বিশ্বকাপ ফুটবলে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার
৮ জুলাই ২০২৬ ১৮:২৯
॥ মুন্সী আবু আহনাফ ॥
ফুটবল বরাবরই আবেগের খেলা। কিন্তু গত এক দশকে এই আবেগের পাশাপাশি ঢুকে পড়েছে হিসাব-নিকাশ, ডেটা আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। ২০১৪ সালের গোললাইন প্রযুক্তি থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকো বিশ্বকাপের থ্রিডি প্লেয়ার অ্যাভাটার পর্যন্ত; প্রতিটি বিশ্বকাপেই প্রযুক্তি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। রেফারির চোখের ভুল থেকে শুরু করে খেলোয়াড়ের চোটের পূর্বাভাস, দলের কৌশল বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা; সবখানেই এখন এআইয়ের উপস্থিতি স্পষ্ট। এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো ফুটবল বিশ্বকাপে এআই প্রযুক্তির ইতিহাস, বর্তমান ব্যবহার এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা।
১. ফুটবলে এআই প্রযুক্তির ইতিহাস : ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছিল মূলত ক্যামেরাভিত্তিক ট্র্যাকিং সিস্টেম দিয়ে, যা পরবর্তীতে কম্পিউটার ভিশন ও মেশিন লার্নিংয়ের সংযোগে আরও পরিশীলিত হয়ে ওঠে। ইংল্যান্ডের প্রকৌশলী পল হকিন্স ২০০০ সালে ক্রিকেটের জন্য হক-আই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন, যা পরে টেনিস, ক্রিকেট হয়ে ফুটবলে প্রবেশ করে। ২০১০ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্স ল্যাম্পার্ডের বিখ্যাত ‘ভূত-গোল’ বিতর্কের পর ফিফা প্রযুক্তি ব্যবহারে বাধ্য হয়। এরপর ধাপে ধাপে গোললাইন প্রযুক্তি, ভিডিও রিভিউ এবং সব শেষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্র্যাকিং সিস্টেম যুক্ত হয়েছে খেলাটিতে।
২. ফিফা বিশ্বকাপে এআই ব্যবহারের শুরু ও বিবর্তন : ২০১৩ সালে ফিফা প্রথমবারের মতো গোললাইন প্রযুক্তি অনুমোদন করে এবং ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে জার্মান প্রতিষ্ঠান গোলকন্ট্রোলের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে প্রথমবার ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর যুক্ত হয়, যেখানে পুরো আসরে প্রায় ২৯টি সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছিল এই প্রযুক্তি। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি এবং কানেক্টেড বল যুক্ত হওয়ায় এআইয়ের ব্যবহার সরাসরি ম্যাচ পরিচালনায় প্রবেশ করে। আর ২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকো বিশ্বকাপে ফুটবল এআই প্রো, থ্রিডি প্লেয়ার অ্যাভাটার ও উন্নত রেফারি ভিউয়ের মাধ্যমে এআই এখন টুর্নামেন্টের প্রায় প্রতিটি স্তরে প্রবেশ করেছে।
৩. সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি (SAOT) কীভাবে কাজ করে : সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি বা SAOT স্টেডিয়ামের ছাদে বসানো ডজনখানেক ক্যামেরার মাধ্যমে প্রতিটি খেলোয়াড়ের শরীরের প্রায় ত্রিশটি বিন্দু সেকেন্ডে বহুবার পর্যবেক্ষণ করে তাদের নির্ভুল অবস্থান নির্ণয় করে। এর সঙ্গে বলের ভেতরে বসানো সেন্সর যুক্ত হয়ে বল কখন এবং কীভাবে স্পর্শ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে শনাক্ত করে। এই দুই তথ্যের সমন্বয়ে সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে অফসাইড লাইন তৈরি করে, যা ভিএআর কর্মকর্তারা যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হয়েছে; এখন মাত্র দশ সেন্টিমিটার ব্যবধানেও স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা সরাসরি লাইন্সম্যানের কানে পৌঁছে যায়, যা আগে ছিল পঞ্চাশ সেন্টিমিটার।
