প্রেরণার বাতিঘর শহীদ প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ মুরসি
১৯ আগস্ট ২০২৬ ২১:১৫
॥ ছয় ॥
ঐতিহাসিক বিজয়ের পূর্বকথা : যে পথ পেরিয়ে মুরসি
মিশরের শহীদ রাষ্ট্রপতি ড. মুহাম্মদ মুরসির শাহাদাত, তার রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং পরিকল্পিতভাবে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার নেপথ্য ইতিহাস উপলব্ধি করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের সেই সুদূর পেছনের অধ্যায়ে- যেখান থেকে জন্ম নিয়েছিল একটি আদর্শিক আন্দোলন; যে আন্দোলন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেনি, বরং মানুষের চিন্তা, চেতনা, নৈতিকতা ও জীবনব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রত্যয় ধারণ করেছিল।
এই পথ কখনোই মসৃণ নয়। এর প্রতিটি বাঁকে ছিল কারাবন্দিত্ব, নির্যাতন, নিপীড়ন, নির্বাসন, রক্তপাত ও শাহাদাতের ইতিহাস। অসংখ্য মানুষ এই আন্দোলনের আদর্শের জন্য নিজেদের জীবন, স্বাচ্ছন্দ্য ও ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়েছেন। দীর্ঘ কয়েক দশকের সেই ত্যাগ, অশ্রু ও রক্তের সিঁড়ি বেয়ে মিশরের জনগণের মধ্যে একসময় যে গণজাগরণের বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে ড. মুহাম্মদ মুরসি মিশরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
কিন্তু মুরসির রাষ্ট্রপতি হওয়ার ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘ এক সংগ্রামের ঐতিহাসিক পরিণতি। তাঁর বিজয়ের পেছনে ছিল এমন এক রাজনৈতিক ও আদর্শিক ইতিহাস, যার শিকড় বহু দশকের কারানির্যাতন, ফাঁসি, হত্যাকাণ্ড, নিষেধাজ্ঞা ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের গভীরে প্রোথিত। তাই মুরসির বিজয়কে বুঝতে হলে তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়ার দিনের দিকে শুধু তাকালে চলবে না; তাকাতে হবে সেই দীর্ঘ পথের দিকে, যে পথ ধরে মিশরের ইসলামী আন্দোলন জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিল।
একইভাবে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতি এবং পরবর্তী শাহাদাতের ঘটনাকেও বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারণের পর মিশরে যে ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু হয়, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, দীর্ঘ কারাবাস, বিচারিক হয়রানি এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর পদক্ষেপের যে অধ্যায় রচিত হয়- তার পেছনেও রয়েছে মিশরের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যকার দীর্ঘ সংঘাতের ইতিহাস।
ড. মুরসির শাহাদাতের পর সেই ইতিহাস যেন নতুন এক বাঁকে প্রবেশ করে। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে অসুস্থতা ও অবহেলার মধ্যে তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে আজও বহু প্রশ্ন উচ্চারিত হয়। তাঁর অনুসারীদের ওপর চলতে থাকে গ্রেপ্তার, মামলা, কারাবন্দিত্ব ও নানা ধরনের নিপীড়ন। কিন্তু ইতিহাসের বিস্ময়কর শিক্ষা হলোÑ জুলুম কখনো কোনো আদর্শকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে পারে না; বরং কখনো কখনো নির্যাতনের অন্ধকারেই কোনো আদর্শ আরও গভীরভাবে মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত হয়।
