জাতীয় ঐক্য কীভাবে গড়া যায়
২২ জুলাই ২০২৬ ২০:০৭
॥ মাহবুবুল হক ॥
কোম্পানি লে-অফ করা যায়। রাষ্ট্র নামের ২০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ১৩ কোটি ভোটার কাম শ্রমিকের এই বিশাল রাষ্ট্রীয় কোম্পানিটিকে কি লে-অফ করা যাবে? গেলে মনে হয় ভালো হতো। কিছুটা হলেও সুস্থির হওয়া যেত।
সবাই বলেন, দুনিয়ায় সমস্যা আছে, সমাধানও আছে। সমাধানের পথটা কোথাও দীর্ঘ, কোথাও খাটো। আমাদের ক্ষেত্রে অনেক দীর্ঘ হচ্ছে। এতে মানুষের অর্থাৎ রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বপ্ন, পরিকল্পনা, সংগঠন, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, কর্মসূচি সবকিছু হয় তছনছ; না হয় এলোমেলো হয়ে গেছে। তথ্যাভিজ্ঞ অভিভাবকগণ অত্যন্ত সন্তর্পণে বলার চেষ্টা করছেন, আমাদের রাষ্ট্রটি টোটালি ডিরেইল্ড হয়ে গেছে। আরে ভাই, হবে না কেন। সত্যিকার অর্থে রেলের কথাই যদি ধরি, তাহলে আমাদের দেশের রেললাইন বা রেলপথ শুরু হয়েছে ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর। ব্রিটিশ শাসনামলে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থেকে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত। ১৬৪ বছর আগে এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি সময় ব্রিটিশ পিরিয়ড অর্থাৎ ৮৫ বছর, পাকিস্তান সময়কাল মাত্র দুই যুগ, আর বাংলাদেশকাল চলছে ৫৫ বছর। ব্রিটিশ পিরিয়ডে ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা কম ছিল, কারণ ওদের ধারণা ছিল (একটু বোকাসোকা ছিল মনে হয়) কিয়ামত পর্যন্ত তাদের গড়া এই রেল ব্যবস্থা অটুট থাকবে। সে কারণে তারা বিশেষভাবে নজর রেখেছিল আঁকাবাঁকা রেললাইনের মজবুত স্থাপনার ওপর। সড়ক ব্যবস্থা তখন অনুন্নত ছিল। প্রাকৃতিকভাবে ছিল মহান আল্লাহর দেয়া অনন্ত-অফুরন্ত নদী-খাল-বিল ইত্যাদি ব্যবস্থা।
ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার সমস্যাগুলো সৃষ্টি হলো ব্রিটিশ আমলের চল্লিশ দশক থেকে। ভারতব্যাপী স্বাধীনতার আন্দোলন অনেক তুঙ্গে। ব্রিটিশরা তখন তাদের উপনিবেশ সামলাবে নাকি বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর লাইনচ্যুতি সামলাবে, না নিজেদের লাইন ঠিক রাখবে, সে নিয়ে তাদের তখন টালমাটাল অবস্থা। বেনিয়ার জাতি পারচেজ এবং সেলের খতিয়ান দেখে বুঝতে পারল ডিভাইড এন্ড রুল ছাড়া ভারতীয় তথা বাংলাদেশে তাদের উপনিবেশ টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
এর মধ্যে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর কনস্ট্রাকশন এবং রিকনস্ট্রাকশনের কাজও রেলের লাইনচ্যুতি মেরামত করার মতো কাজও শুরু হয়ে গেল। সব মানুষের চিকিৎসা যেমন এক ধরনের নয়, ঠিক তেমনি লাইনচ্যুতি ও মেরামতও একই ধরনের নয়। আসলে রেলের কথা বলে আমরা মূল্যবোধের লাইনচ্যুতির কথাই বলতে চেষ্টা করছি।
