হাসিনার নেতৃত্বাধীন দেড় দশকের সংসদ ছিল অকার্যকর-বিতর্কিত
২২ জুলাই ২০২৬ ২১:১০
শক্তিশালী বিরোধীদলের অনুপস্থিতি, সরকারে ঢুকে গিয়েছিল বিরোধীদল
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
জাতীয় সংসদকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রধান সাংবিধানিক মঞ্চ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনামলে গঠিত নবম থেকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন, গবেষক, নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সংসদে কার্যকর বিরোধীদলের অনুপস্থিতি, সংসদীয় নজরদারির দুর্বলতা, আইন পাসের প্রক্রিয়া এবং সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতা সমালোচনা বিদ্যমান ছিল। ২০০৯ সালে নবম জাতীয় সংসদে বিএনপি ও জামায়াতের সংসদ সদস্যরা থাকার কারণে কিছুটা বিরোধিতা হয়েছিল, তাও যথাযথ ও শক্তিশালী বিরোধিতার সুযোগ সরকারি দলের পক্ষ থেকে দেওয়া হননি। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের দশম, ২০১৮ সালের একাদশ এবং ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রতিনিধিত্বশীলতা, কার্যকর বিরোধীদলের অনুপস্থিতি, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সক্ষমতা এবং সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতা একেবারেই অনুপস্থিত ছিল। ফলে এ নিয়ে দেশীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নাগরিক সমাজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, আইন প্রণয়ন ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে সংসদ সক্রিয় থাকবে, তবে সেটি কোনোভাবেই কার্যকর সংসদীয় বিতর্ক, নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা ছাড়া নয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সংসদ পুরোটাই ছিল বিতর্কিত।
জাতীয় সংসদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক
২০০৯ সালে নবম জাতীয় সংসদ গঠনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসে। ওই সংসদের শুরুতে বিএনপি সংসদে থাকলেও পরে দলটির উপস্থিতি সীমিত হয়ে পড়ে। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ বিরোধীদল বর্জন করে। ফলে সংসদের প্রতিনিধিত্বশীলতা নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ২০১৮ ও ২০২৪ সালে গঠিত সংসদ নিয়েও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা প্রশ্ন তোলেন। ফলে সংসদ আইন প্রণয়নের সাংবিধানিক কেন্দ্র হলেও এর গণভিত্তি ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দীর্ঘসময় ধরে আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক সংসদ ছিল না আওয়ামী লীগের শাসনামলে।
সংসদে শক্তিশালী বিরোধীদলের অনুপস্থিতি
নবম সংসদের শুরুতে বিএনপি সংসদে ৩১টি আসন নিয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছিল। দলটি বেশ শক্তিশালী ভূমিকাও রাখে শুরুতে। দশম সংসদে বিএনপি ও জামায়াত নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে আরেক স্বৈরাচার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধীদলের দায়িত্ব পালন করে। একাদশ সংসদে বিএনপি অংশ নিয়ে পায় মাত্র ৬টি আসন। এরা সংসদে গেলেও শক্তিশালী বিরোধী কণ্ঠ গড়ে ওঠেনি। এই সংসদেও জাতীয় পার্টি বিরোধীদলের আসনে বসে। যারা আওয়ামী লীগ সরকারের আজ্ঞাবহ ছিল। ফলে তারা শক্তিশালী বিরোধীদলের ভূমিকায় ছিল না। দ্বাদশ সংসদেও প্রধান প্রধান বিরোধীদল বিএনপি ও জামায়াত নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় একই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে। স্বৈরাচার এরশাদের ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি বিরোধীদলের আসনে বসেন। তিনিও সরকারি দল আওয়ামী লীগের অনুগত ও সুবিধাভোগী হওয়ায় সরকারের দোষ-ত্রুটির সমালোচনা করেননি। কার্যকর বিরোধীদল না থাকায় সরকারের নীতি, বাজেট ও আইন নিয়ে কঠোর পর্যালোচনা এবং বিকল্প মতামত সংসদে প্রত্যাশিত মাত্রায় প্রতিফলিত হয়নি।
‘গৃহপালিত বিরোধীদল’ আখ্যা
দশম জাতীয় সংসদ থেকেই জাতীয় পার্টিকে ‘গৃহপালিত বিরোধীদল’ আখ্যা দেয় দেশবাসী। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে প্রথমে রওশন এরশাদ এবং পরে বিভিন্ন সময়ে দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও সরকারের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান কতটা কার্যকর ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিরোধীদল সরকারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান না নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই সমঝোতার রাজনীতি অনুসরণ করেছে। জাতীয় পার্টি সংসদ সদস্যরা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসায় ব্যস্ত ছিলেন সংসদে। সংসদের সরকারের ভুল পদক্ষেপগুলোর সমালোচনা না করে হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রশংসায় সময় কাটিয়েছেন অনেক জাপা সংসদ সদস্য। রাজনৈতিক অঙ্গনে জাপা ‘গৃহপালিত বিরোধীদল’ খ্যাতি লাভ করে।