ইখওয়ানুল মুসলিমিনের ইতিহাসকে সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই পাঠ করা প্রয়োজন। তাদের সামনে কেবল রাষ্ট্রক্ষমতার মঞ্চ দখলের কোনো সাধারণ রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা ছিল- এমন ব্যাখ্যা তাদের দীর্ঘ ইতিহাসের পূর্ণতাকে ধারণ করে না। তাদের ঘোষিত আদর্শিক প্রত্যয় ছিল ইসলামকে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা। তাদের কাছে ক্ষমতা ছিল লক্ষ্য নয়; বরং একটি বৃহত্তর আদর্শ বাস্তবায়নের সম্ভাব্য মাধ্যম।
প্রাচীন মিশরের যে মাটিতে একদিন ফেরাউনের জুলুমের ইতিহাস রচিত হয়েছিল, সেই মাটিতেই পরবর্তী যুগে ইসলামের পতাকা সমুন্নত করার স্বপ্ন দেখেছিল একটি প্রজন্ম। সেই স্বপ্নের পথে তারা কারাগারকে ভয় করেনি, নির্যাতনকে ভয় করেনি, মৃত্যুকে ভয় করেনি। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আদর্শের জীবন দীর্ঘতর; ব্যক্তির মৃত্যু ঘটতে পারে, কিন্তু সত্যের মৃত্যু ঘটে না।
এই বিশ্বাসের কারণেই তাদের সংগ্রামের ইতিহাসে কারাগার কেবল কারাগার হয়ে থাকেনি; তা হয়ে উঠেছে আত্মশুদ্ধি ও আত্মত্যাগের বিদ্যালয়। ফাঁসির মঞ্চ কেবল মৃত্যুর স্থান হয়ে থাকেনি; তা হয়ে উঠেছে বিশ্বাসের অমর সাক্ষ্য। আর শাহাদাত কেবল একটি জীবনের সমাপ্তি নয়; তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হয়ে উঠেছে নতুন প্রত্যয়ের সূচনা।
তাই ড. মুহাম্মদ মুরসির রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাকে বুঝতে হলে আমাদের আরও পেছনে ফিরতে হবে। জানতে হবে- কীভাবে মিশরের রাজনৈতিক মাটিতে ইসলামী আন্দোলনের উত্থান ঘটেছিল; কীভাবে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মধ্যেও সেই আন্দোলন টিকে ছিল; কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কারাগার, নির্যাতন ও শাহাদাতের মধ্য দিয়ে তাদের আদর্শিক পথ নির্মাণ করেছিল এবং কীভাবে সেই দীর্ঘ সংগ্রামের পর ২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থান মিশরের রাজনৈতিক ইতিহাসের দরজা খুলে দেয় এক নতুন সম্ভাবনার দিকে। সেই সম্ভাবনারই এক ঐতিহাসিক পরিণতি ছিল ২০১২ সালে ড. মুহাম্মদ মুরসির রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া।
অতএব মুরসির বিজয়ের ইতিহাস আসলে শুরু হয় ২০১২ সালে নয়। তার শুরু আরও বহু আগে একটি চিন্তার জন্মের মধ্য দিয়ে, একটি আন্দোলনের আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে এবং অসংখ্য মানুষের ত্যাগ ও রক্তের মধ্য দিয়ে। মুরসি ছিলেন সেই দীর্ঘ ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি; তাঁর বিজয় ছিল সেই সংগ্রামের এক বিরল রাজনৈতিক সাফল্য, আর তাঁর শাহাদাত হয়ে উঠেছিল সেই ইতিহাসের এক মর্মস্পর্শী অধ্যায়।
এখন আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সেই ইতিহাসের দিকে- মুরসির বিজয়ের বহু পূর্বে, যখন মিশরের মাটিতে জন্ম নিচ্ছিল এমন একটি আন্দোলন, যা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, কারাবাস, নির্যাতন ও শাহাদাতের মধ্য দিয়েও তার আদর্শিক যাত্রা অব্যাহত রাখে।
ইতিহাসের নাম ইখওয়ানুল মুসলিমিন
আর সেই ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়েই আমরা দেখতে পাব, কীভাবে দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পেরিয়ে মিশরের জনগণ একদিন ব্যালটের মাধ্যমে তাদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিল মুহাম্মদ মুরসিকে।
হাসান আল-বান্না : এক তরুণের স্বপ্ন থেকে এক জাগরণের মহাকাব্য