৪. ভিডিও এসিস্টেন রেফারি (VAR)-এ ক্ষেত্রে এআই-এর ভূমিকা : ভিএআর মূলত একটি ভিডিও রিভিউ ব্যবস্থা, যেখানে গোল, পেনাল্টি, লালকার্ড ও ভুল খেলোয়াড় শনাক্তির মতো ‘স্পষ্ট ভুল’ সংশোধনে সহায়তা করা হয়। ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্স-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে প্রথমবার বিশ্বকাপে ভিএআরের মাধ্যমে পেনাল্টি সিদ্ধান্ত বদলানো হয়। বর্তমানে এই ব্যবস্থার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হয়ে দ্রুত ফুটেজ বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য অফসাইড বা ফাউলের মুহূর্ত চিহ্নিতকরণ এবং থ্রিডি পুনর্গঠনের কাজ করছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো মানুষ রেফারিই নেন- এআই শুধু প্রমাণ ও সুপারিশ সরবরাহ করে; যাতে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত ও সংগতিপূর্ণ হয়।
৫. কানেক্টেড বল প্রযুক্তিতে কী? : কানেক্টেড বল প্রযুক্তিতে ফুটবলের ভেতরে একটি ক্ষুদ্র জড়তা পরিমাপক সেন্সর বা আইএমইউ বসানো থাকে, যা সেকেন্ডে বহুবার বলের গতিবিধির তথ্য ভিডিও অপারেশন কক্ষে পাঠায়। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ব্যবহৃত ‘আল রিহলা’ বলে এই সেন্সর প্রথমবার যুক্ত করা হয়, যা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বল স্পর্শের মুহূর্ত শনাক্ত করতে সাহায্য করে। ২০২৬ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল ‘ত্রিওন্দা’তেও একই ধরনের সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। এই তথ্য অফসাইড ও হ্যান্ডবলের মতো সূক্ষ্ম সিদ্ধান্তে বিশেষভাবে কাজে লাগে। কারণ মানুষের চোখে যা অস্পষ্ট থাকে, সেন্সর তা মিলিসেকেন্ডের নির্ভুলতায় ধরে ফেলে।
৬. এআই ক্যামেরা ট্রাকিং সিস্টেম : আধুনিক ফুটবলে একাধিক ক্যামেরা মিলে প্রতিটি খেলোয়াড় ও বলের অবস্থান প্রতি সেকেন্ডে বহুবার রেকর্ড করে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে প্রায় তিরিশটি ক্যামেরা সেকেন্ডে একশত ফ্রেম গতিতে কাজ করে এবং প্রতিটি খেলোয়াড়ের শরীরের দশ হাজারের বেশি তল-বিন্দু পর্যবেক্ষণ করতে পারে। ডেটা প্রতিষ্ঠান অপ্টার তৈরি ‘অপ্টা ভিশন’ প্রতি ম্যাচে বাইশজন খেলোয়াড়ের অবস্থানের বিশ লক্ষাধিক তথ্যবিন্দু সংগ্রহ করে। এই বিপুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কম্পিউটার ভিশন ও এআই মডেল দলের গঠন, চাপ প্রয়োগের তীব্রতা এবং খেলোয়াড়দের দৌড়ের ধরন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে।
৭. খেলোয়াড়দের দক্ষতা বিশ্লেষণে এআই : খেলোয়াড়দের দক্ষতা বিশ্লেষণে এআই বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় স্ট্যাটসবম্ব ও অপ্টার মতো প্রতিষ্ঠানের ডেটা, যা কম্পিউটার ভিশন ও মানুষের যাচাইয়ের সমন্বয়ে তৈরি হয়। প্রতিটি ম্যাচে প্রায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি ঘটনা রেকর্ড করা হয়; পাস, ট্যাকল, শট, চাপ প্রয়োগসহ নানা তথ্য। এক্সপেক্টেড গোল বা এক্সজি, প্যাসিং নেটওয়ার্ক ও প্রেশার ইনটেনসিটির মতো উন্নত মেট্রিক্স তৈরিতে এআই সরাসরি ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে করে কোচ ও স্কাউটরা কোনো খেলোয়াড়ের প্রকৃত অবদান, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা এবং মাঠে অবস্থানগত বুদ্ধিমত্তা অনেক সূক্ষ্মভাবে বিচার করতে পারেন, যা আগে শুধু চোখে দেখে বোঝা সম্ভব ছিল না।
