শেখ মুজিব থেকে শেখ হাসিনা : ভারতে আশ্রয়-প্রশ্রয়


২২ জুলাই ২০২৬ ২০:০৬

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
বাংলাদেশ ও ভারত নিকট প্রতিবেশী দেশ। রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার দিক থেকে দুটি দেশ কাগজে-কলমে প্রায় কাছাকাছি হলেও বাস্তবে নেই। বাংলাদেশ ও ভারত রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হলেও বাস্তবে বর্তমান ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতার লেশমাত্রও নেই। বহুদিন পর ভারত তার আসল রূপে পরিচিত হয়ে উঠেছে যে, সে একটা হিন্দু রাষ্ট্র। যদিও ভারতে ২০ শতাংশ মুসলিম এবং আরো ২০ শতাংশ হবে হরিজন, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান। বিজেপি সরকার বর্তমানে হিন্দুত্ববাদের বিকাশ ঘটাতে মুসলিমসহ অন্য ধর্ম ও বিশ্বাসীদের ওপর নির্মম অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। ভারত শুধু নিজ দেশের মুসলিমদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করেই থেমে নেই, তারা প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোকে শত্রু নির্ধারণ করেই অপকৌশল নিয়ে প্রতিশোধমূলক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারত তার আরেক প্রতিবেশী পাকিস্তানের সাথে প্রত্যক্ষ বিরোধে লিপ্ত হলেও বাংলাদেশের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দুইভাবে বিরোধিতা করছে। তবে বিরোধিতাই নয়, ভারত বাংলাদেশকে দুর্বল করে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, যা বাংলাদেশের জনগণ কোনোদিন মানছে না এবং মানবেও না।
রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল করা, অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে রাখাসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে বাংলাদেশকে ভারতের নিয়ন্ত্রণে রাখাই হচ্ছে দিল্লির মূল টার্গেট। তার অন্যতম কারণ, বাংলাদেশ হচ্ছে একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। ভারত চাচ্ছে এ মুসলিম রাষ্ট্রটাকে কোনোভাবেই এগিয়ে যেতে না দেয়া। তাই শুরু থেকেই দিল্লির হিন্দুত্ববাদী শাসকগোষ্ঠী আমাদের এ জন্মভূমির বিরুদ্ধে একের পর এক ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। ১৯৪৭ সালে শুরু হওয়া ভারতের হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর এ ষড়যন্ত্র থামছেই না। তার সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে দিল্লিতে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে নিরাপদে আশ্রয় দেয়া আর সর্বশেষ হচ্ছে জিয়া হত্যার অন্যতম খুনি মেজর (অব.) মোজাফফরকে দিয়ে আবারো নয়া কোনো ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন।
প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যাকাণ্ডের অন্যতম খুনি মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের একটি চৌকস টিম গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতার করেছে ঠিক আছে, কিন্তু বিগত ৪৫ বছর কীভাবে একজন খুনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে নিরাপদে বসবাস করে আসছিল- তা একটি বড় প্রশ্ন। অবশ্য সম্ভব হয়েছে ভারতের অবৈধ মদদে, যা আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পুরো লঙ্ঘন।
‘বের হতে পারে জিয়া হত্যার ভূরাজনীতির নেপথ্য সত্য’- এ শিরোনামে গত ২০ জুলাই দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘মোজাফফরের দীর্ঘ পলাতক জীবন এবং ভারতের আশ্রয় : মেজর (অব.) মোজাফফরের জবানবন্দী ও তার পলাতক জীবনের রুটম্যাপ বিশ্লেষণ করলে প্রথম যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা হলো তার দীর্ঘসময় ধরে ভারতে অবস্থান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর এবং বিদ্রোহের মূল নায়ক মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের মৃত্যুর পর, জিয়া হত্যাকাণ্ডের সাথে সরাসরি যুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা সুপরিকল্পিতভাবে সীমান্ত অতিক্রম করেন।
আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা বাহিনীর বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, মোজাফফর হোসেন হত্যাকাণ্ডের পরপরই চট্টগ্রামের গহিন জঙ্গল এবং স্থানীয় কিছু দালালের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। এরপর তিনি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে দীর্ঘসময় ধরে ছদ্মবেশে অবস্থান করেন এবং পরবর্তীকালে থাইল্যান্ডেও কিছু সময় কাটান। একজন রাষ্ট্রপতির হত্যাকারী এবং সেনাবাহিনীর তালিকাভুক্ত ফেরারি আসামি হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে তিনি ভারতের মাটিতে দীর্ঘসময় ধরে কোনো আইনি জটিলতা ছাড়াই অবস্থান করতে পারলেন, তা নিয়ে গভীর ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন উঠেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা বা কোনো বিশেষ মহলের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতা ও অর্থায়ন ছাড়া একজন দাগি সামরিক আসামির পক্ষে এত বছর ধরে পরিচয় গোপন করে নিরাপদ আশ্রয় উপভোগ করা অসম্ভব। ফলে তার এই দীর্ঘ ভারতীয় প্রবাস জীবনের পেছনের মদদদাতাদের খুঁজে বের করা গেলেই জিয়া হত্যাকাণ্ডের বৈশ্বিক চক্রান্তের সুতাগুলো বেরিয়ে আসবে।’
খুনি মোজাফফর যেমন দেড় দশকের মতো ভারতে নিরাপদে আশ্রয় পেয়েছিল, তেমনি এখনো বাংলাদেশের কয়েক হাজার খুনি ফ্যাসিস্ট ভারত সরকারের নিরাপত্তায় আশ্রয় নিয়ে আছেন। বিশেষ করে জুলাই ২০২৪ থেকে ভারত বাংলাদেশের খুনি ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের দিল্লি থেকে শুরু করে কলকাতাসহ বড় বড় শহরগুলোয় আশ্রয় দিয়ে যাাচ্ছে। ভারত শুধু আশ্রয়ই দিয়েই ক্ষান্ত থাকছে না, তাদের দিয়ে বিভিন্ন অপকর্ম করার সহযোগিতা করে আসছে। দিল্লির শাসকরা কোনো সময়ই বাংলাদেশকে স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল থাকতে দেয়নি। ভারতের সমর্থিত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলেও যেমন দিল্লি বাংলাদেশে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে রেখেছিল। এখনো তারা ফ্যাসিস্টদের ভারতে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে।
আমাদের এ জন্মভূমিকে অস্থিতিশীল করার ভারতের এ ষড়যন্ত্র ও পাঁয়তারা শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সাল থেকেই। প্রথমে ভাষার প্রশ্ন নিয়ে বাঙালিদের ক্ষেপিয়ে তোলে, অথচ ভারতের অসংখ্য ভাষার মধ্যে হিন্দিকে তাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা করেছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি থেকে শুরু করে তামিল ও গুজরাটি ভাষাভাষীদের পক্ষ থেকে কোনো সময়ই কোনো প্রতিবাদ বিক্ষোভ করতে শুনা যায়নি। তারপর ভারত আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে দিয়ে শুরু করে অন্য এক আন্দোলন, যার পরিণতিতে মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি পাকিস্তান ভেঙে দুই টুকরা করে দেয়া হয়।
১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানে; বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে একটি মামলা বেশ আলোচিত ছিল সেটি হচ্ছে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’। সেই মামলার প্রধান আসামি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। যেই মামলাকে আওয়ামী লীগ ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বলতো মিথ্যা মামলা। তারপর যখন ইতিহাসের সত্য বেরিয়ে আসতে শুরু করলো, তখন আওয়ামী লীগের নেতাদের পক্ষ থেকে বলা শুরু হলো আগরতলার মামলাটি মিথ্যা ছিল না। আওয়ামী লীগের নেতা ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলী তো এ বিষয়ে একটি বই লিখেছেন, যে বইটির নামই হচ্ছে ‘সত্য মামলা আগরতলা’। প্রথম আলোর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রথমা এ বইটি প্রকাশ করে। আওয়ামী লীগ নেতা শওকত আলী ২০২১ সালের ১১ ডিসেম্বর ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শতভাগ সত্য ছিল। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ২০২১ সালের ১১ ডিসেম্বর শনিবার ধানমন্ডির ডব্লিউভিএ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত ও মিত্রদের অবদান’ শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। প্রথম আলো ১২ ডিসেম্বর খবরটি প্রকাশ করে। প্রথম আলো প্রকাশিত খবরটিতে বলা হয়েছে, ‘১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সরকারের দায়ের করা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযোগ শতভাগ সত্য ছিল বলে জানিয়েছেন ওই মামলার অন্যতম আসামি ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ৩৮তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।’
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামটা হয়েছে কেন, তার প্রশ্নের উত্তরটা এক দুই শব্দে দেয়া সম্ভব নয়। আগরতলা একটি ছোট শহরের নাম, যেটি ভারতের একটি ছোট রাজ্যের রাজধানী। কিন্তু সেই রাজধানীর নাম কীভাবে একটি মামলার নামে জড়িয়েছে, তা জানতে আমাদের একটু পেছনের দিকে যেতে হবে। শেখ মুজিবুর রহমান একসময়ের মুসলিম কর্মী ও নেতা। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর শেখ মুজিব জাতীয় রাজনীতিতে কোনো জাতীয় অবস্থান পাচ্ছিলেন না। ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত ছয় বছর শেখ মুজিব কোনো এমপি বা মন্ত্রী হতে পারেনি। কারণ মুসলিম লীগের মতো এলিট মেধাবী রাজনীতিকদের সংগঠনে তার কোনো পাত্তাই নেই। কিন্তু তার তো অনেক প্রত্যাশা, তাকে যেকোনোভাবেই এমপি-মন্ত্রী হতে হবে। তাই মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে আরেক নেতা মওলানা ভাসানীকে নিয়ে নতুন দল গঠন করলেন আওয়ামী মুসলিম লীগ। শেখ মুজিব আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের সাথে ঐক্য করে আওয়ামী মুসলিম লীগ বেশকিছু আসনে বিজয়ী হন আর শেখ মুজিব মন্ত্রিপরিষদে স্থান করে নিলেন। কিন্তু যুক্তফ্রন্ট সরকার বেশিদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি।
আওয়ামী মুসলিম লীগকে ভারত ও হিন্দুদের কাছে আরো গ্রহণযোগ্য করতে শেখ মুজিব এবার দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেন। দলের নতুন নাম হয় আওয়ামী লীগ। নতুন নামে ভারত ও হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে জনপ্রিয় হতে থাকে আওয়ামী লীগ। শেখ মুজিবও ভারত সরকারের সাহায্য কামনা করতে বিভিন্ন কৌশলে আগাতে থাকেন। শেখ মুজিব যে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ করতে ভারত সরকার ও তার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে সার্বিক সহযোগিতা কামনা করে চিঠি দিয়েছিলেন, তার একটি বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোর ২০১৯ সালে ঈদ ম্যাগাজিনে। দেশের সেরা লেখক ও কলামিস্ট মহিউদ্দিন আহমদ ‘সিরাজুল আলম খান এবং স্বাধীনতার নিউক্লিয়াস’ নামক নিবন্ধের চতুর্থ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘শাহ মোয়াজ্জেমের কথায় বোঝা যায়, পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা নিয়ে শেখ মুজিবের নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনা ছিল। এজন্য তিনি ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালান। এর একটি বিস্ময়কর বিবরণ পাওয়া যায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের তৎকালীন উপহাইকমিশনের পলিটিক্যাল অফিসার শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জির কাছ থেকে। ব্যানার্জি পুরান ঢাকায় চক্রবর্তী ভিলায় থাকতেন। পাশের বাড়িতেই ছিল ইত্তেফাক অফিস। ১৯৬২ সালের ২৪ মার্চ মাঝরাতে ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়া একটি ছেলেকে পাঠিয়ে ব্যানার্জিকে ইত্তেফাক অফিসে ডেকে আনেন। মানিক মিয়ার সঙ্গে ছিলেন শেখ মুজিব। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে তারা কথা বলেন। ব্যানার্জি দেখলেন, একপর্যায়ে শেখ মুজিব ও মানিক মিয়ার কথাবার্তার ধরন বদলে গেল। তারা কিছু একটা বলতে বা দেখাতে চাইছেন। ব্যানার্জি জানতে চান তারা উঁচুপর্যায়ের কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো বার্তা পৌঁছাতে চাচ্ছেন কিনা। মুজিব মুখ খুললেন। বললেন, এই বৈঠক ডাকার উদ্দেশ্য হলো, তারা ব্যানার্জির মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটা গোপনীয় চিঠি পাঠাতে চান। মুজিব চিঠিটা ব্যানার্জির হাতে দিলেন। তার মধ্যে তাড়াহুড়ো ছিল। চিঠিটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরুকে ব্যক্তিগতভাবে সম্বোধন করে লেখা। ভূমিকার পর সরাসরি একটা কর্মপরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। মুজিব বললেন, তিনি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনা করবেন। মানিক মিয়া ইত্তেফাক-এ লেখনীর মাধ্যমে প্রচারকাজ চালাবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৬৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চের মধ্যে মুজিব লন্ডনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে প্রবাসী সরকার গঠন করবেন। চিঠির শেষ প্যারাগ্রাফে নৈতিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন ও সাজসরঞ্জাম চেয়ে নেহরুকে অনুরোধ জানানো হয় এবং এ বিষয়ে কথা বলার জন্য মুজিব গোপনে নেহরুর সঙ্গে দেখা করতে চান।
চিঠি পাঠানো হলো। ভারত তখন চীনের সঙ্গে যুদ্ধে বিপর্যস্ত। দিল্লি থেকে খবর এলো, মুজিবকে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। মুজিব ভাবলেন, ঢাকায় ভারতীয় উপহাইকমিশনের আমলাদের কারণেই দেরি হচ্ছে। ধৈর্য হারিয়ে তিনি কৌশল পাল্টালেন। গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে আগরতলায় গেলেন। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহের সঙ্গে তার বৈঠক হয়। আগরতলায় মুজিবকে রেখে শচীন সিং দিল্লি যান এবং নেহরুর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেন। চীনের সঙ্গে যুদ্ধের পর নেহরু আরেকটি ফ্রন্ট খুলতে চাননি। শচীন সিং আগরতলা ফিরে এসে মুজিবকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তাঁকে সাহায্য দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং তা ভারতের ঢাকা উপহাইকমিশনকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। নেহরুর পরামর্শ ছিল, এরপর থেকে মুজিব যেন ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমেই যোগাযোগ করেন, আগরতলার মাধ্যমে নয়।
শচীন সিংয়ের ভাষ্যে এবং অন্যান্য সূত্রে জানা যায়, শেখ মুজিব আগরতলা গিয়েছিলেন ১৯৬৩ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে। তিনি সেখানে ছিলেন ১৫ দিন। তার আগরতলা মিশন সম্বন্ধে দলের সহকর্মীরা এবং সরকারের গোয়েন্দারা ছিলেন সম্পূর্ণ অন্ধকারে।
১৯৯১ সালে মফিদুল হক দিল্লিতে শচীন সিংয়ের সঙ্গে দেখা করলে তিনি ঘটনাটি নিজের হাতে লিখে দিয়েছিলেন। সেই ভাষ্য ফয়েজ আহমদ উল্লেখ করেছেন তার আগরতলা মামলা, শেখ মুজিব ও বাংলার বিদ্রোহ বইয়ে।’
এ আগরতলায় যাওয়া নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগেই পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবসহ বেশ কয়েকজন রাজনীতিকের বিরুদ্ধে মামলা করে, যেটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামেই অধিক পরিচিত।
