ক্ষত শুকায়নি মুসলিমদের


২২ জুলাই ২০২৬ ২১:০৮

॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ২০০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে তাসমান সাগরের মধ্যে অবস্থিত নিউজিল্যান্ড। দেশটির দক্ষিণে জনমানবহীন এন্টার্কটিকা মহাদেশ। সেই হিসেবে নিউজিল্যান্ডকে পৃথিবীর সর্ব দক্ষিণের দেশ বলা যায়। চারদিকে পানিবেষ্টিত হওয়ায় দেশটির কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেই তবে অস্ট্রেলিয়া ছাড়া নিকটবর্তী ভূখণ্ড ফিজি, টোঙ্গা এবং ক্যালেডোনিয়া। নিউজিল্যান্ডে বর্ণবাদের সমস্যা তেমন ছিল না। দেশটিতে মুসলমানরা শান্তিপূর্ণ ও সহানুভূতিশীল হিসেবেই পরিচিত। তবে ক্রাইস্টচার্চে মুসলিমদের ওপর ভয়াবহ খ্রিস্টান জঙ্গি হামলার পর দেশটির মুসলমানরা এখনো আতঙ্কগ্রস্থ।
ইসলামের আগমন : নিউজিল্যান্ডে ইসলাম ধর্ম আলোড়িত হয় ১৮৭০ সালে। ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর ইউরোপ, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাসহ নানা দেশের বহু মানুষ এখানে বসতি স্থাপন করে। নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের দেশটিতে ইসলামের প্রচার ও প্রসার হয় মূলত অভিবাসীদের মাধ্যমে। সে সময় স্বর্ণ অনুসন্ধানকারী পেশার ১৫ জন চীনা মুসলমান পাড়ি জমিয়েছিলেন নিউজিল্যান্ডে। ওটাগোর ডানস্টানের স্বর্ণক্ষেত্রে তারা কাজ করতেন। পরে ১৯০০ সালের শুরুর দিকে গুজরাট, ভারতের তিনটি মুসলিম পরিবার সেখানে বসতি স্থাপন করে। নিউজিল্যান্ড সরকারের হিসাব মতে, ১৯৫০ সালে নিউজিল্যান্ডে মুসলমান অধিবাসী ছিল মাত্র ১৫০ জন। অভিবাসী মুসলমানদের বড় আকারে বসতি স্থাপন শুরু হয় ১৯৭০ সালে। ১৯৯০ সালের মধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত অনেক দেশের শরণার্থী মুসলমানরা পাড়ি জমায় নিউজিল্যান্ডে। নিউজিল্যান্ডের দ্রুততম ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ইসলাম অন্যতম। ১৯৯১-২০০৬ এর মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যা ছয়গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মুসলিমদের অনেক ইসলামিক স্কলার রয়েছেন। কিছু মসজিদের উদ্যোগে ‘সানডে স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশের বৃহত্তম শহর অকল্যান্ডের মুসলমানরা আল-মদিনা স্কুল নামে একটি ইসলামিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। মুসলিম ছেলেমেয়েদের উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত সহশিক্ষা চালু থাকলেও এরপর থেকে ছেলেদের পৃথকভাবে এবং মেয়েদের পর্দার সঙ্গে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা করেনি সরকার।
ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় FIANZ : নিউজিল্যান্ডে ‘ফেডারেশন অব ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশন অব নিউজিল্যান্ড’ (FIANZ) নামে একটি সংগঠন রয়েছে। ১৯৭৯ সালে সংগঠনটি ইসলামোফোবিয়ার মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও এটি নিউজিল্যান্ড সরকারের নিবন্ধিত। সমাজসেবামূলক এই সংগঠনটি মুসলমানরা পরিচালনা করে থাকেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তারা ইসলাম চর্চা, ইসলামী শিক্ষা, সামাজিক সম্পর্ক উন্নয়ন ছাড়াও নানা ধরনের সমাজসেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে নিউজিল্যান্ডে ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় উন্মুক্ত মসজিদ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এ নীতির ফলে হ্যামিলটনে ইসলামের ব্যাপারে ভুল ধারণা