৪৫ বছর পর গ্রেফতার মোজাফফর

জিয়া হত্যা মামলার এক দীর্ঘ অধ্যায়ের নতুন মোড়


২২ জুলাই ২০২৬ ২১:১৪

স্টাফ রিপোর্টার : সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আত্মগোপনে থাকার পর অবশেষে গ্রেফতার হয়েছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত বহুল আলোচিত ওই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে ছিলেন। দীর্ঘ ৪৫ বছর পর তার গ্রেফতার শুধু একটি পলাতক আসামিকে আইনের আওতায় আনার ঘটনা নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়ের নতুন পর্ব হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। গ্রেফতারের পর আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে গত ২০ জুলাই সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সেনা আইনে তার বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
গত ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বনানী ডিওএইচএস থেকে মোজাফফর হোসেনকে গ্রেফতার করে। পরে তাকে সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হলে সামরিক বিচার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে নেওয়া হয়। জানা গেছে, গত ১৯ জুলাই রোববার রাতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় সামরিক বিমানে করে তাকে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আনা হয়। মিলিটারি পুলিশ (এমপি) ও আর্মি সিকিউরিটি ইউনিটের (এএসইউ) তত্ত্বাবধানে স্থানান্তর সম্পন্ন হয়। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে তাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। তবে এই জিজ্ঞাসাবাদ কেবল সেনাবাহিনী পরিচালনা করবে, নাকি ডিজিএফআই, এনএসআই, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এবং অন্যান্য সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ টাস্কফোর্স করবে, সে বিষয়ে কিছু জানা যায়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) জানায়, গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে মোজাফফর হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ভিন্ন পরিচয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, বিভিন্ন সময়ে তিনি অবস্থান পরিবর্তন করেছেন এবং নিজেকে আড়ালে রাখতে নানা কৌশল অবলম্বন করেন। সাম্প্রতিক সময়ে তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার পর তাকে আটক করা সম্ভব হয়।
জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার ইতিহাসে মোজাফফর হোসেনের নাম বহুদিন ধরেই আলোচিত। বিচারিক নথি অনুযায়ী তিনি মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের একজন। হত্যাকাণ্ডের পর অন্য অভিযুক্তদের অনেকেই গ্রেফতার, বিচার কিংবা দণ্ড কার্যকরের আওতায় এলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরেই পলাতক ছিলেন। তাকে ধরিয়ে দিতে একসময় পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।
মোজাফফরকে গ্রেফতারের পর স্বাভাবিক আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। প্রথমে তাকে ডিবি হেফাজতে নিয়ে পরিচয় ও মামলার তথ্য যাচাই করা হয়। এরপর প্রয়োজনীয় নথিপত্র সম্পন্ন করে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। কারণ জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার মূল বিচার সামরিক আদালতে সম্পন্ন হয়েছিল এবং মোজাফফরও তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। এ কারণে পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম সেনা আইনের আওতায় পরিচালিত হবে বলে সরকার জানিয়েছে।
গ্রেফতারের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য আসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছ থেকে। তিনি বলেন, একই অপরাধে একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে একযোগে দেওয়ানি বা ফৌজদারি আদালত এবং সামরিক আদালতে পৃথক বিচার করার সুযোগ নেই। যেহেতু এই মামলার বিচার সেনা আইনের অধীনে শুরু হয়েছিল এবং সামরিক আদালতের সিদ্ধান্ত বিদ্যমান রয়েছে, তাই বর্তমান আইন অনুযায়ীও সেনা আইনেই বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। তিনি আরও জানান, এ লক্ষ্যে জেনারেল কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। তার ভাষায়, এটি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগও জানিয়েছে, মোজাফফর হোসেন দীর্ঘসময় ধরে নিজের পরিচয় গোপন রেখে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছিলেন। তাকে গ্রেফতারের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই নজরদারি চলছিল। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানের মাধ্যমে তার অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযান পরিচালনা করা হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল আলোচিত ঘটনা। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর সেই মামলার অন্যতম পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির গ্রেফতার নতুন করে জনমনে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। এখন দৃষ্টি থাকবে পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয় এবং দীর্ঘদিনের এই আইনি অধ্যায়ের সমাপ্তি কীভাবে টানা হয় তার ওপর। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রচলিত আইন অনুসরণ করেই পরবর্তী সব কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং মামলার অবশিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
প্রসঙ্গত, ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পরদিন তিনি ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে বিভিন্ন স্থানে অবস্থানের পর ভুয়া পরিচয়ে ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ এবং পরে সেই পরিচয়ে পাসপোর্ট তৈরি করেন বলে ডিবি সূত্রের দাবি। একই সূত্রের ভাষ্য, বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের মাধ্যমে তিনি নিজের অবস্থান গোপন রাখার চেষ্টা করেন। তবে এসব তথ্যের সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি। ডিবি সূত্র আরো দাবি করেছে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন এবং ১৯৯৮ সালে গোপনে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। দীর্ঘসময় বিভিন্ন জেলায় ভাড়াবাসায় অবস্থান করার পর কয়েক বছর ধরে বনানী ডিওএইচএসে শ্বশুরের একটি ফ্ল্যাটে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে থাকছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, দীর্ঘসময় পরিচয় গোপন রাখায় তার অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই এবং মামলার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার কাজ চলছে। তবে তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ বিষয়ে সেনাবাহিনী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। মোজাফফরের গ্রেফতারে বহু অমীমাংসিত অধ্যায়ের জট খোলার আশা করা হচ্ছে।