আমরা যদি জাতিগত লাইনচ্যুতির কথা বলি, তাহলে তো শুধু মুসলিমদের কথা বলা ঠিক হবে না। যত জাতি-গোষ্ঠী এ ব-দ্বীপে এখনো আছে, তাদের সবার কথাই আমাদের মমতার সাথে ভাবতে হবে। সব জাতি-গোষ্ঠীর ‘লাইন’ আলাদা। তার মানে মূল্যবোধ আলাদা। এই মূল্যবোধের অর্থ কী? এর অর্থ খুব সোজা, আমি যা তাই- এটাই আমার মূল্যবোধ। আমি সনাতন ধর্মের মানুষ ছিলাম, সেই সনাতন গোষ্ঠী থেকে আমরা কিছু লোক যখন ‘বৌদ্ধ’ হলাম, খ্রিস্টান হলাম, মুসলিম হলাম, তখন তো আমরা আর এক লাইনে থাকলাম না। আমরা মোটাদাগে বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন সময়ে, ইতিহাসের নানা বাঁকে আমরা নতুন করে সনাতন ধর্মী ছাড়াও তিনটি বড় গোষ্ঠীতে পরিণত হলাম।
অতীতে এই বিভিন্ন লাইনে বিভক্ত হওয়ায় জাতিগতভাবে আমরা যে খুব বেশি এলোমেলো হয়ে গেলাম, তা তো নয়। ধর্মীয়ভাবে আমরা আলাদা বা পৃথক লাইনে উন্নীত হলেও সাথে সাথে আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাহিত্য, দর্শন, স্বপ্ন, কল্পনা সব আলাদা হয়ে যায়নি। সনাতন ধর্মের লোকেরা যাকে ‘জীবনবেদ’ বলে উচ্চকিত করেছে বা করে আসছে, সেভাবে বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা মুসলিমরা সমুজ্জ্বল করতে পারেনি।
খুব বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই। ৫০, ৬০, ৭০ দশকেও বৌদ্ধরা পূজা-পার্বণ করেছে অনেকটা সনাতন ধর্মের মতো। খ্রিস্টান ও মুসলমানদের কথাও একইভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। সনাতন ধর্মের মানুষ অধ্যুষিত নগর, শহর, বন্দর, বাজার, এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ ত্বরিতবেগে বা হঠাৎ করে অথবা রাতারাতি সনাতন ধর্মের পূজা-পার্বণ এবং সহযোগী সংস্কৃতিকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি।
এটা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কারণ ধর্ম আর সংস্কৃতি বা ‘জীবনবেদ এবং জীবনবোধ সবসময় একসাথে হামাগুড়ি দেয়, বিচরণ করে, সহযাত্রী হয়। এসব কারণে ‘লেগাছি অব দি পাস্ট’ বা স্থানীয় সংস্কৃতি থেকে নিজেদের চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন বা বিচ্যুত করা যায়নি। তার অর্থ এই নয় যে, ‘জীবনবেদ থেকে জীবনবোধে ফেরানোর বা ফিরে আসার চেষ্টাও কেউ করেনি। বলতে দ্বিধা নেই আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশেষ বিশেষ কারণে ও অকারণে সনাতন ধর্মের পূজা-পার্বণেও অংশগ্রহণ করেছেন। শুধু কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেন, তদানীন্তন সময়গুলোয় আমাদের স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, সমাজসেবক, শিক্ষিত আলেম ছাড়া মুসলিম সমাজের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত প্রায় একই অবস্থা বিরাজমান ছিল। নাম বলব না, বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত অধ্যক্ষ একসময় ইসলামের পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছেন, ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হলেন হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি ৬১০ খ্রিস্টাব্দে আরব দেশে ইসলাম ধর্ম প্রবর্তন করেন। আরেকজন বহু ভাষাবিদ জ্ঞানতাপস বলেছেন, ধর্মের দিক থেকে আমরা যেমন হিন্দু-মুসলমান, তার চেয়ে বড় পরিচয় আমরা বাঙালি। জাগতিক অন্যান্য ধর্মের অনুকরণে আমাদের সম্মানিত শ্রদ্ধাভাজন পূর্বসূরিগণের কাছ থেকে এ ধরনের শিক্ষা-দীক্ষা আমরা লাভ করেছি। একদিকে দ্বি-জাতিতত্ত্বের উন্মাদনা আমরা মুসলমানদের জন্য একটি ধর্মীয় রাষ্ট্রের স্বপ্ন ও সংগ্রাম নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকছি। সারা ভারতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে বলছি- ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’।