পাল্টে গেছে। ‘এফআইএএনজেড’ একটি স্থানীয় ইনস্ট্রুমেন্ট কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে মুসলিমদের সুদমুক্ত উপায়ে বাড়িঘর ব্যবস্থার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া নিউজিল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে বিশ্বের বড় বড় স্কলারগণ সুদের ক্ষতির দিক ও ইসলামিক নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে মুসলিমদের সচেতন করার উদ্দেশ্যে কাজ করে যাচ্ছে। ব্যাংকিং কার্যক্রম ইসলামী আইনবিরোধী হচ্ছে কি না, তা নিরীক্ষার জন্য একটি ওলামা বোর্ডও রয়েছে। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেন। এই উপলক্ষ্য কেন্দ্র করে তারা আন্তঃধর্মীয় আলোচনা, ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিশেষ ডিনার এবং ইসলামী শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর আয়োজন করলেও হালে ক্রাইস্টচার্চে মুসলিমদের ওপর হামলা বলে দেয় ইসলামোফোবিয়ার আক্রমনে জর্জরিত দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়।
ক্রাইস্টচার্চে মুসলিমদের ওপর খ্রিস্টান জঙ্গি হামলা : ২০১৯ সালের ১৫ মার্চের নিউজিল্যান্ডের সাউথ আইল্যান্ডে ক্রাইস্টচার্চ শহরে জুমার নামাজের সময় আল নূর মসজিদ এবং ক্রাইস্টচার্চে লিনউড ইসলামিক সেন্টারে খ্রিস্টান জঙ্গি হামলা করে। এই জঙ্গি হামলা নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী হামলা। এতে ৫১ মুসলিমকে হত্যা করা হয় এবং কমপক্ষে ৫০ জনের মতো গুরুতরভাবে আহত হয়। এই জঘন্য ও কাপুরুষোচিত হত্যা ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচার করেছিল খ্রিস্টান জঙ্গি ঘাতক নিজেই। দেশটিতে পরিকল্পিতভাবে মুসলিমবিদ্বেষী এই জঘন্য হামলায় গোটা বিশ্ব হতবিহবল ও শোকার্ত হয়ে পড়ে। এরপর নিউজিল্যান্ডের অস্ত্র আইনে ত্বরিত পরিবর্তন আনা হয়েছে তবে ক্রাইস্টচার্চে বর্বর খ্রিস্টান জঙ্গি হামলার সাত বছর অতিক্রম হলেও ক্ষত শুকায়নি মুসলিমদের।
আদালতে শুনানির সময় ধৃষ্টতা প্রদর্শন : ধুসর রঙের পোশাক এবং তিনজন পুলিশ কর্মকর্তার বেষ্টনীতে বন্দুক হামলাকারী পুরো সময় চুপচাপ ছিলো বলে জানা গেছে। মাঝে মাঝে তিনি রুমের অন্যত্র বসে থাকা বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি, হতাহতদের স্বজনদের দিকে তাকিয়ে দেখছিলেন এবং ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে হাসছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বার্নাবি হাওয়েজ আদালতকে বলেছেন, ওই হামলার জন্য বন্দুকধারী বহু বছর ধরে পরিকল্পনা করছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল ‘যথাসম্ভব বেশি মানুষকে হতাহত করা।’ নিউজিল্যান্ডের মসজিদের নকশা, অবস্থান এবং আরও বিস্তারিত সব তথ্য পূর্বেই সংগ্রহ করে হামলাকারী। মসজিদে সবচেয়ে ব্যস্ত সময়ে হামলা করার হীন উদ্দেশ্য ছিল বলে জানায় জঙ্গি টারান্ট।
ড্রোন দিয়ে হামলাস্থল পর্যবেক্ষণ : মসজিদে হামলার আগে অস্ট্রেলিয়ান ব্রেন্টন টারান্ট জঙ্গি ক্রাইস্টচার্চ শহর পরিদর্শন করেন এবং তার প্রাথমিক লক্ষ্যস্থল, আল নূর মসজিদের ওপর একটি ড্রোন উড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। আল নূর মসজিদ এবং লিনউড ইসলামিক সেন্টারের বাইরে তিনি অ্যাশবার্টন মসজিদে হামলার পরিকল্পনা করছিলেন। তৃতীয় মসজিদে যাবার পথে তাকে আটক করা হয়। আদালতে আরও বলা হয়, আল নূর মসজিদের বাইরে যারা নিরাপদ আশ্রয়ে লুকানোর চেষ্টা করছিলেন, তাদের ওপরেও গুলি করেন ব্রেন্টন টারান্ট। এদের একজন আনসি আলিবাভা, মসজিদের বাইরে