বিরোধীদলের সদস্যদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি
দশম জাতীয় সংসদে বিরোধীদল হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী জাতীয় পার্টির একাধিক সংসদ সদস্য একই সময়ে সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধীদলের সাংবিধানিক ভূমিকা আলাদা হলেও জাতীয় পার্টির ভূমিকার কারণে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করে। এই সংসদ নির্বাচন বিএনপি-জামায়াত অংশ না নেওয়ায় তারা সংসদে ছিলেন না। একই দলের কেউ সরকারে আবার কেউ বিরোধীদলে থাকায় সংসদে সরকারের কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক বিশ্লেষক এটিকে সংসদীয় রীতিনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে অভিহিত করেন। দশম সংসদে সরকার ও বিরোধীদল দুই কূলেই থেকেছে জাতীয় পার্টি। দলটির প্রধান এইচ এম এরশাদ মন্ত্রীর পদমর্যাদায় নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত নিযুক্ত হয়েছেন। তার দলের অপর তিন নেতা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। আর এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদকে করা হয়েছে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা। এর ফলে দশম জাতীয় সংসদে কার্যত কোনো বিরোধীদলই ছিল না। অভিনব এই সরকারকাঠামো নিয়ে তখনই প্রশ্ন ওঠে, বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ওই সময়ের মন্ত্রিসভা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও মত দিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের তৎকালীন সদস্য (বর্তমানে মৃত) সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর তখনকার ভাষ্য ছিল, ‘বিরোধীদল গণতন্ত্রের পাহারাদার। তাদের দায়িত্ব সরকারের ভালো কাজের সমর্থন দেওয়া, খারাপ কাজের সমালোচনা করা। এখন যে মন্ত্রিসভা হয়েছে, তা সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে বিরল। বিরোধীদল যদি সরকারে ঢুকে যায়, তবে গণতন্ত্র পাহারা দেবে কে?’
বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচন নিয়েও ছিল বিতর্ক
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচন কয়েক দফায় রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। দশম সংসদে রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতা হন। পরে জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন, তা নিয়েও মতবিরোধ তৈরি হয়। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের অবস্থান ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিরোধীদলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। বিরোধীদল গৃহপালিত হওয়ায় ওই দলের পক্ষ থেকে প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন তাও সরকারের ইশারায় নিযুক্ত হয়েছিলেন। জানা গেছে, দশম সংসদ নির্বাচনে এরশাদের স্ত্রী রওশন আওয়ামী লীগের অধীনে বিনাভোটের নির্বাচনে যাওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টিকে বাধ্য করেছিলেন, ফলে পুরস্কার হিসেবে এরশাদের পরবর্তী সরকারি দল রওশনকেই বিরোধীদলের নেতার চেয়ারে দেখতে চেয়েছিলেন। যদিও তখনো এরশাদ জাতীয় পার্টির প্রধান, নিয়ম অনুযায়ী তারই বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসার কথা, কিন্তু তা তিনি পারেননি। পরে জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরে এ নিয়ে বিরোধ চরম আকারে ধারণ করলে তা নিরসনে এরশাদকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার দূত নিযুক্ত করে পরিস্থিতি ধামাচাপা দেওয়া হয়।
প্রশ্নোত্তর ও জবাবদিহির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্ব সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম সাংবিধানিক উপায়। কিন্তু দশম থেকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ পর্যন্ত এ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন ওঠে। ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা শেখ হাসিনা সংসদে নিয়মিত উপস্থিত থেকে প্রশ্নের উত্তর দিলেও বিরোধীদলের সীমিত অংশগ্রহণের কারণে অনেক সময় প্রশ্নোত্তর পর্ব প্রত্যাশিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশ পায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কঠোর অনুসন্ধানী প্রশ্ন, ধারাবাহিক সম্পূরক প্রশ্ন এবং সরকারের নীতির গভীর পর্যালোচনা তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে। ফলে সংসদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়াটি কাক্সিক্ষত শক্তি অর্জন করতে পারেনি।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কার্যকারিতা
সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড তদারকির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আওয়ামী লীগ আমলে এসব কমিটি অনেক সুপারিশ দিলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। পর্যবেক্ষকের মতে, কমিটিগুলোর অনেক প্রতিবেদন ও সুপারিশ বাস্তবে কার্যকর হয়নি অথবা সেগুলোর অগ্রগতি জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে নির্বাহী বিভাগের ওপর সংসদীয় নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাশিত মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী সংসদীয় কমিটি ছাড়া কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, কিন্তু শেখ হাসিনা শাসনামলে সেই পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল। জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ যাত্রা শুরুর মাত্র ১০ কার্যদিবসের মধ্যে ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি করা হয়েছিল। দ্রুততার সঙ্গে কমিটি গঠন করা হলেও বেশিরভাগ কমিটির তেমন তৎপরতা ছিল না। ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত। বাকি ১১টি কমিটি বিষয়ভিত্তিক।
সংসদীয় কমিটির কাজ হচ্ছে, প্রতি মাসে অন্তত একটি বৈঠক করে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনে অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্ত করা। কিন্তু এই নিয়ম মানেনি বেশিরভাগ কমিটি। কার্যত এই কমিটিগুলো নিষ্ক্রিয় ছিল।
বিরোধীদলের সংশোধনী প্রস্তাবের সীমিত প্রভাব
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধীদলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সরকারি বিলের বিভিন্ন ধারা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করা। কিন্তু ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সংসদে বিরোধীদলের উত্থাপিত অধিকাংশ সংশোধনী প্রস্তাব গৃহীত হয়নি বলে সংসদীয় কার্যবিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে। নবম সংসদে বিএনপির সীমিত অংশগ্রহণ, দশম সংসদে বিএনপি-জামায়াতের অনুপস্থিতি এবং একাদশ ও দ্বাদশ সংসদে কার্যকর বিরোধী ভূমিকার অভাবের কারণে সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা খুব কমই হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকারি বিল অনুমোদিত হওয়ায় আইন প্রণয়নে বিরোধীদলের গঠনমূলক ভূমিকা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে সংসদে আইন প্রণয়নের সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে।
ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক
সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের অন্যতম দায়িত্ব হলো নির্বাহী বিভাগের ওপর কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের টানা শাসনামলে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ভোগ করায় প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সহজেই অনুমোদন পেত। সংসদ অনেক ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছিল। বিরোধীদলের দুর্বল ও নতজানু ভূমিকা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে সরকারের কর্মকাণ্ডের স্বাধীন ও কার্যকর পর্যালোচনা সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে সাংবিধানিক ভারসাম্য যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সংসদে নীতিগত বিতর্কের ঘাটতি
জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রীয় নীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নির্বাচন ব্যবস্থা ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে গভীর বিতর্ক হওয়াই সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের সংসদীয় কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইস্যুতে দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক নীতিগত বিতর্ক হয়নি বললেই চলে। নবম সংসদের পর হাসিনার সময় বাকি সংসদগুলোয় বিরোধীদল সরকারের ছত্রছায়ায় থাকায় বিকল্প মত ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ সংসদে গুরুত্ব পায়নি। ফলে সরকারের নীতির সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ এবং বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপনের ক্ষেত্র সংকুচিত ছিল। এ কারণে সংসদকে জাতীয় নীতিনির্ধারণের প্রাণবন্ত ফোরাম হিসেবে প্রতিষ্ঠা বিবেচিত হয়নি।
গণতান্ত্রিক চর্চা নিয়ে সামগ্রিক বিতর্ক
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদকে কেন্দ্র করে গণতান্ত্রিক চর্চার মান নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধারাবাহিক আলোচনা হয়েছে। নবম সংসদে বিএনপি-জামায়াতের এমপিরা সংসদে থাকার কারণে গণতান্ত্রিক চর্চা ছিল। কিন্তু পরবর্তী সংসদগুলোয় কার্যকর বিরোধীদল, জবাবদিহিমূলক সংসদীয় সংস্কৃতি এবং সমান রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ ছিল না। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় অংশ সংসদের বাইরে অবস্থান করায় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অনেক সময় সংসদের পরিবর্তে রাজপথ, সংবাদ সম্মেলন কিংবা আদালতকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, ফলে সংসদ জাতীয় রাজনৈতিক সংলাপের প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তার প্রত্যাশিত ভূমিকা পুরোপুরি পালন করতে পারেনি।
সরকারি বিল সহজে পাস হওয়া
আওয়ামী লীগ সরকারের টানা সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সংসদে উপস্থাপিত অধিকাংশ সরকারি বিল তুলনামূলক কম বাধার মুখে পাস হয়েছে। বিভিন্ন সংসদীয় অধিবেশন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অনেক বিল অল্প সময়ের আলোচনা শেষে কণ্ঠভোটে অনুমোদিত হয়েছে। বিরোধীদলের সীমিত উপস্থিতি এবং সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণের হার কম থাকায় বিলগুলোর বিস্তারিত ধারা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা খুব কমই হয়েছে। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অধিকতর জনমত, বিশেষজ্ঞ মতামত ও বিরোধীদলের সুপারিশ বিবেচনার সুযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে গভীর পর্যালোচনার সংস্কৃতি দুর্বল হওয়ায় আইন প্রণয়নের গুণগতমান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
প্রধান বিরোধীদলের সংসদ বর্জন বা সীমিত উপস্থিতি
নবম জাতীয় সংসদে বিএনপি-জামায়াতের সদস্য কম নির্বাচিত হন। বিরোধী এই সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে সংসদ বর্জন করে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি-জামায়াত বর্জন করায় সংসদে তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না। একাদশ সংসদে নির্বাচিত কয়েকজন সদস্য শুরুতে শপথ নেননি এবং পরে অংশ নিলেও রাজনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত থাকে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপি-জামায়াত অংশ নেয়নি। ফলে টানা এক দশকেরও বেশি সময় দেশের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির কার্যকর উপস্থিতি সংসদে অনুপস্থিত ছিল। এতে সরকারের নীতির শক্তিশালী সংসদীয় সমালোচনা, বিকল্প প্রস্তাব এবং গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগ
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংসদীয় কার্যক্রম নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, কমনওয়েলথভুক্ত পর্যবেক্ষক এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একাংশ বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। তাদের পর্যবেক্ষণে কার্যকর বিরোধীদলের ভূমিকা, সংসদে জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে। এসব পর্যবেক্ষণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
নবম জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চীফ হুইফ জয়নুল আবেদনীন ফারুকের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, গত সাড়ে ১৫ বছর যে সংসদ ছিল সেই সংসদ কোনো নির্বাচিত সংসদ ছিল না। সেখানে সাধারণ মানুষের উন্নয়ন অগ্রগতি নিয়ে কথা বলা যায়নি। দেশের স্বার্থ নিয়ে কথা বলা যায়নি। জনগণের অধিকার নিয়ে কথা বলার সুযোগ ছিল না। সংসদ পরিচালিত হয়েছে ওইসময় শেখ হাসিনার ইচ্ছা অনুযায়ী, সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী সংসদ পরিচালিত হয়নি।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বিগত সরকারগুলোর সময় জাতীয় সংসদ ছিল ‘অকার্যকর’ ও ‘রঙ্গশালা’। তার মতে, ওই সময়ে সংসদগুলো ছিল জনমতের প্রতিফলনহীন এবং নির্বাহী বিভাগ ও সরকারপ্রধানের ইচ্ছার রাবার স্ট্যাম্প। তিনি মনে করেন, বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর মাধ্যমে গঠিত এসব সংসদে প্রকৃত বিরোধীদল না থাকায় জবাবদিহি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। সংসদ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি, বরং সরকারপ্রধান ও নির্বাহী বিভাগের ইচ্ছানুযায়ী আইন পাস করা হতো। সংসদীয় বিতর্ক ও মতপ্রকাশের পরিসর সংকুচিত ছিল।
জাতীয় সংসদের কার্যক্রম নিয়ে নিয়মিত গবেষণা প্রতিবেদন ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম থেকে পঞ্চম এই পাঁচটি অধিবেশন বিশ্লেষণ করে ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল সংস্থাটি। সেখানে তারা বলেছিল, আইন প্রণয়ন, জনগণের প্রতিনিধিত্ব ও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই সংসদের প্রথম পাঁচটি অধিবেশন প্রত্যাশিত পর্যায়ে কার্যকর ছিল না। এর পরের বছরগুলোয়ও সংসদের ভূমিকায় তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ মনে করেন, আইন প্রণয়ন বা সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা কোনো ক্ষেত্রেই হাসিনার সময়কার সংসদ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তিনি বলেন, সত্যিকারের বিরোধীদলের অনুপস্থিতি এর বড় কারণ। বিরোধীদল না থাকলে কোনো সংসদ কার্যকর হতে পারে না, তাই হয়নি।