আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা


২ জুলাই ২০২৬ ২১:৩১

সক্রিয় হয়ে উঠছে শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপ

বাড়ছে খুন ছিনতাই ধর্ষণ

॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই এখন নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততায় বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাংসহ ছিনতাই চক্র। প্রতিনিয়ত ছিনতাই, চুরি, ধর্ষণ, খুন এবং মাদকের মতো ভয়াবহ ঘটনার বিস্তারে আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্নীতিবাজ একশ্রেণির সদস্যদের প্রশ্রয় এবং ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে আশীর্বাদপুষ্ট টপটেররদের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য অপরাধী চক্র।
বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। তাদের দীর্ঘদিনের আশা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিসহ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ আরও দৃঢ় হবে। তবে তাদের এই আশা অনেকটাই ফিকে হতে শুরু করেছে। বর্তমানে প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও খুন, ধর্ষণসহ ভয়াবহ অপরাধের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষের আতঙ্ক দূর করার জন্য পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে ধরনের দৃশ্যমান তৎপরতা থাকা দরকার, সে ধরনের তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বরং দেখা যাচ্ছে, পুলিশ কেমন যেন আওয়ামী আমলের ধারায় ফিরছে। আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতিতেও তাদের মাঝে নেই বোধোদয়।
সক্রিয় হয়ে উঠছে শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সব সেক্টরের মতো আন্ডার ওয়ার্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মাঝেও নতুন করে মেরুকরণ হয়। একে একে জামিন পায় শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। এদের মধ্যে আছে মিরপুরের আব্বাস, মোহাম্মদপুরের পিচ্চি হেলাল, বাড্ডার ফ্রিডম রাসু, হাজারীবাগের সানজিদুল ইসলাম ইমন প্রমুখ। এছাড়া বিশেষ ক্ষমতা আইনে বন্দি থাকা ৪২৬ দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী জেল থেকে বেরিয়ে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। মুক্তি পেয়ে বেশিরভাগ সন্ত্রাসী পুরোনো আন্ডারওয়ার্ল্ড পুনর্গঠনে তৎপর হয়ে ওঠে। আত্মগোপনে থাকা এসব সন্ত্রাসী এখন ঢাকার অপরাধজগতের নতুন আতঙ্ক। তারা এখন এলাকাভিত্তিক নতুন সাম্রাজ্য গড়ে তুলছে জানা গেছে। কিন্তু পুলিশ এসব গ্রুপগুলোর কাউকেই গ্রেফতার করতে পারছে না।
সূত্র জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা তাদের অনুসারীর মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। সক্রিয় করছে পুরোনো ক্যাডার বাহিনী ও শুটার গ্রুপকে। জমি দখল, চাঁদাবাজি এবং ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা হোয়াটসঅ্যাপ বা সিগন্যাল অ্যাপে বিদেশের নম্বর থেকে ফোন করে ব্যবসায়ীদের নিকট চাঁদা দাবি করছে। আর স্থানীয় সহযোগীরা টাকা সংগ্রহ করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মিরপুর-পল্লবী এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান মামুন বর্তমানে দুবাইয়ে পলাতক রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ২৭টি মামলা রয়েছে। দুবাইয়ে বসেই সে পল্লবীর ঝুট ব্যবসা, ডিশ ব্যবসা ও ফুটপাত থেকে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুর এলাকায় তার গ্রুপের সঙ্গে স্থানীয় প্রতিপক্ষ গ্রুপের বেশ কয়েকটি রক্তাক্ত সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনা ঘটেছে। পল্লবী ও মিরপুর এলাকায় মামুনের পক্ষে মাঠ নিয়ন্ত্রণ করছে তার ভাইসহ যুবদলের পদধারী কয়েকজন বিতর্কিত নেতা। তারা বিহারি ক্যাম্পের একাংশ এবং ইস্টার্ন হাউজিং এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। অন্যদিকে আব্বাসের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযোগীরা কাফরুল, কচুক্ষেত ও ইব্রাহিমপুর এলাকায় পুরোনো চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট পুনরুজ্জীবিত করেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাড্ডা ও রামপুরা এলাকা সবসময়ই আন্ডারওয়ার্ল্ডের জন্য একটি লোভনীয় জোন। এখানে ফ্রিডম রাসু এবং দুবাইয়ে পলাতক জিসানের সহযোগীরা আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে লিপ্ত। এই দুটি গ্রুপ আফতাবনগর ও ডিআইটি প্রজেক্টের বালু ভরাট, ঝুট ব্যবসা, নতুন আবাসন প্রকল্পের জমি দখল এবং অভিজাত এলাকার ব্যবসায়ীদের হুমকি দেয়। বাড্ডার সাঁতারকুল ও বেরাইদ এলাকায় ফ্রিডম রাসুর ভাগনে ও পুরোনো ফ্রিডম পার্টির কিছু ক্যাডার আবার সক্রিয় হয়েছে। তারা স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং ইট-বালু সরবরাহকারীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক কমিশন আদায় করছে। পাশাপাশি জিসানের ‘কন্ট্রাক্ট শুটার’রা গুলশান-বনানীর বড় বড় ব্যবসায়ী ও ডেভেলপার কোম্পানিগুলোকে দুবাই ও মালয়েশিয়ার নম্বর থেকে ফোন করে হুমকি দিচ্ছে।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতা ও সর্বশেষ অবস্থান নিয়ে সরকারের নিকট তথ্য থাকলেও এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেই। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর তেজগাঁও, ফার্মগেট ও কাওরান বাজার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে জামিনপ্রাপ্ত একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে ৯টি হত্যা মামলাসহ গুরুতর অপরাধের অন্তত ২২টি মামলা হয়েছিল। এসব মামলায় দীর্ঘ ২৭ বছর সে কারাগারে ছিল। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সে গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পায়। কাওরান বাজারের কাঁচামালের আড়ত, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ঝুট এবং রেলওয়ের ওয়াগন থেকে পণ্য চুরির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে এই শীর্ষ সন্ত্রাসীর অনুসারীরা। তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়ী এবং কুনিপাড়া এলাকাতেও সক্রিয় এই বাহিনীর সদস্যরা। তারা স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ‘পার্টনারশিপ’ মডেলে চাঁদাবাজি চালাচ্ছে।
তথ্য বলছে, আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাসের নিয়ন্ত্রণে আছে মিরপুর, কাফরুল, কচুক্ষেত ও ইব্রাহিমপুর এলাকা। ঢাকা জেলা জজ আদালত ভবনের সামনে এবং কচুক্ষেতে প্রকাশ্যে ব্যবসায়ী খুনসহ অন্তত ৬টি হত্যা মামলা ছিল তার নামে। সব মিলিয়ে তার নামে মামলা ছিল প্রায় এক ডজন। ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতারের পর ২১ বছর কারাগারে ছিল। কারাগারে বসেই সে মিরপুরের অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করত বলে অভিযোগ আছে। ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট সে জামিনে মুক্তি পায়। এরপর সে দেশ ছেড়েছে। তবে গভীর আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় সে যুগান্তরকে বলে, ‘আমি চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে আছি। আমার বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছিল সবই রাজনৈতিক ও ষড়যন্ত্রমূলক। কোনো ধরনের অপরাধ বা সন্ত্রাসী কার্যক্রমে আমার সংশ্লিষ্টতা নেই।’
জানা গেছে, মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডি এলাকার নিয়ন্ত্রণে আছে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল বাহিনী। হেলালের বিরুদ্ধে ৪টি হত্যা মামলাসহ ৮টি গুরুতর মামলা ছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় ছিল তার নাম। ২০০১ সালে সে ডিবির হাতে গ্রেফতার হয়। প্রায় ২৩ বছর পর ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট সে জামিনে মুক্তি পায়। এর পরপরই মোহাম্মদপুর এলাকায় অপরাধমূলক তৎপরতা এবং জমি দখল-চাঁদাবাজির ঘটনা বেড়ে যায়। মাদক কারবার, লেগুনা ও বাসস্ট্যান্ডের জিপি (গেট পাস) আদায় এবং জেনেভা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারে লিপ্ত হয় হেলাল বাহিনীর সদস্যরা। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জেনেভা ক্যাম্পের বেশ কয়েকজন অস্ত্রধারী মাদক কারবারি। তারা স্থানীয় হাউজিং কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ‘প্রজেক্ট সাইন’ বাবদ মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করছে।
