বিবি হাজেরা (আ.) ঈমান, তাওয়াক্কুল ও সবরের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
৮ জুলাই ২০২৬ ১৮:৩২
॥ কাজী তাবাসসুম ॥
বিবি হাজেরা জিলহজ মাসের সাথে, হজের আরকানসমূহের সাথে যার নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি এমন একজন নারী, যিনি পৃথিবীর অন্যসব নারীর জন্য হয়ে গেছেন ঈমান, তাওয়াক্কুল ও সবরের উজ্জল দৃষ্টান্ত।
তিনি ছিলেন মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর স্ত্রী এবং হযরত ইসমাইল (আ.)-এর মা। হাজেরা (আ.)-এর বংশ পরিচয় সম্পর্কে কুরআন ও সহীহ হাদীসে বিস্তারিত তথ্য নেই। তবে ইসলামের ইতিহাস ও তাফসীর গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, তিনি মিসরের একজন সম্ভ্রান্ত নারী ছিলেন। কিছু বর্ণনায় তাঁকে কিবতী বা মিশরীয় বলা হয়েছে।
তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটসাপ্রবাহ আমাদের সবার জানা। নিছক সে ঘটনাপ্রবাহের পুনরাবৃত্তি আজকের লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং স্মরণ করতে চাই বিবি হাজেরাকে (আ.) মহান রবের কাছে সম্মানিতা নারী হিসেবে, যিনি কেয়ামত পর্যন্ত সব নারীর জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবেন।
চলুন নজর বুলিয়ে আসি সেই দিনগুলোয়-
হযরত ইসমাইল (আ.) তখন দুধের শিশু। এই সময় আল্লাহ তায়ালা প্রিয়নবী হযরত ইবরাহিমকে হুকুম করলেন বিবি হাজেরা (আ.) ও তার দুধের সন্তানকে মরুভূমিতে ছেড়ে আসতে। হযরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর আদেশ আক্ষরিকভাবেই পালন করলেন। ছেড়ে এলেন বিবি হাজেরাকে (আ.) তার দুধের সন্তানসহ নির্জন মরুপ্রান্তরে। রেখে এলেন তাদের জন্য মাত্র এক মশক পানি এবং এক থলি খেজুর।
বিবি হাজেরা (আ.) জানতে চাইলেন, ‘আমাদের একা কোথায় ছেড়ে যাচ্ছেন?’ হযরত ইবরাহিম (আ.) নিরুত্তর। বিবি হাজেরা কাতর স্বরে আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তবে এটা কি আল্লাহর আদেশ?’ হযরত ইবরাহিম (আ.) বললেন, হ্যাঁ! এবার সহাস্যে বিবি হাজেরা বলে উঠলেন, ‘তাহলে আল্লাহ তায়ালা আমাদের ধ্বংস করবেন না।’ এরপর তিনি সন্তানের কাছে ফিরে এলেন। এরপর বিবি হাজেরা সেখানে প্রশান্তচিত্তে অবস্থান করতে লাগলেন। খেজুর খেয়ে, পানি পান করে দিনের পর দিন অতিবাহিত করতে লাগলেন। ছেলেকে বুকের দুধ পান করাতে লাগলেন। এখানে মুসলিম উম্মাহর নারী সমাজের জন্য লক্ষণীয় বিষয় এই যে, হজরত হাজেরা আলাইহিস সালামের অন্তরে আল্লাহর প্রতি কত গভীর আস্থা এবং ভরসা ছিল। তিনি যখন জানতে পারলেন যে, এই নির্জন মরুভূমিতে আল্লাহর নির্দেশেই তাঁকে রেখে যাওয়া হচ্ছে, তখন তিনি চিন্তামুক্ত হয়ে গেলেন এবং সম্পূর্ণ আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে সেখানে থাকতে লাগলেন।