পড়ে থাকা তার শরীরের ওপর তিনি গাড়ি চালিয়ে দেন। আদালতে জানানো হয়, হামলাকারী টারান্ট যখন গাড়ি চালিয়ে লিনউড ইসলামিক সেন্টারের দিকে যাচ্ছিলেন, গাড়ি থামিয়ে পলায়নপর একজন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ব্যক্তিকে তিনি গুলি করেন। একজন ককেশীয় ব্যক্তির দিকেও তিনি বন্দুক তাক করেন, পরে হেসে গাড়ি চালিয়ে চলে যান। গ্রেপ্তারের পর তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন, তার আরো উদ্দেশ্যে ছিল হামলার পরে মসজিদ আগুনে পুড়িয়ে দেয়া।
৫১ মুসলিম হত্যার পরও লঘু শাস্তি! : নিউজিল্যান্ডের বিচার ব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই অযুহাতে ২৯ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়ান, ব্রেন্টন টারান্টকে ৫১ মুসলিম হত্যা, আরো ৫০ মুসলিম হত্যার চেষ্টা এবং তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ দায়ের করা হলেও অপরাধীকে শুধু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি দিয়েছে নিউজিল্যান্ডের একটি আদালত। সাজাপ্রাপ্ত ব্রেন্টন টারান্টের প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ডে প্যারোল ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি দেয়া হলেও এতগুলো লোকের হতাহতের পর এটি খুবই লঘু শাস্তি। বিবৃতির শেষদিনে আদালতে কুরআন তিলাওয়াত এবং হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া সদস্যদের ছবি প্রদর্শন করা হলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে সরকারের পুনর্বাসন করার কোনো উদ্যোগের খবর জানা যায়নি। দণ্ডাদেশ দেয়ার সময় বিচারক মন্তব্য করেন যে, সন্ত্রাসী ব্রেন্টন টারান্ট পরিকল্পিতভাবে দু’টি মসজিদে হামলা করেন এবং তিনি তার কৃতকর্মের জন্য লজ্জিতও নন। যদিও সাজা শোনানোর আগে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সন্ত্রাসী ব্রেন্টন টারান্ট আদালতে কোনো কথা বলেননি।
খুতবায় ক্রাইস্টচার্চ মসজিদের ইমাম : ক্রাইস্টচার্চে হামলার ঠিক এক সপ্তাহ পরে সেই মসজিদ ঘিরে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। শুধু মুসলিমরা নন, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা থেকে শুরু করে নানা জাতি-ধর্মের মানুষ। ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে হামলায় নিহতদের স্মরণে পুরো নিউজিল্যান্ডজুড়েই দুই মিনিটের নীরবতা পালন করা হয়। আল নূর মসজিদে হাজার হাজার মানুষের সামনে ইমাম জামাল ফাওদা যে বক্তৃতা দেন, সেটি আলোড়িত করেছে সব মানুষকে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সে তার বক্তব্যের বিস্তারিত প্রকাশ করেছে। ইমাম জামাল ফাওদার বক্তব্যের উল্লেখযোগ্য অংশ :
গত শুক্রবার আমি এ মসজিদটিতে দাঁড়িয়েছিলাম এবং সন্ত্রাসীর চোখে-মুখে ঘৃণা ও ক্ষোভ দেখেছি। এতে ৫১ জন মানুষ নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ৫০ জন আর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের মন ভেঙ্গে গেছে। আজ সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে যখন চারপাশে তাকিয়েছি, তখন নিউজিল্যান্ড ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার মানুষের চোখে ভালোবাসা ও সহানুভূতি দেখেছি। এতে আরও লাখ লাখ মানুষের হৃদয় ভরে গেছে, যারা আমাদের সঙ্গে এখানে শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তাদের আত্মা আমাদের সাথেই আছে।