“আমি দাঈ ও প্রশিক্ষক হতে চাই। দিনের অধিকাংশ সময় মিশরের নবপ্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দেব; আর রাতের বেলা ও ছুটির দিনগুলোয় তাদের অভিভাবকদের কাছে দীনের উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য তুলে ধরব। তাদের জানাব- শান্তি ও সৌভাগ্যের উৎস কোথায়, জীবনের প্রকৃত সুখ ও আনন্দ কীভাবে অর্জন করা যায়। বক্তৃতা, আলোচনা, পারস্পরিক আলাপচারিতা, পুস্তক-পুস্তিকা রচনা- মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতে পারে, এমন প্রতিটি উপায় আমি কাজে লাগাব।”
কথাগুলো প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল এক তরুণ হৃদয়ের গভীর প্রত্যয় থেকে। তখনো কেউ জানত না, এই স্বপ্ন একদিন মিশরের সীমানা পেরিয়ে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে একটি দীর্ঘস্থায়ী অধ্যায়ের জন্ম দেবে।
তরুণের নাম হাসান আল-বান্না
কিছু মানুষ নিজের মুক্তির স্বপ্ন দেখে। কিছু মানুষ নিজের পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে। আর ইতিহাসে এমন কিছু মানুষও আসেন, যাদের হৃদয়ে ব্যক্তিগত জীবনের সীমা অতিক্রম করে একটি সমাজ, একটি জাতি কিংবা একটি সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্থিরতার জন্ম নেয়। হাসান আল-বান্নার জীবনকে তাঁর অনুসারীরা সেই ধরনের এক জাগরণের কাহিনি হিসেবেই দেখেছেন।
তিনি উপলব্ধি করেছিলেন- শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন কোনো সমাজের গভীর সংকটের সমাধান করতে পারে না। মানুষের চিন্তা, চরিত্র, নৈতিকতা ও আত্মপরিচয়ের পরিবর্তন ছাড়া বাহ্যিক পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
তাঁর কাছে তাই দাওয়াত ছিল শুধু বক্তৃতা নয়; ছিল মানুষ গড়ার কর্মসূচি। সংগঠন ছিল শুধু সদস্য সংগ্রহের ব্যবস্থা নয়; ছিল চরিত্র নির্মাণের বিদ্যালয়। আর ইসলামী পুনর্জাগরণ ছিল কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের প্রশ্ন নয়; বরং মানুষের অন্তর থেকে সমাজের দিকে বিস্তৃত একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের স্বপ্ন।
শৈশবের মাটি থেকে জাগরণের বীজ
হাসান আল-বান্না জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৬ সালে মিশরের মাহমুদিয়া অঞ্চলে। তাঁর পিতা ছিলেন ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন একজন মানুষ। শৈশবেই কুরআন, হাদিস, আরবি ভাষা ও ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। কৈশোরে তিনি সুফি পরিবেশের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী জীবনে তাঁর চিন্তা ও সংগঠন সম্পর্কে নানা বিতর্ক থাকলেও তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে ধর্মীয় অনুশাসন ও আত্মশুদ্ধির প্রভাব ছিল গভীর।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী মিশর ছিল এক অস্থির সময়ের দেশ। ব্রিটিশ প্রভাব, ঔপনিবেশিক আধিপত্য, সামাজিক বৈষম্য, দ্রুত পরিবর্তিত সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক দুর্বলতা তরুণ প্রজন্মের সামনে নানা প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছিল।
১৯১৯ সালের মিশরীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও তরুণ হাসানের ওপর প্রভাব ফেলেছিল। পরবর্তীকালে তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে যে প্রশ্নটি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল তা হলোÑ একটি জাতির পরাধীনতার মূল কি শুধু বিদেশি শাসনে, নাকি তার আত্মিক ও নৈতিক দুর্বলতার মধ্যেও?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি ধর্মীয় শিক্ষা, সমাজ সংস্কার ও জনসম্পৃক্ততার পথ বেছে নেন।
আল-আজহারের গণ্ডি নয়, মানুষের জনপথ
