দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানির ছোবলে হৃত প্রায় রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা জাতিসত্তা


১২ আগস্ট ২০২৬ ২০:০৪

॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
হাজার বছরের পুরোনো জাতিগোষ্ঠী রোহিঙ্গা। যে জাতিগোষ্ঠী রোহিঙ্গার ওপর প্রভাব রয়েছে আরব, মুঘল ও পর্তুগিজদের। সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্যীয় মুসলমান ও স্থানীয় আরাকানিদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। পরবর্তীতে চাঁটগাইয়া, রাখাইন, আরাকানি, বার্মিজ, বাঙালি, ভারতীয়, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষদের মিশ্রণে উদ্ভুত এই শংকর জাতি ত্রয়োদশ-চর্তুদশ শতাব্দীতে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পঞ্চদশ শতাব্দী হতে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত আরাকানে রোহিঙ্গাদের নিজস্ব রাজ্য ছিল। ব্রিটিশরা বার্মায় শাসক হিসেবে আসার কয়েক শতাব্দী আগে হতেই রোহিঙ্গারা আরাকানে জাতিগোষ্ঠী হিসেবে বিকশিত হয়েছিল। ১৭৯৯ সালে ব্রিটিশ নথিতে ‘রুইঙ্গা’ হিসেবে তাদের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। তারা ‘রুয়াইঙ্গা’ বা ‘রোহিঙ্গা’ ভাষায় কথা বলে। রোহিঙ্গারা মূলত স্বাধীন আরাকান রাজ্যের অধিবাসী ছিল, যা ১৮২৬ সালে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আসে এবং ১৯৪৮ সালে মিয়ানমারের এক অংশে পরিণত হয়। সাংস্কৃতিক বিবেচনায় রোহিঙ্গারা মুসলিম। ইসলামোফোবিয়ায় বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের মুসলিম রোহিঙ্গা নিধনে জাতিগোষ্ঠী রোহিঙ্গা আজ বিশ্বের সংকটাপন্ন জাতিতে পরিণত হয়েছে। যদিও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে কিছু অংশ হিন্দুও রয়েছে।
রোহিঙ্গা মুসলিমরা বিজয়ী শক্তি হয়েও সংকটাপন্ন : রোহিঙ্গা মুসলিমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের পক্ষে থেকে জাপানের মিত্রপক্ষ হিসেবে থাকা রাখাইন বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয় লাভ করে। বিজয়ী হয়েও বৌদ্ধ সন্ত্রাসবাদের ছোবলে রোহিঙ্গারা বিপন্ন হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। ১৯৭৭-৭৮ সালের ‘অপারেশন ড্রাগন কিং’ মিয়ানমার সরকার মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালায় ফলে তারা জীবনভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে যায়। এ বিষয়ে মানবাধিকার কর্মী শাকের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছিলেন রোহিঙ্গা মুসলিমরা তাদের জানমাল সব বার্মায় ফেলে আসছে। যারা মাথাপ্রতি বিশ্ব খাদ্য সংস্থা কর্তৃক মাসিক মাত্র ১২ মার্কিন ডলারের সমমূল্যের পণ্যসামগ্রী দিয়ে কোনোরকম বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছেন।
রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী : ১৯৮২ সালের মিয়ানমার নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়েছে। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা ব্যতীত ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে তারা এক রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে, যাদের কোনো আইনি অধিকার নেই। যদিও রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে কয়েক শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসছে। ১৯৯১-৯২ সালে The State Law and Order Restoration Council (SLORC)-এর মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার উত্তর আরাকান/রাখাইন স্টেটে রোহিঙ্গাদের আবার ঘৃণিত জাতিগত নিধনে দেশছাড়া করে। অন্যদিকে মিয়ানমারে যে কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্য আছেন, তাদের বিয়ে করার জন্যও স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নেয়া লাগে। দুটির বেশি সন্তান নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রশাসনের অনুমতি না নিয়ে বিয়ে করায় ও দুজনের বেশি সন্তানের জন্ম দেয়ায় রোহিঙ্গা পরিবারের সন্তানদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। এরা সরকারি গ্যাটোতে থাকতে পারে না। আবার গ্যাটোর বাইরেও থাকতে পারে না। কারণ মিয়ানমারের নাগরিক নয় ওরা। অবস্থাটা ওদের এমন যে, মিয়ানমার সরকার ওদের কোনো অস্তিত্বই স্বীকার করে না। এসব পরিচয়হীন রোহিঙ্গারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের পথে পা বাড়ায়। নৌপথে সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে অসংখ্য রোহিঙ্গার সলিল সমাধি হয়।