সন্ত্রাসী আমাদের দেশকে তার অশুভ মতাদর্শ দিয়ে বিভক্ত করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তার বদলে আমরা তাকে দেখিয়ে দিতে পেরেছি যে নিউজিল্যান্ড ভেঙে টুকরো হয়ে যায়নি। বরং বিশ্ব আমাদের ভালোবাসা আর ঐক্যের উদাহরণ হিসেবে দেখছে।
শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের অশুভ এই মতাদর্শের প্রথম শিকার আমরা হইনি, কিন্তু তবু তা আমাদের ভীষণভাবে আঘাত করেছে। নিহত মানুষের সংখ্যা হয়ত অসাধারণ নয়, বরং নিউজিল্যান্ডের মানুষের যে সংহতি আমাদের সাথে তা অসাধারণ।
এই হামলায় যারা হতাহত হয়েছেন, তাদের পরিবারকে বলছি আপনাদের স্বজনের মৃত্যু বৃথা যায়নি। তাদের মাধ্যমে বিশ্ববাসী ইসলাম এবং আমাদের ঐক্যের সৌন্দর্য দেখতে পাবেন। আল্লাহর রাস্তায় গিয়ে যাদের মৃত্যু হয়েছে, দয়া করে বলবেন না তারা মৃত, বরং তারা জীবিত। (সূরা বাকারা-১৫৪)।
ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামবিদ্বেষ হন্তারক। মুসলমানেরা আগেও এর শিকার হয়েছে। কানাডা, নরওয়ে, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই ইসলাম বিদ্বেষের শিকার হয়েছেন অনেক মানুষ।
ইসলামবিদ্বেষ খুবই বাস্তব। এ মতাদর্শ মানুষের মানবতা ভুলে অযৌক্তিকভাবে মুসলমানদের সম্পর্কে ভীতি ছড়ায়। আমরা নিউজিল্যান্ডের সরকার এবং অন্যান্য দেশগুলোর কাছে আহ্বান জানাই হেটস্পিচ বা হিংসাত্মক বক্তৃতা ও ভয়ের রাজনীতির ইতি টানার জন্য।
শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের উত্থান এবং ডানপন্থী প্রতিক্রিয়াশীলতা বিশ্ব মানবতার জন্য বিরাট এক হুমকি। এর অবসান এখনি হতে হবে। ইমাম তার বক্তব্যে শুক্রবারের ঘটনায় হতাহতদের প্রতি নিউজিল্যান্ডের মুসলমান ও অমুসলমানদের ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ জানান। নিউজিল্যান্ডের মানুষ মুসলমানদের সাথে সংহতি জানিয়ে যে ঐতিহ্যবাহী হাকা নৃত্যের আয়োজন করেছে সেজন্যও ধন্যবাদ জানান ইমাম।
‘হেডস্কার্ফ ফর হারমনি’ : ক্রাইস্টচার্চ হত্যাকাণ্ডের পর কিউই নারীরা নিউজিল্যান্ডের মুসলমান নারীদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে মাথায় প্রতিকী স্কার্ফ পরে। এই অনুষ্ঠানটি ‘হেডস্কার্ফ ফর হারমনি’ নামে পরিচিত। অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্কলার ড. যাইন আলী বলছেন, এই অনুষ্ঠানটি নিয়ে তিনি ভীষণভাবে গর্বিত। নিউজিল্যান্ডের মুসলমান নারীরাও অনুষ্ঠানটি নিয়ে নিশ্চয় গর্বিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড বলছে, ‘হেডস্কার্ফ ফর হারমনি’র ধারণাটা প্রথম আসে অকল্যান্ডের একজন ডাক্তার থায়য়া আশমানের মাথায়। ক্রাইস্টচার্চের হামলার পর একদিন তিনি টিভির খবর দেখতে পান যে একজন মহিলা বলছেন, তিনি হিজাব পরে বাইরে বেরোতে ভয় পাচ্ছেন। একথা শুনে তিনি মনে করলেন সারা দেশের মুসলমান নারীদের জন্য কিছু একটা করা দরকার। এরই পথ ধরে ‘হেডস্কার্ফ ফর হারমনি’র শুরু। নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড আরো জানায়, শুরুর দিকে ডা. আশমান বিষয়টি নিয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সাথে আলাপ করেন। পরে তিনি ইসলামিক উইমেন কাউন্সিল অব নিউজিল্যান্ড এবং মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন অব নিউজিল্যান্ডের কর্মকর্তাদের সাথেও কথা বলেন। দুটি প্রতিষ্ঠানই ডা. আশমানের উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানায়। কিউইরা কিভাবে এই মাথা ঢেকে রাখবেন তা নিয়ে ডা. আশমান তাদের কাছ থেকে পরামর্শ চান। ‘হেডস্কার্ফ ফর হারমনি’ প্রতিকী হলেও নিউজিল্যান্ডের সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই এর বিরোধিতা করেছেন। একজন পোস্ট করেছেন: ‘হ্যাঁ, নারীদের নির্যাতন করতেই হবে। ইরানে নারীরা মাথার চাদর খুলে ফেললে তাদের পিটিয়ে জেলে পোরা হয়।’