শীর্ষ সন্ত্রাসী খোরশেদ আলম রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসুর অপতৎপরতা ধানমন্ডি, কলাবাগান ও বাড্ডা এলাকায় বেশি। ১৯৮৯ সালে ধানমন্ডিতে শেখ হাসিনার বাসভবনে হামলা এবং পুলিশ কর্মকর্তা হত্যাসহ অন্তত ১৩টি মামলা ছিল তার নামে। সে ‘ফ্রিডম পার্টি’র ক্যাডার ছিল। দুই দশকেরও বেশি সময় কারাবন্দি থাকার পর ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট সে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পায়।
ধানমন্ডি, কলাবাগান ও জিগাতলা এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অভিযোগ সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে কলাবাগান ইমনের বিরুদ্ধে। চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলা এবং বহুল আলোচিত ট্রানজিট গালিব হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ইমন। ২০০৮ সালে ভারত থেকে তাকে গ্রেফতার করে ঢাকায় আনা হয়। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট সে জামিনে কারামুক্ত হয়। মুক্তি পেয়েই পুরোনো সিন্ডিকেট পুনর্গঠনের চেষ্টায় সক্রিয় হয়। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ইমন বাহিনী রেস্টুরেন্ট, শোরুম ও ফ্ল্যাট নির্মাণে নীরব চাঁদাবাজি করছে। নতুন কোনো বহুতল ভবন নির্মাণ করতে গেলে ইমনের লোকজনকে বিশাল অঙ্কের ‘টোকেন মানি’ দিতে হচ্ছে।
খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের নিয়ন্ত্রিত এলাকা ছিল রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট, গুলশান ও বনানী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকার ২ নম্বর শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিলেন টিটন। তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি হত্যা ও অস্ত্র মামলা ছিল। ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে ডিবির হাতে পিস্তলসহ গ্রেফতার হয়। দীর্ঘ ২১ বছর পর ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি জেল থেকে জামিনে মুক্তি পায়। ২৯ এপ্রিল সে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়।
পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধ : এক বছরে প্রায় ১৭ হাজার মামলা
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য বলছে, এক বছরে ঢাকায় বিভিন্ন অপরাধে ১৬ হাজার ৯২৬ মামলা দায়ের হয়েছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এত মামলার ফলে খুন, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, মাদক, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি, প্রতারণা থেকে শুরু করে সাইবার অপরাধ সব মিলিয়ে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। সাধারণত থানা পুলিশ বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন ঘটনা ঘটলেও মামলা নিতে অপারগতা প্রকাশ করে। কিন্তু এত মামলায় ক্রাইমের আধিক্য ও ভয়াবহতা আঁচ করা যাচ্ছে।
ডিএমপির ৮টি বিভাগের ৫০টি থানার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৬টি মামলা। সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য যেখানেই থাকুক সেগুলো নির্মূল করা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য যেখানেই থাকুক, সেগুলো নির্মূল করা হবে। আমরা আশা করি, আপনারা সবাই সহযোগিতা করবেন এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষ আমাদের এ উদ্যোগকে সমর্থন ও সহযোগিতা করবেন। আমরা এ দেশে কোনোভাবেই সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী এবং চাঁদাবাজদের স্থান দেব না।
সাড়ে ৫ মাসে ৯৮ খুন