৮. খেলোয়াড়দের শরীরে ইনজুরি বিষয়ে এআই : খেলোয়াড়দের শরীরে পরিধানযোগ্য সেন্সর, জিপিএস ট্র্যাকার ও অ্যাক্সেলেরোমিটার বসিয়ে হৃদস্পন্দন, দৌড়ের গতি ও শরীরের ওপর চাপের তথ্য প্রতিনিয়ত সংগ্রহ করা হয়। এই তথ্য মেশিন লার্নিং মডেলে বিশ্লেষণ করে চোটের ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এক্সজিবুস্ট নামের একটি অ্যালগরিদম নব্বই শতাংশের বেশি নির্ভুলতায় চোটের ঝুঁকি চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বজুড়ে পঞ্চাশটির বেশি ক্লাব জোন সেভেনের মতো প্রতিষ্ঠানের এআই ব্যবস্থা ব্যবহার করছে, যা কয়েকশ’ চোটের তথ্য বিশ্লেষণ করে বেশ ভালো নির্ভুলতায় ঝুঁকি পূর্বাভাস দিতে পারে। এতে খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করা এবং দলের পারফরম্যান্স ধরে রাখা সহজ হচ্ছে।
৯. ফুটবল ম্যাচ বিশ্লেষণের এআই : আধুনিক ফুটবল বিশ্লেষণের ভিত্তি এখন বিশাল পরিমাণ ডেটা বা বিগ ডেটা। অপ্টার মতো প্রতিষ্ঠান প্রায় সাড়ে সাত পেটাবাইট তথ্য সংরক্ষণ করে, যা প্রায় চার হাজার প্রতিযোগিতা ও কুড়িটির বেশি খেলা থেকে সংগৃহীত। এই তথ্যভাণ্ডার সরাসরি সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, জাতীয় দল; এমনকি বাজি ধরার প্ল্যাটফর্মেও ব্যবহৃত হয়। কম্পিউটার ভিশন ও এআইয়ের মাধ্যমে ডেটা সংগ্রহের গতি ও নির্ভুলতা দুটিই বহুগুণ বেড়েছে, ফলে ম্যাচ চলাকালীনই পরিসংখ্যানভিত্তিক গভীর বিশ্লেষণ সম্ভব হচ্ছে, যা দর্শক, ধারাভাষ্যকার ও কোচÑ সবার জন্যই কাজে লাগছে।
১০. ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত সংযোজনগুলোর একটি হলো ‘ফুটবল এআই প্রো’-ফিফা ও লেনোভোর যৌথ উদ্যোগে তৈরি একটি জেনারেটিভ এআই সহকারী, যা ফিফার নিজস্ব ফুটবল ভাষা মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এই টুল কয়েকশ কোটি তথ্যবিন্দু বিশ্লেষণ করে লেখা, গ্রাফ, ভিডিও ও থ্রিডি ভিজুয়ালাইজেশন আকারে কৌশলগত পরামর্শ দিতে পারে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অংশগ্রহণকারী আটচল্লিশটি দলকেই সমান সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, যাতে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর পাশাপাশি সীমিত সম্পদের দেশগুলোও একই মানের বিশ্লেষণ পেতে পারে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই উদ্যোগকে বিশ্লেষণে সমতা আনার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে এই টুল ম্যাচ চলাকালীন সরাসরি ব্যবহারযোগ্য নয়, শুধু ম্যাচের আগে ও পরে ব্যবহার করা যায়।