আরাকান রাজ্য/নতুন রাষ্ট্র : রাখাইন অঞ্চলে আরাকান আর্মি বিভিন্ন এলাকা দখল করে নিয়েছে, তাতে করে বিচলিত হয়ে পড়েছে মিয়ানমার সরকার। তবে ওয়াং ম্রা নাইং নামে আরাকান আর্মির এক প্রভাবশালী সামরিক নেতার একটি ইন্টারভিউ থেকে জানা যায়, তারা রাখাইন প্রদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়ছে না। ওয়াং ম্রা নাইংয়ের মতে, ‘১৯৭১ সালে এই অঞ্চলে পূর্ব পাকিস্তান পৃথক হয়েছিল। কিন্তু ৫০ বছর পর পরিস্থিতি ভিন্ন। আশপাশের শক্তিশালী (ভারত ও চীন) দেশগুলো কেউ চাইছে না এ অঞ্চলে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হোক। তবে আরাকান আর্মি পরিষ্কার করেছে, চীন ও ভারতের সঙ্গে আরাকান আর্মির যোগাযোগ আছে। আরাকান আর্মি মিয়ানমার সামরিক জান্তার ব্যারাক ও ফাঁড়ি দখল করার সময় রোহিঙ্গা মুসলিমদের হিউম্যান শিল্ড (মানবঢাল) হিসেবে ব্যবহার করেছিল। ২০১২ সালে রাখাইন এবং রোহিঙ্গাদের মধ্যে দাঙ্গা হয়েছিল। তখন মিয়ানমার পুলিশ এবং রাখাইনরা রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয় এবং গণহত্যা চালায়। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সামরিক জান্তা ‘অপারেশন ক্লিয়ারেন্স’ নামে রোহিঙ্গাদের ওপর আবার গণহত্যা চালায়, ঐ সময় আরো প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। তার কন্টিনিউয়েশন আরাকান আর্মি করছে। আরাকান আর্মির আর্টিলারি হামলা এবং ড্রোন হামলায় হাজার হাজার মুসলিম রোরিঙ্গারা শাহাদাতবরণ করেন। তাদের হামলায় আমিও আমার নিকটাত্মীয় হারিয়েছি। আরাকান থেকে জীবনভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার খবরের কো ফাউন্ডার শোকার্ত ফয়সাল আলম বলছিলেন। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেছেন, ‘আরাকান আর্মিও মিয়ানমার সরকারের ন্যায় রোহিঙ্গাদের ওপর যে দমননীতি অনুসরণ করছে। তাদের উচিত, এই বৈষম্যমূলক ও নিপীড়নমূলক আচরণ বন্ধ করে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা’। (৩০ জুলাই ২০২৫; প্রথম আলো)।
মানবতাবিরোধী ভারত : ভারত সরকার; বিশেষ করে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি, রোহিঙ্গাদের ‘অবৈধ বিদেশি’ হিসেবে গণ্য করে, শরণার্থী হিসেবে নয়। ভারত শরণার্থীদের সুরক্ষায় কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো রোহিঙ্গাদের ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখাচ্ছে। এই নীতি হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী ধারণার সঙ্গে জড়িত বলে মনে করা হয়। যদিও রোহিঙ্গাদের মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বী রয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও ভারত সরকার একাধিকবার বলপূর্বক মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করেছে, যা অত্যাধিক মানবতাবিরোধী। সাম্প্রতিক সময়ে, ভারত নৌবাহিনীর মাধ্যমে কিছু রোহিঙ্গাকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার মতো অমানবিক পদক্ষেপ নেওয়ার ঘটনা মিডিয়ায় উঠে এসেছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অবস্থান, আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ এবং জান্তা সরকারকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে মানবতাবিরোধী দেশটির বিরুদ্ধে।
প্রত্যাবর্তন না আত্মীকরণ : সম্প্রতি বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়ার মধ্যস্থতায় মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবর্তন আলোচনা একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। প্রথম ধাপে তিন লাখ রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা পাওয়া গেছে। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। ২০১৯ সালে গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) সীমান্ত অতিক্রম করে সংঘটিত সম্ভাব্য অপরাধের তদন্ত করছে। এসব প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে সংকটটির গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে। তবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো শরণার্থীকে, জীবন ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে কোনো স্থানে ফেরত পাঠানো যায় না। (গবেষক ড. মো. মিজানুর রহমান)। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনে রাজি হয় মিয়ানমারের অং সান সু চি সরকার। ওই বছর বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে সইও করে দেশটি। একপর্যায়ে ২০১৯ সালে দুই দফায় প্রত্যাবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের ওপর আস্থা রাখতে পারেনি রোহিঙ্গারা, ভেস্তে যায় আলোচনা। এদিকে ২০২৪ সালে রমাদান মাসে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে গিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসকে পাশে রেখে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে বলেছিলেন, আগামী পবিত্র ঈদুল আজহা রোহিঙ্গারা আরাকানে করবে। তার কথায় রোহিঙ্গারা খুশি হয়েছিল। তারপর ২ বছর অতিক্রান্ত হলেও সেই প্রত্যাবর্তন হয়নি। যদিও রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কেবল মিয়ানমারের ভেতরেই সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) ফিলিপ্পো গ্রান্ডি। অন্যদিকে ইউরোপে সিরীয় শরণার্থী, কেনিয়ায় সোমালি শরণার্থী, পাকিস্তানে আফঘান শরণার্থীÑ তারা সবাই একটি যুদ্ধ পরিস্থিতি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে পালিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছিল। অনেক শরণার্থী সমস্যা আবার প্রথমবারের মতো সৃষ্টি হয়েছিল। সেদিক থেকে রোহিঙ্গা সমস্যা ভিন্ন। যেটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সহযোগিতায় একপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ফলে বারবার সৃষ্ট। তারা কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে পলায়নপর কোনো উদ্বাস্তু নয়। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও ইউএনএইচসিআর মানবিক সহায়তার মাধ্যমে ক্যাম্পে স্থায়ীকরণে ও স্থানীয়করণে উদ্বুদ্ধ করে। শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে আশ্রয়দাতা দেশের সংস্কৃতি, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নানাবিধ বিনিয়োগ সহায়তা করে থাকে। (২৪ আগস্ট ২০২৫; প্রথম আলো)। যদিও আরাকান থেকে জীবননাশের আশাঙ্কায় বাংলাদেশে আসা তরুণ অ্যাক্টিভিস্ট আজাস খান বলছিলেন, আমার মূল লক্ষ্য শরণার্থী হওয়া নয়। আমি সম্মানের সঙ্গে নিরাপদে আমার দেশ মিয়ানমারে যেতে চাই। যতক্ষণ সেই দিন না আসে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি রোহিঙ্গা তরুণদের জন্য কাজ করে যাব এবং এমন একটি ভবিষ্যতের জন্য কাজ করব যেখানে রোহিঙ্গা শিশুরা নিজের বাড়িতে স্বাধীন মানুষ হিসেবে বড় হতে পারবে, শরণার্থী হিসেবে নয়।
বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা : বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তিনটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সম্মেলনের আয়োজন করছে। প্রথমটি ‘স্টেকহোল্ডার্স ডায়ালগ : টেকঅ্যাওয়ে টু দ্য হাই-লেভেল কনফারেন্স অন দ্য রোহিঙ্গা সিচুয়েশন’ হয় ২৫ আগস্ট ২০২৫ কক্সবাজারে। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বাকি দুই সম্মেলনের একটি ৩০ সেপ্টেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। অন্যটি ৬ ডিসেম্বর কাতারে। (২৫ আগস্ট ২০২৫; প্রথম আলো)। এসব সম্মেলনে অধ্যাপক ইউনূস তার বক্তব্যে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে সাত দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন। অন্যদিকে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস লিনাস রাগনার উইকসের সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয় (১১ আগস্ট ২০২৬) ঢাকায়। সাক্ষাৎকালে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান বিষয়ে আলোচনা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সুইডেন রোহিঙ্গা ডোনার গ্রুপের কো-চেয়ার হওয়ায় বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে রাখতে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তুরস্কে চলমান আন্তালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামে শুক্রবার ‘গ্লোবাল রেফিউজি প্রটেকশন সিস্টেম ইন দ্য ফেইস অব ডিসপ্লেসমেন্ট ক্রাইসিস’ শীর্ষক বৈঠকে এ আহ্বান জানান তিনি। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় এবং মানবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের ভূয়সি প্রশংসা করেছে। (২৫ আগস্ট ২০২৫; প্রথম আলো)।
মানবিক করিডোর : জাতিসংঘের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, ১৯৯০ সালের আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে মানবিক করিডোর একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি চুক্তি, যা যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো সংকটময় পরিস্থিতিতে নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানো, চিকিৎসা ও আহতদের সরিয়ে নেওয়া, শরণার্থীদের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়। নিরাপত্তা ইস্যু থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর কল্যাণে এমন মানবিক করিডোর দিতে সম্মতি জানিয়েছে। এ বিষয়ে ইউএনএইচসিআর প্রধান বলেন, ‘অসংখ্য চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো রোহিঙ্গার সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্বের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। উল্লেখ্য, এমন মানবিক করিডোর দেওয়ার উদাহরণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (কিন্ডারট্রান্সপোর্ট) : ১৯৩৮-১৯৩৯ সালের দিকে নাৎসি-নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে প্রায় ১০,০০০ ইহুদি শিশুকে যুক্তরাজ্যে সরিয়ে নেওয়ার জন্য একটি মানবিক করিডোর ব্যবহার করা হয়েছিল।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ (২০২২) : ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সময় মানবিক করিডোর প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এটি ব্যর্থ হয় এবং হামলার ঘটনাও ঘটেছিল।
সুদান যুদ্ধ (২০২৫) : সুদানে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে ত্রাণ পৌঁছানোর জন্য মানবিক করিডোর চালু করা হয়েছিল।
রাখাইন রাজ্য (২০২৫) : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি করিডোরের বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মতি দেয়।
কৌশলগত ও সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধি : মাত্র ৩০ হাজার যোদ্ধা নিয়ে গঠিত আরাকান আর্মি যদি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে উল্লেখযোগ্যভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারে, তাহলে ১৩ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর মধ্য থেকে ৫০ হাজার সদস্যের একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলা কি বাংলাদেশের জন্য সম্ভব নয়? বাংলাদেশ কেন কেবল সফট পাওয়ার পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ? বাংলাদেশের উচিত, ভূরাজনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে বিশ্বাসযোগ্য (হার্ড পাওয়ার) সামরিক শক্তিতে কৌশলগতভাবে এগিয়ে যাওয়া।
বাংলাদেশ মিয়ানমার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক : বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত প্রায় ৩০০ কিলোমিটার। মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী ৭৫ বছর ধরে দেশটির কোথাও না কোথাও নিজ জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত আছে। ২০২২ সালে মিয়ানমারের জান্তাবাহিনী বাংলাদেশের দিকেও মর্টার ও গুলি ছুড়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে। (০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪; কক্সবাংলা ডটকম)। যদিও পরিস্থিতি অনুকূলে এলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে সম্প্রতি জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াও সোয়ে মোয়ে। (২ আগস্ট ২০২৬)। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ তথ্য জানান মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত।
মুসলিম বিশ্বের ভূমিকা : রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিয়ে মুসলিম বিশ্বের ভূমিকা মিশ্র এবং জটিল। একদিকে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, যেমন বাংলাদেশ, ওআইসি (OIC) এবং ইসলামিক এনজিওগুলো মানবিক সহায়তা ও আশ্রয় প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মুসলিম বিশ্ব সম্মিলিত এবং সুসংহতভাবে প্রায়োগিক শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে পারেনি। তবে মুসলিম দেশ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম গত সপ্তাহে ঘোষণা দেন, মিয়ানমার ৫ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। গত বুধবার (৫ আগস্ট) এক সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল বলেন, মালয়েশিয়া একটি দায়িত্বশীল দেশ। যদি দেখা যায়, কাউকে ফেরত পাঠালে তিনি নির্যাতনের শিকার হবেন, তাহলে তাকে ফেরত পাঠানো হবে না। মালয়েশিয়ায় বর্তমানে নিবন্ধিত দুই লাখ ১৫ হাজারের বেশি শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে এক লাখ ২৬ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা, যা দেশটির সবচেয়ে বড় শরণার্থী জনগোষ্ঠী। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনগোষ্ঠীর আশ্রয়স্থল হলেও মালয়েশিয়া ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের সদস্য নয় এবং দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে শরণার্থী মর্যাদা স্বীকৃতি দেয় না।
জাতিসংঘ ও অন্যান্য : জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা-UNHCR, WFP, UNICEF, WHO I IOM- দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে। ইইউও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর প্রতি চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জোরদার করে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয়দানকারী বাংলাদেশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য আরও ২৫ দশমিক ২৫ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। গত সোমবার (৩ আগস্ট) ঢাকায় এ চুক্তি সই হয়। অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল এবং বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ জুলিয়েট মুরেকেইয়িসোনি চুক্তিতে সই করেন। এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব, কাস্টমস ও বহুসংস্কৃতিবিষয়ক এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিল উপস্থিত ছিলেন। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া এ খাতে এক দশমিক ২৬ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও রোহিঙ্গাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে থাকে। আর বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘ইনক্লুসিভ সার্ভিসেস অ্যান্ড অপরচুনিটিস ফর হোস্ট কমিউনিটি অ্যান্ড ডিসপ্লেসড রোহিঙ্গা পপুলেশন এবং হোস্ট অ্যান্ড রোহিঙ্গা এনহ্যান্সমেন্ট অব লাইভস প্রকল্প চালু হয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবনমান উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার ৭০ কোটি ডলারের এই প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করবে। যদিও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ হ্যান্স জে. মরগেনথাউ বলেছেন, “International politics, like all politics, is a struggle for power.” অর্থাৎ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মানবিক মূল্যবোধের পাশাপাশি কৌশলগত স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশ জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মুসলিম বিশ্বসহ বিভিন্ন অংশীজনদের সমন্বয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন করার চেষ্টা করলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত মিয়ানমারের বৌদ্ধ সন্ত্রাসবাদের ছোবলের কারনে সম্ভব হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর নিরাপত্তা দিতে না পারলে অচীরেই এই জাতিগোষ্ঠীকে বিলুপ্ত ঘোষণা করতে হবে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তন সম্ভব না হলে বিশ্ববাসীর কাছে একমাত্র পথ আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের স্থায়ীকরণ করা। মানুষ এখন আর জনসংখ্যা নয় জনসম্পদ। বিশ্বের অনেক দেশেই এখন জনসম্পদের অভাব রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার ন্যায় পৃথিবীর অনেক দেশই এখন বিভিন্ন দেশ থেকে জনসম্পদ হায়ার করে এবং চীনের মতো দেশ শুধু জনসম্পদের সঠিক ব্যবহার করে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সুতরাং পৃথিবীর মানচিত্রে রোহিঙ্গা জাতিসত্তাকে টিকিয়ে রাখতে মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তন না করতে পারলে রোহিঙ্গাদের স্থানীয় করাই বিশ্বের সামনে একমাত্র বিকল্প।
তথ্যসূত্র : CNN, AP বিবিসি, দ্য হিন্দুস্তান টাইমস, আল্-জাজিরা ইত্যাদি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com