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পরিসংখ্যান বলছে, বিগত সাড়ে পাঁচ মাসে শুধু রাজধানীতেই খুনের ঘটনা ঘটেছে ৯৮টি। এর মধ্যে মে মাস পর্যন্ত ৯৪টি এবং সমাপ্ত জুন মাসে চারটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া জুন মাসে তিনটি প্রকাশ্যে গুলি করে প্রতিপক্ষকে আহত ও টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে। সব মিলিয়ে ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং সাধারণ মানুষের আতংক প্রতিফলিত হয়েছে।
ডিএমপির তথ্যমতে, মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে জানুয়ারিতে খুনের ঘটনা ঘটেছে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি, মার্চে ২৪টি, এপ্রিলে ১৭টি এবং মে মাসে ১৬টি। জানুয়ারি ও মার্চে খুনের ঘটনা তুলনামূলক বেশি ছিল।
অন্যদিকে অন্যান্য অপরাধের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও দস্যুতার ঘটনা মোটামুটি একই হারে চলমান রয়েছে। নগরীতে সবচেয়ে বেশি বাড়ছে নারী ও শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনা। রামিসার মতো কিছু ঘটনা মিডিয়ায় আসলে আলোচনায় আসে, কিন্তু বেশির ভাগ ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে।
গত পাঁচ মাসে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনায় এপ্রিল ছিল সবচেয়ে বেশি ঘটনার মাস। ওই মাসে ৭০টি ঘটনা ঘটে। তার আগের ও পরের মাসে ৫৬টি করে ঘটনা ঘটেছে। বেশিরভাগ ঘটনায় মামলা হচ্ছে না। যেসব ঘটনা কোনোভাবে চেপে রাখা যাচ্ছে না, সেগুলোই থানায় মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও মামলা হওয়ার পর সালিশ-মীমাংসার ঘটনাও ভেতরে ভেতরে ঘটছে। পাঁচ মাসে নারী ও শিশু ধর্ষণের গড় ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেড়েছে।
ডিএমপির তথ্যমতে, মে মাসে ডাকাতি ২টি, দস্যুতা ৩৩টি, খুন ১৬টি, নারী ও শিশু ধর্ষণ ৫৬টি, অপহরণ ১৩টি এবং অন্যান্য অপরাধে ১ হাজার ৩৬৫টি মামলা হয়েছে। এপ্রিলে ডাকাতি ৩টি, দস্যুতা ২৫টি, খুন ১৭টি, নারী ও শিশু ধর্ষণ ৭০টি, অপহরণ ২১টি এবং অন্যান্য অপরাধে ১ হাজার ৪৮৮টি মামলা হয়েছে। মার্চে ডাকাতি ৫টি, দস্যুতা ২৫টি, খুন ২৪টি, নারী ও শিশু ধর্ষণ ৫৬টি, অপহরণ ২০টি এবং অন্যান্য অপরাধে ১ হাজার ৩০৫টি মামলা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ডাকাতি ৩টি, দস্যুতা ২৩টি, খুন ১৬টি, নারী ও শিশু ধর্ষণ ৩৭টি, অপহরণ ১২টি এবং অন্যান্য অপরাধে ১ হাজার ৪১টি মামলা হয়েছে। জানুয়ারিতে ডাকাতি ৪টি, দস্যুতা ২৯টি, খুন ২১টি, নারী ও শিশু ধর্ষণ ৩৮টি, অপহরণ ১৪টি এবং অন্যান্য অপরাধে ১ হাজার ৩৫২টি মামলা হয়েছে।
নগরীতে একের পর এক দস্যুতার ঘটনা ঘটছে, কিন্তু সেগুলো তেমন আলোচনায় আসছে না। থানায় মামলা হওয়ার পর শুধু সংখ্যাই জানা যাচ্ছে। ফলে গত পাঁচ মাসে এ ধরনের অপরাধ কমেনি, বরং প্রায় একই হারে চলছে। কারণ পুলিশ শুধু মামলা নিয়েই দায়িত্ব শেষ করছে।
নির্লিপ্ত পুলিশ
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অধিকাংশই ঢাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসী এবং তাদের সহযোগীদের তালিকা করা হয়েছে। খুব শিগগির তাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হবে।
শীর্ষ সন্ত্রাসী ও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, তাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে মুক্তি পেয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। আবার অনেকে অপরাধজগতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। যারা আবার অপরাধজগতে সক্রিয় হচ্ছে, অপরাধী চক্রকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে, তাদের অবশ্যই গ্রেফতার করা হবে। এসব অপরাধী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মুক্তি পাওয়া সন্ত্রাসীরা আবার অপরাধে জড়াচ্ছেন কি না, তা নজরদারিতে রাখা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে মনে হয়, তাদের কার্যকর নজরদারির মধ্যে রাখা যায়নি। অপরাধীরা যাতে কোনোভাবেই রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে।