলের ঘটনাও তেমনই এক অধ্যায়— যেখানে একটি তরুণ প্রাণের অবসানের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর সামনে নতুন করে উচ্চারিত হয়েছিল একটি পুরোনো প্রশ্ন— ক্ষমতার আদালত কি সত্যিই মানুষের বিবেকের ওপর চূড়ান্ত রায় দিতে পারে?
সময়ের স্রোত অনেক কিছু মুছে দেয়। শাসকের আদেশ, আদালতের কাগজ, কারাগারের দেয়াল— সবই একদিন ইতিহাসের ধুলায় ঢাকা পড়ে। কিন্তু আত্মত্যাগের স্মৃতি কখনো কখনো সময়ের চেয়েও দীর্ঘজীবী হয়। লুৎফির মতো তরুণদের রক্ত সেই ইতিহাসেরই এক অমোচনীয় দাগ, যা মিশরের রাজনৈতিক অন্ধকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে এবং একইসঙ্গে মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখাবে, ন্যায়ের জন্য একজন মানুষ কতদূর যেতে পারে, আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মূল্য কতটা হতে পারে।
(চলবে)