‘রয়াল কমিশন’ : মুসলিমরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর সেবার ক্ষেত্রে তীব্র বৈষম্যের শিকার। ইসলামিক উইমেন কাউন্সিলের সদস্যরা বলেন, তাঁরা অপর্যাপ্ত সেবার মুখোমুখি হয়েছেন। সংস্থার মুখপাত্র আলিয়া ডানজেইসেন বলেন, ‘নিউজিল্যান্ডের সব নাগরিকের প্রতি মুসলিমদের আহ্বান তারা যেন আমাদের উত্থাপিত নথি পড়েন এবং জানার চেষ্টা করেন যে আমাদের সম্প্রদায়ের সঙ্গে কী আচরণ করা হচ্ছে এবং সেগুলো যেন আর করা না হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘ক্রাইস্টচার্চ হামলার দিন ফেসবুক মেসেজে হ্যামিল্টনের একটি মসজিদে হামলার হুমকি দেওয়া হয়। বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়, কিন্তু পুলিশ আমাদের উপেক্ষা করে।’ ক্রাইস্টচার্চ সন্ত্রাসী হামলাসহ নিউজিল্যান্ডে মুসলিমদের প্রতি যে বৈষম্য ও বিদ্রƒপাত্মক আচরণ করা হয়েছে তার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাওয়ার দাবি করেছেন দেশটির মুসলিমরা। তারা তাদের দাবির পক্ষে ১৩০ পৃষ্ঠা দীর্ঘ নথি জমা দিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের ‘রয়াল কমিশনে’। হামলার জন্য সহমর্মিতা প্রকাশ করলেও দাবিটি মেনে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমাও দুঃখ প্রকাশের খবর জানা যায়নি।
আযান নিষিদ্ধ : নিউজিল্যান্ডের আয়তন ২ লাখ ৬৭ হাজার ৭১০ বর্গকিলোমিটার। এটি পৃথিবীর ৭৫তম বৃহত্তম দেশ। হরেক রকম জাতি-গোষ্ঠীর সমাগম হওয়ায় নিউজিল্যান্ডে বেশ কয়েকটি ভাষার প্রচলন রয়েছে। নিউজিল্যান্ডে মোট জনসংখ্যা বর্তমানে ৪.৩ মিলিয়ন। প্রতি চারজন নাগরিকের মধ্যে একজন মুসলিম। নিউজিল্যান্ডে প্রথম মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত ১৯৭০ সালে অকল্যান্ড শহরে। তবে মসজিদের মিনার থেকে মাইকে আজান দেয়া দেশের আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ যেটি মুসলিমদের স্বাধীনভাবে ধর্মীয় চর্চায় বাঁধা।
হামলাকারী জঙ্গি ট্রাম্পের একজন সমর্থক : নিউজিল্যান্ডের মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর নিউইয়র্ক শহরের অন্যতম বৃহৎ মসজিদ জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে জুমার নামাজের সময় উপস্থিত হন মার্কিন কংগ্রেসম্যান, এসেম্বলিম্যান, সিটি কাউন্সিলম্যান এবং নিউইয়র্কের পুলিশ প্রধান (কমিশনার) জেমস ও’নীল। এ ঘটনায় ম্যানহাটানের একটি মসজিদে প্রেস ব্রিফিং করেন নিউইয়র্কের সিটি মেয়র বিল ডি ব্লাজিও। তারা সবাই ন্যক্কারজনক সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানান। তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে মুসলমানদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন। সিএনএন নিউজিল্যান্ডের হামলাকে সরাসরি শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীর সন্ত্রাসী হামলা বলে শিরোনাম করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সবকটি টিভি চ্যানেল সারাদিন তাদের বুলেটিনে নিউজিল্যান্ডে হামলার ঘটনাটি শীর্ষ সংবাদ হিসেবে প্রচার করে। সিএনএন-এর তিনটি সংবাদভিত্তিক জনপ্রিয় শো ‘এন্ডারসন কুপার থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি’, ‘কুমো প্রাইম টাইম’ ও ডন লেমনের সঞ্চালনায় ‘সিএনএন টুনাইট’ এর বিষয় ছিল ‘নিউজিল্যান্ডের সন্ত্রাসী হামলা’। টিভি শোগুলোয় মুসলিম কমিউনিটি নেতাদের অতিথি হিসেবে আনা হয়। সেখানে লাইভে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক নিজে মুসলিম অতিথির হাত ধরে ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন, সমবেদনা জানান। শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিস্টান কমিউনিটি নেতারাও টিভি শোতে উপস্থিত হয়ে সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছেন। তবে হামলাকারী অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক টারন্ট নিজেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একজন সমর্থক হিসেবেই দাবি করেছেন। অভিবাসীবিদ্বেষী এই হামলাকারী ৮৭ পৃষ্ঠার ইশতেহারে (মেনিফেস্টো) বলেছেন, এ হামলার মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারীদের (অভিবাসী) জন্য তার বার্তা, ‘আমাদের ভূমি কখনো তাদের ভূমি হবে না যতক্ষণ শ্বেতাঙ্গরা জীবিত থাকবে।’ সে আরও লিখেছে, ‘পুনরুজ্জীবিত শ্বেতাঙ্গ পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে’ আমি অবশ্যই ট্রাম্পের একজন সমর্থক তবে নেতা বা নীতি নির্ধারণের দিক দিয়ে বিচার করলে আমি চিন্তায় তার সমর্থক নই।’
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ‘ক্রমবর্ধমান ইসলামবিদ্বেষ’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সেইসঙ্গে নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের সরকারকে ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে ঘৃণাত্মক বক্তব্য প্রতিহত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন। ক্রাইস্টচার্চে হামলার ১৫ মার্চ, আন্তর্জাতিক ইসলামবিদ্বেষ প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বক্তব্যে এসব কথা বলেন গুতেরেস। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এ খবর জানিয়েছে। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গাজার ওপর ইসরাইলের গণহত্যা শুরুর পর থেকে ইসলামবিদ্বেষ, আরববিরোধী মনোভাব এবং সাথে সাথে ইহুদিবিদ্বেষও বেড়ে চলেছে। গুতেরেস বলেন, ‘আমরা ক্রমবর্ধমান ইসলামবিদ্বেষের ফল প্রত্যক্ষ করছি নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে। জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল মোরাতিনোস জানান, মুসলমানরা বর্তমানে ‘প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও সামাজিক-অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার’ মুখোমুখি হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘মুসলিমদের প্রতি অযৌক্তিকভাবে জাতিগত সন্দেহ, পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন এবং কিছু রাজনৈতিক নেতার ইসলামবিরোধী বক্তব্যের মাধ্যমে আরও উসকে দেওয়া হচ্ছে।‘ কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশন্স (সিএআইআর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৩ সালে ইসলামবিদ্বেষ ও আরববিরোধী ঘটনার অভিযোগের সংখ্যা ৮,৬৫৮-এ পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংস্থাটির দাবি, ১৯৯৬ সালে তথ্য সংরক্ষণ শুরুর পর থেকে এটি সর্বোচ্চ সংখ্যা। তিনি নিউজিল্যান্ডের মুসলিমদের আস্থা ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে নিউজিল্যান্ডের সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। ‘সন্ত্রাসীর কোনো ধর্ম নেই,’ সেই সাথে সরকারকে এমন ‘ধর্মান্ধ জঙ্গিদের’ প্রতিরোধ করার দাবিও জানান।
সূত্র : আল-জাজিরা, আল খলিজ অনলাইন, টিভিএনজেড, নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড, রয়টার্সে।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.coms