১১. দর্শকদের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করতে এআই : দর্শকদের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করতে এআই এখন সরাসরি সম্প্রচার ও তথ্যসেবায় ব্যবহৃত হচ্ছে। অফসাইড সিদ্ধান্তের থ্রিডি পুনর্গঠন এখন স্টেডিয়ামের স্ক্রিন ও টিভি সম্প্রচারে সরাসরি দেখানো হয়, যাতে জটিল সিদ্ধান্তও দর্শকরা সহজে বুঝতে পারেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে এই থ্রিডি অ্যাভাটার তৈরিতে অংশগ্রহণকারী ১,২৪৮ জন খেলোয়াড়ের শরীর স্ক্যান করা হয়েছে, যা মাত্র এক সেকেন্ডেই সম্পন্ন হয়। ফিফা জানিয়েছে, ভবিষ্যতে ফুটবল এআই প্রোর মতো বিশ্লেষণী টুলও ধীরে ধীরে সাধারণ দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে তারাও গভীর তথ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে খেলা উপভোগ করতে পারেন।
১২. সম্প্রচার প্রযুক্তিতে এআই : সম্প্রচার প্রযুক্তিতে এআইয়ের অন্যতম বড় সংযোজন ‘রেফারি ভিউ’; রেফারির শরীরে বসানো ক্যামেরা থেকে পাওয়া ফুটেজ এআই দিয়ে স্থিতিশীল করে দর্শকদের কাছে পরিষ্কার প্রথম-ব্যক্তি দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করা হয়। ফিফার তথ্যমতে, এই প্রযুক্তি ছবির অস্থিরতা প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত কমাতে সক্ষম। এছাড়া ডালাসের আন্তর্জাতিক সম্প্রচার কেন্দ্রে লেনোভোর এআই-চালিত পরিকাঠামো সতেরো হাজারের বেশি ডিভাইস ও দুইশর বেশি প্রকৌশলীর মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার পরিচালনা করছে, যা ষোলোটি ভেন্যু থেকে আসা ফুটেজ প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বজুড়ে পৌঁছে দিচ্ছে।
১৩. নিরাপত্তা ও ক্রাউড ম্যানেজমেন্টে এআই : ২০২৬ বিশ্বকাপে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় এআইয়ের ব্যবহার আগের যেকোনো আসরের চেয়ে ব্যাপক। ‘ইন্টেলিজেন্ট কমান্ড সেন্টার’ নামে একটি ডিজিটাল টুইন ব্যবস্থার মাধ্যমে ষোলোটি ভেন্যুর ভিড় ঘনত্ব বাস্তব সময়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরির আগেই ব্যবস্থা নেওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি স্টেডিয়ামে মুখাবয়ব শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, আর মেক্সিকোর কিছু ভেন্যুতে টহল দিচ্ছে এআইচালিত রোবট-কুকুর। তবে এই ব্যাপক নজরদারি নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে; বিশেষত মুখাবয়ব শনাক্তকরণ প্রযুক্তিতে নারী ও ভিন্ন বর্ণের মানুষদের ভুল শনাক্তির হার তুলনামূলক বেশি হওয়ায়। ব্রাজিল ও চিলির মতো দেশ ইতোমধ্যে স্টেডিয়ামে বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা বাধ্যতামূলক করার আইনও প্রণয়ন করেছে।
১৪. এআইভিত্তিক প্রযুক্তির সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা : এআইভিত্তিক প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সিদ্ধান্তের গতি ও সামঞ্জস্যতা। ইংল্যান্ডের ফুটবল সংস্থার তথ্যমতে, সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি ব্যবহারে গড়ে প্রায় ত্রিশ সেকেন্ড সময় সাশ্রয় হয়। তবে সীমাবদ্ধতাও কম নয়; প্রযুক্তি এখনো বিষয়ভিত্তিক সিদ্ধান্ত, যেমন কোনো খেলোয়াড় প্রতিপক্ষকে বাধা দিচ্ছে কিনা, তা নিজে থেকে বিচার করতে পারে না। দীর্ঘসময় ধরে ভিডিও রিভিউ চলার কারণে মাঠে ও গ্যালারিতে অস্বস্তি তৈরি হওয়ার নজিরও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি রেফারিকে সহায়তা করার জন্য তৈরি, প্রতিস্থাপনের জন্য নয়—তাই মানবিক বিচারবুদ্ধি এখনো খেলাটির কেন্দ্রে থাকছে।
১৫. এআই ব্যবহারে নৈতিক ও আইনি প্রশ্ন : ফুটবলে এআইয়ের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে বেশকিছু নৈতিক ও আইনি প্রশ্নও সামনে এসেছে। খেলোয়াড় ট্র্যাকিং ও বলের তথ্যের একচ্ছত্র মালিকানা থাকে ফিফার হাতে, যা তথ্যের ব্যবহার নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন তোলে। দর্শকদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ নিয়ে গোপনীয়তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। কারণ এই তথ্য প্রায়ই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে জমা থাকে এবং টুর্নামেন্ট শেষেও তা রয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সমালোচকদের মতে, বড় ক্রীড়া আয়োজনকে ব্যবহার করে ব্যাপক নজরদারি অবকাঠামো সাধারণ মানুষের জীবনে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করার একটি প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে গোপনীয়তা অধিকারের জন্য উদ্বেগজনক হতে পারে।
১৬. ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে এআই প্রযুক্তির বাস্তব ব্যবহার : কাতার বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহৃত হয়, যা এর আগে ২০২১ সালের আরব কাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল। একইসঙ্গে ব্যবহৃত হয় সেন্সরযুক্ত ‘আল রিহলা’ বল, যা জার্মান প্রতিষ্ঠান কাইনেক্সনের সহযোগিতায় তৈরি। এই দুই প্রযুক্তির সমন্বয়ে কাতার আসরে অফসাইড সিদ্ধান্ত আগের চেয়ে অনেক দ্রুত ও নির্ভুলভাবে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল, যদিও কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ভক্তদের মধ্যে বিতর্কও হয়েছিল, বিশেষত অত্যন্ত সূক্ষ্ম ব্যবধানের অফসাইড কলগুলোতে।
১৭. ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নতুন কী এআই প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে : ৪৮ দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত সবচেয়ে বড় এই বিশ্বকাপে ফিফা ও লেনোভো একগুচ্ছ নতুন এআই প্রযুক্তি উন্মোচন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘ফুটবল এআই প্রো’ নামের জেনারেটিভ এআই বিশ্লেষণ সহকারী, খেলোয়াড়দের থ্রিডি অ্যাভাটারভিত্তিক উন্নত অফসাইড প্রযুক্তি, স্থিতিশীল ফুটেজসহ নতুন সংস্করণের রেফারি ভিউ, সেন্সরযুক্ত ‘ত্রিওন্দা’ বল এবং ভিড় ব্যবস্থাপনার জন্য ইন্টেলিজেন্ট কমান্ড সেন্টার। এছাড়া কিছু ভেন্যুতে যুক্ত হয়েছে মুখাবয়ব শনাক্তকরণভিত্তিক প্রবেশ ব্যবস্থা ও রোবটিক টহল প্রযুক্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আসরই হতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি এআইনির্ভর টুর্নামেন্ট।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতে ফুটবলে এআইয়ের ভূমিকা আরও বিস্তৃত হবে; রেফারিং থেকে শুরু করে খেলোয়াড় নিয়োগ, প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা ও দর্শক অভিজ্ঞতা, সবখানেই। গবেষণা সাময়িকী ‘নেচার’-এর সঙ্গে কথা বলা ক্রীড়া বিজ্ঞানীরা বলছেন, তথ্যের পরিমাণ বাড়লেও তার গুণগতমান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি প্রযুক্তির সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, তথ্যের নৈতিক ব্যবহার এবং নজরদারির সীমারেখা নির্ধারণ; এই বিষয়গুলো আগামী দিনে ফুটবল প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট- মাঠের সিদ্ধান্ত যত প্রযুক্তিনির্ভরই হোক না কেন, খেলাটির শেষ কথা এখনো বলবেন মানুষ রেফারিই।