হাসান আল-বান্নার শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল কায়রোর দারুল উলুম। সেখানে তিনি ধর্মীয় ও আধুনিক উভয় ধরনের শিক্ষার সংস্পর্শে আসেন। ১৯২৭ সালে শিক্ষকতার কাজে তাঁকে ইসমাইলিয়ায় পাঠানো হয়। সুয়েজ খাল অঞ্চলের এই শহরে ব্রিটিশ উপস্থিতি ছিল প্রবল। ঔপনিবেশিক শক্তির অর্থনৈতিক প্রভাব এবং সাধারণ মানুষের দারিদ্র্যের বৈপরীত্য তাঁর চিন্তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে।
তিনি বুঝতে শুরু করেন- মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে মসজিদের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। যেতে হবে বাজারে, চায়ের দোকানে, শ্রমিকের ঘরে, সাধারণ মানুষের আড্ডায়।
তাই তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন, মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন, ছোট ছোট বৈঠক করেছেন, তরুণদের সংগঠিত করেছেন। তাঁর দাওয়াতের ভাষা ছিল তুলনামূলকভাবে সরল; কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল গভীর- মানুষকে তার বিশ্বাস, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখানো।
১৯২৮ : ছোট্ট বৈঠক থেকে ঐতিহাসিক যাত্রা
১৯২৮ সালের মার্চ মাসে ইসমাইলিয়ায় হাসান আল-বান্না কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে যে সংগঠনের সূচনা করেন, সেটিই পরবর্তীকালে আল-ইখওয়ান আল-মুসলিমুনÑ মুসলিম ব্রাদারহুড নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়। প্রতিষ্ঠার প্রথম পর্যায়ে এটি মূলত ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক সংস্কার ও সামাজিক পুনর্গঠনের সংগঠন হিসেবে বিকশিত হয়।
ছোট্ট একটি শহর। অল্পসংখ্যক মানুষ। সীমিত সামর্থ্য কিন্তু ইতিহাসের সব বড় পরিবর্তনের শুরু কি কখনো বিশাল প্রাসাদ থেকে হয়?
কখনো কখনো ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ প্রতিধ্বনির জন্ম হয় একটি ছোট ঘরে, কয়েকজন মানুষের আন্তরিক কথোপকথন থেকে।
ইখওয়ানের প্রথম দিকের কর্মকাণ্ডের মধ্যে ছিল মসজিদ নির্মাণ, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, কুরআন শিক্ষা, দাওয়াত এবং দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সংগঠনটি ধীরে ধীরে ইসমাইলিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে মিশরের অন্যান্য অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে।
কায়রো : আন্দোলনের নতুন অধ্যায়
১৯৩০-এর দশকে ইখওয়ানের কার্যক্রম দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে। ১৯৩৪ সালে সংগঠনের কেন্দ্র কায়রোয় স্থানান্তরিত হয়। কায়রো ছিল মিশরের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক হৃদয়। ফলে এখান থেকে ইখওয়ানের দাওয়াত ও সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত পরিসর লাভ করে।
হাসান আল-বান্না শুধু বক্তা ছিলেন না। তিনি ছিলেন সংগঠক, শিক্ষক এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার এক অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন কর্মী।
তিনি জানতেন, একটি বক্তৃতা মানুষকে কিছু সময়ের জন্য আবেগতাড়িত করতে পারে; কিন্তু একটি সুসংগঠিত প্রশিক্ষণ একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।
তাই তাঁর কর্মপদ্ধতিতে ছিল-
দাওয়াত,
তরবিয়াত,
চরিত্রগঠন,
সংগঠন,
সমাজসেবা এবং
ধীরে ধীরে বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের প্রস্তুতি।