ইতিহাসের প্রমাণিত ঘটনা দিয়ে বোঝা যায়, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবই প্রথম ভারতের রাজনৈতিক ও আর্থিক সহযোগিতা নিয়েই ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করা শুরু করেন তার সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে তারই কন্যা শেখ হাসিনার দিল্লিতে নিরাপদ অবস্থান। শুধু শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনাই নয়, আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীরাও ভারতে অবস্থান করে বাংলাদেশ, ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
১৯৪৭ সাল থেকেই ভারত মুসলিম ভুখণ্ড পাকিস্তানকে যেমন অস্থিতিশীল করে ভেঙে দিয়েছে তেমনিভাবে ১৯৭১ সালের পর থেকেই বাংলাদেশ নামক নুতন রাষ্ট্রটিকে স্থিতিশীল হতে দেয়নি। ১৯৭১ সালের পর থেকেই ভারত বাংলাদেশে বারবার তাদের দালাল রাজনীতিকদের দিয়ে পুতুল সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। যার কারণে বাংলাদেশের জনগণকে কয়েক বছর পরপরই গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়েছে, রক্ত দিতে হয়েছে জীবন দিতে হয়েছে। শেখ মুজিব ও এরশাদ থেকে শেখ হাসিনার মতো ফ্যাসিস্ট ও পুতুলদের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়ে ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
১৯৭২ সালে ক্ষমতায় বসেই শেখ মুজিব দেশটাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা শুরু করে। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য দিয়ে সংবিধান প্রণয়ন, শাসনব্যবস্থার বার বার পরিবর্তন, সকল সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া এবং সর্বশেষ গণতন্ত্রকে হত্যা করে বাকশাল কায়েম। তার কন্যা ফ্যাসিস্ট হাসিনাও ক্ষমতায় এসে ভারতের প্রেসক্রিপশনে দেশকে অস্থিতিশীল করে গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠায়। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলে। কিন্তু প্রতিবারই বাংলার বীর জনতা তাদের হাত থেকে রক্ত দিয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে ফিরিয়ে এনেছে। আর বাপ-বেটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্রসহ দেশকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পেরেছে ভারতের হিন্দুত্ববাদি গোষ্ঠীর আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে।
আমি এ নিবন্ধের শিরোনামটি ‘শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনাকে ভারতের আশ্রয়-প্রশ্রয়’ এ বাক্যের মাধ্যমে তুলে ধরেছি। উনাদের ব্যাপারে ‘আশ্রয় ও প্রশ্রয়’ এ দুটি শব্দ খুবই যুৎসই হয়েছে। আমরা যদি এ দুটি শব্দের অর্থ সামান্য বিশ্লেষণ করি, তাহলে যা পাই তা বাপ-বেটিসহ আওয়ামী লীগারদের ভারত তাই করছে।
’আশ্রয়’ এবং ‘প্রশ্রয়’ শব্দ দুটির অর্থ ভিন্ন। আশ্রয় বলতে বোঝায় কাউকে থাকার জায়গা, রক্ষণ বা সহায়তা প্রদান করা; অন্যদিকে প্রশ্রয় অর্থ হলো অতিরিক্ত আদর, আশকারা দেওয়া। কোনো খারাপ কাজের পেছনে মদদ দেওয়া একত্রে ‘আশ্রয়-প্রশ্রয়’ বলতে বোঝায় কাউকে শুধু ঠাঁই দেওয়া নয়, বরং তার ভুল বা অন্যায় আচরণকে সমর্থন করে মাথায় তুলে রাখা। ভারত বিগত কয়েক দশক ধরে শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় তথা মদদ দিয়েই যাচ্ছে। ভারতের টার্গেট হচ্ছে এ মদদ দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সব কিছু ধ্বংস করে দিয়ে বাংলাদেশকে দুর্বল রেখে নিয়ন্ত্রন করা। কিন্তু বাংলার বীর ছাত্র যুবকরা ভারতের আশ্রিত এসব কুলাঙ্গার আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের সহযোগিতায় ভারতের ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছে বারবার এবং ভবিষ্যতেও দেবে। বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় মুসলিম দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করেই বিশ্বের দরবারে আসীন থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com