সম্পাদকীয়

ফ্যাসিস্ট কালচার রাজপথে সংঘাত-সংঘর্ষ গণতান্ত্রিক সমাধান সংসদে বিতর্কে


৮ জুলাই ২০২৬ ২০:২২

শক্তি নয়, সততা, যোগ্যতায় এগিয়ে যারা, তারাই পাবেন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব। কারা উল্লেখিত গুণাবলিতে এগিয়ে, তা নির্ণয় করবে দেশের জনগণ। তারা গোপন ব্যালটে ভোট দিয়ে তাদের নেতা নির্বাচিত করবে। তবেই বন্ধ হবে শক্তির মহড়া, অস্ত্রের ঝনঝনানি। যুদ্ধ-বিগ্রহ আর হত্যা-সন্ত্রাস। এমন ভাবনা থেকেই জুলুমবাজ, রাজতন্ত্র, সামন্তবাদী ফ্যাসিস্ট দুঃশাসনের অবসান ঘটিয়ে শূরা বা পরামর্শভিত্তিক নেতা নির্বাচনের পদ্ধতি গ্রহণ করেছে বিশ্বের শান্তিবাদী মানুষ। আধুনিক ভাষায় যার নাম গণতন্ত্র। যার যার জাতীয় ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী তারা এ রাজনৈতিক মতবাদকে নিজেদের মতো করে গ্রহণ করেছে। দীর্ঘ ১৭ বছর ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনে অতিষ্ঠ বাংলাদেশের মানুষ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রায় ২ হাজার প্রাণের বিনিময়ে ফিরে পেয়েছে গণতান্ত্রিক সরকার। বিরোধীদলের আসন অলংকৃত করেছে উপমহাদেশের সবচেয়ে সুুশৃঙ্খল রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে জাতীয় সংসদে জনগণের মতামত ও দাবি যৌক্তিক ভাষায় তুলে ধরছেন আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান এবং বিরোধীদলের এমপিরা। জাতীয় সংসদে চলছে প্রাণবন্ত বিতর্ক। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, একটি স্বার্থান্বেষী মহল ব্যক্তিস্বার্থ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, দখলবাজি টিকিয়ে রাখতে ফ্যাসিস্ট কায়দায় সন্ত্রাসবাদকে উসকে দিচ্ছে। বিরোধীদলের মিছিল-মিটিংয়ে হামলা করছে। এমনকি সরকারি দলের ব্যানার ব্যবহার করে তারা ব্যক্তি স্বার্থে নিজ দলের নেতা-কর্মীদের হত্যা করছে।
পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, চলতি বছরের প্রথম সাড়ে পাঁচ মাসে সারা দেশে ৫৯ রাজনৈতিক নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন বিএনপির ৪৫ জন, জামায়াতের সাতজন এবং জঙ্গিবাদের দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাতজন। দলীয় কোন্দল এবং অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ ও হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩০ জন। এর মধ্যে ২৩ জনই বিএনপি ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। জামায়াতের পাঁচজন এবং আওয়ামী লীগের দুজন। বিএনপি এবং অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের কোন্দলে নিহত হয়েছেন ১৪ জন। বিএনপি ও জামায়াতের বিরোধে নিহত হয়েছেন ১১ জন। তাদের মধ্যে ছয়জন বিএনপির ও পাঁচজন জামায়াতের নেতাকর্মী। বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সহিংসতায় নিহত হয়েছেন পাঁচজন। তাদের তিনজন বিএনপির ও দুজন আওয়ামী লীগের। অন্যান্য ঘটনায় খুন হন ২৯ নেতাকর্মী।
গত ৪ জুলাই শনিবার রাজধানীর গুলিস্তানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শান্তিপূর্ণ মিছিলে বিএনপির ব্যানার ব্যবহার করে হামলার ঘটনায় রাজধানীসহ সারা দেশের ব্যবসায়ীরা বিক্ষুব্ধ। কারণ জামায়াতে ইসলামীর এ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বিক্ষোভ ছিল সন্ত্রাস, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ ও দখলবাজির বিরুদ্ধে। মজলুম জনগণ তাদের পক্ষে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছে।
আমরা মনে করি, ফ্যাসিস্ট আমলের রাজনৈতিক কারণে হামলা-মামলার যে অপসংস্কৃতি রাজনীতি কলুষিত করেছে, তা থেকে বের হওয়ার এখন উত্তম সময় চলছে দেশে। জাতীয় সংসদে প্রাণবন্ত বিতর্কের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক, জাতীয় ও স্থানীয় সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। আমরা মনে করি, আমাদের জাতীয় নেতারা বিশ্বাস করেন, সকল মতবিরোধ নিরসনের জন্য জাতীয় সংসদই সর্বোত্তম স্থান। রাজপথে প্রতিবাদ করার অধিকার প্রত্যেকটি বৈধ রাজনৈতিক দলের আছে। কিন্তু সংঘর্ষ ও সন্ত্রাস ফ্যাসিবাদের হাতিয়ার- এটি যারাই ব্যবহার করতে চাইবে, তাদের কঠোর হাতে দমন করতে হবে। গণতন্ত্র এবং দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষায় আইন চলবে নিজস্ব গতিতে দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে। এ ব্যত্যয় মানে ফ্যাসিবাদের উত্থানের অশনিসংকেত, যা আমাদের কারো কাম্য নয়।