এই কারণেই ইখওয়ানের বিস্তার শুধু বক্তৃতার ওপর নির্ভর করেনি। সংগঠনটি বিদ্যালয়, ক্লিনিক, হাসপাতাল, দাতব্য কার্যক্রম এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে।
নারী ও সমাজ : জাগরণের আরেক অর্ধেক
ইখওয়ানের নারী শাখার সূচনাও এই সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ১৯৩৩ সালে ইসমাইলিয়ায় নারীদের জন্য সংগঠনিক কার্যক্রমের সূচনা হয় এবং পরবর্তীকালে হাসান আল-বান্নার উৎসাহে তা আরও বিস্তৃত হয়। নারীদের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষা, দাওয়াত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সচেতনতা সৃষ্টিতে এই শাখা ভূমিকা রাখে।
হাসান আল-বান্নার সমাজচিন্তায় পরিবার ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ একক। তাঁর দৃষ্টিতে পরিবার পরিবর্তিত হলে সমাজ পরিবর্তনের পথও প্রশস্ত হয়।
তাই তাঁর কাছে আন্দোলন মানে শুধু রাজপথের মিছিল নয়; বরং একটি শিশুর শিক্ষা, একজন তরুণের চরিত্র, একজন মায়ের সচেতনতা এবং একজন পিতার নৈতিক দায়িত্ব- সবকিছুর সমন্বিত পরিবর্তন।
দাওয়াত থেকে রাজনীতি
সময়ের সঙ্গে ইখওয়ানের কর্মসূচি ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক প্রশ্নেও প্রবেশ করে। ব্রিটিশ প্রভাব, ফিলিস্তিন প্রশ্ন, মিশরের রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং ইসলামের সামাজিক ভূমিকা নিয়ে সংগঠনটি ক্রমেই সক্রিয় হয়ে ওঠে।
এই পর্যায়ে ইখওয়ান শুধু একটি ধর্মীয় সমিতি ছিল না; এটি একটি বৃহৎ সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিতে শুরু করে।
তবে এর ইতিহাস একরৈখিক নয়।
ইখওয়ানের সামাজিক কল্যাণমূলক ভূমিকার পাশাপাশি রাজনৈতিক ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৮ সালে মিশরের প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ ফাহমি আল-নুকরাশি নিহত হন; সরকার ইখওয়ানকে নিষিদ্ধ করে এবং ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু করে। হাসান আল-বান্না এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংগঠনের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক অস্বীকার করেছিলেন।
১৯৪৮-এর ঝড় এবং ১৯৪৯-এর রক্তাক্ত ভোর
১৯৪৮ সালের শেষদিকে ইখওয়ান নিষিদ্ধ হলো। সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হলো, বহু নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হলেন। তারপর এল ১৯৪৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি।
হাসান আল-বান্না কায়রোয় হত্যাকারীদের গুলিতে গুরুতর আহত হন এবং পরে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে একটি যুগের অবসান হলেও আন্দোলনের ইতিহাস থেমে যায়নি।
একজন ক্ষণজন্মা রাজপুরুষের বিদায়
কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সংগঠন রয়ে গেল।
একটি ধারণা রয়ে গেল।
একটি স্বপ্ন রয়ে গেল।
আর ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়- কখনো কখনো একজন মানুষের মৃত্যুই তাঁর অনুসারীদের কাছে তাঁর জীবনের চেয়ে বড় প্রতীকে পরিণত হয়।
আল-হুদায়বি : কঠিন সময়ে নেতৃত্ব
হাসান আল-বান্নার মৃত্যুর পর ইখওয়ানের নেতৃত্বে আসেন হাসান আল-হুদায়বি। তাঁর সময়ে সংগঠনটি এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। ১৯৫২ সালের সামরিক বিপ্লবের পর প্রথমদিকে ইখওয়ান ও ফ্রি অফিসারদের মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাবনা দেখা দিলেও খুব দ্রুত সম্পর্কের অবনতি ঘটে। কারণ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং সমাজের আদর্শগত চরিত্র নিয়ে উভয় পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে গভীর পার্থক্য ছিল।
১৯৫৪ সালে নাসেরকে হত্যার একটি প্রচেষ্টার পর ইখওয়ানের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু হয়। হাজার হাজার নেতা-কর্মী কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। সংগঠন কার্যত ভূগর্ভস্থ হয়ে পড়ে।
কারাগার তখন হয়ে উঠল ইখওয়ানের নতুন বিদ্যালয়।
লোহার শিকল হয়ে উঠল নতুন পরীক্ষা।
আর নির্যাতনের অন্ধকারে জন্ম নিতে থাকল নতুন এক চিন্তার ভাষা।
আবদুল কাদের আওদাহ : বিচারকের আসন থেকে কাঠগড়ায়
এই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিত্বদের একজন ছিলেন আবদুল কাদের আওদাহ আইনজ্ঞ, বিচারক এবং ইখওয়ানের বিশিষ্ট নেতা।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীকী মুহূর্ত ছিল বিচারকের আসন ত্যাগ করে রাজনৈতিক ও আদর্শিকভাবে নিজের অবস্থান প্রকাশ করা। পরবর্তী সময়ে নাসের সরকারের বিচারে তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন এবং ১৯৫৪ সালে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
তাঁর কাহিনী ইখওয়ানের অনুসারীদের কাছে পরিণত হয় ন্যায়বিচার, আত্মমর্যাদা ও আদর্শের জন্য আত্মত্যাগের প্রতীকে।
তবে ইতিহাসের ভাষায় বলা যায়, এই সময়টি ছিল মিশরের রাষ্ট্রক্ষমতা ও ইখওয়ানের মধ্যে সংঘাতের এক চরম অধ্যায়; যেখানে বিচার, রাজনীতি, নিরাপত্তা ও আদর্শ সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল।
কারাগারের অন্ধকারে এক নতুন চিন্তার জন্ম
নাসেরের কারাগারেই আবির্ভূত হন আরেক শক্তিশালী কণ্ঠ সাইয়েদ কুতুব।
সাইয়েদ কুতুব ছিলেন সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ ও ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম প্রভাবশালী লেখক। তিনি একসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেন। পশ্চিমা সমাজের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আড়ালে যে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংকট তিনি অনুভব করেছিলেন, তা তাঁর পরবর্তী চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলে।
১৯৫০-এর দশকে তিনি ইখওয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। ১৯৫৪ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দীর্ঘ কারাবাসে পাঠানো হয়। কারাগারে নির্যাতন, অসুস্থতা ও একাকিত্ব তাঁর চিন্তাকে আরও তীক্ষè করে তোলে।
সেখানেই তিনি লিখতে থাকেন তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘ফি জিলালিল কুরআন’ এবং পরবর্তীকালে ‘মা’আলিম ফিত তারিক’।
তাঁর লেখায় উঠে আসে জাহেলিয়াত, ঈমান, তাওহীদ, সমাজব্যবস্থা এবং ইসলামী পুনর্গঠনের প্রশ্ন। পরবর্তী দশকগুলোয় তাঁর চিন্তা বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলন ও জিহাদি ধারার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে যদিও মূলধারার ইখওয়ান ও পরবর্তী সশস্ত্র জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্যও ছিল।
ক্ষমার বিনিময়ে নীরবতা নয়
কারাগারে সাইয়েদ কুতুবের দৃঢ়তার বহু কাহিনি তাঁর অনুসারীদের মধ্যে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। তাঁর কাছে স্বাধীনতার অর্থ ছিল শুধু কারাগারের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসা নয়; বরং সত্যের কাছে অবিচল থাকা।
তাঁর জীবনদর্শনের কেন্দ্রে ছিল একটি বিশ্বাস মানুষের জীবন, মৃত্যু ও রিজিক শেষ পর্যন্ত আল্লাহর হাতে।
