একতরফা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখে আওয়ামী লীগ


৩০ জুলাই ২০২৬ ১০:০৭

॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর টানা প্রায় দেড় দশকের বেশি ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের শাসনামলে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলো ছিল চরম বিতর্কিত। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরপরই ‘সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংবিধানে থাকা নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। অথচ ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর আসন ও সমর্থন নিয়ে বিএনপির ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালুর দাবি জোরালো হয়ে উঠলে জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগও একই দাবিতে রাজপথে সোচ্চার ছিল। ফলে বাধ্য হয়েই নির্দলীয়-নিরপেক্ষা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধানে স্থান পায়। সেই আওয়ামী লীগই অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে ঠেকিয়ে ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেশে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। দেশের সাধারণ মানুষ ও বিরোধীদলগুলোর দাবিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা না ফিরে ক্ষমতায় থেকে একতরফা নির্বাচন করে টানা ক্ষমতায় থাকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও তার দলের নীতিনির্ধারকরা দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে এমনভাবে ধ্বংস করে দিয়েছিল যে, শেষ দিকে এসে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের লোকেরাও ভোট দিতে কেন্দ্র আসেনি। কারণ তারা জানতেন যে, তারা ভোট দিতে না আসলেও সিল (ভোটের সিল) পিটিয়ে দলীয় ক্যাডাররা ঠিকই হাসিনার শাসনক্ষমতায় দীর্ঘায়িত করতে তাকে বিজয়ী করে নেবে। ফলে ২০২৪-এর নির্বাচনে সাধারণ কোনো ভোটার দূরের কথা, দলের কর্মীরাও ভোট দিতে কেন্দ্র আসেনি।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ও ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি ফ্যাসিস্ট হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসনের ভূমিকা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটের গ্রহণযোগ্যতা বলে কিছুই ছিল না। বিরোধীদলগুলোর অভিযোগ, এসব নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক গণতান্ত্রিক চর্চা শতভাগ বিনিষ্ট হয়েছে। ভোটের ওপর মানুষর আস্থাহীনতা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা চার মেয়াদের ক্ষমতায় থাকার পেছনে মূল কারণই ছিল- সংবিধান থেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থার পরিবর্তন। আর দলীয় সরকারের অধীনে ভোট করার কারণেই আওয়ামী লীগ প্রশানকে ব্যবহার করে নির্বাচন আয়োজন করে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করেছে। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতমূলক ভূমিকা, আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় জনগণের ভোট ছাড়াই ক্ষমতায় থাকতে পেরেছে আওয়ামী লীগ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল
বাংলাদেশে ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন থেকে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সব ক’টি জাতীয় নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হলেও ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে সেই ব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকার। এর আগে ২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করলেও ভবিষ্যতের দুটি নির্বাচন এ ব্যবস্থার অধীনে আয়োজনের সুযোগ রাখা হয়েছিল। তবে সরকার সেই সুযোগ ব্যবহার না করে সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে। বিরোধীদলগুলো তখন থেকেই নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু সরকার তাতে কোনো পাত্তা দেয়নি। কারণ আওয়ামী লীগ এতটাই জনবিচ্ছিন্ন ছিল যে, তারা জানতো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোট হলে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। ফলে বিরোধীদলগুলোর তীব্র আন্দোলন হওয়ার পরও তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ফেরেনি।
দাবি না মানায় দুটি নির্বাচনে অংশ নেয়নি প্রধান বিরোধীদল