পশ্চিম বাংলা থেকে পূর্ব বাংলায় প্রবেশের জন্য আহা! কী উন্মাতাল অবস্থা বাংলা, বিহার, আসাম, ঊড়িষ্যার উত্তেজনা মুহাজির ও আনসার হওয়ার কষ্ট-কল্পনা। সম্পত্তি একচেঞ্জ করার চঞ্চলতা। তারই সাথে আবার কমিউনিজম ও সমাজতন্ত্রের মহামারি। আজাদ হিন্দ ও অনুশীলনের ঝংকার সব মিলিয়ে এক যৌবন যৌবন অবস্থা। প্রথম ধাক্কাই এসেছে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে। পাকিস্তান জন্মের প্রায় সাথে সাথেই। গভীর অভিনিবেশের স্বার্থে তখনকার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সর্বপ্রথম ঢাকাবাসী এই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করে। ঢাকার প্রখ্যাত আলেমগণ তখন বলেছিলেন, ‘ইয়ে হিন্দু স্থানকা কাশমা কাশ হ্যায়’। ষড়যন্ত্র এক ধরনের বিষয়; অন্যদিকে একটি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, আত্মপরিচয় ও জাতিসত্তা বিষয়টি হলো সম্পূর্ণ আলাদা। তমুদ্দুন মজলিস পাকিস্তান ভাঙার জন্য বা পাকিস্তানকে দুর্বল করার জন্য পাকিস্তান জন্মের সাথে সাথে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনা করেছিল, এ কথা বাংলাদেশের কোনো পাগলও বিশ্বাস করবে না। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষিতজন জানেন, তমুদ্দুন মজলিসের বিরুদ্ধেও এই এজলাস অল্প-বিস্তর ছিল। কোইনসিডেন্স বলে একটি কথা আছে, শত্রুর শত্রু কখনো কখনো বন্ধু হয়ে যায়। আবার বন্ধুর বন্ধুও বন্ধু হয়ে যায়। একটা সাধারণ সরলীকরণ। আবার উল্টোটাও নানা সমীকরণে সমান্তরাল হতে পারে। ঠিক একই সময় খাদ্য ব্যবস্থা একটু উল্টাপাল্টা হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানে হঠাৎ করে নতুন এক আন্দোলন শুরু হয়। ‘এ আজাদী ঝুঠা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’। আন্দোলন শুধু একপক্ষীয় ছিল না, ছিল সর্বভারতে। সেখান থেকে শুরু করে এই যে এতটাকাল আমরা পার হয়ে এলাম, একটি দিনের জন্য কি আমরা সুস্থির থেকেছি?
১৯৪৭-এর পর বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নোর যুক্তফ্রন্ট সহসা ইসলামের জায়গায়, মুসলমানের জায়গায় সামনে এসে দাঁড়াল। আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগ। আমাদের মওলানা ভাসানী শামছুল হককে সাথে নিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ রি-অরগানাইজড করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি একদিকে মুসলমানিত্ব; অপরদিকে সাম্যবাদের নির্ঘণ্ট তৈরি করতে চেয়েছিলেন। পারেননি। কিন্তু তার কাগমারী সম্মেলন কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা আলটিমেটলি তৈরি করতে পারেনি। তিনি ছিলেন জয়পুরহাটের পীরসাহেব। সেখান থেকে সিরাজগঞ্জ ও পাবনা হয়ে একটা বিশাল এলাকায় যা কিছু করার চেষ্টা করলেন, তা হয়ে গেল ভারতে। চায়নিজদের নকশাল আন্দোলনের প্রটোটাইপ। একটি ভূ-স্বামীদের বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন। বাংলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্বে স্থানীয়দের মধ্যে অগ্রপথিক ছিলেন হিন্দু জমিদার ও ত্বদীয় শাহজাদারা। সাবেক জমিদার, তালুকদার, জোতদার, ভূ-স্বামীদের বিরুদ্ধে গোপন কৃষক আন্দোলন নকশালপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আন্দোলন হলেও আগ্রো এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার মহান নেতা মওলানা ভাসানী, হক-ত্বোহা-মতিন-সিরাজ শিকদার এদের কারো সাথে কখনো ঐকমত্যে পৌঁছে আন্দোলন করেননি। তিনি কখনোই হত্যার আন্দোলন করেননি। তিনি কৃষক, মজুর-শ্রমিক অর্থাৎ হতদরিদ্র ও দরিদ্রদের মুক্তির আন্দোলনই করে গেছেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের তথাকথিত প্রোলেতারিয়েত আন্দোলনের সাথে কখনো যুক্ত ছিলেন না। বর্জোয়াদের বিরুদ্ধে, ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রীয় পুঁজির বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রীয়করণের বিরুদ্ধে একই সাথে নানামাত্রিক রাজনীতি করলেও অগত্যা চায়নিজদের কালচারাল বিপ্লব তথা মাওজেদুং (মাওসেতুং) ও চৌ এন লাইয়ের সাথে দেশের স্বার্থে হাত মিলিয়েছিলেন। কিন্তু সৌভাগ্যবশত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে গণহত্যাকে তিনি সমর্থন করেননি।
অন্যদিকে বলশেভিক হোক, ম্যানসেভিক হোক আমাদের দেশে যারা সোভিয়েতমুখী কমিউনিজমের সাথে সংযুক্ত ছিলেন, তাদেরও বেশিরভাগ সদস্য হত্যা বা গণহত্যার সাথে সংযুক্ত ছিলেন না। এটা সম্ভবত আমাদের দেশে এক ধরনের একটা গৌরব। কমরেড মুজাফফর আহমদের পর এবং ভারতের এম এন রায়ের পর কমিউনিস্ট আন্দোলনে যারা সংযুক্ত হয়েছিলেন, তাদের অধিকাংশই ছিলেন কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী, নাট্যকার, চলচ্চিত্রকার, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সঙ্গীত শিল্পী- এই শ্রেণির শিক্ষিতজন।
চল্লিশ দশকের শুরুতে যারা ইসলাম ও মুসলমানের জন্য অহরনিশ কাজ করছিলেন, জাতির ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তারাই অল্প সময়ের ভেতরেই কমিউনিজম, সোশ্যালিজম, সায়েন্টিফিক সোশ্যালিজম ইত্যাদির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এর কারণ ছিল হীনম্মন্যতাবোধ। শিল্প বিপ্লবের পর ইউরোপিয়ান কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার ও সংস্কৃতিজন এমনভাবে ইতিহাস, নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প, সঙ্গীত এবং এর সাথে সাংবাদিকতা যে ব্যঞ্জনায় মুখরিত করল, তাতে পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ মনে করে বসল ইউরোপিয়ানরাই বিজ্ঞানসহ মননশীলতা ও সৃজনশীলতার একমাত্র স্রষ্টা। মিডল এইজ বা মধ্যযুগে মুসলিমরা ইসলামের সাথে পূর্বের সকল সভ্যতাকে কানেক্ট করে জ্ঞানের প্রায় সকল শাখা-উপশাখায় জ্ঞান ও শিক্ষার যে বিপ্লব ঘটিয়েছিল, সেসব সৃষ্টিকে তারা গোপন করে ফেলল, আড়াল করে ফেলল। শিক্ষা ব্যবস্থার অধিকাংশ রুটেই মুসলমানদের আবিষ্কার ও উত্থানকে ডিলিট করে ফেলল। এর অব্যবহিত পর বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই পাশ্চাত্য শিক্ষায় যারা