এই বিশ্বাসই তাঁকে কারাগারের অন্ধকারে এক ধরনের অন্তর্গত স্বাধীনতা দিয়েছিল।
লোহার শিকল তাঁর শরীরকে আটকে রাখতে পেরেছিল; তাঁর চিন্তাকে নয়।
১৯৬৫-৬৬ : শেষ অধ্যায়
১৯৬৪ সালে সাইয়েদ কুতুব মুক্তি পেলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৬৫ সালে সরকার ইখওয়ানের বিরুদ্ধে নতুন ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলে। ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়। সাইয়েদ কুতুবসহ বহু নেতা-কর্মী পুনরায় কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন।
১৯৬৬ সালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
২৬ আগস্ট ১৯৬৬ সাইয়েদ কুতুবের জীবনের শেষ দিন।
রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত।
তাঁর অনুসারীদের কাছে তিনি ছিলেন সত্যের পথে অবিচল এক শহীদ।
তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর চিন্তা আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কারাগারের ভেতরে লেখা তাঁর বইগুলো আর কারাগারে আটকে রইল না। সেগুলো পৌঁছে গেল আরব বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এবং পরবর্তীকালে মুসলিম বিশ্বের বহু চিন্তাশীল তরুণের হাতে।
এখানেই ইতিহাসের এক গভীর পরিহাস
যে কণ্ঠকে ফাঁসির দড়ি দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার লেখা বইগুলোই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আরও জোরে কথা বলতে শুরু করল।
নির্যাতনের ইতিহাস : অন্ধকারের ভেতরেও আলো
ইখওয়ানের ইতিহাসে কারাগার, নির্যাতন, নির্বাসন ও মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা অসংখ্য। নাসেরের আমলে সংগঠনটি দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ ও দমন-পীড়নের মধ্যে ছিল।
তবে এই ইতিহাসের বর্ণনায় আবেগের পাশাপাশি ঐতিহাসিক সতর্কতাও জরুরি। ইখওয়ানের সব সদস্য একই ধরনের রাজনৈতিক বা ধর্মীয় চিন্তা পোষণ করতেন না; আবার সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ও রাজনৈতিক কৌশলও পরিবর্তিত হয়েছে।
তবু একটি বিষয় অনস্বীকার্য- দীর্ঘ দমন-পীড়ন সত্ত্বেও ইখওয়ান মিশরের সামাজিক চেতনা থেকে বিলীন হয়ে যায়নি।
কারাগারের ভেতরে তাদের শরীর বন্দী হয়েছে; কিন্তু তাদের সামাজিক নেটওয়ার্ক, পরিবার, শিক্ষা, দাওয়াহ ও স্মৃতির ভেতর দিয়ে সংগঠনটি টিকে থেকেছে।
কারাগার থেকে নির্বাচনের ময়দানে
নাসের-পরবর্তী সময়ে ইখওয়ানের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। আনোয়ার সাদাতের সময় রাজনৈতিক পরিসরে সীমিত সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তী দশকগুলোয় ইখওয়ান ধীরে ধীরে নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশগ্রহণের কৌশল গ্রহণ করে।
১৯৮৪ সালের সংসদ নির্বাচনে ইখওয়ান সরাসরি দল হিসেবে অংশ নিতে পারেনি, কারণ সংগঠনটি তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ছিল। তারা ওয়াফদ পার্টির সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ওই জোট ৪৫০ আসনের সংসদে ৬৫টি আসন লাভ করে। (Council on Foreign Relations)
এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা।
যে আন্দোলনের বহু নেতা একসময় কারাগারের অন্ধকারে জীবন কাটিয়েছিলেন, তাদের উত্তরসূরিরা এখন ব্যালট বাক্সের দিকে তাকাচ্ছিলেন।
অস্ত্র নয়- ভোট।
গোপন সংগঠন নয়- জনসমর্থন।
কারাগারের দরজা নয়- সংসদের দরজা।
ইখওয়ানের ইতিহাসে এটি ছিল এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়। (চলবে)