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করলেও তা প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় বিএনপি-জামায়াত ও অন্য বিরোধীদলগুলো ২০১৪ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে। ২০১৪ সালের ৭ জানুয়ারি নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টিতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই প্রার্থীদের বিজয়ী করে রাখে আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন ও প্রতিবাদ হয়। আন্দোলন থামাতে সরকার ব্যাপক বলপ্রয়োগ করে। বহু মানুষকে গুম ও খুন করে, তবুও ফ্যাসিস্ট সরকার দাবি মানেনি। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী অংশ নেয়নি এবং নির্বাচন প্রতিহতের কর্মসূচি পালন করে।
২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিলেও সমান সুযোগ পায়নি বিরোধীরা
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অংশগ্রহণ করে। তৎকালীন সরকারপ্রধান পূর্বে ঘোষণা করেছিলেন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও এবার সবার প্রতি সমান আচরণ করবে সরকার ও প্রশাসন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলে তার উল্টো, সরকারের দলের ক্যাডারদের দখলে ছিল ৩০০ আসন। পুলিশ ছিল সরকারের নিয়ন্ত্রণে, তারা বিরোধীদলের কোনো প্রার্থীকে মাঠেই মানতে দেয়নি। কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ভোটের মাঠে গিয়েছিলেন, একপর্যায়ে প্রাণ রক্ষায় তাকে মাঠ ছেড়ে পালিয়ে আসতে হয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হয়েছিলেন কে এম মজিবুল হক। তিনি এই আসনের একাধিকবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা, ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের ছোট ভাই। তিনি ওই নির্বাচনে প্রচারণা চালাতে নির্বাচনী এলাকায় প্রবেশ করলে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা তার ও তার গাড়িবহরে হামলা চালায়। প্রায় দুই ঘণ্টা টানা হামলা-পাল্টাহামলায় অনেকেই আহত হন। এরপর প্রার্থী তার বাড়িতে পৌঁছালে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা তাকে ঘর থেকে বের হতে দেয়নি। একইভাবে ভোলা-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি তার নির্বাচনী এলাকায় নিজ বাড়িতে পৌঁছাতে বাধার মুখে পড়েন। বাড়ি পৌঁছানোর পর ভোটের দিন পর্যন্ত তাকে বাসা থেকে বের হতে দেয়নি পুলিশ ও আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা। প্রায় একই অবস্থান নেওয়া হয়েছিল জামায়াতে ইসলামী ও অন্য বিরোধীদলগুলোর প্রার্থীদের ক্ষেত্রে। ফলে হাসিনার সেই অঙ্গীকার যে ভুয়া ও মিথ্যা ছিল, তার প্রমাণিত হয় এবং ভোটে বিএনপির মতো বড় দল মাত্র ৬টি আসন পায়। অনেকে তখন এও বলাবলি করেছিলেন, সরকারের পছন্দের ছয়জানকে সংসদে রাখতে চেয়েছিলেন হাসিনা, আর সে কারণেই তারা বিজয়ী ঘোষিত হয়েছিলেন। ওই সংসদে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ও চলাকালে বিরোধীদলের প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, মামলা, প্রচারণায় বাধা, হামলা করা হয়। বিরোধীদলগুলো দাবি করে, তাদের জন্য সমান সুযোগ দূরে থাক, প্রচারণাই চালাতে দেওয়া হয়নি, নির্বাচেন এজেন্টও দিতে দেয়নি আওয়ামী লীগ।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের তিন মাস আগেই দেশে একটি ভীতিকর পরিস্থিতি করে রাখে আওয়ামী লীগ সরকার। পুলিশ বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালিয়ে গ্রেফতার করে নিয়ে আসে। যারা ওইসময় আত্মগোপনে ছিলেন তারাই গ্রেফতার এড়াতে পেরেছিলেন। শুধু আওয়ামী লীগের ক্যাডাররাই নয়, পুলিশের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদের ডেকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। নির্বাচনগুলোয় প্রশাসন, পুলিশ, র‌্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। বিরোধীদল ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগ ছিল, প্রশাসনের প্রায় সবাই সরকারি দলের পক্ষে কাজ করেছে এবং বিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। আর ২০১৪ ও ২০২৪ সালের ভোটে বিরোধীদল অংশই নেয়নি।
নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গঠিত নির্বাচন কমিশনগুলোর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও নাগরিক সমাজে প্রশ্ন ওঠে। বিরোধীদলগুলোর অভিযোগ ছিল, কমিশন সরকারের প্রভাবমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি এবং নির্বাচনী অনিয়ম মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা নেয়নি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে সরকারের ইরাশায় ১৫৩ আসরে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের জিতিয়ে রাখে নির্বাচন কমিশন। কারণ সরকার গঠন করতে দরকার ছিল ১৫১ আসন। আওয়ামী লীগ ও সরকারের প্রধানের শঙ্কা ছিল যদি নির্বাচন পর্যন্ত সরকার না টিকে, ভোটের দিন ভোট হচ্ছে দেখানো সুযোগ না থাকে, তাহলে এই ১৫৩ আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের দ্বারাই নতুন করে সরকার গঠন করতে পারবে আওয়ামী লীগ। সরকারের সেই ইচ্ছা পূরণে ওইসময় নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে আওয়ামী লীগের ওই ১৫৩ জন সংসদ সদস্য প্রার্থী ছাড়া ১৫৩ আসনে বাকি সবার মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেওয়া হয়। কাউকে কাউকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার দেখানো হয়। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির তৎকালীন চেয়ারম্যান ও স্বৈরাচার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচন কমিশনের কাছে তার মনোনয়ন প্রত্যাহারের জন্য চিঠি পাঠালেও কমিশন সেই চিঠি গ্রহণ করেনি। কারণ হাসিনা এরশাদকে সংসদে রাখতে চেয়েছিল। কারণ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো বড় বড় দল নির্বাচনে আসেনি, এরশাদও যদি সংসদে না থাকেন, তাহলে বিশ্বের কাছে যাওয়া নেতিবাচক বার্তা আরও শক্তিশালী হবে। ফলে সরকারপ্রধানের ইচ্ছায় তখন এরশাদের আবেদন গ্রহণ না করে তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।
দশম জাতীয় সংসদ হয় বিনাভোটের নির্বাচনে
শেখ হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোট জনগণের কাছে বিনাভোটের নির্বাচন বলে প্রতিষ্ঠা পায়। ওই নির্বাচনের পরদিন দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে প্রধান ছবি প্রকাশিত হয়, যাতে দেখা যায় একটি ভোট কেন্দ্রের মাঠে কুকুর ঘুমাচ্ছে। কেন্দ্রে একজনও ভোটার আসেনি। ওই নির্বাচনে শতাধিক ভোট কেন্দ্রে কোনো ভোটার আসেনি; এমনকি ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারাও আসেননি। প্রধান প্রধান বিরোধীদল হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচন বর্জন করেছিল। সেই নির্বাচনেই ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। প্রায় অর্ধেকের বেশি আসনে ভোটগ্রহণেরই প্রয়োজন হয়নি। নির্বাচন ঘিরে দেশজুড়ে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার না থাকায় নিরপেক্ষ ভোট হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানায়।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিশিরাতের নির্বাচন
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোট হওয়ার কথা থাকলেও ২৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে যায়। ২৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তরের বর্তমান প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার প্রতিবেদককে ফোন করে জানান, আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের আসনে আওয়ামী লীগের লোকেরা ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করে নৌকা মার্কায় সিল মারছে। একই সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোট শুরু হওয়ার তথ্য মোবাইল ফোনে পান বিভিন্ন গণমাধ্যম কর্মীরা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিবিসি বাংলা আগের রাতে ভোট হওয়ার একটি ভিডিও প্রকাশ করে। যেখানে দেখা যায়, ভোট শুরু হওয়ার আগে ব্যালট পেপার ভর্তি ভোটের বাক্স কেন্দ্রে প্রবেশ করানো হচ্ছে। এসব চিত্র প্রকাশের পর সাধারণ মানুষের কাছে এই নির্বাচনকে নিশিরাতের নির্বাচন বলে আখ্যা দেন। বিরোধীদলগুলো এই ভোটে অংশ নিলেও বিরোধী প্রার্থীদের গ্রেপ্তার, মামলা ও প্রচারণায় বাধা দেওয়া হয়। ভোটের দিন অনিয়ম, কেন্দ্র দখল ও জাল ভোট দেওয়া হয়। সরকারি দলের লোকদের বাধার মুখে অনেক কেন্দ্রে বিরোধীদলের পোলিং এজেন্ট থাকতে পারেনি। সরকারি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা বজায় রাখেনি। নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ না থেকে সরকারের পক্ষে ভূমিকা রাখে। সরকারি জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করায় ফলাফল নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়ে। ফলে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পর্যবেক্ষক নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক ছিল না বলে আখ্যা দেয়।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ডামি নির্বাচন
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির ভোটও বর্জন করে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি এবং এই দুই বড় দলের মিত্ররাও ভোটে যায়নি। কারণ তারা জানে, হাসিনার অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না। বিরোধীদলগুলো ভোটে আসেনি তাই নয়, বিরোধী জোটে না থাকা অনেক দলও ৭ জানুয়ারির ভোটে অংশ নেয়নি। ফলে দলীয় প্রার্থী বাছাইকালে গণভবনে এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ডামি প্রার্থী দেওয়ার নির্দেশ দেন হাসিনা। তার নির্দেশনা অনুযায়ী সব আওয়ামী লীগ প্রার্থীই নিজের আত্মীয় ও বিশ্বস্ত এক/দুজনকে ডামি প্রার্থী রাখেন। ওই প্রার্থীকে নির্বাচন পরিচালনার জন্য পয়সাও দেওয়া হয়েছে। মিত্র দলগুলোকেও সব আসনে প্রার্থী দিতে বলেছিলেন হাসিনা। ভোলা-৩ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী তার স্ত্রীকে ডামি প্রার্থী করেছিলেন এবং ওই আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মেজর (অব.) জসিম উদ্দিনকেও তিনি ডামি প্রার্থী করেছিলেন। এজন্য তাকে নগদ টাকাও দিতে হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির ভোটে অনেক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমিত ছিল। ভোটার উপস্থিতির হার নিয়ে বিতর্ক ও প্রশ্ন দেখা দেয়। এ প্রতিবেদক ওই ভোটের দিন বহু কেন্দ্রে গিয়েছিলেন, কোথাও সাধারণ ভোটারের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। এসব কারণে ৭ জানুয়ারির নির্বাচনকে ‘ডামি প্রার্থী’ ডামি নির্বাচন হিসেবে আখ্যা দেয় জনগণ।
দেশি-বিদেশি মহলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদার অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে বিবৃতি দেয়। দেশীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক, মানবাধিকার সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের অনেক প্রতিনিধিও নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হয়নি
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোও সুষ্ঠু ছিল না। সুষ্ঠু নির্বাচন চান না বলে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করেছিলেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান বলেছেন, শেখ হাসিনার অধীনে ২০১৪ সালের নির্বাচন ছিল বিনাভোটের নির্বাচন, ২০১৮ সালে ছিল নিশিরাতের ভোট আর ২০২৪ সালে ছিল ‘ডামি নির্বাচন’। হাসিনার অধীনে ৭ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জনের আহ্বান করেছিল ৬৩টি রাজনেতিক দল। বিএনপির এই নেতা ওই রাজনৈতিক দলগুলোকেও সাধুবাদ জানান। মঈন খান বলেন, ৭ জানুয়ারি নির্বাচনে কমিশন প্রথমে ২৭ শতাংশ ভোটের তথ্য দেয়, পরে আবার ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে তথ্য দেয়, যা হাস্যকর ছিল। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ডামি নির্বাচন কমিশন, প্রার্থী ও পর্যবেক্ষক ব্যবহার করে’ হাসিনা ‘একতরফা নির্বাচন’ করে ক্ষমতায় ছিলেন। মঈন খান জানান, খাগড়াছড়ির ১৯টি কেন্দ্রে ‘শূন্য ভোট পড়েছে’, যা প্রমাণ করে হাসিনার নির্বাচন কেমন ছিল।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ১৯৯১ সালে বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের সময়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছিল। জামায়াতের সাবেক আমীর মরহুম গোলাম আযম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ‘রূপকার’ ছিলেন উল্লেখ করে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করলে পরাজিত হওয়ার ইতিহাস নেই। এ কারণে জামায়াত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তোলে। একপর্যায়ে জামায়াত আন্দোলনে নেমেছিল। পরে ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়েছিল। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচন পক্ষপাতদুষ্ট হয়েছে বলে সমালোচনা আছে। এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচার হয়ে ওঠেন। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে দেশে কলঙ্কিত নির্বাচন হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা না থাকলে কী হতে পারে, গত তিনটি নির্বাচনই তার উদাহরণ।