শিক্ষিত হলেন, তাদের চিন্তা-ভাবনা, জ্ঞান-গবেষণা এবং শারীরিকভাবে একটা মিথ্যা উপলব্ধি উদভাসন হলো যে, গত শতাব্দীতে (ঊনবিংশ) জ্ঞানের যে বিস্তার ঘটেছে এবং বিজ্ঞানের যে তুফান সৃষ্টি হয়েছে, এর সবকিছুর মালিক ইউরোপীয়রা। মহান আল্লাহর কী ইচ্ছা আমরা জানি না, বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে নতুন মতবাদ ও আদর্শবাদ হিসেবে সারা পৃথিবীর যুবকদের সামনে এসে গেল কমিউনিজমের মহা উত্থান। পাঠকমাত্রই জানেন, তার পূর্বে খ্রিস্টানদের শিক্ষিতজনদের মধ্যে অধিকাংশই ধর্মকে জীবন থেকে পৃথক করে ফেলেছিল। ধর্মের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়েছিল। গির্জার প্রধানকে অবলুপ্ত করা হয়েছিল। এসব কারণে চল্লিশ দশকের শেষ দিকে আমাদের দেশের জ্ঞানী-বুদ্ধিজীবী ও প্রজ্ঞাবান মানুষ চলমান বৈশ্বিক চিন্তাধারাকে লুফে নিয়েছিল। বামপন্থা ছাড়া ডানপন্থার কোনো জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেক-বিবেচনা, পৌরাণিক বিষয় বলে পরিগণিত হলো। সবকিছু মিলিয়ে রাইটিস্টরা হয়ে পড়ল ব্যাকডেটেট। লেফটিস্টরাই হয়ে গেল হোয়াইট কলার বুদ্ধিজীবী।
এত কথা কেন বললাম! যা বললাম সব তো পুরোনো কথা। অল্প-বিস্তর সবাই জানে। এত কিছুর মধ্যে বাঙালি মুসলমানরা বা সেক্যুলার মুসলমানরা কীভাবে যে এখনো বেঁচে আছে এই দুর্ভাগা দেশে- সিনিয়র সিটিজেনরা সেসব নিয়েই এখন চিন্তাভাবনায় দিনগুজরানরত। অবস্থা ও ব্যবস্থা এমন যে, কোনো কিছুকে মেগ্রিগেট বা বাইফারকেট করা যাচ্ছে না। একটা চরমভাবে জগাখিচুড়ি অবস্থায় আমরা পড়ে আছি। ৭ যুগ আগে এই এলাকায় সমস্ত ন্যাশনকে মাত্র দু’ভাগে ভাগ করেছিলাম। ভেবেছিলাম দু’ভাগে ভাগ করলে দুনিয়ার সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সনাতন ধর্মের লোকেরা যদি নিজেদের জাতিসত্তা নিয়ে এক জায়গায় বসবাস করে, তাহলে ওরা যেমন সুখ-শান্তি ও স্বস্তি পাবে, ঠিক তেমনি সব ধরনের মুসলমান ও মুমিন মুসলিমরা যদি নিজেদের আত্মপরিচয় ও কৃষ্টি নিয়ে পৃথক একটি জায়গায় বসবাস করে, তাহলে কাক্সিক্ষত সুখ-শান্তি ও প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে। পাঠক এখানে এসে একটু দাঁড়ান। একটু অপেক্ষা করুন। একটু ভাবুন তো। কেন একই সময় ধর্মীয় ভিত্তিতে এক এক করে তিনটি রাষ্ট্র গঠন করা হলো? মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদি রাষ্ট্র, ভারতীয় উপমহাদেশে একটি হিন্দু আরেকটি মুসলিম রাষ্ট্র যুদ্ধের পর যুদ্ধ চলিয়ে ইহুদি রাষ্ট্রের আয়তন বৃদ্ধি করা হচ্ছে। অন্যদিকে হিন্দু রাষ্ট্রকেও শুধু দৈর্ঘ্য-েপ্রস্থে নয়, সবদিক দিয়ে সমৃদ্ধি করা হচ্ছে। সাথে সাথে চরম দুঃখ ও কষ্টের বিষয় হলো মুসলিম রাষ্ট্রের চিন্তা, কল্পনা ও বাস্তবতাকে খণ্ডিত ও সংকুচিত করা হচ্ছে। ব্ল্যাকহোলের দিকে ধাবিত উপমহাদেশের পূর্ব দিগন্তের মুসলিম রাষ্ট্রটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে সর্বপ্রথম যে কাজটি আমাদের করতে হবে, তা হলো- জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সেই মহান জাগতিক প্রতিষ্ঠার জন্য একটা ‘লে-অফ’ সিচুয়েশন দরকার। আইনগতভাবে সেটা করতে হলে অন্তত কিছু সময়ের জন্য কোয়ালিশন সরকার জরুরি।