দিন গড়িয়ে এমন একদিন এলো, যখন খেজুর ও পানি সবই ফুরিয়ে গেল। স্তনও দুধহীন হয়ে পড়ল। দুজনেরই ক্ষুধা ও পিপাসা পৌঁছাল চরমে। পিপাসায় মরুভূমির তাপে দুধের শিশু ছটফট করতে লাগল। পানির খোজে মা হাজেরা (আ.) দৌড়াদৌড়ি করতে লাগলেন। ছাফা পাহাড়ে চড়ে চারদিকে পানির খোঁজ করলেন। কোথাও পানির দেখা পেলেন না। সেখান থেকে নেমে ছুটলেন মারওয়া পাহাড়ের দিকে। সবরের কঠিন পরীক্ষা। পাহাড়ের ওপর উঠে চারদিকে পানি খুঁজলেন। কোথাও একবিন্দু পানি নেই। দুই পাহাড়ের মাঝে নিচু এলাকা ছিল। যতক্ষণ সমভূমিতে চলতেন, ছেলের দিকে লক্ষ রাখতেন। কিন্তু নিচু জায়গায় গিয়ে আর ছেলেকে দেখতে পেতেন না। তিনি ঐ জায়গাটুকু দৌড়ে পার হতেন। এভাবে বিবি হাজেরা (আ.) দৌড়ে দৌড়ে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে উঠে কয়েকবার পানির খোঁজ করলেন। বিবি হাজেরার (আ.) এই দৌড়ানো আল্লাহ এতটাই পছন্দ হলো যে, তিনি হাজীদের জন্য সাতবার দৌড়ান (সায়ী) ইবাদতে পরিণত করে দিলেন। এই হলো বিবি হাজেরার (আ.) আল্লাহর ওপর অপরিমেয় বিশ্বাস ও ভরসার ফসল। অবশেষে সপ্তমবার পাহাড় থেকে নেমে দেখা পেলেন জমজমের। আকাশে উড়তে লাগলো পাখি। তা দেখে কাফেলারা ধীরে ধীরে জড়ো হতে লাগলো, গড়ে উঠলো বসতি।
আল্লাহর ওপর বিবি হাজেরার (আ.) অবিচল আস্থা, বিশ্বাস, ভরসার কারণেই আল্লাহ তায়ালা তাকে জমজমের ধারার বরকত এবং উত্তম লোক বসতি দিয়ে সহযোগিতা করলেন। বিবি হাজেরা (আ.) চরম ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করে কেয়ামত পর্যন্ত উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইলেন।
যে কোনো পেরেশানি বা বিপদ এলে আমরা কত সহজে ঘাবড়ে যাই। এমন নির্জন নির্বাসনের কথা আমাদের ভাবনার বাইরে।
কুরআনে আমরা নির্দেশ পেয়েছি, “সামি’না ওয়া আতা’না”। যার গুঢ় অর্থ বুঝেছিলেন বিবি হাজেরা (আ.)। ‘আমরা শুনেছি এবং আনুগত্য করেছি।’ এর গুঢ় অর্থ শুধু “শোনা” আর “মানা” নয়; এর মধ্যে একজন মুমিনের পূর্ণ আত্মসমর্পণের চেতনা নিহিত আছে।
“সামি’না”- শুধু কান দিয়ে শোনা নয়। এখানে ‘শোনা’ বলতে বোঝায় মনোযোগ দিয়ে গ্রহণ করা, হৃদয়ে স্থান দেওয়া, সত্য হিসেবে মেনে নেওয়া। অর্থাৎ আল্লাহর আদেশকে তর্কের বস্তু না বানিয়ে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করা।
“আতা’না”- নিঃশর্ত আনুগত্য। এটি এমন আনুগত্য যা সুবিধা-অসুবিধা দেখে নয়, নিজের প্রবৃত্তির ওপর নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
এটি ঈমানের পরিপূর্ণ রূপ। এই বাক্য একজন বান্দার তিনটি অবস্থাকে প্রকাশ করে: বিশ্বাস, বিনয় ও আত্মসমর্পণ। এটি মূলত বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহর প্রতি একটি অঙ্গীকার: ‘আমি নিজের ইচ্ছাকে নয়, তোমার হুকুমকে প্রাধান্য দেব।’
বনি ইসরাইলের চরিত্র ছিল এর বিপরীত। কুরআনে বনি ইসরাইলের কিছু লোকের কথা এসেছে যারা বলেছিল: ‘শুনলাম কিন্তু অমান্য করলাম।’ তার বিপরীতে মুমিনরা বলে: ‘শুনলাম এবং মেনে নিলাম।’ অর্থাৎ প্রকৃত ঈমান শুধু জ্ঞান নয়, আনুগত্যেও প্রকাশ পায়।
অহংকার ত্যাগ করতে, আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকতে, এই ছোট বাক্যটি মানুষকে শেখায় দীনের সামনে নিজের মতকে ছোট মনে করতে।
তাই “সামি’না ওয়া আতা’না” আসলে একজন মুমিনের প্রকৃত জীবনদর্শন। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে তার ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে ভরসা রাখার তৌফিক দিন।
লেখক : প্রভাষক, মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ।