সম্পাদকীয়

জুলাই গণহত্যাকারীদের বিচারে আর বিলম্ব নয়


১ জুলাই ২০২৬ ২১:৪৩

উপমহাদেশের পাঁচশত বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। শুধু এ জনপদ নয়, সারা পৃথিবীর মানুষ সাক্ষী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসকগোষ্ঠী অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল ও আঁকড়ে রাখতে কেমন নির্মম নিষ্ঠুর গণহত্যা চালিয়েছে। জুলাই-আগস্ট মাসের আন্দোলন এবং এর আগে সাড়ে সতেরো বছর হাসিনার দুঃশাসনে বাংলাদেশ প্রথমে একটি বড় জেলখানা এবং পরে বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিলো। জুলাই-আগস্টের কয়েকদিনেই প্রায় দুই হাজার বনি আদম শাহাদাতবরণ করেছেন। পঙ্গুত্ববরণ করেছেন প্রায় অর্ধ লাখ। যাদের মধ্যে অনেকে এখনো নির্মম যন্ত্রণা সহ্য করে হাসপাতালের বিছানায় চিকিৎসাধীন আছেন। শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনে অংশ নেয়া এদের অধিকাংশই নিরস্ত্র শান্তিপ্রিয় কিশোর-তরুণ। স্বজনরা তাদের প্রিয় মানুষটির হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায়। তাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনকারী জালিমের বিচার চায়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়ে আছে। কিন্তু তিনি ভারত সরকারের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকায় রায় কার্যকর করা নিয়ে সংশয় কাটেনি। অন্তর্বর্তী ও বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারের কাছে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ফেরত চাওয়া হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। কিন্তু ভারত বন্দিবিনিময় চুক্তির তোয়াক্কা করছে না। হাসিনা ছাড়াও তাদের আশ্রয়ে আছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ আরো অনেকে। গণহত্যায় সরাসরি অংশ নেয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎকালীন ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের অনেকেই আছেন তাদের সাথে। বিষয়টি উদ্বেগজনক। কারণ কথায় আছে, ‘নরমাংসের স্বাদ একবার যে বাঘ পায়, তাকে, হত্যা না করলে সে সুযোগ পেলে নরহত্যা করতে ছাড়ে না।’ তাই হত্যাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা ছাড়া শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আর বিচারকাজ বিলম্বিত মানে বিচারকে অস্বীকার করা। ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী William Ewart Gladstone (উইলিয়াম ইওয়র্ট গ্ল্যাডস্টেন)-এর ভাষায়, ‘Justice delayed is justice denied.’ সব বিচারের ক্ষেত্রেই কথাটি প্রযোজ্য। অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনবিরোধী গণহত্যাকারীদের খুনিদের বিচার বিলম্বিত করার মাধ্যমে বিচার অস্বীকার ইতিহাসের একটি দায় পূরণের ব্যর্থতা। যার খেসারত ইতোমধ্যেই সরকার ও সাধারণ জনগণকে দিতে হচ্ছে। ফ্যাসিস্টদের দোসররা নতুন নতুন অপরাধ করছে। সরকার ও বিরোধীদলের নেতাদের হত্যা করছে। পুলিশকে জানে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে, যা রীতিমতো রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল।
তাই আর বিলম্ব নয়। যত দ্রুত সম্ভব জুলাই আন্দোলনবিরোধী গণহত্যাকারী খুনি ও তাদের দোসরদের বিচার করতে হবে। বিচারের রায় বাস্তবায়ন করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং জুলাইযোদ্ধার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অঙ্গীকার, এ কথা ভুলে গেলে যে বিপদের আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীকে নয়, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করবে, যা কারো কাম্য নয়।